সারা রাজ্য জুড়ে সম্মানের সহিত ইন্দিরা গান্ধির ১০৬-তম জন্মবার্ষিকী পালিত হলো। কলকাতা পৌরসংস্থার পক্ষ থেকে মেয়র ফিরহাদ হাকিম ২১-শে উদ্যানে ইন্দিরা গান্ধির মূর্তিতে মাল্যদান করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ৭ নম্বর বরোর চেয়ারপার্সন সুস্মিতা ভট্টাচার্য সহ বিশিষ্টগণ। প্রসঙ্গত, মেয়র সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে বিড়লা তারামণ্ডলের বিপরীত দিকে পৌর উদ্যানে এই মূর্তি স্থাপিত হয়। বর্তমানে কলকাতা পৌরসংস্থা এই মূর্তিটির পরিচর্চা করে। এদিনের অনুষ্ঠানে মেয়র ফিরহাদ হাকিম জানান, “একটা সময় ছিল যখন আমরা বলতাম ইন্ডিয়া ইজ ইন্দিরা অ্যান্ড ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া। ভারত তথা বিশ্বের বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে প্রথম সারিতে থাকবেন ইন্দিরা গান্ধি। আজ তাঁর ১০৬ তম জন্মদিনে আমরা তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই।”
এক সময় শাসকপক্ষে না থেকেও ইন্দিরা গান্ধি জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছিলেন। মানুষের মধ্যে ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে এক সময় প্রচণ্ড উম্মাদনা তৈরী হয়। ইন্দিরা ছিলেন ছাইয়ের মধ্যে থেকে উঠে আসা ফিনিক্স পাখির মতো। তিনি ক্ষমতায় যেমন থেকেছেন আবার ক্ষমতাচ্যুতও হয়েছেন। অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রেই এমন হয়। তবে ইন্দিরার ক্ষেত্রে বিশেষত্ব হলো পুনরায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠা। এটাকে ‘ইন্দিরা ম্যাজিক’ বললে অত্যুক্তি হয় না। আজ ইন্দিরাকে কেন্দ্র করে এমনই এক দুঃসাহসীক ও হাস্যকর ঘটনার উল্লেখ করব।
ঘটনাটা ১৯৭৮ সালের ২০ ডিসেম্বর। ইন্ডিয়ান এয়ালাইন্স-এর ফ্লাইট (নম্বর আই.সি – ৪১০) লক্ষ্মৌ থেকে দিল্লি যাওয়ার জন্য উড়ে যেতেই শুরু হলো এক অদ্ভুত ঘটনা। আজমগড়ের বাসিন্দা ভোলা পাণ্ডে ও বালিয়ার বাসিন্দা দেবেন্দরর পাণ্ডে অস্ত্র দেখিয়ে বিমানটি ছিনতাই করে বারাণসী বিমানবন্দরে নিয়ে যেতে বাধ্য ঘরলেন। বিমানটিতে যাত্রী ছিলেন ১৩২ জন। বিমান ছিনতাইয়ের কারণ কী? আসল ঘটনায় এবার আসা যাক, এর ঠিক আগের দিন ইন্দিরা গান্ধি ও সঞ্জয় গান্ধিকে গ্রেফতার করা হয়। অন্যদিকে ভোলা ও দেবেন্দর নিজেদের যুব কংগ্রেসের সদস্য বলে পরিচয় দিয়েছিলেন বিমান ছিনতাইয়ের পর এবং তাঁদের বেশ কয়েকটি দাবি ছিল। দাবিগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল অবিলম্বে ইন্দিরা গান্ধি ও সঞ্জয় গান্ধিকে কারাগার থেকে মুক্তি দিতে হবে, তাঁদের বিরুদ্ধে সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে এবং কর্তৃপক্ষকে ইন্দিরা ও সঞ্জয় গান্ধির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে হবে। ভোলা ও দেবেন্দর আরো দাবি করতে থাকেন, অবিলম্বে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীকে তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। এই ঘটনার পরিপেক্ষিতে সারা দেশে খবর ছড়িয়ে যায় এবং তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। উক্ত সময়ে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন রাম নরেশ যাদব। তিনি খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গেই বারাণসী যাওয়ার সিদ্ধান্ত করেন। সঙ্গে ছিলেন রাজ্যের মুখ্যসচিব ও রাজ্য পুলিশের আই.জি। রাত একটার সময় তাঁরা বারাণসী বিমানবন্ধরে নামেন। এদিকে বিমান ছিনতাইকারীরা তাঁদের দাবি ক্রমাগত বাড়িয়েই যেতে থাকেন। এবার তাঁরা বলতে থাকেন, বিমানবন্দরেই তাঁদের একটি সাংবাদিক সম্মেলন করতে দিতে হবে এবং প্রধানমন্ত্রীকে ও অল ইন্ডিয়া রেডিওকে বিমান ছিনতাইয়ের খবর ও তাঁদের দাবির বিষয়ে জানাতে হবে। সেই রাতেই উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও শীর্ষ অফিসারদের সঙ্গে ভোলা পাণ্ডে ও দেবেন্দর পাণ্ডের দীর্ঘ আলোচনা শুরু হয়। সকাল হয়ে যায়। অবশেষে ছিনতাইকারীরা বিমানের যাত্রীদের মুক্তি দিতে সম্মত হন। সবাইকে মুক্তি দিয়ে তাঁরা আত্মসমর্পণ করেন। পরে দেখা যায়, ভোলা ও দেবেন্দরের কাছে খেলনা বন্দুক ছিল।

এবার একটু আগের ঘটনাক্রমে ফিরে যাওয়া যাক। ১৯৭৭ সালে কংগ্রেসের যত জন লোকসভায় জিতেছিলেন, কংগ্রেসের ভাঙনের পর তাঁদের থেকে বেশ কিছু জনের সমর্থন হারিয়ে ইন্দিরা গান্ধি সংসদীয় দলের নেতা হয়ে লোকসভায় ফিরে এলেন। কিন্তু সংসদে ইন্দিরার উপস্থিতি জনতা পার্টির সদস্যরা মেনে নিতে পারছিলেন না। সংসদে আসার ঠিক পরেই জনতা পার্টির নেতারা সংসদ থেকে ইন্দিরাকে বহিষ্কার করতে একটি প্রস্তাব আনেন। প্রস্তাবে বলা হয়, গত লোকসভায়, যখন ইন্দিরা গান্ধি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, কয়েক জন অফিসার সংসদে কোনও প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য তথ্যের খোঁজ করছিলেন, তখন ইন্দিরা তাঁদের ভয় দেখিয়েছেন, তাঁদের বিড়াম্বনায় ফেলেছেন, গ্রেফতার করিয়েছেন ইত্যাদি। তা ছাড়া তাঁর শাসনকালে বিরোধী নেতাদের হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলেন ইন্দিরা, এমন অভিযোগও আনা হয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ১৯৭৮ সালের ১৮ নভেম্বর ইন্দিরা গান্ধিকে লোকসভা থেকে বহিষ্কার করা হয়। ঘটনাটির একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছিলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেছিলেন, “১৯৭৭-এর ভোটের এক বছর কেটে যাওয়ার পরেও ইন্দিরাজির উপর আক্রমণ থামেনি। সেটা বরং এবার সংসদে এসে পৌঁছোলো। লোকসভায় আরও কয়েক জনের সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধেও স্বাধিকার ভঙ্গের অভিযোগ আনলেন জনতা পার্টির মধু লিময়ে এবং কানওয়ারলাল গুপ্ত। সেটা ১৯৭৮ সালের ১৬ নভেম্বর। মারুতি উদ্যোগ লিমিটেড-এর ব্যাপারে কিছু সরকারি অফিসার তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। অভিযোগ উঠল, ইন্দিরা তাঁদের কাজে বাধা দিয়েছেন, তাঁদের শাসিয়েছেন, হেনস্থা করেছেন, তাঁদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছেন। ১৮ নভেম্বর বিষয়টি প্রিভিলেজ কমিটিতে যাবে বলে ঠিক হলো। ১৯ নভেম্বর লোকসভায় এই মর্মে প্রস্তাব পাশ হলো যে, চলতি অধিবেশনের জন্য ইন্দিরাকে সাংসদ থেকে বহিষ্কার করা হোক এবং তাঁকে গ্রেফতার করা হোক। প্রস্তাব পাশ করে অধিবেশন সেদিনকার মতো স্থগিত হয়ে গেল বিকেল পাঁচটা বেজে পাঁচ মিনিটে। ইন্দিরাজি তিন ঘণ্টা সংসদে বসে রইলেন, যতক্ষণ না সমস্ত আইনি কাজকর্ম মিটল। ওঁর সঙ্গে সেদিন আমরা অনেকে ছিলাম। রাজীবজি আর সনিয়াজিও ছিলেন। ইন্দিরাজি তখন আমাদের সান্ত্বনা দিয়ে ইংরেজি কবিতার লাইন ধার করে বললেন, ‘সে গুডবাই নট উইথ টিয়ার্স বাট উইথ স্মাইলস। চোখে জল নিয়ে বিদায় বলতে নেই, হাসিমুখে বলতে হয়।’ রাজনীতিতে এই সাময়িক এলোমেলো পর্বটাই ইন্দিরার ভিতরের শক্তিটা বের করে এনেছিল।”
অবশ্য ১৯৭৮ সালেইই ১৯ ডিসেম্বর লোকসভায় এক প্রস্তাব পাশ করে ইন্দিরা গান্ধিকে বহিষ্কারের প্রস্তাব ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তিনি আবার সংসদে যেতে পারলেন। কিন্তু ওই প্রস্তাবেই তাঁকে এক সপ্তাহের কারাবাসের দণ্ড দেওয়া হলো। আর এভাবেই দ্বিতীয় বার ইন্দিরাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এজন্য লোকসভার প্রিভিলেজ প্রস্তাবকে ব্যবহার করা হয়। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসের ১৯ তারিখে ইন্দিরা গান্ধিকে গ্রেফতার করে তিহার জেলে রাখা হয়, সঙ্গে সঞ্জয় গান্ধিকেও। এর পরের দিনই ঘটে বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাটি। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন ইন্দিরা ও সঞ্জয়ের গ্রেফতারির পরেই দেশের নানা জায়গায় হিংসাত্মক ঘটনা ঘটতে থাকে। কলকাতায় জনতা পার্টির অন্যতম নেতা সমর গুহর বাড়িও আক্রান্ত হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

বিমান ছিনতাইকারী ভোলা পাণ্ডে ও দেবেন্দর পাণ্ডের শেষ পর্যন্ত কী হয়? ১৯৭৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর বিমান ছিনতাই নিয়ে লোকসভায় বিতর্ক হয়। কংগ্রেসের নেতারা ভোলা ও দেবেন্দরকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সমর্থনই করেন। ইন্দিরা কংগ্রেস নেতা ও পরবর্তীকালে দেশের রাষ্ট্রপতি আর ভেঙ্কটরামন, অন্যতম নেতা বসন্ত শাঠে প্রমুখরা বলার চেষ্টা করেন, বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাকে বেশি ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে, আসলে ওই ঘটনা একটা রসিকতা ছাড়া কিছুই নয়। তবে ভোলা পাণ্ডে ও দেবেন্দর পাণ্ডে তাঁদের দুঃসাহসিক কাজের জন্য পরবর্তীকালে যথেষ্ট পুরস্কার পেয়েছিলেন। ১৯৮০ সালে তাঁদের বিধানসবা ভোটের টিকিট দেয় ইন্দিরা কংগ্রেস। দু-জনেই ভোটে জেতেন এবং এম.এল.এ হন। ভোলা পাণ্ডে ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ এবং আবার ১৯৮৯ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত বালিয়ার দোয়াবা থেকে এম.এল.এ ছিলেন। চার-পাঁচ বার তিনি সালেমপুর থেকে লোকসভায়ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, কিন্তু জিততে পারেননি। দেবেন্দ্র এম.এল.এ হবার পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদকের পদেও ছিলেন অনেক বছর।
ইন্দিরা গান্ধি তিহার জেল থেকে মুক্তি পান ২৬ ডিসেম্বর ১৯৭৮ মঙ্গলবার। তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক আচরণ করা হচ্ছে, এমনই ধারণা ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল। অন্যদিকে জনতা পার্টি ও তাদের পরিচালনায় সরকারও গভীর সংকটে ঢুকতে থাকে।