হীরেন্দ্রকুমার গঙ্গোপাধ্যায়ের (হীরুবাবু) জন্ম ১৯১১ সালের এপ্রিল মাসে। তাঁর বাবা মন্মথনাথ গঙ্গোপাধ্যায় স্বনামধন্য মানুষ — আইন জগতে সুপ্রতিষ্ঠিত এবং সঙ্গীত অনুরাগী। মা নলিনী এদবী। হীরুবাবুরা ছিলেন মোট তিন ভাই, এক বোন। ধীরেন, বীরেন ও বীনাপাণি।
পিতা মন্মথনাথ হাইকোর্টের এটর্নি, ডেপুটি রেজিস্ট্রার, মিউনিসিপ্যাল ম্যাজিস্ট্রেট। দোর্দ্দণ্ড প্রতাপ বৃটিশ শাসনের ভক্ত, আচারনিষ্ঠ, প্রাচীন পন্থী কিন্তু সঙ্গীতের প্রতি ভালবাসা তাঁর স্বভাবের কঠিন সব দিকই কোমল করে দিতে পারে। সঙ্গীতের জন্য তিনি ছাড়তেও পারতেন সব। ওঁর গুরু ছিলেন বাবু খান। নিজ জ্যাঠামশাই কুমুদনাথ গঙ্গোপাধ্যায় গান গাইতেন। একটা শখের যাত্রাদলও গঠন করেছিলেন। অভিনেতারা ওঁরই বাড়িতে থাকতে। আর এক কাকা নৃপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় কীর্তন, ভজন, শ্যামা সঙ্গীতে দক্ষ ছিলেন। হীরুবাবুর সেজদা গান শিখতেন সঙ্গীতাচার্য গিরিজাশংকর চক্রবর্তীর কাছে। বড়দা তবলা পিতার কাছে সামান্য শিক্ষা নিয়ে ভালই বাজাতে পারতেন। তাঁর জ্যাঠতুত দাদা শ্রীকৃষ্ণকুমার (নাটুবাবু) তবলায় এবং তাঁর ছোট ভাই শ্যাম (সরোদে) ভারত জোড়া খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
হীরুবাবুর জন্ম মাতামহের বাড়ি ভবানীপুরে। মাতামহ রজনীকান্ত ভট্টাচার্য গাইতেন ধ্রুপদ। ভবানীপুর সঙ্গীত সম্মিলনীর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন আমৃত্যু। হীরুবাবুর পৈত্রিক বাড়ী টালায় ৬ নম্বর বনমালী চট্টোপাধ্যায় স্ট্রিটে। ১৯১৪ সালে তৈরী।
হীরুবাবু কবে তবলা শেখা ধরলেন তা অনেক করেও নিজেই মনে করতে পারতেন না। অতীতের দিকে যত সুদূরই তাকান দেখতে পেতেন বাজিয়েই চলেছেন। শুনেছিলেন যখন তাঁর বয়স তিন, বাইরের ঘরে বাজাতে বাজাতে বাবা উঠে গেলেন কিছু কাজে। ফিরে এসে দেখলেন ছোট্ট ছেলেটি তাকিয়ার উপর বসে তাঁর তবলায় বোল ফাটাচ্ছে এবং বাবা যে লয় বাজাতে বাজাতে ছেড়ে গিয়েছিলেন, ছোট ছেলেটির হাতে সেই লয়ই বাজছে। ছেলেকে চিনতে বাবার দেরী হলো না। নিজেই শুরু করলেন ছেলেকে শেখাতে।
হীরুবাবুর পরিবারের পরিচয় সামান্য দেওয়া গেছে। নিয়মানুবর্তিতা নিষ্ঠা আর কালচারের প্রতি অনুরাগ এই তিনই ছিল এই পরিবারের ভিত্তি। হীরুবাবুর বড়দা সলিসিটার ছিলেন। সেজদা কলকাতা কর্পোরেশনের সাব এসেসর ছিলেন। হীরুবাবুর শৈশব কৈশোর যৌবন কেটেছে শৃংখলা আর দায়িত্বপূর্ণ কাজের মধ্য দিয়ে। তবলায় কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন। সঙ্গীতরসিক মহলে তাঁর সম্বন্ধে তখনকার বিখ্যাত ‘সঙ্গীত বিজ্ঞান প্রবেশিকায়’ প্রবন্ধ লিখেছেন স্বনামধন্য গিরিজাশংকর চক্রবর্তী ১৯৩১-৩২ সালে। কিন্তু তবলা তাঁর পড়াশোনার বিঘ্ন বা বিস্তৃত কর্মজীবনের প্রতিবন্ধক হয়নি কোনও দিন।

১৯২০ সাল থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত তাঁর পড়াশোনা টালায় নর্থ সাবারবন স্কুলে। তারপর ১৯২৬ সালে স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রথম ডিভিসনে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৩০ এ দর্শনে সাম্মানিক সব গ্র্যাজুয়েট, ৩৩এ বি এল ফাইনাল ১৯৩৭এ এটার্নিশিপ পাস। ১৯৩৭ থেকে ৫১ পর্যন্ত হাইকোর্টে প্র্যাকটিশ, ১৯৫১ সালে অ্যাসিস্টেন্ট রেজিষ্ট্রার হিসেবে হাইকোর্টে যোগ দেন। ১৯৬১ থেকে ৬৯ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের কম্পানি অ্যাফেয়ার্স বিভাগে অফিসিয়াল লিকুইডেটোর। ১৯৬৯ সালের ১ লা মে সসম্মান অবসর গ্রহণ। ‘ঝংকার’ মিউজিক সার্কেল ১৯৫০ সালে হীরুবাবুকে ‘ডি মিউজ’ উপাধিতে ভূষিত করে। এছাড়া আরও কত সামাজিক দায়িত্বে নিজেকে নিয়োজিত করতে হয়েছিল তাঁকে।
এই যে বিরাট কর্মবহুল জীবন-এর মধ্যে তবলা রইল কোথায়, কখন কেমনভাবে? তবলা তাঁর অন্যান্য জৈবিক অভ্যাস, যেমন খাওয়া বেড়ানো ঘুমোনোর মতই প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে জড়িত। আবার যেমন ছাত্রাবস্থায় তেমনি কর্মজীবনেও ভোর পাঁচটা থেকে সাড়ে ছয়টা অবধি তবলা রেওয়াজে বিরতি ছিল না। সাধারণত প্রতি শুক্রবার বাড়িতে আসর বসত। কে না এসেছে সেই আসরে।
হীরুবাবু বিবাহ করেন ১৯৪৮ সালে। গৌহাটী কটন কলেজে এককালীন সহকারী অধ্যক্ষের মেয়ে নীলিমা তাঁর সহধর্মিনী। তাঁদের একমাত্র সন্তান তাপস।
হীরুবাবু প্রথমে বাজানো শিখতে শুরু করলেন বাবার কাছে।এরপর গুরু পদে বরণ করলেন শ্রীনগেন্দ্র নাথ বোসকে। তাঁর জীবনে তারপর অলৌকিক আবির্ভাব লক্ষ্ণৌর ওস্তাদ সেই সময়কার অবিসম্বাদিত শ্রেষ্ঠ তবলাবাদক ওস্তাদ খলিফা আবিদ হোসেন খাঁন সাহেবের।
১৯১৯ সাল। তখন গান বাজনার আসর বসতো সাধারণত গুণগ্রাহী ধনী ব্যক্তিদের পারিবারিক উৎসবকে কেন্দ্র করেই। রাজা হৃষিকেশ লাহার বাড়ি বিবাহের সময় এমন এক আসরে বাজালেন আবিদ হোসেন খাঁ সাহেব। শুনলেন হীরু,তাঁর বাবা এবং বাবার বন্ধু হেমাঙ্গভূষণ মুখোপাধ্যায়। ওস্তাদ কেরামাতুল্লার সরোদের সঙ্গে ওস্তাদজীর সেই বাজনা। সে স্বর্গীয় অনুভূতি যে নিজে পায় না সে ব্যক্ত করতে পারে না। তাঁর বাবার ইচ্ছা হলো হীরুকে ওঁর কাছে শেখানো হবে। সাতকড়ি বাবুর এক ছাত্র বিজয়লাল মুখোপাধ্যায় ভাল গাইতেন। এই আসরেও ছিলেন। তাঁকে অনুরোধ করা হলো ওস্তাদজীকে এই প্রস্তাব দেওয়ার জন্য। কারণ নগেনবাবুকে দিয়ে বলানো শোভন হয় না।
বিজয়বাবুর আগ্রহাতিশয্যে কয়লা ব্যবসায়ী নীলমণি চৌধুরীর বাড়ির আসরে আবিদ হোসেনকে আনা হলো। স্থির হলো প্রথমে হীরু বাজাবেন সাতকড়িবাবুর গানের সঙ্গে। ওস্তাদজী আগে স্বকর্ণে তাঁর বাজনা তো শুনুন। বেলঘরিয়ার বাগানবাড়িতে আসর বসলো। ওস্তাদজী হীরুর বাজনা শুনে খুব খুশী। সন্তর্পণে তাঁর কাছে পাড়া হলো হীরুকে শেখানোর কথা। সম্ভবত মুখ ফসকেই বলে ফেললেন ওস্তাদজী, ‘আল্লার কসম, ম্যায় বাচ্ছাকো শিখায়েঙ্গে।’ এরপরেই ওস্তাদজী মেয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে দেশে চলে গেলেন।
কলকাতায় ফিরে এসে বউবাজারে এক বাঈজীর বাড়িতে ওস্তাদজী থাকেন। সেখানে বারান্দায় বসে উনি তামাক খেতেন। মন্মথবাবু আর হেমবাবু যাওয়া আসার পথে লক্ষ্য রাখেন। ওই তামাকের নিশানা দিয়েই ওস্তাদজীকে একদিন ধরা হলো। ওস্তাদজী মাসে একশ টাকা চেয়ে বসলেন। ‘আল্লার কসমের’ কথা তুলতেই একশ সর সর করে নেমে এলো চল্লিশে। নাড়া বাঁধা হলো। তখন হীরুবাবুর বয়স ৮। এই শিক্ষা চলেছে ১৯৩৬ পর্যন্ত। ওস্তাদজীর জামাই খলিফা ওয়াজেদ হোসেন অনন্যসাধারণ তবলা শিল্পী ছিলেন। এঁর পুত্র আফাক হোসেন খাঁর ভারত জোড়া নাম।
হীরুবাবুর শেখাটা ছিল বিচিত্র ধরনের। যে বোল বাজানো হতো তিনি সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিতেন। যা কিছু লিখে রাখবার তা তাঁর বাবা লিখে নিতেন। এমন চলেছে ১৯২৩ পর্যন্ত। এরপর হীরুবাবু নিজেই লিখতে শুরু করলেন। (চলবে)