উদ্বোধনের ৫ দিনের মধ্যে এবং প্রধানমন্ত্রী মোদীর গুজরাত সফরকালেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছিল মোরবি কেবল সেতু। ভয়ংকর সেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৬২ জন। স্থানীয় প্রশাসনের তদন্তে প্রকাশ্যে এসেছিল রাজ্য সরকারের একাধিক গাফিলতি। টেন্ডার না ডেকেই ব্রিজ সারাইয়ের বরাত দেওয়া, এমনকি ফিট সার্টিফিকেট না নিয়েই সাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল সেতু। বিপর্যয়ের পর রাজনীতির কারবারিরা দাবি করেছিল এবার গুজরাতে ধাক্কা খাবে বিজেপির ভোট ব্যাঙ্ক। কিন্তু বাস্তবে ঘটলো তার উলটো। গুজরাতের ৫১ শতাংশ মানুষ ফের বেছে নিলেন সেই বিজেপিকেই। ১৯৯৫ সাল থেকে আড়াই দশকেরও বেশি সময় গুজরাটে টানা ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি। সেই রাজ্যের মসনদে সপ্তমবারেও পদ্ম সরকার। তার মানে কি মোদী ম্যাজিকে সব গাফিলতি ধামাচাপা পড়ে গিয়েছিল।
গুজরাটে করোনা পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ হওয়া থেকে শুরু করে মোরাবিতে সেতু বিপর্যয়, রাজ্যের বেকারত্ব, নিত্য প্রয়োজীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি, স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে মুদ্রাস্ফীতি সব ক্ষেত্রেই ব্যর্থ সে রাজ্যে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া হওয়া ছিল যথেষ্ট। এবারের গুজরাট ভোট বিজেপির জন্য ছিল যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের। কারণ, এতদিন ধরে গুজরাটে লড়াইটা ছিল দুটি রাজনৈতিক দল বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে। এবার গুজরাটে লড়াইটা ছিল ত্রিমুখী। কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি দিল্লি, পাঞ্জাব জয়ের পর ভোটের আসরে প্রবল ভাবে ঝাপিয়ে পড়েছিল। তাছাড়া গুজরাট ভোটে গ্রামীণ কেন্দ্রগুলি ছিল বিজেপির পক্ষে দুর্বল জায়গা। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা বিজেপির শহরে প্রভাব বেশি থাকলেও গ্রামাঞ্চলে তুলনায় ছিল কমজোরি। সেদিক থেকে গ্রামীন অঞ্চলে কংগ্রেসের প্রভাব বেশি ছিল। যে কারণে ২০১৭ সালের বিধানসভা ভোটে বিজেপি ৯৮টি গ্রামীন আসনের মধ্যে পেয়েছিল ৩৬টি। যা ২০১২ সালের বিধানসভা নির্বাচনের থেকে কম। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে বিজেপির প্রভাব বেশি থাকলেও গুজরাতে যুব সম্প্রদায় ও মাঝবয়সিদের একটি বড় অংশ পরিবর্তন চাইছিল।
কিন্তু তা সত্ত্বেও গতবারের থেকেও খারাপ ফল করলো কংগ্রেস। ভোট ব্যাঙ্ক বাড়াতে তারা পুরোপুরি ব্যার্থ হয়েছে। অথচ ২০১৭ সালে তারা বিজেপিকে ভাল টক্কর দিয়েছিল। ভোটের আগে বিজেপির দপ্তরে যে রিপোর্ট জমা পড়ে তাতে দেখা যায় গত ২৭ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকায় যুব ও মধ্যবয়সিদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার লক্ষণ স্পষ্ট। কিন্তু কংগ্রেস সেই প্রতিষ্ঠানবিরোধি হাওয়াকে কাজে লাগাতে পারেনি। অন্যদিকে বিক্ষুব্ধ ভোটারদের কথা মাথায় রেখে মোদী ভোটের আগে রাজ্যে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে একগুচ্ছ প্রকল্পের ঘোষণা ও শিলান্যাস করেন। উলটো দিকে ভোটের আগে একাধিক হেভিওয়েট কংগ্রেস নেতা বিজেপিতে যোগ দেন। তার সঙ্গে কাজ করেছে আম আদমি পার্টির গুজরাট ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। প্রথমবার গুজরাট ভোটে লড়াই করেই তারা ১৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে। যে কারণে রাজনৈতিক বিশেষঙ্গরা মনে করছেন, কংগ্রেসের ভোট ব্যাঙ্কে ভাঙন ধরিয়েছে আপ। সর্বোপরি গুজরাটে বিজেপি শাসকের সব রকম ব্যর্থতা ঢাকা পড়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ম্যাজিকে। এমনকি মোরবি বিপর্যয়ের জন্য সরকারের বিরোধিতাও কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি।
গুজরাটের উপজাতীয় অঞ্চলও ছিল বিজেপির দুর্বল জায়গা। গতবার উপজাতীয় অঞ্চলে কংগ্রেসের দাপট ছিল যথেষ্ট। গতবার কংগ্রেস তার জোটসঙ্গী ভারতীয় উপজাতি পার্টি এখানে ভালো জায়গা করে নিয়েছিল। কিন্তু এবার সেখানে পা রাখে আম আদমি পার্টি আর তাতেই কংগ্রেস ও জোটসঙ্গী বিটিপি বা ভারতীয় উপজাতি পার্টিকে প্রত্যাখ্যাত হতে হয়। যেখানে ২০১৭ সালে উপজাতীয় অঞ্চলের ২৭টির মধ্যে ১৫টিতে জিতেছিল কংগ্রেস। এবার সেখানে বিজেপি কংগ্রেসত্যাগীদের প্রার্থী করে। ভারতীয় উপজাতি পার্টিতে ভাঙন ধরে আম আদমি পার্টি কারণে। সেই ভোটব্যাঙ্কে থাবা বসায় আপ আর ফায়দা লুটে নেয় বিজেপি। এর ফলে বিজেপি নতুন করে আদিবাসী অঞ্চলে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করল। আদিবাসী ভোট বেরিয়ে গেল কংগ্রেসের হাত থেকে। উল্টোদিকে আম আদমি পার্টি বিজেপির হিন্দু ভোট কাটতে পারেনি বরং তারা কংগ্রেসের মুসলিম ভোট কেটেও বিজেপিকে সুবিধা করে দিল। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মোদী-শাহরা আম আদমি পার্টিকে কাজে লাগিয়ে অ্যান্টি ইনকামবেন্সি ফ্যাক্টরকে দুরমুশ করে দিয়েছে। আম আদমি পার্টিকে বিজেপি এমন ভাবে কাজে লাগালো যে কংগ্রেসকে ছত্রখান হয়ে গেল। বিজেপির যে ব্রহ্মাস্ত্রকে রুখতে কংগ্রেস এবার ডোর টু ডোর প্রচার চালিয়ে ছিল কিন্তু বিজেপি অঞ্চলভিত্তিক জাতিগত ভোট বিভাজন করে কংগ্রেসের ১৯৮৫ সালের রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস রচনা করলো।
শুধু মোদী-রাজ্যে নয় অন্য অনেক রাজ্যেই কংগ্রেসের ভোটব্যাঙ্কে থাবা বসাচ্ছে আম আদমি পার্টি পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেস। আম আদমি পার্টির সুপ্রিমো অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যে রাজ্যে বিজেপিকেই সুবিধা করে দিচ্ছে। আম আদমি পার্টির মতোই উত্তর-পূ্র্বের রাজ্যগুলিতে শাখা বিস্তার করছে তৃণমূল।