একটু আগে, অর্থাৎ সকাল তখন ন’টাও বাজেনি, টেলিফোন বেজে ওঠে। রিসিভার তুলতেই এক নারীকণ্ঠ বেশ মধুর কণ্ঠে বলেন, ‘গুম্ মর্নিং’, শোনায় অনেকটা গুড-মোনিং-এর মতোই। আমার নামটি তিনি চমৎকার উচ্চারণ করেন। বলেন, কেমন করে আপনার নামটা বানান করেন? প্রশ্নটা ইংরেজিতেই করেন। আমি বলি, হ-য়ে কী যেন একটা, ভুলে যাচ্ছি, হ্রস্ব-ই হতে পারে, দীর্ঘ-ই হলেও হতে পারে, সর্বদা খেয়াল থাকে না। তিনি ইংরেজিতে বলেন, আমি বলে যাচ্ছি— এটা ইংরেজিতেই লিখতে হবে, মানে আমাদের কম্পিউটারে তোলা থাকবে কিনা আপনার নাম। আমি বলি, কী ব্যাপার বলুন তো! তিনি মধুর হেসে বলেন, আপনার পক্ষে একটা সুখবর আছে—। আপনার যদি টাকা-পয়সার অভাব থাকে তা হলে আমরা তার ব্যবস্থা করি। কোনও কিছু বাঁধা না দিয়ে ছ’লাখ পর্যন্ত টাকা, মানে হ্যাঁ, সম্পূর্ণ নগদে দেওয়া হয়। বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয় ছ’ঘণ্টার মধ্যে। প্রথম তিন মাস কোনও সুদ নেওয়া হয় না। তার পর মাসে যৎসামান্য সুদ দিলেই চলে। আমি বলি, দারুণ ব্যাপার তো! এক্ষুনি টাকা পাঠান, হ্যাঁ ওই এখন অত টাকার দরকার নেই, সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা হলেই চলে যাবে কষ্টে সিষ্টে। তবে একটা কথা বলি, এই যে আমি টাকা নিচ্ছি আপনাদের কাছ থেকে সেটা কাউকে বলবেন না। এটা সম্পূর্ণ গোপন রাখবেন। আমি বাংলায় বলছি, বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না তো? মধুর কণ্ঠী বলেন, এ বার বাংলাতেই, সম্পূর্ণ গোপন থাকবে, এটাই আমাদের পলিসি। আমি বলি, এক বার যদি আমার আত্মীয়-স্বজন টের পেয়ে যায়, তা হলে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। তবে আর একটা কথা, কোনও কাগজপত্রে সই করতে পারব না, গনৎকার পই পই করে বারণ করেছেন আমাকে। সই করলেই নাকি ভয়ংকর ফাঁড়া। যাই হোক আমার টেলিফোন নম্বর যখন জানতে পেরেছেন তখন ঠিকানাও নিশ্চয়ই জানেন, আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে রইলাম। মহিলাকণ্ঠ কী যেন বললেন বোঝা গেল না। তবে মনে হল, চাপা ক্রোধযুক্ত কণ্ঠে মনে হল বললেন, ওহ্ ডিস্গাস্টিং! আমিও কথাটা বলি, ইংরেজিতেই, ডিস্গাস্টিং!
সপ্তাহে অন্তত চার বার কারা যেন আমাকে টাকা ধার দেওয়ার জন্য দরবার করেন। টেলিফোনে আমি খুব স্মার্ট কথাবার্তা বলতে পারি, নিজেকে বেশ নিরাপদ বলে মনে হয়। নির্ভীকও হয়ে পড়ি। বেশ ইয়ার্কির মুডও সৃজন করতে পারি। বলতে পারি না পয়সার অভাবে ডায়েট করা শুরু করেছি। অবশ্য খাওয়া কমিয়ে দিয়েছি বলার পরিবর্তে ডায়েট কথাটা ভারী ভব্য শোনায়। মাঝে মাঝে মনে হয়, গণতন্ত্র এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা। হাসিই পায়। টেলিফোন থাকলে নাকি ব্যক্তিস্বাধীনতা বজায় রাখার উপায় নেই এ দেশে। অন্য দেশে যে সব জায়গায় গণতন্ত্র থই থই করছে, সেখানে কী হয় কে জানে। পয়সার অভাবে কয়েক বছর হল খবরের কাগজ কেনা ছেড়ে দিয়েছি।
টেলিফোনটা তবু সহ্য করতে পারি। সহ্য করতেই হয়। কিন্তু যেটা সব চেয়ে মারত্মক ঝামেলা মনে হয়, সেটা হল দরজার ঘন্টি। সকাল থেকে বারোটা পর্যন্ত বেশ কয়েক বার, আবার বিকেল চারটে থেকে রাত আটটা পর্যন্ত, সেও দু-চার বার। তাঁদের আসার আর শেষ হয় না। কষ্টও করেন বটে সত্যি, প্রায় প্রত্যেকেই বলেন তাঁরা মার্কেট রিসার্চ করছেন— কোনও বদ মতলব নেই। বলতে পারি না, আপনি মার্কেট রিসার্চ করছেন তাতে আমার কী? আপনার কিছু লাভ হচ্ছে, কিন্তু আমার কেবল যে সময় নষ্ট হচ্ছে তা নয়, আমার মুডও যে নষ্ট হচ্ছে! আমি মাঝে মাঝে পুরনো অভ্যেস মতো কিছু লিখেও থাকি। সকলেই নিশ্চয়ই জানেন কোনও লেখার জন্য কাগজ লাগে, কলম লাগে, মনও লাগে, আর লাগে মুড! খুব দামি এই সতত সঞ্চরণশীল মুডকে কায়দা করে কাগজের উপর ‘নামাতে’ হয়। এক বার মুড নষ্ট হয়ে গেলে কম করেও কয়েক ঘণ্টা বরবাদ হয়ে যায়। অনেক সময় গল্পের প্লট ভুলেও যাই। আইডিয়া বেপথে চলতে থাকে। গোয়েন্দা কাহিনির আসল ব্যাপারটি হুট করে কোথায় মিলিয়ে যায়। অনেক কষ্ট করেও সে আইডিয়াটি প্রায়ই ফিরে পাই না। এই সব, যাঁরা রোদে ঝড়ে শীতে কত কষ্ট করে আমার দরজায় এসে ঘণ্টা বাজান, তাঁদের সঙ্গে কথা বলতেও কষ্ট হয়। মুখের উপর দরজা বন্ধ করার মতো অভদ্রতা করতে ইচ্ছে হলেও পুরনো অভ্যেসের ফলে তাও পারি না। অনেক সময় মেয়েরাও আসেন। তাঁরা কেউ কেউ মার্কেট-রিসার্চ করেন এবং একখানা পেল্লাই কাগজ বার করে আমার নাম, ঠিকানা, বাপের নাম, জীবনে কুকুর পুষেছি কি না, বাড়িতে টিভি আছে কি না, থাকলে কোন সময়ে দেখেন, কোন চ্যানেল দেখেন, কেন দেখেন ইত্যাদি গড়ে চুয়ান্নটি প্রশ্নের উত্তর লিখে নেন। টেলিফোন নম্বরটি লেখার সময় আমি একটু যেন ভুলে যাই, আমার এক অপ্রিয় ব্যক্তির টেলিফোন নম্বরটা দিয়ে ভারী আহ্লাদ বোধ করি। কিন্তু ওইটুকুই যা আমোদ। ওঁদের হাত থেকে নিস্তার নেই। কেউ আবার এমন যে, সেল্সম্যানদের যে-সব ট্রেনিং নিলে ভাল হয় সে-সবের ধার ধারেন না। অনেকে এমন কথাও বলেন যা বেশ আমোদজনক। এক জন এক বার এলেন। বললেন, রান্নাঘরের ঝাঁঝালো গন্ধ, হাওয়ায় ভাসমান তেল ইত্যাদি বড় নলের সাহায্যে বাড়ির বাইরে চলে যাবে। মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকায় সেটা তাঁরা অতি আনন্দের সঙ্গে ফিক্স করে দেবেন। আসল দাম সাত হাজার। কিন্তু কিছু দিনের জন্য একটু কন্সেশন দেওয়া হচ্ছে। আমি বলি, আমার রান্নাঘর একটা আছে বটে, তবে সেখানে রান্না করি না। শুনে তিনি খ্যাঁক করে উঠে বলেন, দাদা মিথ্যে কথাটা কি না বললেই নয়? আসলে আমার খাদ্য আমি যে বাইরে থেকে আনাই, আমি যে একা থাকি, এ সব কথা তাঁর জানার কথা নয়। আমিও বলি না। তবে ভদ্রতাটা ওঁদের মতো সেল্সম্যানদের শিখে নেওয়া উচিত।
যাই হোক, এ ভাবে থাকা বেশ বিরক্তিকর। ওঁদের প্রত্যেকেই এক জন ব্যক্তি, তিনি যে একা নন তার মতো শয়ে শয়ে ব্যক্তি যে বাড়িতে বাড়িতে ঘুরছেন তা তাঁরা জানেনই না। কিন্তু এ সব ভেবেও আমার কষ্ট কমে না। অবশেষে এক দিন দুপুর রাতে হঠাৎই একটা প্রেরণা এল। ঠাকুর স্বপ্ন দিলেন কি না জানি না, তবে এটি খুবই চমৎকার আইডিয়া বলেই মনে হল।
আইডিয়াটা মনের কাগজে-কলমে চমৎকার মনে হল ঠিকই। কিন্তু হাতে-কলমে কী হয় সেটা তখনও বোঝা যাচ্ছিল না। তাই ঠিক করলাম এ বারে একটু পরীক্ষা করে দেখা যাক। পরীক্ষা শুরু করার আগে একটু প্রস্তুত হয়ে নিতে হল। একটা বড় কাগজে লিখে ফেললাম এক দুই তিন থেকে শুরু করে তিরিশটি প্রশ্ন— ডান পাশে রাখলাম একটু ফাঁকা জায়গা। কাছেই রয়েছে একটি ফোটো কপি করার দোকান। দোকান মালিককে ফোন করে দিই, তিনি এক জনকে পাঠিয়ে দেন। আমি কুড়িটা কপি করিয়ে নিই। কিছু খরচ হয় বটে, তবে পরীক্ষার জন্য এটা করতেই হয়। ফর্মগুলো টেবিলের এক কোণে রেখে দিই। প্রথম প্রশ্ন থাকে নাম, তার পর তাঁর বয়স, লেখাপড়ার বিবরণ, এই কাজ করতে তাঁর ভাল লাগে কি না, বান্ধবী কেউ আছেন কি না, থাকলে কত জন— তাঁদের নাম ঠিকানা। আর যদি কোনও মেয়ে কষ্ট করে আমার সাক্ষাৎপ্রার্থী হন, তা হলে তাঁর বয়স, বাড়ির ঠিকানা, ফোন নম্বর, বয় ফ্রেণ্ডদের নাম ইত্যাদি সে সবের জন্যও ব্যবস্থা রাখলাম কাগজে। আমার নিজের স্বভাবটাই বদলে ফেললাম অনেক ভেবেচিন্তে। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা, যার সারমর্ম হল, যখন যেমন তখন তেমন। আইডিয়াগুলো এত পরে কেন এল ভেবে বেশ আশ্চর্য হই— তবে এ জগতে জানা তো বেশি হয়নি, তাই আশ্চর্য হবার সম্ভাবনা অনেক অনেক বেশি।
আমার এই নতুন পরীক্ষা শুরু করার জন্য খুব একটা বেশি অপেক্ষা করতে হল না। সকাল আটটা চল্লিশ নাগাদ দরজার ঘন্টি বাজল। আমি অপ্রস্তুত ছিলাম না, তাড়াতাড়ি দরজাটি খুলতেই এক জন যুবক বেশ সপ্রতিভ ভাবেই বললেন, গুড-মর্নিং স্যার। আমি বলি তাই বুঝি, গুড মর্নিং? বেশ কথা, মর্নিং গুড যদি ধরুন হয়ই— যদিও আমার বেশ সংশয় আছে এ ব্যাপারে, তাতে আমার কিছু সুবিধে হবে কি? যুবক আমার কথার কোনও জবাব না দিয়ে বলেন, আমি এক্স-ই-জেড থেকে আসছি।
—এক্স-ই-জেড? আমি একটু ন্যাকা কণ্ঠে বলি, ই-জেড গত হয়েছেন বুঝি? আহা শুনে খুবই ব্যথিত হলাম, নিশ্চয় তিনি ভাল মানুষ ছিলেন। পরের জন্য দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে অক্কা প্রাপ্ত হয়েছেন?
যুবক একটু ঘাবড়ে যান। সাময়িক ভাবেই। তিনি আমার কথাটা নিয়ে একটু ভাবেন, ম্লান হাসিতে তাঁর অর্ধেক মুখ উদ্ভাসিত হয়। তিনি বলেন, না না এক্স মানে বিগত কোনও ব্যক্তির পরিচয় নয়, এক্স-ই-জেড একটা কোম্পানির নাম। বলতে লজ্জা নেই এখন সমস্ত বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে— এই কোম্পানি প্রথমে পবিত্র ধোওয়া তুলসী পাতা, গঙ্গার জলে ধুয়ে ঠাণ্ডায় বরফ করে মার্কেটিং শুরু করেছিল সাত বছর আগে। এখন পৃথিবীময় রাজনৈতিক মহলে এর দারুণ কাটতি। তা ছাড়া এক্স-ই-জেডের আর একটি পপুলার প্রোডাক্ট হল পবিত্র ঘুঁটে। এর সঙ্গে ধূপ ব্লেণ্ড করে ভারতে তো বটেই পাকিস্তানে পর্যন্ত চালান যাচ্ছে। তা ছাড়া এক্স-ই-জেডের আরও তেরোটি প্রোডাক্ট রয়েছে….।
আমি যুবককে বাধা দিই। বলি, বাইরে দাঁড়িয়ে কেন, ভেতরে আসুন। বসুন একটু, পাখা চালিয়ে দিই। হাওয়া টানুন নাক দিয়ে, ছাড়ুন নাক দিয়ে। আমি ততক্ষণে এক কাপ চা বানাই। বেশি সময় লাগবে না, একটা ইমারশন হিটার আছে ছোট্ট দেখতে হলে হবে কী, দু’মিনিটে জল ফুটতে থাকে। কফি চলে তো? কফি না চললে চা-ও বানাতে পারি, সেটাও শিখে নিয়েছি। তবে চায়ের টেস্টটা এক এক সময় এক এক রকম হয়।
যুবক ইতস্তত করেন। আমার অনুরোধ ঠেলতে পারেন না। ঘরে এসে বসেন একটা চেয়ারে। আমি একটা প্লেটে কয়েকখানা বিস্কুট আর ডালমুট কিছুটা রাখি। বলি, এ বারে এগুলোর ব্যবহার করুন। যুবক বলেন, আমাদের তুলসী পাতার স্যাম্পল এনেছি, দু’শো গ্রাম মাত্র একশো ত্রিশ টাকা, কেবল প্রচারের জন্য একশো আঠাশ টাকায় ছাড়ছি কেবল এই সপ্তাহের জন্য। বড় পবিত্র মাল, মশাই। বাড়ির দশ জায়গায় একটা করে পাতা রাখুন, মন পবিত্রতায় ভরে যাবে। সঙ্গে দুশো গ্রাম গঙ্গাজল ফ্রি। তা ছাড়া পবিত্র ঘুঁটেরও অনেক গুণ, এক একখানা কেক সত্তর গ্রাম ওজনের, দশটির দাম পঁয়ত্রিশ টাকা। কিন্তু এখন সাড়ে বত্রিশ টাকায় ঝাড়ছি। আমি সবই শুনি। কিন্তু রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে তাঁকে বলি, কী যেন বলছিলেন ভাই আপনি? সবটা শুনতে পাইনি, মাফ করবেন।
যুবকের মুখ থেকে হাসির আভাস এখন প্রত্নতাত্ত্বিকেরাও খুঁজে পাবেন না। তিনি চুপ করেন। আমি উৎসাহ দিই। বলি, বলুন বলুন, আমি সব কথাই শুনতে চাই, লজ্জা পাবেন না। তবে একটু বসুন আমি গরম জলে চায়ের পাতা ফেলে আসি। আপনি কষ্ট করে একটু অপেক্ষা করুন। এ কী! আপনি বিস্কুট মাত্র একটি খেয়েছেন? আরও দু-খানা মুখে দিন। তা ছাড়া ডালমুটটাও চলুক না। আর চা হয়ে এল বলে। আর দু-মিনিট অপেক্ষা করুন।
আমি ফের রান্নাঘরে ঢুকি। কাপে জল ফুটছে। ইমারশন হিটারটির সুইচ অফ করি। দেড় মিনিট অপেক্ষা করে দণ্ডটি কাপ থেকে তুলে দু’চামচ চায়ের পাতা জলে দিই। দু-মিনিট পরে একটা ছাঁকনির সাহায্যে চায়ের জল অন্য একটি কাপে ঢালি। একটু উচ্চ কণ্ঠে যুবককে প্রশ্ন করি, চিনি ক-চামচ? যুবক শুনতে পান না। আমি কাছে গিয়ে বলি, চায়ে চিনি ক-চামচ দেব? তিনি যেন হঠাৎ সম্ভিৎ ফিরে পান। বলেন, চায়ে চিনি? ক চামচ? আমি বলি, বলুন লজ্জা করবেন না, আমার বাড়িতে চিনির অভাব নেই। কালই দুশো গ্রাম কিনেছি কিনা।
যুবক বলেন, দু-চামচ দিলেই হবে।
—মাত্র দু-চামচ? চিনি হচ্ছে কিনা যাকে বলে সোর্স অব এনার্জি, আপনার মতো বয়সে আমি মিনিমাম ছ-চামচ চিনি দিতাম এক কাপ চায়ে। তার পর আর দেখতে হত না, তখন দারুণ এনার্জি। দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত টানা বই পড়তে পারতাম, আর আপনি আছেন কিনা দু-চামচ চিনিতে? স্বাস্থ্য ভেঙে পড়বে যে! যুবক এ ব্যাপারে আর কথা বাড়ান না। বলেন, বলছেন যখন দিন। তবে একটা কথা, আমাদের এক্স-ই-জেডের অন্য প্রোডাক্টগুলির কথা এখনও তো বলিনি। তা ছাড়া আমার কাছে একটা কোশ্চেনেয়ার আছে, সেটাও পূর্ণ করতে হবে, অপূর্ণ রাখা যাবে না।
আমি হর্ষধ্বনি করি। দারুণ ব্যাপার মশাই। আমারও আছে একটা কোশ্চেনেয়ার, আপনারটা পূর্ণ করার পর আমারটা ধরব। আপনারটা পূর্ণ করতে কত সময় লাগবে? যুবক বলেন, বেশি নয়, কুড়ি কি পঁচিশ মিনিট। আমি বলি, আমারটা একটু বেশি সময় লাগবে। কিন্তু তাতে কী, আপনি এত কষ্ট করে এসেছেন আপনার কাজটা তো করতেই হবে। তা ছাড়া, আপনাকে কাছে পেয়েছি, এও তো আমার পরম সৌভাগ্য।
যুবক এ বারে একটু যেন বিচলিত হন। একটু উসখুস ভাব দেখা দেয়। তিনি ঘড়ি দেখেন। বলেন, আজ না হয় এ সব থাক, আর এক দিন সব করা যাবে। আজ আবার আমার ইয়ে, মানে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে কিনা। জরুরি অ্যাপয়েন্টমেন্ট।
আমি বলি, রাখুন আপনার জরুরি অ্যাপয়েন্টমেন্ট। আজকের কাজ আজই সারুন, শাস্ত্রে এটাই কয়। সময় একটু লাগছে বটে, তবে চিন্তা নেই, এখুনি আমি ফোন করে দিচ্ছি দুপুরের আহারটা এখানেই সারবেন। যদি চান-ফান করতে চান সে ব্যবস্থাও আছে। নতুন সাবান, ধোয়া তোয়ালে, মাথায় মাখার শিউলি ফুল তেল, তাও আছে। ও ভাল কথা মনে পড়ল, আধ প্যাকেট কাজু বাদামও আছে। কুচ কুচ করে চিবোন। কাজের সময় কাজু বাদাম কাজের ক্ষমতাকে শতকরা সাঁইত্রিশ ভাগ বাড়িয়ে দেয়, জানেন বোধহয়? যুবক তথ্যটি জানেন কি না বোঝা গেল না। তবে ওঁর মুখের ভাব আরও বদলে গেল। মুখর তুখোর যুবক কেমন যেন নেতিয়ে পড়লেন। আমি একটা প্লেটে কাজু বাদামের সমারোহ করে ওঁর সামনে ধরলাম। তিনি বাধ্য হয়েই দু-একটা কাজু বাদাম মুখে পুরে কুচ কুচ করে দাঁত দিয়ে কাটতে লাগলেন। আমি ওই ফাঁকে আমার খাদ্য সরবরাহকারীকে ফোন করে বললাম, এক জনের জন্য মাংস ভাত তরকারি আর দু’রকম মিষ্টি।
কাজু বাদাম খেয়েই হোক কিংবা মনের জোরের জন্যই হোক দেখা গেল যুবক বেশ যেন নড়েচড়ে বসলেন। ঠিক সেই রকম। তিনি পকেট থেকে মোবাইল টনক বার করলেন। ওটার নাম এখন অনেকে টনক বলেন। বুঝলাম তিনি একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট ক্যানসেল করলেন। আর একটি ফোন করে বোধহয় স্ত্রীকেই বললেন আড়াইটেয় একটি সিনেমা হলে যে যাওয়ার কথা ছিল অনিবার্য কারণে সেটা বাতিল করা হল। তবে যাঁকে ফোন করলেন তাঁর কথাটা স্ত্রী-কণ্ঠ হলেও এটি তাঁরই নিজস্ব কি না সেটা ঠিক বোঝা গেল না। অবশ্য সবই যে বুঝতে হবে এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই আমার।
যুবক নড়েচড়ে বসে বিরাট একটা ফর্ম নিয়ে বসলেন। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে লাগলেন। বাবার নাম মেসোর নাম বাড়িওলার স্ত্রীর নাম। তাঁদের বয়স। এ সব জরুরি তথ্যের পর আমার জরু নিয়েও প্রশ্ন তুললেন। তিনি কেন প্রয়াত হয়েছেন, তাঁর কি কোনও দুরারোগ্য ব্যাধি ছিল ইত্যাদি। তার পর তিনি আমার আয়, হিসাব বহির্ভূত সম্পত্তির হিসাব ইত্যাদি প্রশ্ন করার পর এবং আমার যথেচ্ছ উত্তর লিপিবদ্ধ করার পর বেশ খুশিই দেখাল তাঁকে। এর কিছুক্ষণ পর খাদ্য এসে যাওয়াতে আর বেশি কথাবার্তা হল না। দেখলাম যুবকের ক্ষুধামান্দ্য নেই। বরং ক্ষুধাধিক্যই একটু বেশি আছে। যা যা ছিল সব চেটেপুটে খেলেন। মিষ্টিগুলিকেও সাধনোচিত ধামে পাঠালেন। এর পর এক গেলাস জল টেনে বেসিনে মুখ ধুয়ে রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললেন, মশলা হবে একটু? আমার কাছে আদা শুকনো করা ছিল, তা দিলাম। তিনি গোটা দশেক মুখে দিয়েই উঃ আঃ করে সেগুলো উগড়ে দিলেন। যেন কোনও উগ্রপন্থী এ-কে রাইফেল থেকে গুলি বার করছেন অতি দ্রুততায়। বললেন, এ কী মাল! এত নুন! আমার আবার অধিক নুন খাওয়া নিষেধ। ন্যূনতম নুন খাওয়ার রেজিমে আছি, দিন-রাতে মাত্র এক চায়ের চামচ ব্যস্, তার বেশি নয়! এর পর তিনি হাই তুললেন। লোভীর দৃষ্টিতে আমার বিছানার দিকে তাকালেন। আমি মনে মনেই স্থির করলাম, এটুকুই যথেষ্ট। এ বার আমার জমানা শুরু করতে হবে।
আমার দোষ নেই। যুবকই আমাকে বহু সংখ্যক ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে পথটা মসৃণ করে দিয়েছেন। আমার বিছানার দিকে তাঁর লোলুপ দৃষ্টি দেওয়াতে আমি নিজেকে রক্ষার জন্যই তাঁকে বিশেষ ভাববার সময় না দিয়ে আমার প্রশ্নাবলি ছুড়তে থাকি। নাম ঠিকানা ইত্যাদি মুখবন্ধের পর খোলাখুলি প্রশ্ন করি— আপনার বাবার সংখ্যা কত? শুনে যুবক ঘাবড়ে যান। বলেন, এ কী বলছেন? আমি বলি, এক জন পুরুষের একাধিক ইয়ে মানে ইয়েস্তিরি থাকা এই সুসমাজে যদি চলে, তা হলে একটু উলটো ব্যাপার যা কিনা স্বাভাবিক, কেন চলবে না? যাই হোক ধানাইপানাই না করে স্পষ্ট জবাব দিন। তিনি বলেন, এ অতি ব্যক্তিগত প্রশ্ন, গর্হিত প্রশ্ন। আমি বলি, আপনিও তো আমার কাছ থেকে অব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর লিখে নিয়েছেন। এ কথায় যুবক একটু কাতই হলেন। তিনি কাতর কণ্ঠে বলেন, ছেড়ে দিন মশাই আমাকে। আমার শরীরটা তেমন জুতসই বলে মনে হচ্ছে না।
আমি ওঁর কথা শুনে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। বলি, ঠিক আছে আপনি এই ঘরে ওই সোফাটায় একটু গড়িয়ে নিন। তার পর আরও প্রশ্ন করব, আপনি সুস্থ হলেই। তার পর হয়তো আপনার পবিত্র ধোয়া তুলসী পাতার একটা প্যাকেট কিনতেও পারি। তবে এক প্যাকেটের দাম একসঙ্গে দিতে পারব না। আমার কথায় যুবক রাজি হয়ে যান। তিনি একটা বালিশ নিয়ে সোফায় শুয়ে পড়েন, অবশ্য তাঁর দুটি ঠ্যাংকে সোফার বাইরে রাখতে হয়। ওঁকে বেশ কাহিলই দেখাচ্ছিল।
আমিও পাশের ঘরে আমার খাটে শুয়ে থাকি। ঘুমোই না। এ অবস্থায় ঘুম আসবে না জানতাম। এ বারে মিনিট কয়েক পর আমি ঘুমোনোর ভান করি। বেশ চমৎকার নাক ডাকতে থাকি। বুঝতে পারি, পাশের ঘরে যুবকটি সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছেন। মিনিট কয়েক চুপচাপ। হঠাৎই দরজাটা খোলার আওয়াজ পাই। আমি হুট করে নিজের ঘর ছেড়ে বাইরের ঘরে দাঁড়াই। সব ভোঁ ভাঁ! এক্স-ই-জেডের সেলস্ম্যান ঘরে নেই। এটাই আমি আশা করেছিলাম।
এই পরীক্ষা সফল হবার পর আমি এই কায়দাটাকেই ধ্রুবতারা গণ্য করে চলেছি কয়েক মাস। সাফল্য এখন থই থই করছে। প্রায় প্রত্যেক ক্ষেত্রেই সাফল্য এসেছে অভাবিত নয়, ভাবিত ভাবে! খরচ হয়েছে মন্দ নয়। প্রতি ক্ষেত্রে গড়ে পঞ্চাশ-ষাট টাকা হবে। কিন্তু উপকার যে পেয়েছি তা অমূল্য বললে কম বলা হয়। জানি না কেমন করে ওঁরা সব জেনে গেছেন আমার গূঢ় মতলব। আগে দিনে দু-চার বার হানা দিতেন, এখন সপ্তাহে এক জনকেও দরজায় বেল বাজিয়ে বলতে শুনি না ‘গুড মর্নিং’! এটাও এক ধরনের কষ্ট, একটু উলটো ধরনের কষ্ট। কিন্তু এ জগতে তো এ পর্যন্ত এটা হয়নি যে, সবটাই ভাল— মন্দত্ব একটুও নেই। তাই এ নিয়ে আর আক্ষেপ করি না।