সত্তরের দশকের শেষ লগ্নে কলকাতা মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় হাতিবাগান-শ্যামবাজার তথা উত্তর কলকাতার সিনেমা হলগুলো ছিল আমাদের নাগালের মধ্যে৷ বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের বহু সিনেমা এখানকার হলগুলিতে দেখেছি। ইংরেজি ছবির জন্যে ট্রামে করে এসপ্লানেডে ঢুঁ মারা হত।
হাতিবাগান মোড়ে দাঁড়িয়ে অনেক গুলতানি করেছি একসময়। সেটা অবশ্য সত্তরের শেষ আর আশির দশকের শুরুর বছরগুলিতে। তবে, হাতিবাগানের কাছে ইংরেজি সিনেমাও দেখা যেতো টকি শো হাউসে। আমার দেখা এমনই একটি সিনেমা, ‘অ্যান্ড জিপসি ক্যাম্প ভ্যানিশেস ইনটু দ্য ব্লু’। রাশিয়ান পরিচালক। নায়িকার নাম সেতস্লানা টোমোভা।
অনেকেই আজকাল রাজকৃষ্ণ স্ট্রিট নামটা শুনে বুঝতে পারবেন না। কিন্তু যদি তাঁদের বলা হয়, একসময় এখানেই ছিল বিশ্বরূপা, রঙ্গনা, বিজন থিয়েটার, সারকারিনা থিয়েটার হল, তাহলে হয়তো সবাই বুঝতে পারবেন। সেই গলি থেকে বেরলেই বিধান সরণি। একদিকে স্টার থিয়েটার, অন্যদিকে রংমহল। এইসব নিয়ে জমজমাট ছিল হাতিবাগানের থিয়েটার।

স্টার থিয়েটার
সেই জগৎ আজ কোথায় ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে। একসময় বিশ্বরূপার মঞ্চ কাঁপিয়ে ছিলেন শিশির ভাদুড়ী, যিনি বাংলা মঞ্চ অভিনয়ের ক্ষেত্রে আধুনিকতার স্রষ্টা, সেই তীর্থস্থানকে সরিয়ে গড়ে উঠেছে আকাশচুম্বি আবাসন। আগে অবশ্য বিশ্বরূপার নাম ছিল শ্রীরঙ্গম। সেই আবাসনের বাইরে কাঙালের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে শিশির ভাদুড়ীর মূর্তি। হাইরাইজের উৎপাত মুছে দিয়েছে আমাদের সাংস্কৃতিক বৈভব, নির্মাণ শিল্প গুঁড়িয়ে দিয়েছে আমাদের নাট্যশিল্পের নান্দনিক কাঠামো। তবু বাঙালিরা স্বাভিমান ও কল্পিত শিল্পবোধ নিয়ে ভেসে যায় মেকি আহ্লাদে! আজকের প্রজন্ম হয়তো জানে না, কেমন ছিল হাতিবাগানের থিয়েটার পাড়া? আজকের প্রজন্ম মেগাসিরিয়ালে মজে থাকে। কিন্তু তারা জানে না, কেমন করে একটা নাটক অনায়াসে চারশো-পাঁচশোতম অভিনয় অতিক্রম করে ইতিহাস গড়ে তুলত। সুপারহিট এক একটা নাটক চলত তিন-চার বছর ধরে। থিয়েটার হলের বাইরে থাকত থিকথিকে ভিড়, ঝোলানো হাউসফুল বোর্ড, টিকিটের জন্য হাহাকার। সব যেন স্বপ্নের মতো মনে হয়।
সত্যিই সে ছিল যেন এক স্বপ্নের জগৎ। মঞ্চ দাপিয়ে অভিনয় করছেন শিশির ভাদুড়ী, প্রভা দেবী, ছবি বিশ্বাস, জহর গঙ্গোপাধ্যায়, সরযূ দেবী, উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, বসন্ত চৌধুরী, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, জহর রায়, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, অনুপকুমার, দিলীপ রায়, লিলি চক্রবর্তী, সুব্রতা চট্টোপাধ্যায়, সুপ্রিয়া চৌধুরী-সহ অনেকেই।

থিয়েটার পাড়া হাতিবাগান
উত্তর কলকাতার হাতিবাগানে ছিল অনেকগুলি সিনেমা হল এবং থিয়েটার হল। সেখানে সিনেমাকে টক্কর দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল থিয়েটার। তাই হাতিবাগানকে বলা হতো থিয়েটার পাড়া। বাংলা চলচ্চিত্রের এমন কোনও স্টার নেই, যিনি হাতিবাগান থিয়েটার পাড়ার কোনও না কোনও মঞ্চে অভিনয় করেননি। শিশির ভাদুড়ীর সময়ে শ্রীরঙ্গম ছিল নাট্যমোদীদের কাছে তীর্থস্থান। সে তো সেই চল্লিশের দশকের কথা। বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের অবিসংবাদী নায়ক শিশিরবাবু। সেই প্রথম তিনি মুখোমুখি হলেন এক চ্যালেঞ্জের। শহর কলকাতায় সেই নাটকের পাশাপাশি জন্ম নিল অন্য ধারার এক নাটক। ‘নবান্ন’ দিয়ে তার যাত্রা শুরু। ‘সীতা’য় ডুবে থাকা শিশিরবাবু তার মাহাত্ম্য ঠিক বুঝতে পারেননি। তাঁর মনে হয়েছিল, এই ধারার নাটকের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। থিয়েটার মূলত বিনোদন। সেখানে এই সব ‘আঁস্তাকুড়ের গল্প’ মানুষ নেবে না। মানুষের জীবনের প্রেম, হাসি-কান্না এসবই মানুষ দেখতে চান। সেই সঙ্গে নাচ, গান। সিনেমা ধারার যে গল্প, তারই মঞ্চায়নে তিনি বিশ্বাস করতেন। সেই সঙ্গে বিশ্বাস করতেন স্টারডমে। একথা ঠিক, শুধু শিশিরবাবুর নামেই ‘হাউসফুল’ হয়ে যেত। কিন্তু চল্লিশের কলকাতা তখন অন্য জীবনের দিকে পথ হাঁটতে শুরু করেছে। দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, স্বাধীনতা, দেশভাগ, দারিদ্র্য পরপর অভিঘাত বুঝিয়ে দিয়েছিল জীবনের সঙ্কট। সময়ের বদলে মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে, জীবনের নিশ্চিন্ততা বলে যেন কিছুই থাকছে না।
এর মধ্যে কেউ কেউ মনে করতে লাগলেন বিনোদনই থিয়েটারের শেষ কথা। আবার অন্য একপক্ষ ভাবতে লাগলেন, বিনোদন শেষ কথা হতে পারে না, দায়বদ্ধতা আজ সব থেকে বড় কথা।
একটা সময় পর্যন্ত বাংলা পেশাদারি মঞ্চের প্রবল রমরমা ছিল। গণনাট্য, নবনাট্য ধারাকে পাশে রেখেও দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছে পেশাদারি রঙ্গমঞ্চ। তারপর এক সময় সে একবারেই হারিয়ে গেল। সে এক মর্মান্তিক ট্রাজেডি। সে ট্রাজেডি কিন্তু গ্রিক ট্রাজেডির মতো নিয়তি নির্ধারিত নয়, সেই ট্রাজেডির উদ্ভব শেক্সপিয়রের ট্রাজেডির মতো আপন কৃতকর্মের ফল থেকেই। একদা নবনাট্য কিংবা পরে গ্রুপ থিয়েটারের নাটকে যে ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু হয়েছিল, পেশাদারি রঙ্গমঞ্চেও তার কিছু কিছু লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। বিশেষ করে উৎপল দত্ত কিংবা অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় যখন পেশাদারি মঞ্চের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বৃহস্পতি, শনি, রবি ও ছুটির দিনে একটি নির্দিষ্ট মঞ্চে অভিনয় শুরু করেন।
শিশিরবাবু ছিলেন বাংলা নাট্যমঞ্চের ইতিহাসে একটা যুগ। তাঁর হাত ধরেই বাংলা নাটকে আধুনিক অভিনয়ের ধারা এসেছিল। ‘প্রফুল্ল’ নাটকে শেষ অভিনয়ের সময় তাঁর সংলাপ ছিল, ‘আমার সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল’! কী মর্মস্পর্শী বেদনাহত ছিল সেই উচ্চারণ। এ যেন এক সাম্রাজ্যের ভেঙে পড়ার আর্তনাদ।

রূপবাণী
এবার হাতিবাগানের থিয়েটারপাড়া ছেড়ে আরও পুরনো হাতিবাগানের খোঁজে নামা যাক।
পলাশির যুদ্ধের আগের বছর নবাব সিরাজদৌল্লা কলকাতা আক্রমণ করেন, ইংরেজ তথা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাতব্বরি সহ্য করতে না পেরে৷ সিরাজের সৈন্যবাহিনীতে পদাতিক সৈন্য যেমন ছিল, তেমনি ছিল হাতি ও ঘোড়সওয়ারবাহিনী৷ মালপত্র ও রসদ বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য হাতি ব্যবহার করা হয়েছিল৷ সিরাজের সৈন্যবাহিনীর হাতিগুলো এখানে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলেই নাকি জায়গাটি হাতিবাগান নামে পরিচিত হয়৷ ইতিহাসজারিত এই মুচমুচে গল্পটি সরল বিশ্বাসে একসময় মেনেও নিয়েছিলাম৷
প্রায় তিরিশ বছর পরে কলকাতার ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে দেখেছি, আমি রীতিমতো হস্তীমূর্খ৷ হরিসাধন মুখোপাধ্যায়ের ‘কলিকাতা সেকালের ও একালের’ বই থেকে জানলাম, সিরাজদৌল্লার হাতিগুলো রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা হয়েছিল হালসিবাগানে উমিচাঁদের বাগানবাড়িতে ছাউনিতে৷ কেন-না সৈন্যবাহিনী নিয়ে সিরাজ কলকাতার উত্তর-পূর্বদিকে মারহাট্টা ডিচের পাশে হালসিবাগানেই ছাউনি ফেলেন৷ হাতিবাগান অঞ্চলটিতে হাতি ছিল, তবে এ হাতি অন্য হাতি৷
‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ অভিধানে হাতি শব্দের আর একটি অর্থ দেওয়া আছে৷ হাতি মানে কাজের জোগাড়ে বা সহায়ক৷ রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে লাগে৷ ১৭৫২ সালে কলকাতার তৎকালীন জমিদার জেফানিয়া হলওয়েলের নির্দেশে কুমোরটুলি, দর্জিপাড়া, কলুটোলা, কপালিটোলা, আর্মানিটোলা, নাহারিটোলা, মুচিপাড়া, পটুয়াটোলা, কসাইটোলা, খালাসিটোলা প্রভৃতি নামকরণ লোকের জীবিকা বা পেশা অনুসারে করা হয়েছিল৷ মেছুয়াবাজার, কুলিবাজারও এভাবে তৈরি হয়৷ কলকাতার সেই প্রিমিটিভ যুগে নতুন নতুন অট্টালিকা, ইমারত তৈরির জন্য রাজমিস্ত্রির যেমন প্রয়োজন ছিল, তেমনি প্রয়োজন ছিল জোগাড়ে বা সাহায্যকারীর৷ বটতলা-বাগবাজারের ভাজাভুজির দোকানগুলিতেও তখন মূল পাচকের সাহায্যকারী জোগানদারদের রমরমা৷ হাতিবাগান অঞ্চলটিতে বিভিন্ন কাজের জোগাড়ে বা সাহায্যকারীদের বাস ছিল৷
জোগাড়ের দরকার হলে পুরোনো কলকাতার বাবুরা বিনা বাক্যব্যয়ে চলে যেতেন উত্তর কলকাতার হাতিবাগানে৷ সুতরাং সিরাজদৌল্লার চতুষ্পদ হাতিগুলো হালসিবাগানেই ছিল৷ হাতিবাগানে ছিল দ্বিপদ হাতি তথা জোগাড়েরা৷ হাতিবাগানে এখন জোগাড়েদের ডেরা আছে কিনা আমার জানা নেই। কলকাতার পাট আমার সেই কবেই চুকে গেছে!
অনিচ্ছাকৃতভাবে আমার এই লেখাটির তথ্যসূত্রে লেখক সন্দীপন বিশ্বাসের ‘হাতিবাগানের থিয়েটার’ নিবন্ধটির উল্লেখ করতে ভুলে গেছি। এই লেখাটি পড়ে আমি আমার সত্তর-আশির দশকের স্মৃতি মিলিয়ে নিতে গিয়েছিলাম। ভুলে যাওয়া অনেক কথা এই লেখাটি পড়েই মনে পড়ে গেল। সন্দীপনবাবুর নামটি আমার লেখার তথ্যসূত্রে দিতে ভুলে যাওয়ায় আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
ধন্যবাদ । একদিন সাক্ষাৎ হবে নিশ্চয়।