বৌদ্ধ ধর্মসাহিত্যের একটি বিষয় আমাদের চমৎকৃত করে যে স্বয়ং সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধ বঙ্গে এসেছিলেন এবং ষোড়শ মহাস্থবিররাও বঙ্গদেশে বুদ্ধ ধম্মাচারণ করতেন। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে কোন পথ ধরে এসেছিলেন বুদ্ধদেব এবং তাঁর অনুগামীরা? উত্তর হচ্ছে, রাঢ় অঞ্চলেই ছিল সেই মহাজন-পথ। গাঙ্গেয় বদ্বীপের পশ্চিমে বাংলা ও ঝাড়খণ্ডের যে ভূখণ্ড ছোটনাগপুর মালভূমি পর্যন্ত প্রসারিত তাকে রাঢ় অঞ্চল চিহ্নিত করা হয়। এখনও গাঙ্গেয় পশ্চিমাঞ্চলকে রাঢ়ভূমি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। সাঁওতালি ভাষায় প্রচলিত শব্দ “লার”(সুতো), “রাড়”(সুর) বা “লাড়”(সাপ) বা প্রোটো-অস্ট্রোএশিয়াটিক শব্দ “রাঢ়া” “রাঢ়ো” যার মানে ‘লালমাটির দেশ’ অথবা ‘ল্যাটেরাইট মৃত্তিকার দেশ’-র থেকে রাঢ় শব্দটির বুৎপত্তি। আবার জৈন ধর্মগ্রন্থ আচারাঙ্গসূত্রে এই “লাড়” “রাঢ” রাঢা” রাঢ়” “লাঢা” প্রভৃতি শব্দের দ্বারা উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলকে যথাক্রমে বজ্জভূমি ও সুহ্মভূমি বলা হয়েছে। বরাহমিহিরের বৃহৎসংহিতা গ্রন্থে বর্ণিত বঙ্গ এবং কলিঙ্গের মধ্যবর্তী রাঢ় অঞ্চলের নাম সুহ্মভূমি। সুহ্ম বা সুব্ভভুমি ছিল একটি দেশীয় রাষ্ট্র। এই সুহ্মরাষ্ট্রের ‘দেশক’ নগরে স্বয়ং সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধ ধম্ম প্রচার করেন বলে কথিত। ‘তেজপত্ত জাতক’-এ তাঁর সুহ্মের অন্তর্গত ‘সেদক’ ও ‘জনপদকল্যাণী সূত্রে’ ‘দেশনার’-এ আগমণ কাহিনির কথা উল্লেখ আছে। বিভিন্ন পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং ধর্মসাহিত্য অনুসারে পাটুলিপুত্র বা মগধ থেকে তাম্রলিপ্ত পর্যন্ত আসার প্রাচীন পথ ছিল বলে সিদ্ধান্তে আসা যায়। এবং রাঢ়, সুহ্মভূমি বা সিংহলে বৌদ্ধধর্ম বিস্তারে এই পথের খুব বড় ভূমিকা ছিল। কিন্তু ইতিহাসের নৈব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য এমন গুরুত্বপূর্ণ পথের কথা এখন বিস্মৃত প্রায়।

মূলত পথটি হচ্ছে পাটুলিপুত্র, মগধ থেকে তাম্রলিপ্ত পর্যন্ত যোগাযোগের সংক্ষিপ্ত পথ। তাম্রলিপ্ত ছিল বহির্বিশ্বে যোগাযোগের ভারতের পূ্র্ব প্রান্তে প্রধান সমুদ্র বন্দর। এই সমুদ্রবন্দর থেকেই মধ্য-পূর্ব ভারতের বনিকদের বানিজ্য ডিঙ্গা ছাড়ত সিংহলের উদ্দেশ্যে। প্রাচীনকাল থেকেই বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের ক্ষমতাশালী একটি কেন্দ্র হিসেবে তাম্রলিপ্ত গড়ে উঠেছিল। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সমসাময়িক জৈন আচার্য ভদ্রবাহুর শিষ্য ছিলেন গোদাস, তিনি গোদাস-গণ-এর প্রতিষ্ঠাতা। পরবর্তীকালে গোদাস-গণ-এর বিভাজিত চারটি শাখার অন্যতম গণ ছিল ‘তাম্রলিপ্তিকা’ সেখান থেকে তাম্রলিপ্ত শব্দের উৎপত্তি। সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধের ষোড়শ মহাস্থবিরের অন্যতম ছিলেন ভিক্ষু কালিকা, তিনি তাম্রলিপ্তে সংঘারামে বাস করতেন। (বাঙ্গালার বৌদ্ধধর্ম, নলিনীনাথ দাশগুপ্ত, পৃঃ ৪০)। বঙ্গদেশীয় এক ভিক্ষু “বঙ্গীশ”র নামও উল্লেখ আছে ‘বঙ্গে জাতোতি বঙ্গীসো বচনো ‘হস্সরোতি’। ফলে প্রমাণিত, গৌতম বুদ্ধের সমকালেই বঙ্গে বৌদ্ধ ধম্ম প্রচারিত হয়েছিল। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তর সময় ৪০০ খ্রিস্টাব্দে ফা-হিয়েন ভারতে আসেন। তিনি মথুরা, কৌনজ, শ্রাবস্তি, কপিলাবস্তু, সারনাথ ভ্রমণ করে তাম্রলিপ্তে পৌঁছান। ৪১১ খৃঃ পর্যন্ত ভারতে অবস্থান করে যান সিংহলে। তাঁর সিংহল যাত্রা শুরু হয়েছি তম্রলিপ্ত সমুদ্র বন্দর থেকে। তাম্রলিপ্ত শহরে বৌদ্ধ ধর্মের বাইশটি সংঘারামে তখন বহু বৌদ্ধ ভিক্ষু বাস করতেন, শহরটি ছিল বৌদ্ধধর্মের একটি বর্ধিষ্ণু কেন্দ্র। সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধ জীবদ্দশায় তিনি অনুগামীদের সঙ্গে যে বাণী এবং করণীয় ভাগ করে নিতেন তাই বৌদ্ধ ধম্ম হিসেবে বিবেচিত ছিল। বর্তমানে সারা বিশ্বে বৌদ্ধধর্মের রূপ দেখা যায় তা বুদ্ধ ধম্ম জাত হলেও স্বতন্ত্র। রাঢ় অঞ্চলের বাংলা সেই অর্থে বুদ্ধ ধম্ম বা থেরোবাদের আদি বাহক ছিল। বাংলার পথ ধরেই বৌদ্ধ ধম্ম পৌঁছেছিল শ্রীলঙ্কায় এবং সে দেশে বর্তমানে মোট জনসংখ্যা ২১ মিলিয়নের মধ্যে প্রায় ১৫ মিলিয়ন থেরোবাদী (তথ্যঃ শ্রীলঙ্কায় বুদ্ধ ধম্ম ও বৌদ্ধ ধর্ম, দয়া দিশানায়েক, এবং জলঘড়ি, প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, পৃঃ ৬৯) । বুদ্ধগয়া বা মগধ থেকে এই জঙ্গলাকীর্ণ দুর্গম পথ পেরিয়ে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা, বনিকরা পৌঁছাত তাম্রলিপ্তে। পাটুলীপুত্র থেকে রাঢ় অঞ্চলে প্রবেশ করা পথটি ‘বিঞ্ঝন পথ’ নামে পরিচিত ছিল। বঙ্গ, কলিঙ্গ, সিংহলে বৌদ্ধ ধর্ম প্রসার ইতিহাসে এই পথের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবং বাংলার সঙ্গে স্বয়ং বুদ্ধদেবের সংযোগসূত্র আমাদের কাছে এক মহান আত্ম শ্লাঘার বিষয়। আলোচনার সুবিধার্থে সমগ্র পথকে যদি “বুদ্ধ-পথ” হিসেবে নামাঙ্কিত করি তা হলে বোধহয় মহাভারত অশুদ্ধ হবে না।
আর্কালোজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডীয়ার তদানিন্তন আধিকারিক মিঃ বেগ্লার ১৮৭২-৭৩ সালে রাঢ় অঞ্চলে কয়েকটি প্রাচীন পথঘাটের সন্ধান পান। বুদ্ধগয়ার দিক থেকে সে পথ বিহারের মালভূমির মধ্য দিয়ে পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চল অতিক্রম পৌঁছেছে তাম্রলিপ্ত বন্দরে। গিরিডি-নওয়াদা অঞ্চলে রানি-গদার নামক স্থানে এখনও বেশ কয়েকটি পাচীন গুহার সন্ধান মেলে। সেগুলোর আকার আকৃতির ভিত্তিতে ঐতিহাসিকদের অনুমান, পথের ধারে গুহাগুলি সরাইখানা হিসেবে ব্যবহৃত হত (অধ্যাপক ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, এবং নীলাঞ্জনা সিকদার দত্ত) সিংহলি গ্রন্থ ‘মহাবংশ’-এ বলা হয়েছে মৌর্য সম্রাট মহামতি অশোক তাঁর কন্যা সংঘমিত্রাকে ধর্ম প্রচারে উদ্দেশ্যে সিংহলে পাঠাবার সময় “বিঞ্ঝন পথ” দিয়ে তাম্রলিপ্ত এসেছিলেন। পাটুলিপুত্র থেকে আসতে সময় লেগেছিল মাত্র সাতদিন। সম্ভবত এটিই ছিল জঙ্গলময় রাঢ়ভূমি পার হয়ে সীমান্ত বন্দরে আসার সংক্ষিপ্ততম পথ। সপ্তম শতাব্দীতে তাম্রলিপ্ত বন্দর থেকে চীনা পরিব্রাজক ইৎ-সিং প্রায় ৬০০ বনিকের সঙ্গে বুদ্ধগয়া পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। এই পথটি ছিল সে সময়ের বন্দর শহর তাম্রলিপ্ত-এর সঙ্গে মধ্য ভারতের যোগাযোগের অন্যতম পথ। বিহার থেকে জৈন, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা আসতেন নতুন নতুন এলাকায় ধর্মীয় প্রচারে আর বনিকরা আসতেন রাঢ় অঞ্চলসহ সিংহল, জাভা, সুমাত্রায় নৌ-বানিজ্য সম্প্রসারিত করতে। বনিক এবং ভিক্ষু উভয়ের মধ্যে এক ধরণের সম্প্রসারণ সহযোগিতা মূলক সম্পর্ক ছিল। রানিগঞ্জ মোড় নামে বাঁকুড়া শহরে একটি অতি প্রাচীন চৌমাথা আছে। একটি প্রাচীন পথ দক্ষিণ পশ্চিমে দেউলভিড়া হয়ে পুরুলিয়া জেলার পাকভিড়া-মানবাজাররের মধ্য দিয়ে দুলমি হয়ে সুবর্ণরেখা পার হয়ে বুদ্ধগয়ার দিকে প্রসারিত। অন্য একটি পশ্চিম দিকে পাটপুর-কেঞ্জাপুর-ছাতনা থেকে পুরুলিয়ার রঘুনাথপুর-তেলকুপি-ঝরিয়া-রাজৌলী-রাজগীর হয়ে পাটনা পৌঁছেছে। তৃতীয় পথটি উত্তর দিকে রানিগঞ্জ অতিক্রম করে ভীমগড়-নাগোর-বক্রেশ্বর-মুঙ্গের পৌঁছেছে। অন্য দিকে দারকেশ্বর-রুপনারায়ণ তীরবর্তী স্থান দিয়ে তাম্রলিপ্ত যাওয়ার রাস্তা ছিল। প্রাচীন কাল থেকেই শহরগুলোর সঙ্গে অর্থো-সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল সুদৃঢ়। এই সব পথ ধরে ভাগ্যান্বেষী বনিকরা সিংহলসহ বিভিন্ন দেশে উদ্দেশ্যে বানিজ্য তরী ভাসাত। তাদের সঙ্গে ধর্ম প্রচারে বেরিয়ে পড়তেন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। দুর্গম পথের পাশে এই সব সরাইখানগুলিতে তাঁরা আহার-বিহার করতেন (বাঁকুড়ায় বৌদ্ধ ও জৈন প্রভাব, নীলাঞ্জনা সিকদার দত্ত, পশ্চিমবঙ্গ, বাঁকুড়া জেলা সংখ্যা, ১৪০৯ সাল, পৃঃ ৩৫)।

২০০৩ সালে সার্ক সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্ত শ্রীলঙ্কার দ্বিভাষিক ঔপন্যাসিক ও কবি দয়া দেশনায়েক-এর মতে বহুপ্রচলিত কাহিনি সংঘমিত্রা বা মহেন্ত্র-এর সিংহলে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে আগমণ মূলত পৌরাণিক, যার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই বা থাকলেও তা দুর্বল। তাম্রলিপ্ত থেকে বুদ্ধদেবের অনুগামী শ্রেষ্ঠী-বনিকদের সঙ্গে ভিক্ষুরাও এসেছিলেন দ্বীপরাষ্ট্রে। এবং ভাগ্যান্বেষী বনিকরা দেশীয় মেয়েদের বিয়ে থা করে স্থায়ীভাবে শ্রীলঙ্কায় থেকে যান। তাঁরা বংশ পরম্পরায় যাপনে বুদ্ধ ধম্ম প্রচার করেন। বুদ্ধদেব কোনোদিনই ধর্ম প্রচার করেননি, এবং কাউকে ধর্মান্তরিত করেননি। তিনি কেবল মানুষের দুঃখকষ্টের সার্বজনীন সত্যের ব্যাখ্যা দিতেন এবং মুক্তিলাভের উপায় বলতেন। ফলে রাঢ় অঞ্চলের উল্লেখিত পথ ধরে আসা বুদ্ধদেবের অনুগামী শ্রেষ্ঠী বা বনিকদের আমদানীকৃত ধম্ম শ্রলঙ্কায় বর্তমানেও অনেকটা হিন্দুত্বায়ন বা হিন্দু প্রভাব মুক্ত রাখতে পেরেছেন থেরোবাদী উপাসকরা। তবে তারাও বৌদ্ধ মূর্তি পূজায় বিশ্বাসী হীনজানপন্থী হয়ে উঠেছে।
সম্ভবত পুরুলিয়া বাঁকুড়ার উপর দিয়ে সমুদ্র বন্দর তাম্রলিপ্ত পর্যন্ত যোগাযোগের পথ ধরেই স্বয়ং সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধ, তাঁর ষোড়শ মহাস্থবিরের অন্যতম কালিকা এবং অন্যান্য ভিক্ষুরা রাঢ়বঙ্গে এসেছিলেন। যে পথ এত সমৃদ্ধ ছিল তার সংলগ্ন এলাকায় বৌদ্ধধর্মের প্রভাব পড়া ছিল স্বাভাবিক। প্রশ্ন হচ্ছে কত গভীর ছিল সেই প্রভাব? রাঢ় অঞ্চলে বৌদ্ধ পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন কিন্তু তেমন একটা পাওয়া যায়নি এবং বর্তমানে বৌদ্ধধর্মের অস্তিত্ব একেবারেই অবলুপ্ত। হিমালয় সংলগ্ন এলাকা এবং বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় পাল যুগে প্রসারিত বৌদ্ধ ধর্মের অস্তিত্ব কিছুটা বর্তমান আছে, তা অবশ্য বৌদ্ধ-তান্ত্রিকতামুক্ত নয়, আদি থেরো ধম্মও নয়। আদি বুদ্ধ ধম্ম থাকার অবকাশ ছিল এই অঞ্চলে। তবে পুরুলিয়া বাঁকুড়া বা বৃহত্তর মেদিনীপুরে বৌদ্ধ ধর্মের একেবারে প্রভাবমুক্ত এ কথা বলা যাবে না। জঙ্গলাকীর্ণ আদিবাসী এলাকায় সেই সময়ে আর্যদের আগমণ এবং ধর্ম প্রচারকার্য খুব কঠিন ছিল। বৌধায়ন ধর্মসূত্র, ১।১।২ তে (আনুমানিক ৫০০/৬০০ খৃঃ পূঃ) দেখা যায়, আর্যরা যদি বঙ্গ বা কলিঙ্গ সৌবীর প্রভৃতি দেশে তীর্থযাত্রা বা অন্য কোনো কারণে যেত তবে তাদের যজ্ঞানুষ্ঠানের মাধ্যমে শুদ্ধিলাভ করতে হত। কথিতই আছে, বঙ্গদেশ ছিল পান্ডব বর্জিত। “মহাবংশ”এ একটি ঘটনার সমর্থন মেলে যে আদিবাসীরা ভিক্ষুদের পিছনে কুকুর লেলিয়ে দিত। ভিক্ষুদের আদিবাসীরা অখাদ্য-কুখাদ্য খেতে দিত। নীহাররঞ্জন রায়ের (বাঙালির ইতিহাস) মতে আদিবাসীরা তাদের আমিষযুক্ত খাবার দিত যা আর্য ভিক্ষুদের অখাদ্য কুখাদ্য মনে হত। আর্যসভ্যতা তখনও রাঢ় অঞ্চলে বিকাশ উপযোগী পরিবেশ পায়নি এবং অনার্যরা তাদের ছাড়পত্র দিতেও প্রস্তুত ছিল না। এবং স্থানটি নিয়েও বিতর্ক আছে, মহাবীর পার্শ্বনাথের সঙ্গে নাকি এই ঘটনা ঘটেছিল সুহ্মভূমিতে। মানভূম বা পুরুলিয়ায় নয়। জৈন ধর্ম তৃতীয়-চতুর্থ শতক থেকে জনজীবনে বেশ খানিকটা প্রসারিত হলেও বৌদ্ধ ধর্ম হয়ত মঠের বাইরে ততটা বেরতে পারেনি।
তবু কিছু কিছু বৌদ্ধ নিদর্শন পাওয়া গেছে সেগুলোর গুরুত্ব কম নয়, আলোচনার দাবি রাখে। দ্বারকেশ্বরের উত্তর পশ্চিম দিকে মজে যাওয়া নদীখাতের তীরে কিছু প্রাচীন ডিহরের ঢিবি দেখতে পাওয়া যায়। ডিহরে পাওয়া গেছে বুদ্ধদেবের মুখ আঁকা একটিক্ষুদ্র শ্বেতপাথরের লকেট, নিকটবর্তী পলাশী গ্রামে বৌদ্ধ-দেবী মূর্তি এবং ধরমপুর, তালাজুড়ি, ময়নাজুড়ি, পাঁচলা, মায়াপুর প্রভৃতিগ্রামে পাথরে বিভিন্ন আকৃতির বুদ্ধমূর্তি, ডিহরে ধাতুনির্মিত নিবেদনস্তূপ এবং উপরাংশ, পোড়ামাটির গোঁজ ইত্যাদি মিলেছে। পাশাপাশি গ্রামে প্রাচীন ইটের তৈরি সারিবদ্ধ প্রকোষ্ঠের গাঁথনীর ধ্বংসাবশেষ, ঢিপি দেখা যায়। এই ইটের আকৃতি এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন উত্তর ভারতের প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ বিহারের অনুরূপ। এই ডিহর অঞ্চলেই বাঁকুড়া জেলার সর্বাধিক বৌদ্ধধর্মের পুরাবস্তুর নিদর্শন পাওয়া গেছে। দরকার প্রত্নতাত্ত্বিক খনন এবং বিশ্লেষণ, হয়তো খুলে যাবে আর একটি লুপ্ত বৌদ্ধ সংযোগ সেতু।
বাঁকুড়া বা পুরুলিয়ায় সেভাবে বৌদ্ধস্তূপ বা বিহারের প্রত্ন নিদর্শন না পাওয়া গেলে বাঁকুড়ার চৌমাথা থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরে (এরিয়াল দূরত্ব) পানাগড় রেল স্টেশন থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে মাত্র ৭ কিলোমিটার দূরে দামোদরের তীরে ভরতপুর-মনোরামপুরে একটি বৌদ্ধস্তূপের সন্ধান পাওয়া গেছে। নির্মাণকাল আনুমানিক ৮ম-৯ম শতক। গোলাকৃতি ইট নির্মিত এই বিহারটি কেউ কেউ জগদ্দল বিহারও বলেন। ভিক্ষুরা যাত্রাপথে অস্থায়িভাবে এই জগদ্দল বিহারে (ধর্মশালায়) আহার-বিশ্রাম করতেন। কোনো উচ্চবিত্ত ভক্ত সম্ভবত তীর্থযাত্রীদের সুবিধার্থে এটি নির্মাণ করেছিলেন। মনোরামপুরে বৌদ্ধ পূর্ণিমায় তিন দিন ধরে ধর্মঠাকুর বা ধর্মরাজের পূজা হয়। কোনো ধরনের পশুবলি হয় না এই উৎসবে। কল্পিত ধর্মঠাকুর বা ধর্মরাজ শিব, বৌদ্ধ বা যমরাজের মিলিত রূপকল্প। নিম্ন রাঢ় অঞ্চলে প্রায় উড়িষ্যা সীমান্তে ২০০৩ সাল থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্ন-খননে পঃ মেদিনীপুর জেলার দাঁতন ব্লকে সুবর্ণরেখার তীরে মোগলমারীতে আবিষ্কৃত হয়েছে এক সমৃদ্ধ বৌদ্ধ বিহার। সাক্ষীসেনা (বা সশীসেনা) ঢিপিতে আবিষ্কৃত বৌদ্ধ বিহারটি বাংলায় বৌদ্ধস্থাপত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। ৬ষ্ঠ-৭ম শতাব্দীতে (গুপ্ত পরবর্তী এবং পাল পূর্ববর্তী যুগ) বিহারটি নির্মিত হয়েছিল। খননে পাওয়া গেছে ৪০টি ব্রোঞ্জের পুরাবস্তু। বেশ কিছু স্তূপ, ব্রোঞ্জের বুদ্ধ, বোধিসত্ত্ব, বৌদ্ধদেবী যাম্বলা ও সরস্বতীর মূর্তি, টেরাকোটার ফলক, গুপ্ত পরবর্তী যুগের ব্রাহ্মীলিপিতে লেখা সীলমোহর, মিশ্রধাতুর মূদ্রা যেখানে রাজা সমচারদেবের নামের উল্লেখ আছে। সোনার দুল এবং মুকুটের অংশ। কিছু সীলমোহরের বিশ্লেষণে দেখা গেছে বৌদ্ধ বিহারটির নাম ছিল ‘শ্রীবন্ধক বিহার আর্যভিক্ষু সঙ্ঘ’। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ইটের তৈরি কাঠামো, প্রকোষ্ঠ, মঞ্চ, দেওয়ালের নিচের অংশে পলেস্তার করা মূর্তি দেখে এর বিশালত্ব অনুধাবণ করা যায়। পার্শ্ববর্তী গ্রামসমূহে এখনও পুকুর খনন, চাষাবাদে উঠে আসে বহু পুরাবস্তু। পরবর্তী অধ্যায়ের খনন দায়িত্বে থাকা মুখ্য পুরাতাত্ত্বিক অধ্যাপক প্রকাশ মাইতি জানিয়েছেন, বৌদ্ধ বিহারে সোনা-রূপার পুরাবস্তুর নিদর্শন পাওয়া খানিকটা বিরল ঘটনা। সোনার বস্তুগুলি মুকুটের অংশ। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা মুকুট পূজা করতেন। বৌদ্ধধর্মের মহাজানপন্থীদের একটি উপ-সম্প্রদায় বজ্রজান (Vajrayana) ‘মুকুট বুদ্ধ’ পূজা করত, বুধ-মুকুটকে বুদ্ধমূর্তির সমতুল বিবেচনা করা হত। সঙ্ঘটি সম্ভবত ১২শ শতাব্দী পর্যন্ত চালু ছিল। শুধু রাঢ় অঞ্চলেই নয় সমগ্র বৌদ্ধ বিহার ইতিহাসেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছে মোগলমারী। ধরে নেওয়া যেতে পারে রাঢ় পার করে আসা পথ তাম্রলিপ্তেই শেষ হয়নি। সমুদ্র সরে যাওয়ায় তাম্রলিপ্তের সমুদ্র-বানিজ্য নগরীর গরিমা চলে গেলেও রাঢ়ের সম্প্রসারিত বৌদ্ধ-পথ পৌঁছেছিল মোগলমারী পর্যন্ত। এবং পাল শাসনের শুরুতে বৌদ্ধ ধর্ম শুধু গাঙ্গেয় বঙ্গে বিস্তার লাভ করেনি তা কলিঙ্গমুখীও হয়েছিল।
বর্তমানে রাঢ় অঞ্চলে প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্মলম্বীদের বংশধর নেই, তবে কিছু প্রভাব এখনো ধর্মীয় আচার আচরণে আছে। পুরুলিয়া বাঁকুড়া এবং মেদিনীপুরের কিয়োদাংশে “ধর্মঠাকুর” অত্যন্ত শক্তিশালী দেবতা, তার পূজা মহাধুমধামে অনুষ্ঠিত হয়। পণ্ডিতদের অনুমান এই “ধর্মঠাকুর”-এর রূপকল্প গড়ে উঠেছে বুদ্ধ ও শিবের সংমিশ্রনে। গুপ্তযুগ ও তার পরবর্তীকালে হিন্দু ব্রহ্মণ্যধর্মের পুনরুত্থানে বৌদ্ধধর্মের প্রচার প্রসার ব্যহত হয়। সপ্তম শতকে ভারতে আসা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং গৌড়রাজ শশাঙ্ককে ‘বৌদ্ধনির্যাতক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। পালযুগে বৌদ্ধধর্ম ক্রমান্বয়ে শৈবধর্মের তান্ত্রিকা গ্রহণ করছিল (পশ্চিমবঙ্গে বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি: ভদন্ত প্রজ্ঞানানন্দশ্রী, পৃঃ ২১)। নবজাগ্রত হিন্দু ধর্মের প্লাবনে বৌদ্ধরা যখন তাদের অর্থো-সামাজিক প্রতিষ্ঠা হারাচ্ছিল তখন তাঁরা ধর্মঠাকুরের রূপকল্প গ্রহণ করেছিলেন। আদিবাসী প্রধান রাঢ় অঞ্চলে আজও বর্ণহিন্দু সমাজের দেবতার পরিবর্তে ধর্মঠাকুর, গাজন ব্যাপক জনপ্রিয়। ধর্মঠাকুর, শিব, জগন্নাথ প্রভৃতি দেবতা কল্পনায় বুদ্ধের প্রচ্ছন্নরূপ আছে। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মনে করেন, ‘বুদ্ধ’কে ‘বুদ্ধু’ এবং বুদ্ধমূর্তিকে জটাশংকর নামে রাঢ়বাংলা অভিহিত করেছিল। ‘শূন্যপুরাণ’ রচয়িতা রামাইপণ্ডিত নিজে ছিলেন বাঁকুড়া জেলার ময়নাপুর গ্রামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। ত্রয়োদশ-চতুর্দশ ( বা পঞ্চদশ) শতকে রচিত ‘শূন্যপুরাণ’-এ ধর্মঠাকুর ‘শূন্য’ থেকে উৎপত্তি হয়েছে এবং শূন্যঠাকুরই আন্যান্য দেবতার উৎপত্তিস্থল। শূন্যপুরাণে বৌদ্ধধর্ম দর্শনের ক্ষীণ প্রভাব পাওয়া যায় (বাঁকুড়ায় বৌদ্ধ ও জৈন প্রভাব: নীলাঞ্জনা সিকদার দত্ত)। মানভূমি-পুরুলিয়ার লোকসংস্কৃতি জঙ্গলমহলকে সরস রেখেছে। লোকসাহিত্য-সংস্কৃতিতে ‘টুসু-ঝুমুর’ অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘টুসু-ঝুমুর’-এর সঙ্গে মহাজন-পদাবলীর ভাবময়তার সায়ুয্য খুঁজে পাওয়া যায়। অনার্য কৃষ্টি বা ধর্ম সংস্কৃতিতে অনেক গ্রামদেবতা যেমন সোনামণি, ভাণসিং, ইতু বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। তারা অবায়বহীন লোকদেবতা। সোনামণি মূলত একজাতীয় বিরল পাথার যার সূর্যরশ্মি শোষণ ক্ষমতা আছে। তাই সোনামণি সূর্য দেবতা। এই অঞ্চলে পূজিত অসংখ্য লোকদেবতার বধ্যে কোনো কোনো লোকদেবতায় মধ্যে এখনও বৌদ্ধ প্রভাব বর্তমান।

মৌর্যশুঙ্গ যুগ থেকে ভারতীয় জমির ‘মানক’ হিসেবে ‘আঢ়ক’ ‘দ্রোণ’ প্রভৃতি পরিমাপক ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পুরুলিয়া বাঁকুড়া অঞ্চলে এখনও তার ব্যবহার চলছে। এবং এই অঞ্চলে দত্ত, রক্ষিত, দে, পাল প্রভৃতি পদবিগুলি বৌদ্ধ সংস্কার থেকে অনুসৃত হচ্ছে বলে অনুমান করেন মানিকলাল সিংহ। কারণ সাঁচিস্তূপ ও অন্যান্য বৌদ্ধতীর্থে ভক্ত ও দাতাগণের নামে দত্ত, রক্ষিত, দে, পাল প্রভৃতি বিশেষণসূচক শব্দ যুক্ত হয়েছে (পশ্চিম রাঢ় তথা বাঁকুড়া সংস্কৃতি: মানিকলাল সিংহ, বিষ্ণুপুর, ১৩৮৪)।
অস্টম শতাব্দীর আগেই বাংলার ঐতিহাসিক প্রান্তিক বন্দর তাম্রলিপ্তের গৌরব অবলুপ্তি সূচিত হয়েছিল। যমুনা-সরস্বতীর তীরে আদিসপ্তগ্রাম বন্দরের প্রাধান্য বৃদ্ধি এবং ত্রয়োদশ শতকে সোনারগাঁও বানিজ্য বন্দরের প্রসিদ্ধি লাভে তাম্রলিপ্তের গুরুত্ব একে তলানিতে ঠেকে। বানিজ্য ক্ষমতা কেন্দ্র ক্রমশ পুবে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে তাম্রলিপ্তের গৌরব সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে বিহার থেকে পথগুলি অব্যবহৃত হতে শুরু করে। বানিজ্যযাত্রার সঙ্গে বহুলাংশে যুক্ত ছিল বৌদ্ধ ধর্ম প্রসারও। রাঢ় অঞ্চলে আর বানিজ্যপথের গুরুত্ব ও ব্যবহার না থাকায় জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে যায় এককালের সমৃদ্ধ ‘বৌদ্ধ-পথ’ এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চল। শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধ থেরোবাদ অনেকটা অবশিষ্ট থাকল বটে কিন্তু রাঢ়ের জনজীবনে পড়ে রয়েছে কিছু মাত্র বৌদ্ধ রীতির প্রভাব।
কভারের ছবি : উত্তরপথ (কালো রঙে) এবং দক্ষিণপথ (লাল রঙে) যেখানে তারা যে সমস্ত প্রধান শহরগুলির মধ্য দিয়ে গেছে। ছবির কপিরাইট: লেটস ডিসকভার ইন্ডিয়া।