দোড় গোড়ায় চলে এসেছে বাঙালীর শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গা পূজা। তবে এ বছর পূজা যেন একটু অন্যরকম ভাবে হতে চলছে। করোনা আবহে বাহারিবাঙালীর সেই জাঁকজমক হয়তো কিছু চোখে পড়বে না, কিন্তু নিয়মনিষ্ঠা সহকারে পূজা এবারও হবে বিভিন্ন জায়গায়। বহু প্রাচীন পূজাগুলিও এর মধ্যে সামিল। এমন অনেক প্রাচীন পূজা রয়েছে, যার গল্প-কথা ও ঐতিহ্য প্রায় সকলেরই মুখে মুখে জানা। তেমনই একটি পূজা উত্তর দিনাজপুর জেলার হেমতাবাদ ব্লকের রায়গঞ্জ-বালুরঘাট রাজ্য সড়কের পাশে অবস্থিত কাকড়শিং-এর পূজা।
উত্তর দিনাজপুর জেলার হেমতাবাদ ব্লকের অন্যতম পূজাগুলোর মধ্যে একটি হল কাকড়শিং এলাকার দুর্গাপূজা। প্রতি বারের ন্যায় এবারেও নিয়ম নিষ্ঠা মেনেই চলছে পূজার প্রস্তুতি। শুধু উত্তর দিনাজপুরবাসী নয়, কলকাতা, বালুরঘাট সহ দূর দূরান্ত থেকে বহু মানুষ ছুটে আসেন এই পূজা দেখতে। এই পূজার বিশেষত্ব আর দশটি পূজা থেকে খানিকটা আলাদা। দেবী দুর্গা এখানে দশভূজা নন। এখানে দেবী দুর্গা একটু ভিন্ন। মা দুর্গা এখানে চতুর্ভুজা এবং উৎমাই চন্ডী রূপে পূজিত হন।

স্থানীয় মানুষদের মুখে জানা যায়, বাংলাদেশের রাজশাহী জমিদারেরা এই পূজার প্রচলন করেছিলেন। প্রায় ৫০০ বছর আগে শুরু হয় এই পূজা। দেশ ভাগের আগে জমিদারেরা এখানকার লোকেদের পূজার দায়িত্ব দিয়ে যান। এক সময় এই এলাকা জুড়ে ছিল ঘন জঙ্গল। সময়ের সাথে এখন এখানে দেবী উৎমাই চন্ডীর পাকা মন্দির স্থাপন হয়েছে। মায়ের নামে নিজস্ব ৭ থেকে ৮ বিঘা জমি রয়েছে। সেই জমিতে সারা বছর চাষাবাদ করে যা আয় হয়, তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের সাহায্য মিলিয়ে পূজা হয়। পূজার শুরু থেকে নিয়ম মেনে প্রায় ১০ দিন পুরো গ্রাম নিরামিষ খায়।
মায়ের নামে নিজস্ব ৭ থেকে ৮ বিঘা জমি রয়েছে। সেই জমিতে সারা বছর চাষাবাদ করে যা আয় হয়, তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের সাহায্য মিলিয়ে পূজা হয়। পূজার শুরু থেকে নিয়ম মেনে প্রায় ১০ দিন পুরো গ্রাম নিরামিষ খায়। শুধু তাই না, বাড়ির শুভ কোনো অনুষ্ঠান হলেই সকলেই আগে মায়ের পূজা দিয়েই শুভ কাজের সূচনা করেন।

মায়েরা এখানে পাঁচ বোন। পাঁচ বোন, পাঁচ জায়গায় আছেন। তাঁদের মধ্যে এক বোন হল উৎমাই চন্ডী। শুধু তাই নয়, দেবীদের পাঁচ বোনের যে পরিবার রয়েছে তাঁদের নামে মন্দির এলাকায় ১৯টি থান রয়েছে। সেই ১৯টি থানেও পূজা হয়। দেবীর কাছে সাধারণ মানুষ যে যার মনস্কামনা নিয়ে আসেন। মা উৎমাই চন্ডী সব মনস্কামনা পূরণ করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। পূজার চার দিন গোটা গ্রাম জুড়ে চলে নিরামিষ ভোজন। অষ্টমীর ভোরে মন্দিরে ছাগ বলি হয়। নবমীর দিন মহা খিচুরি ভোগের আয়োজন করা হয়। দশমীতে মিষ্টি মুখ করানোর পরে বিসর্জন দেওয়া হলেও, দেবী মূর্তি মন্দিরে থাকে।
কারণ দুর্গা পূজা ছাড়াও মন্দিরে দুইবার পূজা হয়। দশমীর পরে অষ্টমঙ্গলা পূজা এবং চৈত্র মাসে বাসন্তীরুপে এই প্রতিমাতেই পূজা হয়ে থাকে। আবার দুর্গা পূজোর আগে নিয়ম অনুসারে বিসর্জন দেওয়া হয় মায়ের মূর্তির।

এই পূজাকে কেন্দ্র করে এলাকায় মেলা বসে। শুধু উত্তরদিনাজপুর জেলা নয়, এই পূজার সময় আশে পাশের জেলা সহ কলকাতা ও বিভিন্ন রাজ্য থেকে লোকেরা নিজেদের পূজা দিতে আসেন এবং নিজেদের মনস্কামনা নিয়ে আসেন। মা উৎমাই চন্ডী কাউকে খালি হাতে ফেরান না বলে বিশ্বাস স্থানীয় মানুষ এবং দর্শনার্থীদের।