১৮৬৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে রানিগঞ্জ থেকে আসানসোল অবধি সম্প্রসারিত হলে সেখানে রেল কর্মচারীদের জন্য একটি আবাসন গড়ে ওঠে।
এই রেল আবাসনকে কেন্দ্র করেই আসানসোলে নগরায়ণের গোড়াপত্তন ঘটেছিল। ওই কলোনিতে যারা থাকতেন তাদের মধ্য বেশিরভাগই ছিলেন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান, ব্রিটিশ ও অন্যান্য ইউরোপীয় রেল কর্মচারী।
এ কারনে সে সময়ে এটি ইউরোপিয়ান কলোনি নামে পরিচিত ছিল। এখানকার আবাসিকদের সূত্র ধরেই আসানসোলে খ্রিস্টিয় ধর্মযাজকদের আসা শুরু হয়। খ্রিস্টিয় ধর্মযাজকদের মধ্যে রোমান ক্যাথলিক মিশনের ধর্মযাজকরাই সর্বপ্রথম আসানসোলে আসেন।

১৮৭২-৭৩ সালে রোমান ক্যাথলিক মিশনের উদ্যোগে আসানসোলে একটি গির্জা প্রতিষ্ঠা হওয়ার কথা জানা যাচ্ছে। ১৮৭৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ের আর্থিক আনুকুল্যে এই গির্জা নবরূপে আত্মপ্রকাশ করে। ১৮৭৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর আসানসোলের খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের বড়দিন পালনের মধ্য দিয়ে গির্জাটি ‘স্যাক্রেড হার্ট ক্যাথিড্রাল’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। তারপর কেটে গিয়েছে আরও পঞ্চাশ বছর ১৯২৭ সালে এই গির্জার আয়তন আরও বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী সময়ে সেক্রেড হার্ট চার্চটি আসানসোলের ডায়োসিসের ক্যাথেড্রাল হয়ে ওঠে যখন মহামান্য পোপ দ্বিতীয় জন পল আসানসোলকে কলকাতার মেট্রোপলিটন আর্চডায়োসিস থেকে বিযুক্ত করে এটিকে একটি ডায়োসিস হিসেবে গড়ে তোলেন।

রোমান ক্যাথলিক মিশনের কর্মকাণ্ড শুধুমাত্র গির্জা স্থাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আসানসোলে শিক্ষা প্রসারে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। ১৮৮৩ সালে বেলজিয়াম নিবাসী ক্যাথলিক ধর্মযাজক পল গোয়েথালসের উদ্যোগে আসানসোলে একটি স্কুল ভবন নির্মাণের কার্য সম্পূর্ণ হয়েছিল। ১৮৮৯ সালে স্কুল ভবনের সম্প্রসারণের প্রয়োজনে এখানকার সমস্ত ছাত্রকে সাময়িক ভাবে কার্শিয়াংয়ে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। সুসংসকৃত নতুন ভবন ও স্কুল ‘সেন্ট প্যাট্রিক স্কুল’ নামে পরিচিত হয়। প্রসঙ্গত, আসানসোল শহরে ‘লরেটো কনভেন্ট’ মহিলাদের স্কুলটিও রোমান ক্যাথলিক মিশন দ্বারা পরিচালিত। স্থানীয় সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুয়ায়ী এটি স্থাপিত হয় ১৮৭৭ সালে যা সেন্ট প্যাট্রিক স্কুল স্থাপনেরও আগে। এ ছাড়াও ১৯১৯ সালে ‘সেন্ট ভিনসেন্ট’ নামে আরও একটি স্কু্ল স্থাপিত হয়েছিল।

ইংরেজি ভাষাভাষীদের জন্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুল যেমন ছিল সেরকমই হিন্দিভাষী মেয়েদের জন্য ১৯৪৯ সালে সেন্ট মারিয়া গোরেটি স্কুলটি শুরু হয়েছিল।
রোমান ক্যাথলিক মিশন প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যে ‘মেথডিস্ট এপিওসোপাল চার্চ’ নামে আরও একটি মিশন আসানসোলে স্থাপিত হয়। প্রোটেস্টান খ্রিস্টিয় ধর্মযাজকের উদ্যোগে এটি স্থাপিত হয়েছিল। ১৮৮৩ সালে এই মিশনকে সরকারের তরফে থেকে আসানসোলে জমি বরাদ্দ করা হলে পরের বছরেই সেখানে একটি গির্জা স্থাপিত হয়। বর্তমানে এটি ‘মেথডিস্ট টাউন চার্চ’ নামে পরিচিত। অতীতে এই মিশনের মহিলাদের একটি আবাসিক স্কুল সহ সর্বমোট দু’টি স্কুল থাকার কথা জানা যায়। সেই সময়কালে ওই স্কুলের পড়ুয়াদের মধ্যে অনেকেই ছিল দরিদ্র ও অনাথ শিশু। এই মিশনের স্থাপিত অধুনা ‘বেঙ্গলি গার্লস স্কুল’ নামে পরিচিত স্কুলটি আসানসোল শহরে এখনও চালু রয়েছে।

১৮৮৩ সালে নির্মিত যাজকের বাড়ী। এ বাড়ীটির নির্মাণ শৈলী এক হারানো সময়ের দলিল।
রেলের আগমনের সময় থেকে অর্ধ শতাব্দীরও অধিক সময় অবধি আসানসোল রেল কলোনিতে বসবাসকারী ইউরোপীয় তথা খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বী মানুষেরাই ছিলেন সংখ্যাধিক্য। যার দরুন খ্রিস্টিয় ধর্মযাজকের উদ্যোগে আসানসোলের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি গির্জা স্থাপিত হয়। তাদের উদ্যোগে আসানসোলে কয়েকটি স্কুলও গড়ে ওঠে। এই কর্মকাণ্ডে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টান এই দুই ভিন্ন খ্রিস্টিয় ধর্মযাজদের সদর্থক ভূমিকা সমভাবে উল্লেখযোগ্য। গির্জা নির্মাণ ও স্কুল স্থাপনের জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে উভয়কেই জিটি রোডের উপর বিস্তীর্ণ জমি দান করেছিল। এছাড়াও ওই সময়কালে গির্জা সহ ফাদার’দের বাসভবন নির্মাণের জন্যও ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে সম্পূর্ণ আর্থিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।ওই বাংলোতে ফাদার এখনও থাকেন।
তথ্য সূত্র :-দূর্বাদল চট্টোপাধ্যায় ও আন্তর্জাল
খুব ভাল লাগলো। তথ্যসমৃদ্ধ লেখা ও সুন্দর ছবি। আমি ফেসবুকে শেয়ার করলাম।