গত ৬ এপ্রিল ২০২২, হাওড়ার বাগনান-১ নং ব্লকের অন্তর্গত ওলানপাড়া গ্ৰামের ঘোড়ুই পরিবারের নিজস্ব পুকুর সংস্কার করতে গিয়ে একটি বিষ্ণুমূর্তি উদ্ধার হয়েছে। তাই নিয়ে হইচই হল এলাকায়, প্রকাশিত হল খবর গণমাধ্যম ও সোস্যাল মিডিয়ায়। হাওড়ার বন্ধু ও ক্ষেত্র বিশেষজ্ঞ সন্দিপ বাগ গিয়েছিলেন বিষয়টি সরজমিনে দেখতে। এপ্রিলের ৩০ তারিখ সন্ধ্যায় বন্ধুকে সঙ্গী করে ঘটনাস্থলে পৌঁছন। বাকিটা শুনে নেওয়া যাক ওনার জবানিতেই। পারিবারিক পুকুর, বাঁশবাগান পেরিয়ে সরু কংক্রিটের আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে আমরা এসে পরলাম একটি অন্ধকার ঘরের সামনে। শুনশান অন্ধকার দেখে ভাবলাম বোধহয় মূর্তিটা নেই। জুতো খুলে ঘরে ঢুকে দেখলাম একটা নাইট বাল্ব জ্বলছে। টিমটিমে আলোয় দেখলাম বিষ্ণুমূর্তিটিকে।
আমাকে প্রবেশ করতে দেখে দূর থেকে কয়েকজন এলেন। ভালো করে মূর্তিটি দেখতে চাই বলাতে একটি অল্পবয়সী ছেলে বাল্ব খুলে বেশি ওয়াটের এলইডি বাল্ব লাগিয়ে দিল। ভালো করে দেখলাম মূর্তিটি। ছবি তুললাম। কোথা থেকে এসেছি, কেন এসেছি সেসব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে খানিকটা বিশ্বাস অর্জন করে এই পরিবারের এখনকার কর্তা ও অন্যান্যদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করলাম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ইতিহাস বিভাগের প্রয়াত অধ্যাপক কল্যাণকুমার গঙ্গোপাধ্যায়, যার লেখা পড়ে আমি সমৃদ্ধ হয়েছি। তার ভিত্তিতে বলতে পারি মূর্তিটির উচ্চতা আনুমানিক সাড়ে তিন ফুট। অপূর্ব কারুকার্য মন্ডিত। সম্ভবতঃ বেলে পাথরের তৈরি। মনে হয় কাটোয়া বা দাঁইহাট অঞ্চলের কোনো শিল্পীর কাজ হতে পারে। পুকুরটি থেকে দামোদরের দূরত্ব বেশি নয়। গ্ৰামের মধ্যে বনেদিয়ানা ও সমৃদ্ধির একটা প্রাচীন ছাপ রয়েছে। দামোদর দিয়ে যখন বাংলার ব্যবসা বাণিজ্যের জোয়ার ছিল সে সময়ে এই যায়গার আশেপাশে অনেক মন্দিরের খোঁজ পাওয়া গেছে। পরে বিধর্মীদের আক্রমণে বা আক্রমণ হতে পারে সেই আশঙ্কায় কিংবা দামোদরের বিধ্বংসী বন্যায় বা কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এরকম অনেক মন্দিরের বিগ্ৰহ স্থানচ্যুত হয়ে নদী বা জলাশয়ে স্থান পেয়েছেন এমন নির্দশন অনেক আছে।

আমরা থাকতে থাকতেই দেখলাম দলে দলে লোক আসছেন এটি দেখতে। পুলিশ এসেছিল। প্রশাসন থেকে যোগাযোগ করেছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁরা সবাইকেই জানিয়েছেন যে এটি তাদের পারিবারিক পুকুর থেকে উঠেছে। সেজন্য ভগবানের মূর্তিটি তাদের। এই পরিবারে একসময় সমৃদ্ধি ছিল দেখলে বোঝা যায়। মজার কথা এই দেবতার আকস্মিক আগমন তাদের পরিবারের সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ করেছে। বিশেষত এই পরিবারের মহিলারা একযোগে জানালেন এই দেবতাকে তারা নতুন মন্দির নির্মাণ করে রাখবেন। তাদের গৃহদেবতা মনসা, হরিঠাকুরের পাশাপাশি এই দেবতাও পুজিত হবেন। তাদের কাছে এই মূর্তিটি পুরাকীর্তি বা পুরাবস্তু নয়। এটি শুধুমাত্র দেবতা। সেই দৃষ্টিতেই তারা গৃহদেবতা অধিষ্ঠানের খোলা জায়গায় শীঘ্রই মন্দির নির্মাণ করতে চাইছেন। সেই মন্দিরে শ্রীবিষ্ণুকে মানুষ দেখতে আসুন, ফুল তুলসির মালা পরিয়ে, পুজো করুন সেটাই তারা চান।

অন্যদিকে পুরাকীর্তি ভালবাসেন বা গবেষনার সাথে যারা যুক্ত তারা এটির সুরক্ষা, বৈশিষ্ট্য ও প্রাচীনত্ব জানতে অধিক আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। প্রায় একই সময়ে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বিষ্ণুমূর্তি ও পূর্ণাঙ্গ সূর্য দেবতার মূর্তি উদ্ধার হয়েছে পূর্ব বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোটের খেড়ুয়া গ্রামের কাছে অজয় নদের জল থেকে। নদীতে মাছ ধরার সময় এক জেলের জালে উঠে এসেছে পূর্ণাঙ্গ সূর্যদেবের মূর্তি। পাথরে নির্মিত চুতুর্ভুজ সূর্যদেবের দুই হাতে রয়েছে দুটি প্রস্ফুটিত পদ্ম। সাতটি ঘোড়ায় টানা রথের উপর দণ্ডায়মান সূর্য দেব। নীচে রয়েছে ঊষা ও প্রত্যূষা। তাঁদের পাশেই রয়েছে ঊষা প্রত্যূষার দুই পরিচারিকা দন্ডী ও পিঙ্গলা। মূর্তিটি একাদশ-দ্বাদশ শতকের বলে অনুমান ঐতিহাসিকদের। বর্তমানে গ্রামের একটি মন্দিরে রাখা হয়েছে মূর্তি দুটি। দিন কয়েক আগে অজয় নদের ওই একই জায়গা থেকে জেলেদের জালে উঠে এসেছিল দুটি বিষ্ণুমূর্তি। এগুলো হল বিষ্ণুর বামন বা ত্রিবিক্রম অবতারের শিলামূর্তি। ১৯৮৬ সালে অজয় নদ থেকে প্রথম মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। ২০০১ সালে যক্ষমূর্তি পাওয়া যায়। আর ২০১৫ সাল থেকে মাঝেমাঝেই মূর্তি মিলছে। বেশীর ভাগ মূর্তিই পুজো করছেন স্থানীয়রা। কোথাও বা দেওয়ালে গেঁথে দিয়েছেন। এমনকী বালি খননের সঙ্গে জয়পুরে মূর্তিও উঠেছে।

কিছুদিন আগে পাত্রসায়র থানার নাড়িচায় সর্বমঙ্গলা মন্দিরের অনতিদূরে দ্বারকেশ্বর তটে এক সূর্য মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। নদিয়ার আনুলিয়াতে এইরকম এক অপুর্ব বাসুদেব মুর্তি পাওয়া গিয়েছিল। গ্রামবাসীদের প্রতিরোধে এটি আজও গাছতলায় পুজো নিচ্ছেন। অন্যদিকে দাঁতনের কাছে মোগলমারী থেকে ঢিলছোড়া দুরত্বে পুকুর খোঁড়ার সময় উঠে এলো এক প্রাচীন দেবী মুর্তি। স্থানীয় গবেষকদের মতে এটি দন্তভুক্তি বা আজকের দাঁতনের কোন মন্দিরে ছিল। বর্তমানে এটির স্থান হয়েছে গাছতলায়। এই রকম উদ্ধার হওয়া দেবদেবীর মধ্যে বিখ্যাত হল রেবন্ত। প্রাচীন ভারতের শিল্পকলার অনুপম নিদর্শন ওই ভাস্কর্যে দেখা যায় অশ্বারোহী রেবন্তকে।

ঋগ্বেদ মতে, এই রেবন্ত হলেন সূর্য এবং সংজ্ঞার পুত্র। দাঁতনে পাওয়া রেবন্তটির স্থান হয়েছে আর পাঁচটা ভাঙা মুর্তির সাথে গাছতলায়। ২০১৬ সালে এই রকমই একটি রেবন্ত মুর্তি চোরেদের হাত ঘুরে পৌছিয়ে গিয়েছিল নিউ ইয়র্কের ক্রিসটিজের নিলামঘরে। পরে পুলিসের সাহায্যে তা উদ্ধার হয়ে দেশে ফিরে আসে। এ রকম নদী থেকে মুর্তি অল্প বিস্তার প্রায় সব নদীমাতৃক জেলাগুলিতেই পাওয়া গিয়েছে। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই স্থানীয় লোকেরা এ ধরণের প্রাচীন মূর্তির গুরুত্ব যে অপরিসীম তা বোঝেন, কিন্তু এক ধরনের ভ্রান্ত অধিকারবোধে ভোগেন যে কারনে মুর্তি হাতছাড়া করতে চান না। অমুল্য প্রত্নসম্পদ তার ঐতিহাসিক চরিত্র হারিয়ে চলে যান ধুপ ধুনোর আড়ালে।
অন্যদিকে জেলায় স্থায়ী প্রদর্শণশালার অভাবে উদ্ধার হওয়া মূর্তিগুলির একটা বড় অংশ স্থানীয় থানার মালখানার অন্ধকারে অযত্নে পড়ে থাকে। অবশ্য ব্যতিক্রমও আছে। রায়নায় উদ্ধার হওয়া পাল, সেন আমলের উমা মহেশ্বর মূর্তি স্থান পায় বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঐ রকমই আর একটি স্থাপত্য তাৎক্ষনিক মালিকের জেদে তার বাড়ীতে পৌঁছন কিন্তু বাড়ীতে বিভিন্ন বিপদ ঘটতে থাকায় বাড়ীর কর্তা এটিকে সরকারের হাতে তুলে দেন। বহু বছরের প্রাচীন এই দেবীমূর্তিটি শাস্ত্রের ভাষায় ‘অষ্টভুজাপিতা মারিচী’। দেবীর তিনটে মাথা আর আটটি হাত আছে। দেবীর প্রতিটি মুখে আছে তিনটে করে চোখ।

মণ্ডলহাট থেকে দাঁইহাট পুরসভা যাওয়ার রাস্তায় একটি পুকুরের পাঁক তোলার সময় প্রায় সাড়ে চার ফুট উচ্চতার এই মূর্তি উদ্ধার হয়। বেড়াগ্রামের বাসিন্দা উদয় ঘোষ, দিলীপ ঘোষরা মূর্তিটি নিজেদের বাড়িতেই জোর করে রেখে দেন। মূর্তি এনে যে বিড়ম্বনায় পড়েছিলেন পূ্র্ব বর্ধমানের ঘোষ পরিবার পরে পুলিশের উপস্থিতিতে তা কাটোয়া মহকুমা গ্রন্থাগারের সংগ্রহশালায় দান করে তা থেকে মুক্ত হন। এ বিষয়ে অবশ্য বেশ কিছু ক্ষেত্র সমিক্ষকের মতে ওজনের কারনে এই মূর্তিগুলি গ্রামের ভেতর থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। এর সাথে গ্রামবাসীদের বিশ্বাস জড়িয়ে রয়েছে। যেগুলি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব সেগুলি অনেক আগেই পাচার হয়ে গেছে। যেগুলি পাচার হয়নি সেগুলি বিভিন্ন বাড়িতে রয়েছে। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও এরকম অনেক মূর্তি পাচার কিংবা পাচার হওয়ার ভয়ে অনেকেই গোপন করেন।

তবে বেশীর ভাগ গবেষক একমত যে যদি সরকার সংরক্ষণ করেও, সেক্ষেত্রে মূর্তি নিয়ে গিয়ে কলকাতার কোন সংগ্রহশালায় রাখবে। সেক্ষেত্রে যে অঞ্চল থেকে পাওয়া গেল সেই অঞ্চলের আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চা ও পর্যটন দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর বিকল্প হিসাবে যদি সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে অঞ্চল ভিত্তিক ছোট ছোট মিউজিয়াম করা যায় তাহলে খুব ভাল হয়। এর জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নির্মাণে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বড় ভুমিকা পালন করতে পারে।
বেশ তথ্যবহুল লেখা।এ সমস্যা সব স্থানেই বিদ্যমান।জয়পুরেও উদ্ধার হওয়া সব মূর্তি বিষ্ণুপুরের আচার্য যোগেশচন্দ্র বিদ্যানিধি পুরাকীর্তি ভবনে স্থান পায়নি।সলদা গ্রামের নানা গাছের তলায়, পুকুরের পাড়ে, ফাঁকা মাঠে আজ ও রয়েগেছে অরক্ষিত অবস্থায়। এধরনের লেখা জনগণের মনে নতুন ভাবনার উদয় ঘটাবে। মূর্তি গুলোর সব ধরনের মূল্য আমজনতা বুঝতে পারবেন।
লেখাটি খুবই তথ্যবহুল, সকলের দৃষ্টিগোচরে আসুক। এই ধরনের প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ একান্ত জরুরি। নতুবা হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আপনাকে ধন্যবাদ।
ভালো প্রতিবেদন।
অমূল্য এই প্রত্নসম্পদগুলো সাধারণ মানুষের ইতিহাসবোধ আর ঐতিহ্য চেতনার অভাবে এবং ধর্মান্ধতার জন্য হারিয়ে যায়, পাচার হয়ে যায়, গাছতলায় পড়ে থাকে বা তেল সিঁদুর লিপ্ত হয়ে অন্ধকার ঠাকুরঘরে পড়ে থাকে। সরকারি উদ্যোগ এবং উদাসীনতার কারণেও মালখানায় পড়ে থেকে নষ্ট হয় বহু বিগ্রহ। সরকারি ব্যবস্থাপনাতেই এগুলোর সঠিক সংরক্ষণ ও মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হওয়া দরকার।
লেখাটি পড়লাম। এ বিষয়ে দু একটি কথা মনে হলো।
1 বাংলাদেশের যথার্থ ইতিহাস চর্চা বড় অনাদৃত। এর জন্য প্রত্নতাত্বিক খনন এবং সংরক্ষণ জরুরি।
2 শিক্ষার মাধ্যমে এই সব প্রত্নতাত্বিক মূর্তি ইত্যাদি সম্বন্ধে জনগণকে সচেতন করা দরকার। যাঁরা ইতিহাসকে ভালোবাসেন তাঁরা সংঘবদ্ধ হলে কাজ হবে।
3 এখন প্রায় সব জেলায় একটি করে সরকারি বিশ্ব বিদ্যালয় হয়েছে। সেখানে যাদুঘর করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা হলে ভালো হয়।
আমি স্থানীয় মানুষের কাছে তাঁদের প্রত্নসম্পদ রাখার পক্ষে, যদি তাঁরা তার রক্ষনাবেক্ষন ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন। সাধারণত স্কুল কলেজ বা ক্লাব আগে এগিয়ে আসত। আজকাল সময় বদলেছে, কেউ দায়িত্ব নিতে চায় না, অবহেলায় পড়ে থাকে। তাই মনে হয় প্রত্যেক জেলায় সরকারী উদ্যোগে সংগ্রহশালার প্রয়োজন আছে।তাতে security আর reoccurring খরচের ভাবনা থাকেনা, স্থানীয় সম্পদ দূরে চলে যায় না। তবে ভুললে চলবে না প্রাদেশিক ও জাতীয় সংগ্রহালয়ে স্থান পেলে তার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়, দেশে বিদেশে পরিচিতি হয়।
লেখাটি খুবই তথ্যবহুল এবং সময়োপযোগী । যতদিন না এলাকার ইতিহাস এবং প্রত্নসামগ্রীর ব্যাপারে স্থানীয় মানুষ আগ্রহী হবেন এবং সেগুলির সংরক্ষণের ব্যাপারে বিজ্ঞানমনস্ক হবেন, ততদিন বারম্বার এইভাবে সেগুলি নষ্ট হবে । এক্ষেত্রে সব চাইতে বড় প্রাপ্তি হবে যদি এলাকার সাধারণ মানুষকে, বিশেষত তরুণ প্রজন্মকে এই ব্যাপারে সচেতন করা যায় ।
তথ্যপূর্ণ রচনা পড়ে সমৃদ্ধ হলাম। আন্তরিক ধন্যবাদ নেবেন। সরকার ,কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে অনেক সময়ে এগুলি ভার বস্তু ,মূল্যহীন। অথচ আকবরী মোহর পাওয়া গেলে খুব দ্রুততার সঙ্গে তা সংগ্রহ করা হয়। বাজার দরে এই অসামান্য পুরাবস্তু সমাজের কাছে অনাদরের সামগ্রীর। পুরাতত্ববিদ ও সংস্কৃতি প্রেমিকদের এগিয়ে আসতে হবে।