পাঠ্যবইয়ের সূচি থেকে যদি দু-একশো বছর অথবা এদেশে মুসলমান শাসনকালের দু-একটি অধ্যায় বাদ দেওয়া হয় তাহলে কি ইতিহাসের ওই অধ্যায় বা সময়কাল মুছে যায়? যদি ওই যুগ কিংবা সময় অন্ধকারাচ্ছন্ন কিংবা স্বৈরতান্ত্রিকও হয়, তা হলেও কি ইতিহাস থেকে সেই সময়কে মুছে দেওয়া যায়? ইউরোপের ইতিহাসে মধ্যযুগ সময়টিকে তো অন্ধকারাচ্ছন্ন বলেই ইতিহাসে ব্যাখ্যা করা হয় কিন্তু সামগ্রিক ইতিহাস চর্চা থেকে ওই সময়কে কি বাদ দেওয়া গিয়েছে? সভ্যতার ইতিহাস মানে তো কেবল উত্থান, উত্তরণ, সাফল্য বা আলোর পথেই হেঁটে যাওয়া নয়, মানব সভ্যতার ইতিহাস মানে অনেক ভাঙন, অনেক পতন, অন্ধকারে ঢেকে যাওয়া সময় রয়েছে, কারণ সভ্যতা যুগ যুগান্ত ধরে সেই সময় অতিবাহিত করেছে। ইতিহাস কেবল আলোর পথে উত্তরণ নয়। অন্ধকার নেমে এসেছিল বলেই মানুষ বাঁচার তাগিদে আলোর সন্ধান করেছিল, সেই অনুসন্ধান থেকেই সভ্যতা ক্রমাগত এগিয়ে চলেছে। তাই ইতিহাসের ধারাবাহিক পর্বগুলিকে জানা অত্যন্ত জরুরী, সে আলোকময় হোক কিংবা যতই অন্ধকারাচ্ছণ্নই হোক না কেন। আমাদের দেশের সমাজ, রাজনীতি, দর্শন, সংস্কৃতি এমনকি ইতিহাসের বিবর্তনও স্রোতের মতো প্রবাহমান। যে ধারায় কখনও ছেদ পড়েনি — প্রাচীন রাজবংশীয় আমল থেকে শুরু করে সুলতানি যুগ এবং মুঘল যুগেও সেই বিবর্তন ধারা অব্যাহত ছিল। সেই ধারা থেকে দু-একটি পর্ব বা অধ্যায় বাদ দিলে তাতে কেবল ছেদ পড়ে না, ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়, ইতিহাসের বিকৃতি ঘটে।
জাতীয় শিক্ষা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ পরিষদ যা এনসিইআরটি নামে সমধিক পরিচিত; চলতি শিক্ষাবর্ষের (২০২৫-২৬) জন্য প্রবর্তিত নতুন অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস বা সমাজবিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তকে রাজিয়া সুলতান এবং নূর জাহানের মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের উল্লেখ বাদ দেওয়া হয়েছে। যদিও পুরনো পাঠ্যপুস্তকে রাজিয়া সুলতানের নামে একটি অংশ ছিল, যিনি ১২৩৬ সালে শাসক (সুলতান) হয়েছিলেন এবং ১২৪০ সাল পর্যন্ত তাঁর রাজত্ব অব্যাহত রেখেছিলেন, নতুন সংস্করণ থেকে এটি বাদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে নতুন সপ্তম শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকগুলি দ্বাদশ শতাব্দীর সময়সীমার আগেই শেষ হয়ে যায়। একইভাবে নতুন পাঠ্যপুস্তকে সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্ত্রী নূরজাহানের উল্লেখ বাদ দেওয়া হয়েছে। নতুন পাঠ্যপুস্তকে টিপু সুলতানের উল্লেখও বাদ দেওয়া হয়েছে, যাকে অষ্টম শ্রেণীর ইতিহাসের পুস্তক-এ “মহীশূরের বাঘ” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এমনকি টিপুর পূর্বসূরী হায়দার আলীর নামও বাদ দেওয়া হয়েছে। টিপু সুলতান এবং ব্রিটিশদের মধ্যে ১৮ শতকে সংঘটিত চারটি ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের উপর লেখাও বাদ দেওয়া হয়েছে। পরিবর্তে নতুন পাঠ্যপুস্তকে মারাঠা সাম্রাজ্যের উপর বিভাগটি সম্প্রসারিত করা হয়েছে। “পরাক্রমশালী মারাঠা মহিলা” শিরোনামের একটি বিভাগে তারাবাইকে “নির্ভীক যোদ্ধা রাণী” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি সম্রাট আওরঙ্গজেবের সম্প্রসারণ প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করেছিলেন।এর আগে, এনসিইআরটি-র নতুন অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে বিভিন্ন মুঘল সম্রাটদের রাজত্বকালকে নৃশংস এবং অসহিষ্ণু হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল এবং শেষে প্রশ্নবিদ্ধ নোট লেখা হয়েছিল।
স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, শিক্ষামন্ত্রক তথা এনসিইআরটি ইতিহাস বা সমাজবিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তককে মুঘল সম্রাটদের জীবনের শুধুমাত্র অন্ধকার এবং নেতিবাচক দিক তুলে ধরে খুব ছোট থেকেই স্কুল পড়ুয়াদের মনে মেরুকরণের বীজ পুঁতে দিতে চাইছে। সরকারি সূত্রেই জানা যাচ্ছে, উত্তরাখণ্ডের শিক্ষামন্ত্রী ধনসিং রাওয়াত সম্প্রতি এনসিইআরটি কর্তৃপক্ষকে প্রস্তাব দিয়েছেন যাতে সেই রাজ্যের সরকারি বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে ভগবত গীতা এবং রামায়ণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে পড়ুয়ারা অনেক ছোট থেকেই ভারতের সনাতন ধর্ম সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে পারবে। এখানেই শেষ নয়। ইতিমধ্যেই উত্তরাখণ্ডের বিজেপি সরকার পরিকল্পনা করেছে, যতদিন পর্যন্ত এসব সরকারি বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত পড়ুয়ারা স্কুলের প্রার্থনা সঙ্গীতে গীতা এবং রামায়ণের শ্লোক আবৃত্তি করবে। বোঝা যাচ্ছে কেন এনসিইআরটির অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে কেবলমাত্র মুঘল সম্রাটদের নেতিবাচক দিক তুলে ধরা এবং রাজিয়া সুলতানা এবং নুরজাহানের প্রসঙ্গ বেমালুম বাদ দেওয়া। অথচ সংশোধনের আগে এনসিইআরটির পাঠ্যবইয়েই উল্লেখ করা হয়েছিল যে ১২৩৬ থেকে ১২৪০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত রাজিয়া সুলতানার শাসনকাল দেশের সুলতানি শাসন-ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গিরের স্ত্রী নূরজাহান সম্পর্কিত অধ্যায়ও। দেশ পরিচালনায় জাহাঙ্গিরের পাশাপাশি তাঁরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলেই জানা যায়।
এর আগে উত্তরপ্রদেশ সরকার মুঘল আমলের বহু ঐতিহাসিক শহর ও স্থাননামের বদল ঘটিয়েছে। কেন্দ্র সরকারও দিল্লির মুঘল গার্ডেন্সের নাম পরিবর্তন করেছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বত্তৃতায় তো ইতিহাস নতুন করে লেখার কথা বলেী চলেছেন। আসছেন। সম্প্রতি ইউজিসি-র পক্ষে ইতিহাসের যে সিলেবাস প্রকাশ করা হয়েছে তাতে ভুরি ভুরি ইতিহাস বিকৃতি। ফলে এনসিইআরটি-র সুপারিশ মেনে যে এই রদবদল এই যুক্তি হাস্যকর, তাকে কোনোভাবেই মানা যায়না। আসলে এনসিইআরটিকে ঢাল হিসেবে সামনে রেখে আড়াল থেকে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার তথা আরএসএস দেশের ইতিহাসকে বিকৃত করার সুপরিকল্পিত চক্রান্ত চালাচ্ছে যাতে মুসলমানদের ইতিহাস মুছে ফেলা যায়, হিন্দুত্ববাদকে আরও মহান করে সামনে রাখা যায়- এই গভীর ষড়যন্ত্র সহজেই ধরা পড়ে। সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা মধ্যযুগের ভারতের ইতিহাসকে হিন্দু-মুসলিম সংঘাতের কাহিনি হিসাবে দেখাতে চায়। তারা বলতে চায় হিন্দু ও মুসলমানরা স্বতন্ত্র শিবির, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক তিক্ত এবং বৈরিতাপূর্ণ। সচেতন ভাবেই এই চিন্তা তারা ইতিহাসে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। আসলে ইতিহাস যে ধর্মমতের নয়, হিন্দু-মুসলমানের সমস্যাও নয়, অধিকাংশ শাসকই হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে তাঁর প্রজাদের উপর নির্যাতন চালাতেন, অত্যাচার, লুণ্ঠন চালাতেন আর লুটের ভাগবাটোয়ারা ঘিরে ঝামেলা লেগেই থাকতো- এই সহজ সত্যকে এড়িয়ে কেন মন্দির আক্রান্ত হয়েছে মসজিদ নয় কেন, মুসলমানেরা হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেচছে অতএব তাদের মারো, দেশ থেকে তাড়াও সর্বক্ষণ এই চর্চা হল বিজেপির ইতিহাস। যা আসলে সাম্প্রদায়িক কোপদৃষ্টি, যেখান থেকে স্কুল্পপড়ুয়াদের ইতিহাস পাঠ্যসুচিও রেহাই পাচ্ছে না।