‘স্বাদেশিকতার ধারা যেখানে সর্বহারার আন্তরিকতার সাগরে গিয়ে মিশেছে, সেই মোহনায় গণসংগীতের সৃষ্টি।’ এমনি চিন্তার সূত্রস্থল উপমহাদেশের কিংবদন্তি সুরস্রষ্টা, বলিষ্ঠ গায়ক-সংগঠক হেমাঙ্গ বিশ্বাস। তিনি এ ধারণা আদর্শ হিসেবে নিজ জীবন-সংগ্রামে ও ধারায় যেমন গ্রহণ করেছিলেন, তেমনি সমাজবদ্ধ মানুষগুলোর জীবনেতিহাস পরিবর্তনের জন্য, শ্রেণীবৈষম্যের সমাজকে ভেঙে নতুন দুনিয়া গড়তে আজীবন লড়াই-সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্বাসে সমাজতন্ত্র তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল বলেই তাঁর লেখায়, গানে, সুর সংযোজনা, এমনকি গায়কিতেও সেই সংগ্রামেরই দৃঢ়প্রত্যয় ঘোষিত হয়েছে। আপসহীন জীবনযোদ্ধা এই মহান শিল্পীযোদ্ধা কখনোই পরাজয় মানেননি, আপস করেননি কোনো গণবিরোধী লোভনীয় বস্তু বা ঘটনার কাছে। সাদামাটা জীবনের এই শীর্ণদেহ অসুস্থ মানুষটি তাই যত দিন বেঁচেছিলেন, তত দিনই সত্যিকার মানুষ হিসেবে বাঁচার অভীষ্ট লক্ষ্যে আপসহীন জীবন যাপন করে গেছেন। শোষণমুক্তির লড়াইয়ে কমরেড হেমাঙ্গ বিশ্বাস প্রচলিত দাম্ভিক-শোষিত সমাজকে ভাঙতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ আর জাতীয়তাবাদে প্রলুব্ধ রাজনীতিকদের লোভনীয় স্বার্থবাদী আঁতাত তৎকালীন ভারতবর্ষকে স্বাধীনতাযুদ্ধে স্থির লক্ষ্যে পৌঁছতে দেয়নি। সেদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অস্তগামী সূর্যের স্বাভাবিক লাল আভায় রক্তিম দেশটিকে অকস্মাৎ দ্বিজাতিতত্ত্বের চক্রান্তজালে জড়িয়ে মানুষে-মানুষে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি এবং সম্পদ হরণে নিঃস্ব করে ষড়যন্ত্রের কৌশলে বেঁধে ফেলেছিল এবং দেশীয় রাজনীতিকরা প্রলুব্ধ হয়েছিল তথাকথিত স্বাধীনতার নামে নতুন এক চক্রান্তে। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি মানুষকে প্রলুব্ধ করেছিল বটে, কিন্তু কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষ তথা এ দেশের সাধারণ মানুষের মনের প্রত্যাশা সেই স্বাধীনতা, যা দিয়েছিল ব্রিটিশ বেনিয়া সাম্রাজ্যবাদ এবং মেনে নিয়েছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং নিখিল ভারত মুসলিম লীগ, তা কি আদৌ সার্বিক জনগণের শোষণমুক্তির ‘স্বাধীনতা’ ছিল ? হেমাঙ্গ বিশ্বাসরা যে গণমুক্তির চিন্তায় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেছিলেন, সেখানে তো এই কপটতা ছিল না। সুস্পষ্টভাবে তাঁদের বিশ্বাস, আকাঙ্ক্ষা ও লড়াই ছিল শ্রেণীশোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন।
হেমাঙ্গ বিশ্বাস সমাজসচেতনতা ও শ্রেণীসংগ্রামে ঋদ্ধ এক রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে এসেছিলেন। তাই রচনা করেছিলেন আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাসী সর্বহারা মানুষের গান। নৌ-বিদ্রোহ, তেভাগা সংগ্রাম, কাকদ্বীপ-তেলেঙ্গানা-মালাবারের লড়াই তাঁর বিশ্বাসে সৃজনশীলতার প্রবল শক্তি সঞ্চার করেছিল। বাংলার শীর্ণকায়-শোষিত কৃষকের ন্যায্য অধিকারের দাবি প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তিনি লিখেছিলেন :
‘কাস্তেটারে দিও জোরে শাণ,
কিষান ভাই রে
কাস্তেটারে দিও জোরে শাণ।
ফসল কাটার সময় হলে কাটবে সোনার ধান
দস্যু যদি লুটতে আসে কাটবে তাহার জান রে।
শাণ দিও, জোরসে দিও, দিও বারে বার
হুঁশিয়ার ভাই, কভু তাহার, যায় যেন ধার রে।’
শিল্পী-সুরস্রষ্টা হেমাঙ্গ বিশ্বাস যে রাজনৈতিক আদর্শকে ধারণ করেছিলেন, তারই প্রত্যয়ে তিনি শোষিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই ও লড়াই-পদ্ধতি নির্দেশ করেছেন। আদর্শিক বিশ্বাস ও রাজনীতি তাঁকে গণসাংস্কৃতিক আন্দোলনে যেভাবে ঋদ্ধ করেছিল, সেই চেতনা থেকে তিনি কখনো সরে দাঁড়াননি। যোদ্ধা হিসেবে হাতিয়ার হাতে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তাইতো তিনি ‘কপট’ স্বাধীনতাকে ব্যঙ্গ করে লিখেছিলেন :
‘মাউন্টব্যাটেন সাহেব ও/তোমার সাধের ব্যাটন কার হাতে/থুইয়া গেলায়ও।’
এই ব্রিটিশ ‘মাহাত্ম্য’ ও স্বাধীনতাসংগ্রামীদের কপট আপসকামী রাজনীতিকে কটাক্ষ করে তিনি ভারতে বসেই লিখেছিলেন :
‘নয়াদিল্লিতে ঘোর কলিতে/আইলা কল্কি অবতার- কি বাহার,/পতিত ভারত করিতে উদ্ধার/বড় বড় নেতা দিলা পায়ে ধর্ণা/তপস্যায় লভিলেন বর অন্নপূর্ণা।’
বিশাল এই ‘মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্যে’ তিনি সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা কিভাবে ধসে গেছে, তার বর্ণনা দিয়েছেন। আবার এ-ও বলতে ছাড়েননি- ‘রাজভোগ খাওয়াইবো বইলা খাওয়াইলো কাঁচকলা।’ এই কাব্যগানে ‘রঘুপতি রাঘব মাউন্টব্যাটেন’ বলে উদ্বাহু হয়ে নৃত্য করার ডাক দিয়েছিলেন শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস। ‘স্বাধীনতা’ পেয়ে ভারতকে কী দুরবস্থায় ফেলে গেল, মানুষ কিভাবে বিপন্ন হলো, তার বর্ণনা দিয়েছেন এবং এই বিশাল মঙ্গলকাব্যে ব্যঙ্গাত্মক রচনায় মানুষের চোখ খুলে দিয়েছিলেন। আজও সেই পরাশক্তির আগ্রাসন বেড়েছে এবং জনগণের দুরবস্থার অবসান তো হয়ইনি, বরং যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ শাসকরা জনগণকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিল ভ্রাতৃত্ববোধ, মৈত্রীর বন্ধন থেকে, তাকে আজ মদদ দিয়ে চাঙ্গা করে রেখেছে ওই পুঁজিবাদী লুটেরা শোষকরা। সমাজের সব সুযোগ গ্রহণ করে ভোগবিলাসে মত্ত হতে তারা নিপীড়ন চালায় সাধারণ মানুষ- যারা উৎপাদনের প্রধান শক্তি, তাদেরই ওপর। এই উৎপীড়নে সমাজের বিত্তশালী-লোভী যারা, তারা তাদের স্বার্থোদ্ধারে মত্ত হয়ে ওই উৎপাদনীশক্তি মহান জনগণকেই হেনস্তা করতে চক্রান্ত করতে থাকে। তাদের ধারণা, একজনকে শোষণ করলেও পেটের দায়ে আরেকজনকে পেয়ে যাবে। কিন্তু এই বঞ্চিত, শোষিত মানুষ যখন ক্ষোভে-ক্রোধে একত্র হয়, তখনই যে বিস্ফোরণ ঘটে, তা তারা কল্পনা করতে পারে না। আর পারে না বলেই ঔদ্ধত্য, দাপট দেখিয়ে শোষণপ্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার অপচেষ্টা করতে থাকে। কমরেড হেমাঙ্গ বিশ্বাস এদের প্রলোভন-শোষণ প্রক্রিয়ার মধ্যে সাধারণ মানুষকে যেমন সংগঠিত করতে কণ্ঠকে শাণিত করেছেন, তেমনি সুরের বলিষ্ঠতা ও লোকপ্রিয় ধারাকে আশ্রয় করে সব মানুষকে সচেতন করেছেন আন্দোলন-সংগ্রামের পথে। তাইতো তিনি রাজনৈতিক আদর্শচিন্তা দিয়ে বিচার করতে পেরেছেন এবং তাঁরই বলিষ্ঠতায় নিজেকে যেমন নির্মাণ করেছিলেন, তেমনি সুর বেঁধেছেন জোর কদমে সামনে এগিয়ে চলার জন্য। তাঁর গানে তাই যেমন রাজনৈতিক ঘটনা কিংবা সময়ের ইতিহাস পাওয়া যায়, তেমনি রাজনৈতিক শিক্ষা বা করণীয়, এমনকি কোন প্রক্রিয়ায় মানুষকে এগোতে হবে, তারও নির্দেশ, চিন্তাভাবনা পাওয়া যায়।
শিল্পী-সংগ্রামী হেমাঙ্গ বিশ্বাস ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, তেতাল্লিশের মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশে দেশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভয়াল থাবা, তেভাগা আন্দোলন, নৌ-বিদ্রোহ, তেলেঙ্গানা লড়াই থেকে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাচৈতন্যেসমৃদ্ধ সংগীত রচনা করেছেন। সমাজের স্বঘোষিত প্রধানদের সৃষ্ট অন্যায়-অবিচারকে রুখে দিতে তাঁর কলমে, গলায় আগুন ঝরে পড়েছে। মানুষের বিরুদ্ধে চক্রান্ত প্রতিরোধ করতে সাহস, শক্তি ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন নিরন্তর। মানুষকে ভালোবেসে তাদের কল্যাণের কথা ভেবেছেন অহর্নিশ। তাইতো তাঁর রচনা থেকে শঙ্খচিল, জন হেনরির মতো কাহিনীকাব্য এবং প্রচণ্ড উদ্দীপনাময় সুরসমৃদ্ধ সাহসী প্রয়াস। রাজনৈতিক শিক্ষার উপাখ্যান। তাইতো তিনি লিখেছেন :
‘বাজে ক্ষুব্ধ ঈশানি ঝড় রুদ্র বিশান/ইনকিলাবি আহ্বান- /নিথর জলধিজলে জাগে উতরোল/বিশ্ব-গগনে উঠে জীবন হিল্লোল
তাঁর আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতি আদর্শিক আনুগত্যেরই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু সেই সঙ্গে তাঁর স্বদেশ মুক্তি, মানুষের বিপন্নতাকে মোচনের, শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা কখনোই ভোলেননি। তাই তিনি লিখেছেন :
‘আজাদী হয়নি আজও তোর/নববন্ধন শৃঙ্খল ডোর/দুঃখরাত্রি হয়নি ভোর/আগে কদম কদম চল জোর।’
ভারতের অদম্য স্বাধীনতাস্পৃহাকে যখন মনুষ্যসৃষ্ট মন্বন্তর এবং ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা দমন করতে ব্যর্থ হলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, তখন ভারত ভূখণ্ডকে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভোঁতা ছুরিতে দুই টুকরো একটি মুসলমানদের দেশ বানিয়ে মুসলিম লীগের হাতে এবং হিন্দুদের জন্য জাতীয় কংগ্রেসের হাতে পাকিস্তান ও হিন্দুস্তান তুলে দিয়ে এ দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হলো বটে, কিন্তু ‘বিষাক্ত আগাছা’ বুর্জোয়া সামন্ততান্ত্রিক চলন-বিধান চাপিয়ে দিয়ে গেল- যা তারাই দীর্ঘ দুঃশাসনের সময় তৈরি করেছিল। তাই তথাকথিত ‘আজাদী’ প্রত্যাশিত পথে বাস্তবায়িত হয়নি, যেমনটি আমরা পাকিস্তানি লীগশাহির শাসনকালে প্রত্যক্ষ করেছি। ফলে দেশের কৃষক-মজুর-ছাত্র-জনগণ সবাই ঘৃণায় ক্রুদ্ধ হয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল ১৯৭১-এ। সংঘটিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিসংগ্রাম পর্যন্ত আমাদের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক জীবনে যে বৈষম্য, বৈরিতা নিষ্পেষিত করেছিল বাংলার সব মানুষকে- তখন থেকেই ওই ‘আজাদী’ আমাদের কাছেও যে অর্থহীন হয়ে গিয়েছিল একাত্তর তো তারই প্রকাশ। এই ক্রোধের বিস্ফোরণে গণসংস্কৃতির উপাদান ছিল বিশাল, আর সেই বিপুল সমাবেশ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, তাতে ছিল অন্যতম হাতিয়ার- সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতিকে গণমানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ। উপমহাদেশের লোকপ্রিয় গণসংগীত স্রষ্টা সুরকার শিল্পী সংগ্রামী হেমাঙ্গ বিশ্বাস যেমন রাজনৈতিক আদর্শে সমাজতন্ত্রে ছিলেন বিশ্বাসী আমৃত্যু, এখানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আপসহীন ছিলেন জীবনভর। এমনকি নিজেদের মধ্যেও যদি দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকত, সেখানেও তিনি আদর্শকেই সমুন্নত রেখেছেন। মানুষকে সত্য ও ন্যায় নয়, কেবল মানুষের পক্ষে থাকার জন্য সাহস জোগান দিয়েছেন।
মানুষকে ভালোবাসতেন বলেই একদিন যে যুবক বাবার অন্যায় শোষণকে প্রশ্রয় না দিয়ে বিদ্রোহ করে গৃহত্যাগ করেছিলেন নিপীড়িত কৃষকশ্রেণীর পক্ষে, তিনি চুনারুঘাটের মিরাশি গ্রামের মাটি থেকেই উল্কার মতো ছুটে বেরিয়ে হবিগঞ্জ, সিলেট শহর হয়ে আসাম, তারপর পশ্চিম বাংলার কলকাতায় উড়াল দিয়ে পড়েছিলেন। জীবনের যৌবন সৃষ্টি হয় এসব স্থানেই। যৌবনের জিয়ট তিনি কাজে লাগিয়েছেন রাজনীতিসম্পৃক্ত গণসংস্কৃতির বিশাল অঙ্গনজুড়ে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আমলে যাঁর জন্ম, তিনি শোষণ-নিপীড়ন, মহাদুর্ভিক্ষ বোম্বাইয়ের নৌ-বিদ্রোহ, তেলেঙ্গানা-কাকদ্বীপের গণসংগ্রাম, গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং- বীভৎস ভ্রাতৃঘাতী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক ও লোকগ্রাহ্য, গণনাট্য সংঘের যোদ্ধা হিসেবে। অবহেলিত বিশাল কৃষক সমাজ যখন জমিদার-জোতদারদের বিরুদ্ধে চল্লিশের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে প্রবল প্রতাপে নিজ দাবি প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সংঘবদ্ধ, তখনো তিনি, তাঁর আদর্শ ও সহযোদ্ধারা তাঁদের পাশে। সেই তেভাগার দাবি তখন গণনাট্য সংঘের প্রধান বিষয় ছিল লড়ার। তাইতো হেমাঙ্গ বিশ্বাস-সলিল চৌধুরীরা লিখেছেন, সুর দিয়েছেন এবং গেয়েছেন মানুষকে কৃষক যোদ্ধাদের পাশে টেনে আনার জন্য। হেমাঙ্গ বিশ্বাস লিখলেন :
‘কাস্তেটারে দিও জোরে শাণ কিষান ভাই রে’
শুধু গান গেয়েছেন তা-ই নয়। কৃষকশ্রেণীর আদর্শভিত্তিক লড়াইয়ের পাশে সচেতন মানুষকে সংঘবদ্ধ হতে বলেছেন এবং লড়াকু চাষিদের বলেছেন, ‘কাস্তেটাতে শাণ দিও জোরসে এবং বারবার, যেন তার ধার নষ্ট না হয়। এই কাস্তে দিয়ে কাটবে সোনার ধান, যদি দস্যু আসে তোমার এ ন্যায্য প্রাপ্য লুটতে, কাটবে তার জান।’ এই হিম্মতি সিদ্ধান্ত এবং সংগ্রামের ডাক দিয়ে কয়জন পেরেছেন শেষ পর্যন্ত এই লড়াই জারি রাখতে ? কিন্তু তখনকার মরণরোগ যক্ষ্মা-আক্রান্ত শীর্ণকায় মানুষটি পেরেছিলেন সেই সিদ্ধান্তে অটল থাকতে।
শিল্পীযোদ্ধা হেমাঙ্গ বিশ্বাস আন্তর্জাতিকতাবাদের আদর্শে বিশ্বাসী মানুষ, কর্মী, সংগঠক ছিলেন বলে বিশ্বের তাবৎ মানুষের মুক্তিসংগ্রামেরও তিনি সঙ্গী ছিলেন। কিন্তু এই বাংলা, যাকে পাকিস্তানিরা ‘মাশরেকি পাকিস্তান’ বানিয়েছিল এবং এই বঙ্গের সব মানুষের মাতৃভাষাকে উচ্ছেদ-বিলুপ্তির যে চক্রান্ত করেছিল, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল ছাত্রসমাজ অগ্রণী হিসেবে। কিন্তু জমায়েত হয়েছিল সব মানুষ ক্রমশ সংঘবদ্ধ শক্তির পতাকাতলে, সেখানে হবিগঞ্জে জন্মগ্রহণকারী মাটির সন্তান হিসেবে আমাদের হেমাঙ্গদারও প্রাণ কেঁদে উঠেছিল ১৯৫২ সালে ছাত্র-হত্যায়। তাই তিনি রচনা করেছিলেন ‘শোনো এক আচানক কাহিনী’। দৃঢ় প্রত্যয়ে সংগ্রামের অগি্নশিখা প্রজ্বালন করেছিলেন তিনি জন্মস্থানের অকুতোভয় লড়াকু ছাত্রসমাজের আন্দোলনে।
শুধু কি তাই, পাকিস্তানি দুঃশাসনে সাম্প্রদায়িক মুসলিম লীগের নিপীড়ন-নির্যাতন, শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমরা যখন রাজনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক লড়াই করলাম এই রক্তের শপথে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে, তখন তো আমরা ভারতীয় গণনাট্য সংঘের গান দেখেই যাত্রা শুরু করেছিলাম। আর সেখানে হেমাঙ্গ বিশ্বাসও আমাদের অনুপ্রেরণা ও সাহসের উৎস হয়ে উঠেছিলেন। তাইতো আমরা যখন চূড়ান্ত যুদ্ধে লিপ্ত হলাম, তাঁদের গানকে অস্ত্র হিসেবে নিয়ে, তখনো হেমাঙ্গ বিশ্বাস আমাদের সঙ্গে ছিলেন। কেবল যে তাঁর গানকেই ব্যবহার করেছি হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও প্রত্যাঘাতে পরাজিত করার লড়াইয়ে তা-ই নয়, আমাদের সহযোদ্ধা তরুণ সঙ্গীদের কেউ কেউ তাঁর কাছে গেছেন। তাঁদের গান শিখিয়েছেন তিনি। যদিও তাঁর শেখানো গান আমরা সঠিকভাবে পরিবেশন করতে পেরেছি কি না, তা নিয়ে বিতর্ক ও ক্ষোভ আছে। তা সত্ত্বেও এ দেশের প্রগতিশলী আদর্শবাদী সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী বা সংগঠন, তারাও হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানকে মানুষের সত্যিকার মুক্তির লক্ষ্যে, দেশটাকে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে রূপান্তর করার লক্ষ্যে গেয়ে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজ করে চলেছে।
আজ তাঁর জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনে আমরা পর্ষদ গঠন করে, যদিও ১৪ ডিসেম্বর ১৯১২ সালে তাঁর জন্ম, তবু ২১, ২২, ২৩ ও ২৪ ডিসেম্বর চার দিনব্যাপী উৎসব অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিলাম। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী উদ্বোধন করেছিলেন একুশের বিকেলে। পরদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার হলে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় হেমাঙ্গদাকে নিয়ে। প্রবন্ধ রচনা ও উপস্থাপনা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সংগ্রামী সম্পাদক আনু মুহাম্মদ। প্রবন্ধ নিয়ে আলোচনা করেন ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক শান্তনু কায়সার, সংস্কৃতি সংগঠক-সাহিত্যিক মহসীন শস্ত্রপাণি। সেদিন এবং পরদিন ২২ ও ২৩ ডিসেম্বর রবীন্দ্রসরোবরে সন্ধ্যায় হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান পরিবেশন করা হয়। এতে সংগীত পরিবেশন করে সৃজন, বিবর্তন, স্বাধিকার, মাভৈ, সমগীত, গণশিল্পী আনন্দন। তৃতীয় দিনে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কন্যা এবং কলকাতার মওলানা আজাদ কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক রঙ্গিলা বিশ্বাস সমবেত শ্রোতৃমণ্ডলীকে শুভেচ্ছা জানান এবং উদ্যাপন পর্ষদকে অভিনন্দিত করেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরুতে যুগ্ম আহ্বায়ক মফিজুর রহমান লাল্টু, গণসংস্কৃতি কেন্দ্রের সভাপতি হায়দার আনোয়ার খান জুনো এবং মহসীন শস্ত্রপাণি।
২৪ ডিসেম্বর চুনারুঘাটের মিরাশি গ্রামে তাঁর বাড়ি- যে জমি বেদখল হয়ে গেছে- তারই সামনে ক্ষেতের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে সুদৃশ্য প্যান্ডেলে বিশাল মঞ্চ সাজিয়ে চুনারুঘাট সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদের সহযোগিতায় সমাপনী অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল। অনুষ্ঠানে সভাপতি ছিলেন সাংবাদিক সালেউদ্দিন। বক্তৃতা করেন স্থানীয় বক্তারা, মৌলভীবাজারের সাংস্কৃতিক সংগঠক মাহফুজুর রহমান, সিলেটের সাংস্কৃতিক উদ্যোক্তা কবি শুভেন্দু ইমাম, হবিগঞ্জ মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ জাহানারা খাতুন, স্থানীয় কলেজের প্রিন্সিপাল রঙ্গিলা বিশ্বাস ও কামাল লোহানী। এক অসাধারণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শীতের প্রচণ্ড কাঁপন আর গাঢ় ঘন কুয়াশাকে পরাজিত করে গ্রামের অগণিত মানুষের জমায়েত রাত ৯টা পর্যন্ত হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান ও তাঁর জীবনকথা শুনে উদ্দীপ্ত হয়েছেন। তাঁদের প্রতি সালাম। আর সেই সঙ্গে কমরেড হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা ও রক্তিম অভিনন্দন। কথা দিলাম- বুকের ভাঙা পাঁজরেই নয়া বাংলা গড়ে আমরা তুলবই।