প্রাচীন গ্রিক, মিশরীয় এবং রোমানরা তাদের দেবতাদেরকে নুন-জল দিয়ে আমন্ত্রণ জানাত এবং খ্রিস্ট্রীয় মতাদর্শে বিশ্বাসী কিছু লোক লবণোদককে পবিত্র জলের উৎস বলে এখনও মনে করে। আজটেকের পৌরাণিক কাহিনীতে আছে, Huixtocihuatl ছিলেন একজন দেবী, তিনি লবণ এবং নোনা জলের তত্ত্বাবধায়ক।
তিনদিকে সমুদ্রবেষ্টিত দেশ ভারতে হিন্দুদের কোনও লবণদেবীর খোঁজ পাওয়া যায় না কেন, সেটাই আশ্চর্যের ব্যাপার। তবে লাবণ্য, লাবণী — মেয়েদের এই নামগুলি কিন্তু লবণ শব্দটি থেকে জাত। কর্ণাটক ও বিহারের গয়ায় বাসিরী (বাশুলী) বলে এক দেবীর সন্ধান পাওয়া গেছে। অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের মতো পণ্ডিত সেই দেবীকে সরস্বতী বা বাগীশ্বরীর একটি রূপ বলে মনে করেন। তমাল দাশগুপ্ত তাঁর লেখায় এই দেবীকে বিশালাক্ষীর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন।
আমার মতে বাসিরী (অপভ্রংশে বাসুলী) একজন লবণের দেবী। সংস্কৃত শব্দ বসির-এর অর্থ সামুদ্রিক লবণ। লবণের দেবী তাই বাসিরী। কন্নড় ভাষার বহু শব্দ সংস্কৃত থেকে নেওয়া। সরস্বতী মূলত জলের দেবী। তিনি পদ্মাসনা, হংসবাহনা, মুক্তাহার ধারিণী, কচ্ছপী বীণার অধিকারিণী। নদীবাচী সরস্বতী পরে দেবীবাচী হয়েছেন। তাঁর সঙ্গে সামুদ্রিক লবণের দেবীর কিছুটা সাদৃশ্য তো থাকবেই! তাই লবণের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বাসিরীর সঙ্গে সরস্বতীকে গুলিয়ে ফেলেছেন অনেকে।
ধর্ম ও সংস্কৃতিতে লবণের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। বামনদের বলিদানের সময়, হিট্টাইটদের আচার-অনুষ্ঠানে এবং অমাবস্যার সময়, সেমিটিক ও গ্রিকদের উৎসবের সময়, কর্কশ আওয়াজের সঙ্গে লবণকে আগুনে নিক্ষেপ করা হত। প্রাচীন মিশরীয়, গ্রিক এবং রোমানরা তাদের দেবতাদেরকে নুন জল দিয়ে আমন্ত্রণ জানাত এবং খ্রিস্ট্রীয় মতাদর্শে বিশ্বাসী কিছু লোক লবণোদককে পবিত্র জলের উৎস বলে মনে করে।

হিন্দু ধর্মের বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেমন ঘর-উষ্ণায়ন এবং বিবাহের ক্ষেত্রে লবণ ব্যবহৃত হয়।জৈন ধর্মে, ভক্তরা তাদের ভক্তি বোঝাতে এক চিমটি লবণ দিয়ে কাঁচা চাল দেবতার সামনে নিবেদন দেয় এবং ছাই দাফনের আগে ব্যক্তির দহনকৃত দেহাবশেষে লবণ ছিটিয়ে দেওয়া হয়। মহাযান বৌদ্ধ ঐতিহ্যে বিশ্বাস করা হয় যে, লবণ অশুভ আত্মাদের তাড়াতে পারে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া থেকে বাড়ি ফেরার সময় প্রত্যেকের বাম কাঁধে এক চিমটি লবণ ছুড়ে দেওয়া হয় কারণ এটি অশুভ আত্মাদের ঘরে প্রবেশ করতে বাধা দেয় বলে তারা বিশ্বাস করে। শিন্টৌ ধর্মে, লোকেরা ধর্মীয় শুদ্ধিকরণের জন্য শিও ব্যবহার করে।তারা কোন স্থাপনাকে অমঙ্গল থেকে রক্ষা এবং স্থাপনার পৃষ্ঠপোষককে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে স্থাপনার প্রবেশদ্বারে খাবার লবণের ছোট ছোট পাত্র রাখে।
রাঢ়বঙ্গে বাশুলী বলে যে দেবীর পুজো করা হয়, তিনি বিশালাক্ষী নন, সরস্বতীও নন। তিনি আদত নুনের দেবী বাসিরী। বাংলার ঘরে ঘরে নুন তৈরি একসময় ছিল কুটির শিল্প। স্থাননামেও বসির থাবা গেড়েছে।
শুধু বসিরহাট শহরই নয়, হাবড়ায় বসিরহাটি বলে একটি গ্রামও আছে।এই অঞ্চলে নুনের মোকাম ছিল। বসির মানে সামুদ্রিক লবণ। বসিরপুর, বসিরপাড়া, বসিরগাঁও, বসিরগঞ্জ — এসব জায়গাও আছে। সর্বত্রই নুনের প্রাচীন ইতিহাস। অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বত্র এই নামগুলি ছড়িয়ে আছে।
বাসিরী তাই হিন্দুদের লবণের দেবী। তাঁর অন্য নাম লাবণী বা লাবণ্য কিনা তা দেবা ন জানন্তি, কুতো মনুষ্যা।
ছবি : লেখক
একবারে নতুন, অজানা তথ্য। ব্যাপারটা অত্যন্ত কৌতুহলোদ্দীপক। খুব ভালো লাগলো এমন তথ্য সামনে নিয়ে এলেন। আমরা ঋদ্ধ হলাম।????
এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ লেখা যখন ফেবুতে দিলাম তখন ওদের সিস্টেম জানাল, লেখাটা ওদের কন্ডিসনের সঙ্গে ম্যাচ করছে না। তাই ডিলিট করে দিলাম। ভাবুন একবার। ফেসবুক এরকম অনেক লেখাই ডিলিট করে দিচ্ছে।
আমার গবেষণাধর্মী কোনও লেখাই ফেবু নিচ্ছে না। আমার লেখাটি ফেবুতে শেয়ার করতে পারিনি। ওরা বলছে, ফেবুর অন্য লোকজন বলছে, লেখাটিতে অশ্লীল উপাদান আছে। কেউ কেউ রিপোর্ট করেছে। তাই ফেবু পোস্টটি রাখতে পারছে না। আশ্চর্য হয়ে এখন ভাবছি, এসব লেখায় কার স্বার্থ বিঘ্নিত হচ্ছে?