কান পেতে শুনুন, মন দিয়ে শুনুন। মনে হবে গানের মধ্যে দিয়ে যেন ছবি এঁকে চলেছেন তিনি। মনে হতে পারে, গানের তরীতে বসে এ তাঁর এক আশ্চর্য রকমের প্রেম-বিরহের ধারাবিবরণী। তিনি যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। প্রেম আর পূজার গানের সীমানা মুছে যায় যাঁর কণ্ঠের জাদুতে।
ভালোবাসার নতুন দিগন্ত
‘ঘরে যারা যাবার তারা কখন গেছে ঘর পানে, পারে যারা যাবার গেছে পারে/ঘরেও নহে পারেও নহে, যে জন আছে মাঝখানে সন্ধ্যাবেলায় কে ডেকে নেয় তাকে’ কিংবা ‘ফুলের বাহার নেইকো যাহার ফসল যাহার ফললো না, অশ্রু যাহার ফেলতে হাসি পায়/দিনের আলো যার ফুরালো সাঁঝের আলোও জ্বললো না, সে-ই বসেছে ঘাটের কিনারায়’, কথা আর সুরের রঙে রঙ মিলিয়ে জীবন দর্শনকে এমন সহজভাবে তুলে ধরতে পারে আর কোন কণ্ঠ? অবশ্যই শুধুমাত্র হেমন্ত মুখোপাধ্যায়েরই স্বর্ণকণ্ঠ।

হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। কবিগুরুর লেখা, পঙ্কজ মল্লিকের সুর দেওয়া ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’র কথাই বলছি। আবার বর্ষণমুখর কোনও দিনে যদি শোনেন, ‘এমনও দিনে তারে বলা যায়’, মনে হবে রোমান্টিক হেমন্তের কণ্ঠতরী কোথায় যেন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আপনাকে। চোখের কোণে উঁকি দিতে পারে জলও। আসলে রবীন্দ্রনাথের কথা এবং সুর এমনভাবে প্রভাবিত করেছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গায়কী ভঙ্গিমাকে যে বাংলা ছায়াছবির গান বা আধুনিক গান তো বটেই, হিন্দি ফিল্মি দুনিয়াতেও ভালোবাসার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পেরেছিলেন তিনি।

নায়ক-গায়ক অভিন্ন সত্তা
নামটা ঠিক মনে নেই। সেটা ছিল এক সিনেমার দৃশ্য। গালভর্তি দাড়ি নিয়ে নায়ক মঞ্চে গান গাইতে ওঠামাত্রই বিরক্ত হয়ে হল ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন দর্শকরা। আর ঠিক সেই সময়েই নায়কের উদাত্ত কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়ল সেই গান—বাইরের চেহারাটা দেখে যায় না তো চেনা শিল্পীকে। মোহিত হয়ে ফিরে এলেন সকলে। নায়কের নাম উত্তমকুমার। আর গায়ক? হেমন্তকুমার, মানে আমাদের হেমন্ত। তাঁর গলার জাদুতে বাঁধা পড়ে গেলেন সকলে। হ্যাঁ, গানের কথা যাই বলুক না কেন, বাইরের সুপুরুষ চেহারাটাই কিন্তু বাস্তবে চিনিয়ে দিত এই দুই অনন্য প্রতিভাকে।

আর যা কিছু, সব মিলেমিশে একাকার। ‘ওগো কাজলনয়না হরিণী’ কিংবা ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’, এমন অনেক গানে গায়ক আর নায়ক সত্তাকে আলাদা করে চিনে ওঠাই তো মুশকিল। এই জন্যই বোধ হয় আজও একটা প্রবাদের নাম হেমন্ত। আজও অমর উত্তম-হেমন্ত জুটি। আড্ডার আসরে হেমন্তবাবু বলতেন, ‘আমি যখন প্রেমের গান গাই তখন নিজেই প্রেমিক হয়ে যাই।’ কথা, সুর আর চরিত্রকে আত্মস্থ করে নিজের গানের স্টাইল রচনায় তিনি ছিলেন সত্যিই অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
হেমন্ত-লতা যুগলবন্দি
কিছু কথা, কিছু ঘটনা, সময়ের হাত ধরেই কখন যেন তা ছবি এঁকে দিয়েছে কৌতুহলী মনে। দু-জনের মধ্যে আসলে সম্পর্কটা ছিল শ্রদ্ধা আর বিশ্বাসের। একদিকে গভীর বন্ধুত্ব, অন্যদিকে নিখাদ স্নেহ ও ভালোবাসা। হ্যাঁ, কোকিলকণ্ঠী লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে ‘গোল্ডেন ভয়েস’ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সম্পর্কের ধারাটা বয়ে যেত ঠিক এই খাতেই। তখনকার বম্বেতে সুরসাধনার সূত্রে কাছাকাছি এসেছিলেন শুধু যে এই অনন্য প্রতিভার দু-জন শিল্পী এমন নয়, সুরের মায়াজালে বন্দি হয়ে গিয়েছিলেন তাঁদের দুই পরিবারও। কাজের বাইরে গড়ে উঠেছিল একটা আলাদা পারিবারিক সম্পর্কও। তাই সেদিনের সেই বম্বের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তরিকতার ঢেউ আছড়ে পড়েছিল অনেক অনেক দূরের কলকাতাতেও।

হিন্দি সুরের দুনিয়ায় ঝড় তুললেও পোশাকে, চালচলনে হেমন্তকুমার কিন্তু ছিলেন একেবারে খাঁটি বাঙালি। একদিন বম্বের স্টুডিওতে লতাকে দু-দিকে দুটো বিনুনি ঝুলিয়ে আসতে দেখে হেমন্তের পুলকিত মন্তব্য, ‘আরে, এ যেন ঠিক বাঙালি মেয়ে।’
কাজের ফাঁকে, উইক এন্ডে প্রায়ই এখানে-ওখানে ঘুরতে বেরিয়ে পড়তেন দুই পরিবারের সদস্যরা। সব সময় লং ড্রাইভের মওকা না মিললেও একসঙ্গে সিনেমা দেখা, হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাওয়া, কেনাকাটা। প্রায়ই হেমন্তজায়া বেলা মুখোপাধ্যায় হাত ধরতেন লতাজির। সঙ্গে অবশ্যই হেমন্ত। কখনও কখনও শুধুই লতা-বেলা। সিনেমা দেখতে গিয়ে কতই না গল্প হতো ননদ আর বৌদির মধ্যে। শোনা যায়, হেমন্তকন্যা রানু ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে বাঙালি ভাবীজিকে মারাঠা প্রথা মেনে সাধও খাইয়েছিলেন লতাজি। তাঁর সম্মানে এক নামী হোটেলে গীতসম্রাজ্ঞী আয়োজন করেছিলেন এলাহি খাওয়া-দাওয়ার।

কলকাতাতেও
তখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছে গেছেন লতা মঙ্গেশকর। একটা সরকারি অনুষ্ঠান উপলক্ষে তিনি দিন কয়েকের জন্য এসেছেন কলকাতায়। সঙ্গে ছিল বোধ হয় অন্য কিছু কাজও। কিন্তু সরকারি অতিথি হয়ে রাজভবনে থাকতে তিনি নারাজ। তাই সোজা তিনি হাজির হলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ভবানীপুরের বাসভবনে। হেমন্তবাবুরা সপরিবারে তখন থাকতেন রূপনারায়ণ নন্দন লেনের বাসভবনে। সেখানেই লতাজি একেবারে ঠিক বাড়ির মেয়ের মতো খাটে বাবু হয়ে বসে গল্প জুড়ে দিতেন পরিবারের লোকেদের সঙ্গে। প্রথমে লতার পছন্দমতো খাবার মহারাষ্ট্র ভবন বা মহারাষ্ট্র নিবাস থেকে আনানো হলেও আপত্তি জানালেন অতিথি। তারপরে বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে নিজেই মারাঠি খাবার তৈরি করে সব্বাইকে খাইয়ে অবাক করে দিলেন লতাজি।

কলকাতায় এসে বেড়ানো হবে না, শপিং হবে না—তা কখনও হয়? শুধু হেমন্তদা নয়, বাড়ির অন্যান্যদের নিয়েও দলবেঁধে সেবারে লতাজি বেরিয়ে পড়েছিলেন হইহই করে। জমিয়ে কেনাকাটা করলেন গড়িয়াহাটে। কিনলেন তাঁতের শাড়িও। সব মিলিয়ে ক-টা দিন জমিয়ে রাখলেন হেমন্ত-পরিবারকে।
দুই অনন্যসাধারণ শিল্পীর মধ্যে শ্রদ্ধা, বিশ্বাস আর মর্যাদার সম্পর্কের সাক্ষী নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামও। কিংবদন্তি হেমন্তের সংগীতজীবনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশাল এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে। উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, হেমন্তকুমারের সংবর্ধনায় লতাজি থাকবেন না, তা কখনও হয়? কিন্তু লতাজির কাছে পৌঁছোনো যাবে কীভাবে? তাঁকে রাজিই-বা করাবেন কে? পথ একটাই, দরজাও একটাই—হেমন্তদা। অগত্যা তাঁর কাছে এসেই উদ্যোক্তারা আবদার করলেন, যে করেই হোক লতা মঙ্গেশকরকে একবার হাজির করতেই হবে ইনডোরে। কিন্তু সায় দিলো না হেমন্তের মন। তাঁর যুক্তি, লতার শরীর ভালো যাচ্ছে না। রাজি হয়েও শেষ পর্যন্ত তিনি যদি না আসতে পারেন তা হলে মুখ পুড়বে আয়োজকদের। কিন্তু নাছোড়বান্দা উদ্যোক্তাদের অনুরোধে হেমন্ত ফোন করলেন লতাকে। এককথায় রাজি হয়ে গেলেন লতা। বললেন, ‘যা কিছুই সুবিধে-অসুবিধে থাক না কেন, আপনার সংবর্ধনা সভায় যাবো না তা কখনও হয় দাদা?’

কিন্তু অনুষ্ঠানের দিন কয়েক আগে হঠাৎ মুম্বাই থেকে ফোন হেমন্তর কাছে। ওপ্রান্তে লতা। গলাতে শারীরিক দুর্বলতার ছাপ স্পষ্ট। খুব ইতস্তত করেই সম্রাজ্ঞী জানালেন অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতির ব্যাপারে অনিশ্চয়তার কথা। তা-ই শুনে উদ্যোক্তাদের তো মাথায় হাত। হেমন্তবাবুর কথায় তাঁরা মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়ে দিলেন সেই অনিশ্চয়তার খবর। টিকিটের দাম ফেরত দেওয়ার কথাও বলা হলো। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনুষ্ঠান শুরুর অনেক আগেই দেখা গেল নেতাজি ইনডোর চত্বরে জনজোয়ার। আরও অবাক কাণ্ড, অনুষ্ঠান শুরুর আগের মুহূর্তেই মঞ্চে হাজির কোকিলকণ্ঠী। হেমন্তের গলায় মালা পরিয়ে দিয়ে প্রণাম করলেন পা ছুঁয়ে। গীতসম্রাজ্ঞীর অকপট স্বীকারোক্তি, ‘কারও পায়ে হাত দিয়ে সাধারণত আমি প্রণাম করি না। কিন্তু হেমন্তদার পা ছুঁতে পারলে আমি মনে শান্তি পাই।’ করতালিতে ফেটে পড়লো গোটা স্টেডিয়াম।
হিন্দি ফিল্মি দুনিয়ায় অন্তত ১০০ ছবিতে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন হেমন্তকুমার। সঙ্গে পেয়েছেন লতাজিকে। সাফল্য-ব্যর্থতার দীর্ঘ পথ হেঁটেছেন দু-জনে। তার চুলচেরা বিশ্লেষণে এখন না যাওয়াই ভালো। কিন্তু বাংলা ছবি বা আধুনিক গানে লতাকে সফলভাবেই পথ চিনিয়েছেন হেমন্ত। ‘তোমার হলো শুরু আমার হলো সারা’, ‘তুমি রবে নীরবে’, ‘প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে’, ‘চঞ্চল মন আনমনা হয় যেই তার ছোঁয়া লাগে’, ‘নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা বুঝি-বা পথ ভুলে যায়’, ‘কে যেন গো ডেকেছে আমায়’—এমন অজস্র গান তার উজ্জ্বল প্রমাণ।

স্নেহের নাতনি
মনটা সত্যিই খুব খারাপ হয়ে গেল। সামনের ১৬ জুন প্রয়াত শিল্পী হেমন্তবাবুর জন্মদিন। তাই মুম্বাইতে ফোন করেছিলাম তাঁর ছেলে জয়ন্ত মুখোপাধ্যায়কে। কিন্তু ভেসে এলো তাঁর উদ্দ্বিগ্ন কণ্ঠ। তাঁদের বড়ো মেয়ে, মানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বড়ো নাতনি গুরুতর অসুস্থ। দু-মাস হাসপাতালের আইসিইউ-তে ভর্তি জয়ন্ত-মৌসুমীর মেয়ে পায়েল। প্রায় সারাদিনই তাঁদের কাটছে হাসপাতালেই। খবরটা ফোনের দু-প্রান্তেই নামিয়ে আনলো এক অদ্ভুত নীরবতা, নিস্তব্ধতা।