তেহট্ট মহকুমার লিট্ল ম্যাগাজিনের ইতিহাস জানতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে সেই বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে। এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলে নেওয়া ভালো-তেহট্ট মহকুমার লিট্ল ম্যাগাজিন চর্চা ও সাহিত্য চর্চা যে জায়গাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছিল তা করিমপুর ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল। নদীয়া জেলার সীমান্তবর্তী একটা স্থান হওয়া সত্ত্বেও এই স্থানকে কেন্দ্র করে কেন লিটিল ম্যাগাজিন চর্চা ও সাহিত্যচর্চা ছড়িয়ে পড়েছিল অন্যান্য স্থানে? এর একটা কারণ করিমপুরের অনতিদূরে জমশেরপুর গ্রাম ছিল প্রখ্যাত কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর জন্মস্থান। সেই সূত্রে বাংলা সাহিত্যের বহু প্রথিতযশা কবির যাতায়াত ছিল তাঁর বাড়িতে। বিভিন্ন সময়ে সমকালীন কবি সাহিত্যিকরা এসেছেন তাঁর বাড়িতে। যে বাড়ি এখনও মহাকালের কাছে স্বাক্ষ্য দেবার আশায় দাঁড়িয়ে আছে।তার ফল স্বরূপ এই বাগচী বাড়িকে কেন্দ্র করেই বহু আগে থেকেই করিমপুর হয়ে ওঠে শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্যের ধারক ও বাহক। তাছাড়া তেহট্ট মহকুমার মধ্যে করিমপুর এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলে ছিল বেশ কিছু বনেদী পরিবার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল জমশেরপুরের বাগচী জমিদার বাড়ি, সুন্দলপুরে মিত্ররা, সরকাররা, বাগেরা, দোগাছিতে মজুমদার ও বাগেরা বসবাস করত। হোগলবেড়িয়ায়ও অনেক বনেদী পরিবার বসবাস করতো। দেশভাগের পর প্রচুর মানুষ পূর্ববঙ্গের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর থেকে উঠে এসে ব্যবসা-বাণিজ্য, নিরাপত্তা, জীবিকা ও শিক্ষা-দীক্ষার তাগিদে করিমপুর এবং তার সংলগ্ন অঞ্চলে বসবাস করা শুরু করল। অনেক শিক্ষিত লোকজন এসে জমা হল এই জায়গায়। ফলে তাদের নিয়ে একটা শিক্ষিত সমাজ বা শিক্ষিত মানুষের পরিমণ্ডল তৈরি হল। পত্রিকা, লেখালিখি, সাহিত্যচর্চা এগুলোও শুরু হল ধীরে ধীরে। সমকালীন সময়ে তেহট্ট মহকুমার অন্যান্য জায়গায় (নাজিরপুর, বেতাই, তেহট্ট) কিন্তু এ পরিমণ্ডল তৈরি হয়নি।কারণ এই সব জায়গায় একটা বড়ো অংশের মানুষ ছিলেন উদ্বাস্তু। পূর্ববঙ্গ থেকে সদ্য উঠে এসে তাদের চোখে-মুখে ছিল অশান্তির ছাপ।তাদের কাছে ছিল ‘অন্নচিন্তা চমৎকারা’। তাই পত্রিকা করাটা ছিল বিলাসিতা। এজন্য নাজিরপুর, তেহট্ট, বেতাই, পলাশীপাড়া ইত্যাদি অঞ্চলগুলিতে পত্রিকা প্রকাশের কোনো সম্ভাবনা ছিল না বা তার কোনো খবর এ পর্যন্ত অপ্রকাশিত।

তৎকালীন সময় থেকে আজ পর্যন্ত ষাটের উপর পত্রপত্রিকা শুধুমাত্র করিমপুর এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চল থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এটা খুবই গর্বের বিষয়। সংখ্যাটা নেহাত কম নয়। তবে ৭০/৮০-এর দশক ও তার পরবর্তী সময়ে কিন্তু তেহট্ট, পলাশীপাড়ার আশেপাশের অঞ্চল থেকেও পত্র-পত্রিকা প্রকাশ, সাহিত্যচর্চার খবর পাওয়া যায়। তবে সব পত্রপত্রিকা হয়তো আজ আর টিকে নেই। তবুও বেশ কিছু পত্রপত্রিকা এখনো নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে এবং সেই শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্যের সাধনার ধারাকে অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে। লিট্ল ম্যাগাজিনের চরিত্রই বোধ হয় এটা। কিছু পত্রিকার জন্ম হঠাৎ হঠাৎই হয়। অনেকটা শরতের মেঘের মতো। শরতের মেঘ যেমন ক্ষণস্থায়ী, এগুলোও অনেক সময় ক্ষণস্থায়ী হয়। আবেগের বসে অনেক লিট্ল ম্যাগাজিনের জন্ম। কিন্তু বাস্তবের মাটিতে তাকে টিকিয়ে রাখা অনেক সময় দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। তেমনি অনেক সময় নতুন কোনো পত্রিকা জন্মানোর কিছুদিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। অনেক পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায় সম্পাদকের মৃত্যুর পর, আবার সম্পাদকের মৃত্যুর পরও হয়তো কেউ পত্রিকার হাল ধরে তাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। এভাবেই হয়তো প্রচুর লিট্ল ম্যাগাজিনের জন্ম হয়েছে আবার কালের অতল গর্ভে বিলীন হয়েও গিয়েছে। এই ক্ষুদ্র লেখার মধ্যে সব পত্রপত্রিকা নিয়ে হয়তো আলোচনা করা সম্ভব হলো না, তবে যেটুকু তথ্য সামনে এসেছে সেগুলোকেই লেখার চেষ্টা করলাম এই প্রবন্ধে।

বিংশ শতাব্দীর ছয়ের দশক থেকে করিমপুরের সাহিত্যচর্চার একটা পরিবেশ গড়ে ওঠে। এই দশকের গোড়ার দিকেই ১৯৬২-তে কবি আশীষ সিংহ রায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘অগ্নিবীণা’ পত্রিকা। দুই দশক ধরে পত্রিকাটির নিয়মিত প্রকাশিত হয়। বেশ কিছু তরুণ কবি এই পত্রিকাটিকে কেন্দ্র করে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। তরুণ কবি কুমারেশ দে, প্রভাত ঘোষ থেকে শুরু করে বহু কবি এতে কলম ধরেন, যাঁদের অনেকেরই লেখা পরবর্তীকালের বহু নামিদামি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এভাবেই বাংলার ছোট কাগজের মানচিত্রে পত্রিকাটি সহজেই জায়গা করে নেয়। ১৯৬৮ সালে কার্তিক ভট্টাচার্যের উদ্যোগে ও তাঁরই সম্পাদনায় ‘খুশি’ পত্রিকা প্রকাশিত হয় করিমপুর থেকে। এটি একটি বার্ষিক পত্রিকা। ‘অগ্নিবীণা’র পাশাপাশি এই পত্রিকাটিও বেশ সাড়া ফেলে দেয়। কারণ এটি ছিল বিশেষত শিশু কিশোরদের উপযোগী পত্রিকা। তাদের উপযোগী ছড়া, কবিতা বা অন্যান্য রচনা এতে প্রকাশিত হত নিয়মিত। তবে বেশ কিছু বছর চলার পর দীর্ঘদিন এই পত্রিকাটি বন্ধ ছিল। তবে বর্তমানে আবার পত্রিকাটি নতুন করে প্রকাশের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এটা সত্যি খুশির খবর। তবে বর্তমানে শিশু-কিশোর উপযোগী লেখার পাশাপাশি যে কোনো বিষয়ধর্মী লেখাকে প্রাধান্য দেয়া হয়।

তবে সাতের দশকে লিটল ম্যাগাজিন চর্চা যেন এক লাফে অনেকটাই বেড়ে যায়। এর জন্য অবশ্য দায়ী আগের দশক। পূর্বোক্ত দুজন সম্পাদক করিমপুরের আশেপাশের তরুণদের মধ্যে লিট্ল ম্যাগাজিনের নেশা জাগিয়ে তুলেছিলেন। এই দশকের উল্লেখযোগ্য পত্র পত্রিকার কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই উল্লেখ করতে হবে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত কমলেশ চক্রবর্তীর ‘রং ও তুলি’ পত্রিকার কথা। নিয়মিত দশ বছর ধরে এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল। তারপর এর প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। করিমপুরের বুকে এই পত্রিকাই প্রথম লেখকদের সাম্মানিক দেওয়া শুরু করে, যা সত্যিই অভিনব। তাছাড়া এই পত্রিকার পক্ষ থেকেই প্রথম করিমপুরে নজরুল জয়ন্তী পালন করা হয় ও সাড়ম্বরে কবি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এপার বাংলা, ওপার বাংলার বহু কবি এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। এই অভিনব উদ্যোগ ইতোপূর্বে কোন পত্রিকা তরফ থেকে নেওয়া হয়নি। সমকালীন সময়ের আর এক পত্রিকাও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। পত্রিকাটির নাম ‘স্বাতী’।এর সম্পাদক ছিলেন প্রয়াত কবি ও গীতিকার গণেশ মন্ডল। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে এই পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছিল। এই পত্রিকাটি হাত ধরে কিছু উল্লেখযোগ্য কাজও হয়েছিল। এই দশকেই আরো বেশ কিছু পত্রিকা প্রকাশিত হত করিমপুর এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে।

১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল মাসিক ‘জলঙ্গী’ পত্রিকা পলাশীপাড়া থেকে। এই পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন চিন্ময় দত্ত বিশ্বাস। ১৯৭৬ সালে নাজিরপুর থেকে প্রকাশিত হয় নিখিল সরকার সম্পাদক মাসিক পত্রিকা ‘রেডিয়াম’। আবার ১৯৭৬ সালেই অমল সরকারের সম্পাদনায় করিমপুর থেকে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ‘চাষীভাই’ নামক পত্রিকা। সম্পাদকের মৃত্যু হলে পরবর্তীকালে তাঁর পুত্র অজয় সরকারের সুযোগ্য সম্পাদনায় পত্রিকাটি পুনরায় প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৭৭ সালে শ্যামল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অভিযাত্রী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল করিমপুর থেকে। এটি একটি মাসিক পত্রিকা ছিল। এই পত্রিকাটির হাত ধরে বেশ কিছু তরুণ তুর্কি উঠে এসেছিল। বাংলা সাহিত্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে তাঁরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল। তাছাড়া সাতের দশকেই আরো কয়েকটি পত্রিকা এদের পাশে স্থান করে নিয়েছিল তাদের প্রত্যেকটিই করিমপুর থেকে প্রকাশিত হত। যেমন — কমলেশ চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘হেমা’ (১৯৭৭), এটি একটি পাক্ষিক পত্রিকা। তাছাড়া ‘গ্রহান্তর’, ‘মাটির কথা’, ‘সন্ধ্যাতারা’, ‘জ্ঞানমঞ্জুরী’ (প্রভাত ঘোষের সম্পাদনায়), ‘রঞ্জিকা’, ‘বি এম সি’ পত্রিকা (১৯৭৬, সম্পাদক-অম্লান চৌধুরী, মাসিক পত্রিকা), ‘হোমানল’ (১৯৭৬, সম্পাদক-অম্লান চৌধুরী ও প্রদীপ চৌধুরী, ত্রৈমাসিক পত্রিকা) প্রভৃতি।

১৯৭৯ সালে এস আবুল হোসেন সম্পাদিত ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘প্রিয়জন’ পত্রিকাটিও এই দশকের উল্লেখযোগ্য পত্রিকা। বিংশ শতকের ৭ এর দশক তেহট্ট মহকুমার লিটিল ম্যাগাজিনের ইতিহাসকে স্বর্ণযুগ বললেও অত্যুক্তি হবে না। এই স্বর্ণযুগ খেতাবটি শুধুমাত্র সংখ্যার দিক থেকেই নয়, এই দশকে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ হয়েছিল পত্র-পত্র গুলিকে কেন্দ্র করে। এদিক থেকে এমন উক্তি যথার্থই যুক্তিসঙ্গত। [ক্রমশ]
সকলে পড়ে দেখুন,পড়ে মতামত দেবেন।