মহেঞ্জোদারো আবিষ্কৃত হয় বিংশ শতকের প্রথম ভাগে। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে বাঙালী প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এটি আবিষ্কার করেন। এর আবিষ্কার ঘটে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার উর নগরীর খননের প্রায় সমসাময়িক সময়ে।
উর নগরী ছিল বাইবেলের আব্রাহামের জন্মস্থান। মহেঞ্জোদারো আবিষ্কারের সঙ্গে পার্থক্য হলো, মেসোপটেমিয়া ও মিশরের প্রাচীন নগরীগুলির সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল বাইবেল ও অন্যান্য গ্রন্থের সূত্র ধরে। বিশিষ্ট লেখিকা ও গবেষক পারভীন তালপুর এক জায়গায় লিখেছেন, মহেঞ্জোদারোর নাম নেই বেদ বা মহাভারতের মতো কোনো গ্রন্থে; ঘটনাচক্রে একটি বৌদ্ধ স্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা অবস্থায় সেটি আবিষ্কৃত হয়। ইসলামী ঐতিহ্যেও উল্লেখ মেলে উরের, এটিই নাকি সেই নগরী যেখানে নিমরোদ আব্রাহামকে আগুনে পোড়াতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আগুন পরিণত হয়েছিল ফুলের বাগানে। কিন্তু বেদ-রামায়ণ-মহাভারতে সিন্ধুসভ্যতার উল্লেখ নেই।
রামায়ণ-মহাভারতে না মিললেও পুরাণে কিন্তু সিন্ধুসভ্যতার কিছু প্রক্ষিপ্ত কাহিনী এসে গেছে। পশুপতি সীল ও ইউনিকর্নে, সূর্য দেবতার ছবিতে, তার প্রমাণ পাওয়া যায়। ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির একটি অবস্থা এই ইউনিকর্ণ বলে বিশ্বাস করেন কেউ কেউ।
আর মরুতীর্থ হিংলাজ-এর শক্তিপীঠে ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের যাতায়াত তো হাজার বছর ধরেই চলছে। পাকিস্তানের অন্তর্গত বেলুচিস্তানের মাকরান উপকূলে অবস্থিত হিংলাজ। সতীর ব্রহ্মরন্ধ্র বা মস্তিস্কাংশ পড়েছিল এখানে। একান্ন পীঠের অন্যতম হিংলাজমাতার মন্দির। তিনি হিন্দু ও মুসলমান, দুসম্প্রদায়েরই আরাধ্য।
১৯৬০-এর আগে পর্যন্ত হিংলাজ তীর্থ অনেক বাঙালির কাছেই ছিল অচেনা। ১৯৫৯-এ বেশিরভাগ বাঙালি হিংলাজ তীর্থ সম্পর্কে জানল উত্তমকুমার-বিকাশ রায়ের ছবির হাত ধরে — মরুতীর্থ হিংলাজ নামক ছায়াছবি দেখে। বেলুচিস্তানের রুক্ষ মরুপ্রান্তরে নিঃসঙ্গ এক হিন্দু তীর্থ, হিংলাজ। বহু প্রাচীনকাল থেকেই দেবী এখানে কোট্টরী ও ভৈরব ভীমলোচন রূপে পূজিত হন। স্থানীয়রা বলেন হিংলাজ দেবী। এই মন্দিরের নামেই গোটা গ্রামের নাম হিংলাজ। মূল সংস্কৃত শব্দটি হল “হিঙ্গুলা”৷
পুরাণ মতে, এই বেলুচিস্তানের হিংলাজেই পড়েছিল সতীর ব্রহ্মরন্ধ্র। সিঁদুর লেপা এক খণ্ড পাথরই সর্বজনপূজিতা দেবী হিংলাজ। সঙ্কীর্ণ গিরিখাত, তার মাঝে একটি গুহা। আর সেই গুহাই মহাশক্তিস্থল। গুহাটির উচ্চতা কমপক্ষে ৩০ ফুট। চওড়ায় ৬০ থেকে সত্তর ফুট। নীচে মরীচিকার মতো বয়ে চলেছে হিঙ্গোল নদী। নদীটি এই আছে, এই নেই। বর্ষায় ফেঁপে উঠে এই নদী হয়ে ওঠে স্রোতস্বিনী কল্লোলিনী। যে স্রোত রুদ্ধ করে দেয় গুহায় প্রবেশের পথ।
হিংলাজ মন্দিরকে ঘিরে নানা ইতিহাস ও কিংবদন্তি। ভক্তদের বিশ্বাস, যিনি যতই পাপ করে থাকুন না কেন, এমনকী পূর্ব জন্মের কোনও পাপ থাকলেও, এই মহাশক্তিস্থলে এলে সব পাপই বিলীন হয়ে যায়। হিংলাজের পরতে পরতে জড়িয়ে এমন নানা লোকগাথা। মন্দিরের কাছে আছে একটি কুণ্ড। সেই কুণ্ড ঘিরেও রয়েছে নানা বিশ্বাস। বলা হয়, কুণ্ডের মধ্যে অবিরাম ফুটতে থাকে কাদা মাটি । সেই ফুটন্ত কুণ্ডের কাছে এসে অন্তর থেকে নিজের পাপের কথা বললে নাকি দেবী মাফ করে দেন। মুছে যায় গ্লানি, ঘটে পাপমুক্তি। কথিত আছে, রাবণ যেহেতু ব্রাহ্মণ ছিলেন, তাই রাবণ বধের পর এই হিংলাজে এসেই দীর্ঘদিন ধরে তপস্যা করে পাপস্খালন করেছিলেন স্বয়ং রামচন্দ্র। এতটাই মাহাত্ম্য হিংলাজের।
পাকিস্তানের করাচি থেকে ২৫০ কিলোমিটার দূরে, উত্তর-পূর্ব দিকে বেলুচিস্তান প্রদেশের মকরান মরুভূমির উপর অবস্থিত এই হিংলাজ তীর্থক্ষেত্র।
প্রতি বছর এপ্রিলে হিংলাজে বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়। যাতে হিন্দু-মুসলমান, সকলেই শামিল হন। রীতি অনুযায়ী, নৈবেদ্য হিসেবে ৩টি করে নারকেল দেন সব ভক্ত। বছরে পর বছর ধরে এইভাবেই পূজিত হয়ে আসছেন দেবী হিংলাজ।
বেলুচিস্তান প্রদেশের হিঙ্গুল ন্যাশনাল পার্কের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে হিঙ্গুল নদী। এই নদীর ধারেই একটি দুর্গম পর্বতের মধ্যে বিরাজ করছেন বেলুচিস্তানের ‘নানী কি হজ’ । পাকিস্তানের মুসলিমরা এই নামেই চেনে মরুতীর্থ হিংলাজকে। জানা যায়, এই হিন্দুদেবী পূজিত হন বালুচ মুসলিমদের দ্বারাও। সংসারের সবাইকে নিরাপদে রাখা ও প্রিয় মানুষের মঙ্গল কামনায় এই দেবীর দরবারে আসেন তাঁরা। হিংলাজ তীর্থ মরু প্রান্তরে। তাই প্রসাদও শুকনো। হিংলাজ মাতাকে নিবেদন করা হয় শুকনো নারকেল, মিছরি, বাতাসা।
খুব কম মানুষের কপালেই হিংলাজ দর্শন লেখা থাকে। কারণ হিংলাজ যেমন দুর্গম, তেমনভাবে এটাও সত্যি হিংলাজ এখন বেলুচিস্তানে। বিদেশের মাটিতে গিয়ে সতীপীঠে দর্শনের সুযোগ খুব কম মানুষেরই হয়। করাচি থেকে কোস্টাল হাইওয়ে ধরে বাসে বা গাড়িতে করে পৌঁছনো যায় হিংলাজে।
হিংলাজ থেকে সিন্ধুসভ্যতার পশ্চিমতম কেন্দ্র সুতকাগেনদর-এর দূরত্ব মাত্র ৫৬ মাইল। বলা চলে, হিংলাজের গায়েই সিন্ধুসভ্যতার কেন্দ্র সুতকাগেনদর ও সোকতা-কোহ।
কোনওভাবে সিন্ধুসভ্যতার কোনও অনুষঙ্গ হিংলাজের মন্দিরে এসেছে কিনা তা ভেবে দেখা দরকার। সুতকাগেনদর ছিল দুর্গবেষ্টিত বন্দর নগরী। সেখানে উঁচু দুর্গপ্রাকার ছিল। হিংলাজমাতার মন্দিরও মাটি থেকে তিরিশ ফুট উঁচুতে। সুতকাগেনদরের দুর্গপ্রাকার পাথর দিয়ে তৈরি। মাঝে মাঝে ইট। হিংলাজমাতার মূর্তি বলে কিছু নেই, একখণ্ড পাথরমাত্র।
সুতকাগেনদরে আবিষ্কৃত হয়েছে অনেক ফ্লিন্ট ব্লেড বা পাথর কাটার প্রস্তরনির্মিত ছুরি। এর ফলা এতটাই ধারালো যে পাথরও কেটে ফালাফালা হয়ে যায়। যেন কাচকাটা হীরে! সতীর মৃতদেহের উপর নারায়ণের সুদর্শন চক্রের কর্তনক্রিয়া মনে পড়ায় এই ফ্লিন্ট ব্লেড। সবচেয়ে বড় যে ফ্লিন্টব্লেড আবিষ্কৃত হয়েছে, তার দৈর্ঘ্য ২৭.৫ সেমি।
ড সত্যনারায়ণ দাশের লেখা ‘বাংলায় দ্রাবিড় শব্দ’ বইয়ে বাংলা নরক আর নরুন শব্দের ব্যুৎপত্তিতে তামিল ‘নরকু’ শব্দের কথা বলা হয়েছে। নরকু মানে কর্তন বা কাটা। এই ধরনের আরও শব্দ আছে কিনা দেখার জন্যে ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ দেখলাম। নরসানি বা নরসিং কাটারির নাম পেলাম। পেলাম ‘নারীচ’ তীরের নাম। ‘নরসুন’ শব্দটি একটি বাউল গানে পেয়েছিলাম (সুধীর চক্রবর্তীর গভীর নির্জন পথে বইয়ে)। সেটি সেখানে খুর অর্থে ব্যবহৃত। তাই দেখা যাচ্ছে দ্রাবিড় শব্দ থেকে কাটাকাটির ধারণাসম্বন্ধীয় শব্দগুলি বাংলায় বা সংস্কৃতে এসেছে।
‘নারায়ণ’ নামটি দ্রাবিড় নরকু থেকে জাত কিনা ভেবে দেখা উচিত বইকি! বিশেষত যখন তিনি সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর মরদেহ টুকরো টুকরো করে ফেলেন, আর তৈরি হয় একান্নটি শক্তিপীঠ। সিন্ধুসভ্যতার পশ্চিমতম কেন্দ্র সুতকাগেনদরে প্রাপ্ত পাথর কাটার ফ্লিন্ট ব্লেড থেকেই কি এল পুরাণের সতীর দেহচ্ছেদের ধারণাটি? আর, ফ্লিন্ট ব্লেডের মত ধারালো কর্তনাস্ত্রের উপস্থিতি কি সিন্ধুসভ্যতার প্রোটোদ্রাবিড়ীয় জনগোষ্ঠীর কথা মনে পড়ায় না? হাজার হাজার বছর ধরে ফুটতে থাকা হিংলাজ-কুণ্ডের কাদামাটি কি সিন্ধুসভ্যতার সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত?