আজো যার “অষ্টাদশীর ছোঁওয়ায় লজ্জা জড়ানো” মধুরকণ্ঠ মাতিয়ে রাখে আপামর শ্রোতাকে, স্বর্ণযুগের সেই কিংবদন্তী গায়িকা আরতি মুখোপাধ্যায়ের আজ জন্মদিন।
একসময় তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল বাংলা ছবিতে সুচিত্রা সেনের নেপথ্য কণ্ঠে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের জায়গায় তাঁকে নেওয়া হয়েছিল। যাটের দশকের শেষে তিনি শর্মিলা ঠাকুর, অপর্ণা সেন, দেবশ্রী রায়, তনুজার মতো নায়িকাদের নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে গান গেয়েছেন। অনেক অজানা স্মৃতির স্থিরচিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করলাম আজকের লেখায়।
১৯৪৫ সালের ১৮ই জুলাই কলকাতায় জন্ম আরতি মুখোপাধ্যায়ের। মনোরঞ্জন মুখোপাধ্যায় ও প্রভাবতীদেবীর চার মেয়ে এবং তিন ছেলে। মেয়েদের মধ্যে আরতি মুখোপাধ্যায় বড়ো। গায়িকার ছোটবেলায় জন্মদিন কাটতো মায়ের এস্রাজ, বাবার টুংটাং পিয়ানো আর ঠাকুমার হাতের পায়েস, সিঙ্গারা খেয়ে। আজো আরতি মুখোপাধ্যায় জন্মদিন পালন করেন রবীন্দ্রসঙ্গীত, গজল, ঠুংরির মধ্য দিয়ে পরিবারের সঙ্গে।

ছোটবেলা থেকেই গানবাজনার মধ্যে বড়ো হয়ে ওঠা। গানবাজনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন মা। সুশীল ব্যানার্জি, ওস্তাদ মহম্মদ সগিরুদ্দিন খান, পণ্ডিত চিন্ময় লাহিড়ী, পণ্ডিত লক্ষ্মণ প্রসাদ জয়পুরওয়াল এবং পণ্ডিত রমেশ নাদকার্নির মতন বিখ্যাত সঙ্গীত বিশেষজ্ঞদের তালিমে শুরু হয় সঙ্গীত শিক্ষা। দীর্ঘদিন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চা করেন। তিনি মনে করেন, যে কোন ধরনের গান গাওয়ার জন্য গলার মোবিলিটি দরকার। যত বেশি রেওয়াজ করা যায়, গলার মোবিলিটি তত বাড়ে।
১৯৫৭ সালে এক প্রতিযোগিতায় ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, সুচিত্রা মিত্র ছিলেন বিচারক। গানের গলা শুনে মুগ্ধ হয়ে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য সুশীল ব্যানার্জিকে জিজ্ঞেস করেন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ‘মামলার ফল’ ছবিতে আরতি তাঁর সঙ্গে গান গাইতে আগ্রহী কিনা। শুরু হয় প্রথম প্লে ব্যাক আরতি মুখোপাধ্যায়ের। রেকর্ডিংরুম ক্যালকাটা অর্কেস্ট্রায় সেদিন দেখা হয় সঙ্গীত কিংবদন্তী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তৈরি হয় দিদি-বোনের সম্পর্ক।
সালটা ১৯৫৮, কলকাতায় চলছে ঐতিহ্যবাহী “মার্ফি মেট্রো সিঙ্গিং কনটেস্ট” ভালো প্লেব্যাক সিংগার পাওয়ার আশায়। বিচারক ছিলেন ভূপেন হাজারিকা, নচিকেতা ঘোষ, প্রবীর মজুমদার প্রমুখ। ১৩-১৪ বছরের ছোট্ট মেয়েটি ঠুমরী স্টাইলে ভজন গেয়ে প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়। ফাইনাল হয় মুম্বাইতে। মদন মোহনজী, অনিল বিশ্বাস, সি রামচন্দ্র, নৌশাদ আলি বিচারে সকল প্রতিযোগীকে হারিয়ে শিরোপা খেতাব পেলেন আরতি মুখোপাধ্যায়।
বিজয়ী হওয়ার দরুন, ওই বয়সেই অনিল বিশ্বাসের সুরে ‘অঙ্গুলিমাল’ ছবিতে “ধীরে ধীরে ঢল রে চন্দা” গাইলেন। সি রামচন্দ্রের সুরে ‘তালাক’ ছবিতে প্রথম আশা ভোঁসলের সঙ্গে ডুয়েট। আশাজী আদর করে আরতিকে ‘বেবি’ বলে ডাকতেন।
ঋত্বিক ঘটকের “সুবর্ণরেখা” ছবিতে পুরোপুরি প্লেব্যাকের জগতে প্রবেশ করেন শিল্পী। ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’… ছবিতে ধ্রুপদ, ধামার, রবীন্দ্রসংগীত সবকিছুই গাইলেন। ঋত্বিক ঘটক তাঁকে ছবির নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু গানই যেখানে তাঁর ধ্যান জ্ঞান, তাই অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।

আরতি মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গীত জীবনকে অন্য এক মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছিলেন প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক প্রয়াত সুধীন দাশগুপ্ত। তিনি বলতেন, “রোজ নিয়ম করে রবীন্দ্রসংগীত গাইবে। ওতে কাব্য আর সুরের যে সমন্বয়, সেটা আত্মস্থ হবে।” সুধীন দাশগুপ্তর সুরারোপিত গান “টাপুর টুপুর সারা দুপুর”, “আয়নাতে মুখ দেখবো না”, “আরো কতদিন আমি খুঁজেছি তোমাকে”, “না বলে এসেছি তা বলে ভেবোনা” ইত্যাদি গান প্রচুর জনপ্রিয়তা লাভ করে।
নচিকেতা ঘোষের সুরে “এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে” মহানায়ক উত্তম কুমারের খুবই প্রিয় গান ছিলো। এতটাই যে তিনি নিজে হারমোনিয়াম বাজিয়ে অর্কেস্ট্রার সঙ্গে কলকাতার রবীন্দ্রসদনে গানটি গেয়েছিলেন।”মরি মরি এ কি লজ্জা” গানটি ছিলো কিশোর কুমারের পছন্দের।
৬০-৭০ দশকের বাংলার মুখ্য নায়িকাদের কণ্ঠ হয়ে উঠলেন তিনি। ৭০ দশকে বাংলা সিনেমার গানের জগতে বিখ্যাত দুটি নাম হয়ে উঠলো আশা ভোঁসলে ও আরতি মুখোপাধ্যায়।
১৯৬৬ সালে, তিনি “গল্প হলও সত্যি” ছবিতে গান গেয়েছিলেন, যা সেরা মহিলা নেপথ্য কণ্ঠশিল্পীর জন্য ‘বিএফজে’ পুরস্কার পেয়েছিল। ১৯৭৬ সালে, তিনি “ছুটির ফাদে” চলচ্চিত্রের জন্য পুনরায় পুরস্কারটি পান।
সালটা ১৯৭৫, হিন্দী সিনেমার প্লেব্যাক দুনিয়ায় রাতারাতি খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেয় রাজশ্রী পিকচার্সের “গীত গাতা চল”। “শ্যাম তেরি বংশী পুকারে রাধা নাম” গান তখন লোকের মুখে মুখে। এরপর একের পর এক বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালকদের সুরে দাপটে গেয়ে চললেন আরতি মুখোপাধ্যায়।

“দো নয়না এক কাহানী” আর.ডি বর্মনের সুরে মাসুম ছবির বিখ্যাত গান এনে দেয় তাঁকে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। তপন সিনহার ‘সগিনা মাহাতো’-এর জন্য “ছোটি সি পাঞ্ছি” আরো জনপ্রিয় করে তোলে আরতি মুখোপাধ্যায়কে।
শিল্পীর অজস্র বিখ্যাত গানের মধ্যে ‘তখন তোমার একুশ বছর বোধ হয়’, ‘আয়নাতে মুখ দেখবো না…’, ‘বহু পথ ভেঙে…’, ‘এসো না গল্প করি” আজো আলাদা জায়গা করে নিয়েছে শ্রোতাদের হৃদয়ে।
কেরিয়ারের শুরুতে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ও গীতিকার সুবীর হাজরার সঙ্গে প্রেম ও বিয়ে হয়। কিন্তু সুবিরবাবুর অতিরিক্ত ‘পজেসিভ’ স্বভাব সম্পর্ককে দমিয়ে দিচ্ছিলো। সুধীন দাশগুপ্ত তাঁকে বোম্বেতে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। বাংলায় তখন তার পেশাগত জীবন তুঙ্গে। ১৯৭৯ সালে ডিভোর্সের পর ‘৮৪ তে মুম্বাইয়ের শ্রেয়স মুনিমের সঙ্গে আরতি মুখোপাধ্যায় বিয়ে হয়। তাদের ছেলে সোহমের জন্ম হয় ‘৮৫ সালে।

কিন্তু তার দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রায়শই অনেক সিনিয়র এবং সমসাময়িকদের দ্বারা বিপর্যস্ত হতে হয়েছিলো। তিনি একবার বলেছিলেন— “আমি তখন মুম্বাইয়ে লড়াই করছিলাম। আমি এখনও ঠিক জানি না কে কোন খাবারে কী মিশিয়ে দিয়েছিলো। হঠাৎ একদিন আমি খুব অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। আমার পা দুটি ফুলে ঢোল। অসম্ভব যন্ত্রণা। এবং আমি ব্যথায় নড়তে পারছিলাম না। আমি ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। ডাক্তার তৎক্ষণাৎ আমার পাকস্থলী ধুয়ে কিছু অদ্ভুত পদার্থ বের করেন এবং বললেন যে কেউ আমার খাবারে বিষ মিশিয়ে দিয়েছে। আমার পায়ে যে ব্যথা তখন শুরু হয়েছিল এবং আজও আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। আমি একটানা বসে অনুশীলনও করতে পারি না।”
ব্যক্তিগত জীবনে একেবারে ঘরোয়া আরতি মুখোপাধ্যায়। রীতিমতো স্বাস্থ্য সচেতন। নিয়মিত দুবেলা রেওয়াজ করেন। রান্নাবান্না করতে ভালোবাসেন।
স্বল্প পরিসরে আরতি মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গীত প্রতিভা নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব নয়। কাজল চোখের ইশারায় তিনি নেই অথচ আড়ালে ওই কণ্ঠটা না থাকলে রুপোলি পর্দার নায়িকাদের মনে মনে এত ভালোবাসতে পারতেন কী দর্শক!! এমন লজ্জা জড়ানো ছন্দে মিষ্টি গলার গানের ধারা সবসময় শ্রোতাদের হৃদয়ে গাঁথা থাকবে, এখানেই আরতি মুখোপাধ্যায়ের সার্থকতা। শুভ জন্মদিন প্রিয় গায়িকা।।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: সম্পর্কিত বিভিন্ন ম্যাগাজিন, পত্র পত্রিকা ও উইকিপিডিয়া।
Darun…
আরতি মুখোপ্যাধ্যায়ের গানের ভক্ত ছিলাম। সুলেখিকা রিঙ্কি সামন্তের লেখায় শিল্পীর জীবন সংগ্রাম পড়লাম। খুব ভালো লাগলো।
আমার প্রিয় গায়িকা ।
এখনও ওনার গাওয়া গান শুনতে খুবই ভালো লাগে।
ভীষণ প্রিয় শিল্পী কে নিয়ে এই অসাধারণ লেখা খুব ভালো লাগলো ????
ভালো লাগলো। সুন্দর প্রতিবেদন। তথ্যে সম্মৃদ্ধ।।
খুব ভালো লাগলো বরণীয়া এই গায়িকার জীবনালেখ্য।
খুব ভালো লাগলো বরণীয়া এই গায়িকার জীবনালেখ্য।
এত সুন্দর সুন্দর মতামতের জন্য সকলকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।