“….ভিখুর গলা জড়াইয়া ধরিয়া পাঁচী তাহার পিঠের ওপর ঝুলিয়া পড়িল। তাহার দেহের ভারে সামনে ঝুঁকিয়া ভিখু জোরে জোরে পথ চলিতে লাগিল। পথের দু’দিকে ধানের ক্ষেত আবছা আলোয় নি:সাড়ে পড়িয়া আছে। দূরগ্রামের গাছপালার পিছন হইতে নবমীর চাঁদ আকাশে উঠিয়া আসিয়াছে। ঈশ্বরের পৃথিবীতে শান্ত স্তব্ধতা।
হয়তো ওই চাঁদ আর এই পৃথিবীর ইতিহাস আছে। কিন্তু যে ধারাবাহিক অন্ধকার মাতৃগর্ভ হইতে সংগ্রহ করিয়া দেহের অভ্যন্তরে লুকাইয়া ভিখু ও পাঁচী পৃথিবীতে আসিয়াছিল এবং যে অন্ধকার তাহারা সন্তানের মাংস আবেষ্টনীর মধ্যে গোপন রাখিয়া যাইবে তাহা প্রাগৈতিহাসিক। পৃথিবীর আলো আজ পর্যন্ত তাহার নাগাল পায় নাই। কোনদিন পাইবেও না।”
“প্রাগৈতিহাসিক” গল্পের পরিশেষে লেখক মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় বস্তজগতের রূপময়তায় এই আদিম গোপন আঁধারের উদ্ভাসন ঘটিয়েছেন। প্রাগৈতিহাসিক এক আশ্চর্য কথকতার কুহকজাল। এই আদিমতার কুহকজাল পাঠককে টেনে নিয়ে যায় ভিন্নতর এক রূপজগতে — যে রূপজগতটি সভ্যতার এবং অসভ্যতারও বাইরের এক জগত, এ এক আদিম ও অকৃত্রিম জৈবজগত যার বাসনাপ্রখর মায়াজাল পরিদৃশ্যমান জগতের সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর তন্তুজালে জড়ানো, যা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে অবচেতনার স্তরে -মনুষ্যোচিত সচেতন মনের আড়ালে এই নিয়ন্ত্রণ কর্মটি আপন ছন্দে তার কাজ করে যেতে থাকে।
মাণিকের বস্তুবাদী শিল্পীসত্তার প্রতীকী নির্যাস নিয়ে গড়ে উঠেছে “প্রাগৈতিহাসিক” গল্পটি। কামনা-বাসনা রক্তিম এই বস্তুজগত পরিদৃশ্যমান বস্তুজগতের অন্তরালে তার কাজ করে চলেছে, লোভ, হিংসা, ক্ষুধা, রিরংসা প্রভৃতি ক্রমাগতই রচনা করে চলেছে অন্ধকারের ইতিকথা।
আষাঢ় মাসের প্রথমে বসন্তপুরের বৈকুন্ঠপুরের গদিতে ডাকাতি করতে গিয়ে এগারোজনের ডাকাতদলটি ধরা পড়ে। তারমধ্যে কাঁধে বল্লমের খোঁচা খেয়ে একমাত্র ভিখুই প্রাণে বেঁচেছিল। ন’ক্রোশ পথ হেঁটে তারই আরেক সাঙাত পেহ্লাদ বাগদির বাড়ি চিতলপুরে আশ্রয়ের জন্যে গেলে পেহ্লাদ তাকে আশ্রয় দেয়নি।ভিখুর কাঁধটি দেখিয়ে বলেছিল — “উটি পাকবো। গা ফুলবো। জানাজানি হইয়া গেলে আমি কনে যামু? খুনটো যদি না করতিস” — ভিখুকে সে নিয়ে গিয়েছিল চিতলপুরের কাছে এক বনে। যে প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকার গল্পটির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে সেই অন্ধকার লুকিয়ে থাকে নিবিড় বন জঙ্গলে, পেহ্লাদ তাই ভিখুকে নিয়ে আসে নিবিড় এক জঙ্গলে এবং বন্যপ্রাণী, অনাবৃত প্রকৃতি ও ভিখুর সহাবস্থানের বন্দোবস্ত করে দেয় —
“বন কাছেই ছিল, মাইল পাঁচেক উত্তরে। ভিখু অগত্যা বনেই আশ্রয় লইল। পেহ্লাদ নিজে বাঁশ কাটিয়া বনের একটা দুর্গম অংশে সিনজুরি গাছের নিবিড় ঝোপের মধ্যে তাহাকে একটা মাচা বাঁধিয়া দিল। তালপাতা দিয়া একটা আচ্ছাদনও করিয়া দিল।
বলিল – বাদলায় বাঘ টাঘ সব পাহাড়ের উপরে গেছে গা। সাপে যদি না কাটে ত আরাম কইরাই থাকবি ভিখু।”
ভিখু তো শুধু সভ্য জগতের বাইরের প্রাণী নয়, অসভ্য জগতের শৃঙ্খলারও বাইরে। তাই বাদলায় যেখানে বাঘের আস্তানা সরে যায়, ভিখু আস্তানা গড়ে সেখানে।
সিনজুরি গাছের নিবিড় ঝোপের অন্তরালে ভিখু বাঁচে। কাঁধে বল্লমের খোঁচা খাওয়া জায়গাটি পেহ্লাদের ভবিষ্যৎ বাণীকে সফল করে পেকে ফুলে ওঠে। বর্ষাকালে এই ঘন জঙ্গলে জ্বর গায়ে, কাঁধের বিষাক্ত ঘা নিয়ে, জলে ভিজে, ঘন্টায় একটি করে জোঁক টেনে ছাড়িয়ে, ঘাড়ের ব্যথায় ধুঁকতে ধুঁকতে দু’দিন দু’রাত সঙ্কীর্ণ মাচার ওপর কাটিয়ে দেয় ভিখু। বৃষ্টির ছাঁটে সে ভিজে ওঠে, রোদের ভ্যাপসা গরমের গুমোটে সে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে শ্বাস টানে, মশা ও পোকার উৎপাত সহ্য করে পেহ্লাদের পুঁটলি করে রেখে যাওয়া শুকনো চিঁড়ে চিবিয়ে সে বাঁচে —
“মনে মনে পেহ্লাদের মৃত্যুকামনা করিতে করিতে ভিখু তবু বাঁচিবার জন্য প্রাণপণে ঝুযিতে লাগিল।…. বিষাক্ত রস শুষিয়া লইবে বলিয়া জোঁক ধরিয়া নিজেই ঘায়ের চারিদিকে লাগাইয়া দিল। সবুজ রঙের একটা সাপকে একবার মাথার কাছে সিনজুরি গাছের পাতার ফাঁকে উঁকি দিতে দেখিয়া পুরা দুই ঘন্টা লাঠি হাতে সেদিকে চাহিয়া বসিয়া রহিল…. মরিবে না। সে কিছুতেই মরিবে না। বনের পশু যে অবস্থায় বাঁচে না, সেই অবস্থায় মানুষ সে বাঁচিবে। ”
এই অবস্থাটি অবশ্য পরিচিত জীবনপরিধি অতিক্রান্ত এক অনন্য জগত, যে জগত পরিচিত সাহিত্যজগতের গতিধারায় বাঁক ফিরিয়ে দিয়েছে, যে বাঁকের আড়ালে চলে গেছে বিচিত্র কুহকজালে আবৃত এক অজানা পথ, যে পথে স্পৃষ্ট হয়ে আছে অবচেতন মনের প্রক্রিয়ার বিচিত্র সব প্রতিক্রিয়া। ভিখু পাঁচি বসিরেরা উন্মোচিত করেছে সেই অজানা পথের ধূপছায়াকে।
প্রকৃতির নানাবিধ আক্রমণ ও দেহের বীভৎস ব্যাধি নিয়েও ভিখু বেঁচে উঠল। ভিখুর প্রাণ এমনই শক্ত যে নিশ্চিত মরণকে সে জয় করে ফেলল। সিনজুরি গাছের নীচে
সংকীর্ণ মাচার ওপর শুয়ে থাকা ভিখুকে মৃত্যুর প্রায় মুখোমুখি পৌঁছাতে দেখে পেহ্লাদ তাকে নিজের বাড়িতে এনে আশ্রয় দিয়েছিল। প্রায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর হাত থেকে ভিখু ফিরে এল। অকেজো হয়ে গেল শুধু তার ডানহাতটি। ধীরে ধীরে জেগে উঠতে লাগল তার শরীরী চেতনা। একদিন নির্জন ঘরে পেহ্লাদের বউয়ের হাত চেপে ধরল ভিখু। দেহের ক্ষুধা পরিতৃপ্তির জন্যে তার নারীর প্রয়োজন, হোক না সে আশ্রয়দাতা পেহ্লাদের বউ।
বস্তুত ভিখু তো সেই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারেরই প্রতীক, তাই গল্পের যে সব মুহূর্তে জ্বলে ওঠে মানবিক আলো, ভিখু নিষ্করুণভাবে সেই মুহূর্তগুলো ধ্বংস করেছে এবং আদিম অন্ধকারের অবগুণ্ঠন মোচন করেছে। অতঃপর এই ঘটনার প্রেক্ষিতে পেহ্লাদ ও ভিখুর মারামারি এবং মাঝরাতে পেহ্লাদের ঘরে আগুন দিয়ে ভিখুর পলায়ন বৃত্তান্ত অব্ধি ভিখুর অন্ধকারের ইতিকথা রচনার প্রথম পর্যায়ের পরিসমাপ্তি।
ভিখুর আদিম জীবনাচরণের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় ভিক্ষুক হিসেবে। বাজারের ধারে আর সব ভিক্ষুকের সাথে সে পথের কোণে বসে যায়। রোজগার তার মন্দ হয় না, ভিক্ষার্জিত অন্নে সে কালযাপন করে, দেহে হয় তার শক্তির সঞ্চার, যৌন ক্ষুধার তাড়নায় সে ক্রমশই উদ্ধত ও অসহিষ্ণু হতে থাকে। ডানহাতে তার জোর নেই, সুতরাং মানুষ খুন করার উত্তেজক আনন্দে এখন আর সে ভাগ বসাতে পারে না। মনের জ্বালা সে মিটায় উদাসীন পথচারীকে টিটকারি দিয়ে। দেহের শক্তি সে পুনর্বার অর্জন করেছে। শুধু তার প্রয়োগটাই তার নেই। ডানহাতটাতে অন্ধকারে সে হাত বোলায়, আফসোসের তার সীমা থাকে না। নাহলে, —
“কত দোকানে গভীর রাত্রে সামনে টাকার থোক সাজাইয়া দোকানি একা হিসাব মেলায়, বিদেশগত কত পুরুষের বাড়িতে মেয়েরা থাকে একা। এদিকে, ধারালো একটা অস্ত্র হাতে ওদের সামনে হুমকি দিয়া পড়িয়া একদিনে বড়লোক হওয়ার পরিবর্তে বিন্নুমাঝির চালাটার নীচে সে চুপচাপ শুইয়া থাকে।”
কিন্তু এভাবে কি ভিখু কালযাপন করতে পারে! নিরানন্দ নিরুৎসব জীবনযাপন তার ভালো লাগে না। তাড়ির দোকানে নেশা করে হল্লা করতে করতে গভীর রাতে বাসির ঘরে উন্মত্ত রাত কাটানোর উল্লসিত স্মৃতি তাকে কাতর করে। গভীর রাতে গৃহস্থের বাড়ি লুটপাট করে, স্ত্রীর সামনে স্বামীকে, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে, মায়ের সামনে সন্তানকে বেঁধে মেরে কেটে রক্তের ফোয়ারা ছুটিয়ে আনন্দে মশগুল হয়ে থাকতো সে, একটা ডানহাতের অভাবে এমন নিরানন্দ কালযাপন সে সইতে পারে?
বাজারে ঢোকার মুখে যে ভিখারিনী বসে তার বয়েস কম, দেহের বাঁধুনিও জোরালো, শুধু হাঁটুর নীচে থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত তৈলাক্ত দগদগে ঘা। ঐ ঘা দেখিয়ে ভিখারিনীটি ভিক্ষার্জন করে। ভিখু ভিখারিনীকে তার সঙ্গিনী হবার জন্যে আহ্বান করে। নানাভাবে প্রলোভন দেখায়-
“তোরে খাওয়ামু পরামু, পায়ের পরনি পা’টি দিয়া গাঁট হইয়া বইয়া থাকবি, না করস তুই কিয়ের লেগে? ”
ভিখারিনী পাঁচী তো এই অন্ধকারেরই বাসিন্দা, সহজ অবিশ্বাস তার কাছে সহজ সত্য। সে বলে — “দু’দিন বাদে মোরে যখন তুই খেদাইয়া দিবি, ঘা’টি মুই তখন পামু কোয়ানে?”
কিন্তু এভাবে ভিখুর আর চলে না।
“আকাশে চাঁদ ওঠে, নদীতে জোয়ারভাঁটা বয়, শীতের আমেজে বায়ুস্তরে মাদকতা দেখা দেয়। ভিখুর চালার পাশে কলাবাগানে চাঁপাকলার কাঁদি শেষ হইয়া আসে।….একদিন সকালে উঠিয়াই সে ভিখারিনীর কাছে যায়।
বলে -আইচ্ছা ল, ঘা লইয়াই চল।
ভিখারিনী বলে, “আগে আইবার পারো নাই? যা, অখন মর গিয়া, আখার তলে ছালি খা গিয়া।”
— ক্যান? ছালি খাওনের কথাডা কি?
— তোর লাগি হাঁ কইরা বইয়া আছি ভাবছস তুই? বটে? আমি উই উয়ার সাথে রইছি।
যার সাথে পাঁচি একসাথে থাকার বন্দোবস্ত করেছে সে-ও এক খঞ্জ ভিক্ষুক, সে-ও বেশ জোয়ান ভিখুরই মত। তার ডানহাতটিরই মত ভিক্ষুকটির একটি পা হাঁটুর নীচে শুকিয়ে গেছে। কিন্তু ভিখু এত সহজে ছাড়বার পাত্র নয়। ছুতোনাতা করে সে ভিখারিনীর সাথে ভাব জমাবার চেষ্টা করে। ঝুলির ভেতর থেকে প্রকান্ড এক মর্তমান কলা ভিখারিনীকে দিয়ে তার নাম জানতে চায়। ভিখারিনী কালবিলম্ব না করে কলাটি আত্মসাৎ করে বলে, “নাম শুনবার চাস? পাঁচী কয় মোরে, পাঁচী। তুই কলা দিছছ, নাম কইলাম, এবারে ভাগ।”
ভিখু উঠে না। অতবড় একটা কলা দিয়ে শুধু নাম শুনে সন্তুষ্ট হবার পাত্র সে নয়। সে পাঁচীর সঙ্গী বসিরের সাথে আলাপ জমাতে চায়। বসিরকে সেলাম জানায়।
বসির বলে, “ইদিকে ঘুরাফিরা কি জন্য? সেলাম মিয়া হতিছে। লাঠির এক ঘায়ে শিরটা ছেঁচ্যা দিমু নে।”
ভিখুর সঙ্গহীন জীবনে হঠাৎই উপার্জন কমে যায়। খ্যাপার মতো সে নদীর ধারে ঘুরে বেড়ায়। মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত পুরুষকে হত্যা করে পৃথিবীর যত খাদ্য, যত নারী আছে একা ভোগদখল না করতে পারলে তার তৃপ্তি হবে না। এক গভীর রাতে ভিখু তার যাবতীয় সম্বল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ঝুলিতে ভরে নেয় লোহার শিকটি, যা এতদিন ধরে ঘষে ঘষে সে একটা ধার চোখা করে ফেলেছে।
শহরের প্রান্তভাগে বসির ও পাঁচী বাস করে। অমাবস্যার অন্ধকারে বসির-পাঁচীর কুঁড়েঘর ও তার ভেতরের ছবি পৃথিবীর আদিমতম অন্ধকারের কুহকজাল রচনা করে, —
“…একটা জঙ্গলের ধারে খানিকটা জমি সাফ করিয়া পাঁচ সাতখানা কুঁড়ে তুলিয়া কয়েকটা হতভাগা মানুষ একটি দরিদ্রতম পল্লী স্থাপিত করিয়াছে। তারমধ্যে একটা কুঁড়েঘর বসিরের। ভোরে উঠিয়া ঠকঠক করিয়া কাঠের পা ফেলিয়া সে শহরে ভিক্ষা করিতে যায়। সন্ধ্যায় ফিরিয়া আসে। পাঁচী গাছের পাতা জ্বালাইয়া ভাত রাঁধে। বসির টানে তামাক। রাত্রে পাঁচী পায়ের ঘায়ে ন্যাকড়ার পটি জড়ায়। বাঁশের খাটে পাশাপাশি শুইয়া কাটা কাটা কদর্য ভাষায় গল্প করিতে করিতে তাহারা ঘুমাইয়া পড়ে। তাহাদের নীড়, তাহাদের শয্যা ও তাহাদের দেহ হইতে ভ্যাপসা পচা দুর্গন্ধ উঠিয়া খড়ের চালের ফুটা দিয়া বাহিরের বাতাসে মিশিতে থাকে।”
যেন চিরপরিচিত বস্তুজগতের মধ্যে মিশে যেতে থাকে সেই অন্তরালের পৃথিবী যেখানে লোভ, রিরংসা, ঘৃণা, প্রতিদ্বন্দ্বীকে হটিয়ে দেবার জিঘাংসাবৃত্তির তরঙ্গাভিঘাতের বুদবুদ তার যাবতীয় রূপজাল পৃথিবীর অন্ধতমসার বুকে মায়াময় তন্তুজাল বিস্তার করে চলে। এই পৃথিবীর বুকের ওপর দিয়ে হেঁটে আসে ভিখু প্রায় নিঃশব্দে এবং প্রায় নিঃশব্দেই তার এতদিন ধরে শাণিত করে রাখা চোখা বল্লমটিকে অন্ধকারের চোখ দিয়ে দেখে বসিরের তালুতে আমূল বসিয়ে দেয়। তারপর পাঁচীকে ভয় দেখিয়ে বসিরের আমৃত্যু সঞ্চয়ের ধন ও নবলব্ধ সঙ্গিনী পাঁচীকে নিয়ে নতুন আশ্রয়ের খোঁজে আরও এক আদিমতম কাহিনি রচনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।
বন্ধুদের সঙ্গে বাজি রেখে মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রথম গল্প ‘অতসীমামী’ লিখেছিলেন। অতসীমামীর মত রোমান্টিক আবেগধর্মী গল্প লিখে যিনি সাহিত্যের আঙ্গিনায় প্রবেশ করেছিলেন, তিনি লিখলেন ‘প্রাগৈতিহাসিক’। যে মধ্যবিত্তসুলভ আবেগাশ্রিত বিবেকবোধ বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে একক সম্রাটের মত রাজত্ব করে গেছে, যে কল্লোলীয় বাস্তবতা তার রোমান্টিক আদলকে দেহ থেকে খুলে ফেলতে পারেনি সচেতন প্রয়াসেও, মাণিক সেই মধ্যবিত্ত শ্রেণীভুক্ত হয়েও নিজের শ্রেণীচেতনার বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে নতুন এক বস্তুবিশ্বের সন্ধান দিয়েছেন। সে এমনই এক বস্তুবিশ্ব, যা মধ্যবিত্তসুলভ যাবতীয় ভন্ডামি, তথাকথিত বিবেকবোধকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে। ‘প্রাগৈতিহাসিক’-এ অন্ধকার যেমন স্পষ্ট, অবিশ্বাসও তেমনই খোলামেলা, ক্ষুধা যেমন অনাবৃত, যৌনচেতনাও তেমনই উদগ্রীব, কৃৎকৌশলহীন। এই জৈব নিয়মসঞ্জাত পৃথিবীতে আর যাই থাকুক, ভন্ডামি নেই। যে অন্ধকারের ইতিকথা নির্মাণ করেছে ‘প্রাগৈতিহাসিক’, সেই মগ্ন অন্ধকারেই মাণিকের অবিরত অনুসন্ধানী পদসঞ্চার তাঁর গোটা সাহিত্যকর্মকেই দিয়েছে এক অনন্য বস্তুপৃথিবী যেখানে নির্ভেজাল যৌক্তিক শৃঙ্খলা কখনও তুলে ধরেছে নিরাবয়ব মগ্নচৈতন্যের মায়াবী অবয়ব, কোথাও বা সামাজিক অসাম্য সঞ্জাত চেতন পৃথিবীর আলো-অন্ধকারের ধূপছায়া।
ফ্রয়েডই হোন অথবা মার্ক্সই হোন, তাঁর যুক্তিবাদী মন যে নতুন পৃথিবীর সন্ধান দিয়েছে, সেই পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে উপলব্ধ হয় অন্ধ তমসা বিচ্ছুরিত আলো, সেই আলো যা সাবলীলভাবে ঘোষণা করে কল্লোলীয় বাস্তবতা থেকে নির্মোহ উত্তরণ।