হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁর ছাত্রজীবন শুরু করেছিলেন মিত্র ইনস্টিটিঊট স্কুলে। ছাত্র হিসাবে তিনি যে ভালই তা মাস্টারমশাইরা কিছুদিনের মধ্যেই বুঝে ফেলেন। কিন্তু গোল বেঁধে গেল ম্যট্রিক পরীক্ষার কয়েক মাস আগে। স্কুল থেকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে তাড়িয়ে দেওয়া হয় ম্যাট্রিক পরীক্ষার তিন মাস আগে।
স্কুলের ভাল ছাত্রকে এধরনের শাস্তি কেন? টিফিনের সময় যখন সব ছাত্র টিফিন খায়, খেলাধুলো করে তখন হেমন্ত টেবিল বাজিয়ে গান গায়। পঙ্কজকুমার মল্লিক থেকে শুরু করে শচীন দেব বর্মণের রেকর্ডের গান সে একের পর এক গেয়ে চলে আর তার জেরে এমন এক পরিবেশের সৃষ্টি হয় যাতে ক্ষুব্ধ হয়ে স্কুল কতৃপক্ষ রেজিস্টার থেকে তাঁর নাম কেটে দেয়। কারণ তাঁরা হেমন্তর গান ঘিরে হইচই, হট্টগোল সামাল দিতে পারছেন না। বাবার ধরাকরায় অবশেষে হেমন্ত ম্যাট্রিক পরীক্ষায় বসতে পারেন এবং প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।

বাবার ইচ্ছেকে মর্যাদা দিয়ে হেমন্ত ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শুরু করেছিলেন কিন্তু গান যে তাঁর মন প্রাণ জুড়ে। তাই যে বন্ধুর বাড়িতে তাঁর হারমোনিয়াম বাদন মকশো সেই সুভাষ মুখোপাধ্যায় অসিতবরণকে অনুরোধ করায় তিনি হেমন্তকে রেডিওতে অডিশনের ব্যবস্থা করে দেন। তখন অসিতবরণ রেডিওতে তবলা বাজাতেন। অডিশনের তিন মাস বাদে হাতে এল প্রোগ্রামের চিঠি। গান শুনে পাহাড়ি সান্যাল বললেন, ‘বাহ তুমি তো ভালই গাও হে, চর্চা করলে ভাল গাইয়ে হবে।’ কিছুদিন পর আকাশবাণীতে অনুজ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ হওয়ামাত্র পঙ্কজকুমার মল্লিক বলেছিলেন, ‘ও তুমিই হেমন্ত মুখুজ্জে; তুমি তো দেখছি আমাদের ভাত মারবে।’ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াটা যে হবে না সেটা অনুমেয় ছিল। ইতিমধ্য কিছু অনুষ্ঠান, গানবাজনার চর্চায় আরও মনোসংযোগ করতেই দেড় বছরের মাথায় ছেড়ে দিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া।
এরপর হেমন্ত রেকর্ড কোম্পানির দরজায় দরজায় ঘুরেছেন। জলসায় গান গাওয়ার জন্য ডেকে এনেও চার ঘন্টা বসে থেকেছেন। একথাও শুনেছেন, ‘দূর মশাই কে শুনবে আপনার গান দেখছেন না পঙ্কজ মল্লিক এসে গেছেন’। প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হবার পর সেই রেকর্ডটি কাগজে মুড়ে হাতে করে নিয়েই চেনা-জানা মানুষ, বন্ধু-বান্ধব-আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে যেতেন হেমন্ত। যাতে হাতে কাগজের মোড়ক দেখামাত্রই কৌতূহলী হয়ে ওঠে তারা এবং জানতে চায়—হাতে ওটা কী। আর তখনই জানিয়ে দেওয়া যায় তাঁর গানের কথা, রেকর্ডের কথা। কলকাতার যেখানে শচীন দেব বর্মণের বাড়ি ছিল সেই বাড়ির সামনে বহুদিনই দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করেছেন অনেকক্ষণ। যদি কর্তার দু’কলি ভেসে আসে, মাথা পেতে নেবেন সেই সুরের অঞ্জলি। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কোনও বাড়ি থেকে কখনো ভেসে এসেছে রেডিও কিম্বা রেকর্ডে বেজে ওঠা পঙ্কজকুমার মল্লিকের গাওয়া গান, চলা থামিয়ে দিয়ে শুনতে শুনতে শান্তস্তব্ধ হয়ে ভেবেছেন তাঁর গান কি কোনওদিন এমন করেই বাড়িতে বাড়িতে বাজবে?

অনেকদিন আগের ঘটনা, দিল্লির এক জলসায় গাইছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। অসংখ্য শ্রোতাদের মধ্যে বহু গুণী মানুষ হাজির ছিলেন সেই অনুষ্ঠানে। কিন্তু কতৃপক্ষের জানা ছিল না এমনকী খোদ শিল্পীও ভাবতে পারেন নি যে তাঁর গান শুনতে হাজির হবেন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ঊস্তাদ আমির খাঁ। শ্রোতাদের দাবি মতো গান শেষ করে যখন হেমন্ত মঞ্চ থেকে নেমে এসেছেন তখন তাঁকে অবাক করে দিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালেন উস্তাদজি। সেদিন তিনি ওই অনুষ্ঠানের শিল্পী তালিকায় ছিলেন না। তিনি হেমন্তকে বললেন যে তিনি শুধুমাত্র হেমন্তকুমারে গান শুনতেই এসেছেন এবং তাঁর খুবই ভাল লেগেছে।
কলকাতার এক নামী হোটেলে মেহেদি হাসানকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। কৃতি বহু শিল্পীদের মধ্যে সেখানে হাজির ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। মেহেদি হাসান এক দৃষ্টিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে দেখতে দেখতে এক সময়ে আপন মনে বলেই ফেললেন, ‘ক্যায়া আওয়াজ পায়া হ্যায়; ইয়ে খুদা কি দেন হ্যায়।’ সেটা শুনে পাশে বসা আরতি মুখোপাধ্যায় জিঙ্গাসা করলেন, ‘যদি এমনটা হয় হেমন্তদার আওয়াজ আর আপনার গায়কি তাহলে…’ সঙ্গে সঙ্গে কপালে হাত ঠেকিয়ে তিনি বলে ঊঠলেন, ‘ইনশাআল্লাহ; খুদা কি মর্জি। তব হি ইয়ে চমৎকার হো সকতে।’ ঠিকই বলেছিলেন মেহেদি হাসান, কেবলমাত্র ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই এমন জাদু ঘটা সম্ভব।
তরুন মজুমদারের সব ছবিতেই সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু ‘পলাতক’ ছবির সময় হেমন্ত নিজেই বললেন এ কাজের জন্য তিনি একেবারে অনুপযুক্ত। কারণ, পলাতক পল্লিসুরাশ্রয়ী ছবি। তিনি সেভাবে পল্লিগানের চর্চা করেন না। কিন্তু তরুনবাবুর জোরাজুরিতে হেমন্তকে রাজি হতেই হল। ওই ছবির জন্য হেমন্ত নতুন এক গীতিকার মুকুল দত্তকে বেছে নিলেন। কিন্তু সুর করার সময় অসুস্থ হয়ে হেমন্ত ভরতি হলেন মুম্বাইয়ের নর্থ-কোর্ট হাসপাতালে। সেই অবস্থায় চলতে থাকল অদ্ভুত সব কাণ্ড। মুকুল তাঁর লেখা গানের একটা করে পাতা প্রতিদিন অসুস্থ হেমন্তর সামনে এনে ধরেন আর শুয়ে শুয়ে হেমন্ত সেটি পড়ে নিয়ে একটু ভাবার পর গুনগুন করে গাইতে শুরু করেন। ওইভাবেই তৈরি হয়ে যায় ‘জীবনপুরের পথিক রে ভাই/কোনো দেশের সাকিন নাই/কোথাও আমার মনের খবর পেলাম না’।

১৯৫২ সালে হেমন্ত মুম্বাই থেকে এসেছেন অজয় করের ‘হারানো সুর’ ছবির সুর করতে। সুচিত্রা সেনের প্লে-ব্যাকের জন্য বেছেছেন গীতা দত্তকে। রেকর্ডিং-এর দিনই স্টুডিও থেকে সরাসরি এয়ারপোর্ট গিয়ে ফ্লাইট ধরবেন। টেক শেষ করে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে স্টুডিও থেকে বেরচ্ছেন হেমন্ত পাশে পরিচালক এবং প্রযোজক। তাঁদের মুখ দেখে হেমন্ত বুঝতে পারছেন মন ভরেনি; এত সোজাসাপ্টা সুর মানুষ নেবে কি? কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছেন না হেমন্ত মখোপাধ্যায় বলেই। কিন্তু আত্মবিশ্বাসী হেমন্ত ফের সিগারেটের ধোয়া ছেড়ে বললেন, ‘কিচ্ছু করার নেই ভায়া এ গান হিট না হয়ে পারবে না’। বলেই তিনি গাড়িতে উঠলেন। ছবি মুক্তির পর ‘তুমি যে আমার/ওগো তুমি যে আমার/কানে কানে শুধু একবার বলো তুমি যে আমার’ গানটি ইতিহাস রচনা করলো এমনভাবে যার রেশ আজও রয়ে গেছে।
হেমন্তর দারুণ আত্মবিশ্বাসের আর একটি ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা শুনিয়েছিলেন আরতি মুখোপাধ্যায়। হেমন্ত-আরতির ডুয়েট গান রেকরডিং হচ্ছে স্টুডিওতে । হেমন্ত-র ঠোঁটে জ্বলছে সিগারেট; এই ছাড় কেবল তাঁর ক্ষেত্রেই ছিল তাই স্টুডিওর মধ্যে রাখা থাকত একটি অ্যাস্ট্রে। আরতি তাঁর নিজের অংশটুকু যখন গাইছেন তখন হেমন্ত সিগারেটে সুখটান দিচ্ছেন আর ধোঁয়া ছারছেন। আর তাঁর পাশে আরতি হেমন্তের কাণ্ড দেখে শিঊরে উঠছেন। কিন্তু যেই মাত্র হেমন্তর পালা এল ঠিক তার আগের মুহূর্তে তিনি সিগারেটটি অ্যাস্ট্রের ওপর রেখে আনায়াসে গাইতে শুরু করলেন। নিজের অংশটুক অবলীলায় শেষ করে ফের তিনি সিগারেটে টান দিতে শুরু করলেন, ধোঁয়া ছেরে সিগারেটটি অ্যাস্ট্রেতে রেখে আবার গাইলেন। রেকর্ডিং সেরে আরতি শুধু বলেন, কী কনফিডেন্স, কী কন্ট্রোল। হেমন্ত বলেন কী করব ওটা যে আমায় কিছুতেই ছাড়তে চায় না।
চেনা মানুষের অনেক অজানা গল্প।
অনবদ্য।
চমৎকার একটি মানুষ তার থেকেও অভিনব তাঁর জীবনের টুকরো টুকরো ঘটনা।
এরকম উচ্চতার আরও বহু বাঙালি আছেন যারা তাঁদের কাজের জন্যই অমর, প্রত্যেকেরই নানা গল্প ছড়িয়ে আছে, সেসব
গল্প সাধারণ মানুষকে খুবই আকর্ষণ করে। সেই সব কথা ঘুরেফিরে শুনতে পড়তে ইচ্ছে হয়।
দক্ষিণ কলকাতার একটা অনুষ্ঠানে পঙ্কজ মল্লিক আর হেমন্ত দু’জনেই উপস্থিত ছিলেন। সেখানে দর্শকরা হেমন্তকে ‘দিনের
শেষে ঘুমের দেশে’ গানটি গাওয়ার জন্য অনুরোধ করলে হেমন্ত দর্শকের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলেছিলেন ‘পঙ্কজদার সামনে
ওই গান গাইতে পারব না। আমাকে মাফ করবেন।’
তিনি জীবন ও মৃত্যুতে ধুতি আর শার্টের মধ্য দিয়ে বাঙালিই রয়ে গেলেন।