পুরীর চিত্রকরদের মধ্যে তিনটি শ্রেণী বা ‘বাড়হ’ আছে। মন্দিরে জগন্নাথ, বলরাম বা সুভদ্রার সেবার দায়িত্ব পড়ে বংশপরম্পরায়। কে কোন দেবতার সেবায় নিযুক্ত, সেই অধিকার অনুযায়ী চিত্রকরদের মধ্যে তিন বিগ্রহের নামে তিনটি শ্রেণী আছে। চিত্রকররা নিজেদের সামাজিক পরিচয় দেবার সময় নিজের ‘বাড়হ’ বা শ্রেণীর নাম উল্লেখ করেন। তবে তিনটি ‘বাড়হ’র মধ্যে বিবাহসম্পর্ক স্থাপনে কোন বাধা থাকে না।
রঘুরাজপুরের মহারাণাপল্লীর শিল্প ইতিহাস রয়ে গেছে বয়স্কদের সযত্ন স্মৃতি আর বংশপরম্পরা শুনে আসা কাহিনীতে। পূর্বসূরীদের হাতের কাজ শিল্পীদের ঘরে আঁতিপাতি করে খুঁজলেও আর মিলবে না। তবে প্রাচীন নমস্য শিল্পীদের হাতের কাজের দু-চারটে নমুনা এখনও মিলেয়ে যায়নি বোধহয় পুরীর মঠমন্দিরের দেওয়াল থেকে। ইংরেজ আমলের শেষদিকে হাতেগড়া পটচিত্রের বাজার হয়ে পড়েছিল অসম্ভব মন্দা। তাই শুধু বেঁচে থাকবার তাগিদে সেসময় মামুলী কাগজ কয়েকটা পুরু করে সেঁটে তাতে রঙ ধরিয়ে জলদি হাতের টানে রঙ, পরে রজন বার্নিশ চাপিয়ে শিল্পীদের ছুটতে হত বাজারে। অভাবের তাড়নায় অনেক শিল্পী সে যুগে জাতব্যবসা ছেড়ে অর্থ উপার্জনের অন্য রাস্তায় পা বাড়িয়েছিলেন। অনেকে হয়েছিলেন দেশান্তরী। আবার কেউ যে হাতে রঙ তুলির সূক্ষ্ম কারুকাজ করতেন, সেই হাতেই তুলে নিলেন ইমারত কালি করার বুরুশ। রাজমিস্ত্রী, কাঠের কাজ, দোকানদারি এমনকি যাত্রার দল ও পেশাদার নাচিয়েদেরও সঙ্গী হল বহুজন।

একালে দেশবিদেশের সমঝদারেরা ছুটে আসে রঘুরাজপুরে পটচিত্রের খোঁজে। প্রায়ই দেখা যায় চন্দনপুর থেকে রঘুরাজপুরের পথে ধুলোর মেঘ উড়িয়ে চলেছে পর্যটকদের গাড়ি। বিদেশী পর্যটকরাও মাঝেমধ্যে চলে আসেন ভার্গবীতীরে নারকেল গাছের ছায়ায় লালিত এই গ্রামটিতে। সমঝদারজন রঘুরাজপুরে পা দিয়েই খোঁজ করে প্রবীণ শিল্পী জগন্নাথ মহাপাত্রের ঘরের ঠিকানা। হৃতগৌরব ফিরিয়ে এনে পুরীর পটচিত্রকে আবার নতুন উদ্যমে ঘরে ঘরে শুরু করাতে জগন্নাথ মহাপাত্রের অবদান অনস্বীকার্য।
রঘুরাজপুরের বাসিন্দারা গর্বের সঙ্গে তাঁদের গ্রামের পরিচয় দেন। কেন না, জগন্নাথ মহাপাত্রের নাম শুধু পুরী, ভুবনেশ্বর বা ওড়িশাতেই নয়, সারা ভারতে সেরা কারুশিল্পীদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৭৫ সালে এই পটচিত্রের শিল্পী হিসেবেই তিনি রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার পেয়েছিলেন। এ গ্রামের সে আমলের আরো অনেকের মতো কেলুচরণ মহাপাত্র বালক বয়সে আকৃষ্ট হয়েছিলেন পুরীর নট এবং দেবদাসী বা মাহারীদের নাচেগানে। কম বয়সেই ‘গোতিপুয়া’ বা বালক নটের দলে যোগ দিয়ে নাচে তালিম পেয়েছিলেন তিনি সেরা গুরুদের কাছে।

রঘুরাজপুরে পটচিত্রকরদের পাড়ায় চিত্রশিল্পের পাশাপাশি নাচ গান অভিনয়েরও পালা চলে। পটচিত্রকর জগন্নাথ মহাপাত্র কিশোর বয়সে পুরীর মোহনসুন্দর দেবগোস্বামীর রাসলীলার নাচের দলে ছিলেন কিছুদিন। গুরু মোহনসুন্দরের রাসলীলার পালার দল ছিল পুরোপুরি পেশাদার। পালার বায়না আসতো অনেক দূর থেকেও। শৈশব পেরোতে না পেরোতেই ওস্তাদ পটচিত্রকর বহমালী মহাপাত্রর একমাত্র পুত্র জগন্নাথকে উপার্জনের আশায় ঘর ছাড়তে হয়েছিল। মহাজনের কাছে ঋণের দায়ে হঠাৎ একদিন নিলাম হয়ে যায় পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি। গ্রামের অন্য সব শিল্পীদের মতো কিশোর জগন্নাথের বাবা বনমালী মহাপাত্রও শেষদিকে গড়তেন শুধু নানা বেশের জগন্নাথপট। পরিবারের সবাই মিলে দিনরাত পরিশ্রম করে যে কটা পট তৈরি হতো, পুরীতে বেচতে পারলেও তাতে মজুরীটুকু পুরোপুরি উঠতো না। এহেন সংকট-সময়ে কিশোরবয়সী জগন্নাথ রাসলীলার পেশাদার পালাগানের দলে ঢুকে বাঁচিয়ে ছিলেন তাঁদের সংসার। চৈত্রমাসে পুরীজেলার অনেক গ্রামে ‘সাহীযাত্রা’র মুখোশ নাচের আসর বসে। সেখানে ডাক পড়ত কিশোর নট জগন্নাথের।
প্রায় সাত দশক আগেকার কথা। জগন্নাথ মহাপাত্র তখন যুবক। রঘুরাজপুরে সে সময়ে প্রায় পঁচিশঘর শিল্পীর জীবনে শুধু হতাশার সঙ্গে দিনগুজরান চলছে। শিল্পীঘরের লোকজনদের বিশেষ কায়িক শ্রমে অভ্যাস থাকে না। তাই শিল্পের সরঞ্জাম শিকেয় তুলে রেখে যারা শ্রমিকের কাজে গিয়েছিল দূরে, তাদের অনেকেই কাজ ছেড়ে বিধ্বস্ত অবস্থায় ফিরে এসেছে ঘরে। ঠিক সেই সময়েই শুরু হলো আর এক উদ্যোগ।

১৯৫২ সালে সম্বলপুর জেলার বড়পল্লীর এক মিশনারী সেবাপ্রতিষ্ঠান ‘আমেরিকান ফ্রেণ্ডস সার্ভিস কমিটি’র পরিচালক ফিলিপ জেলির ইচ্ছা ছিল পুরীতেই তাঁদের কাজকর্ম প্রসারিত করার। ফিলিপ জেলির স্ত্রী হেলিনা এসময়ে সমুদ্রের আকর্ষণে কয়েকদিনের জন্য পুরী বেড়াতে এলেন। পুরীতে হেলিনা বিস্মিত হলেন ওড়িশী পট দেখে। যোগাযোগ করলেন শিল্পীদের সঙ্গে। রঘুরাজপুরে এসে শিল্পীদের কাজ দেখলেন, শুনলেন সমস্যার কথা। ভালভাবে পরিচিত হতে কিছুদিন কাটল। হেলিনা চাইলেন দেশে বিদেশে প্রচার হোক পটশিল্পের। তারপর শুরু হলো আর এক অধ্যায়।
হেলিনা জেলি চিত্রকরদের বাছাই করা পট নিয়ে প্রদর্শনী করেছিলেন প্রথমে পুরী, পরে ওড়িশার অন্যত্র এবং কলকাতায়। ১৯৫৪ সালে পুরীতে হস্তশিল্প কেন্দ্র গড়ে ওঠার পেছনেও হেলিনার উদ্যোগ ছিল। সঙ্গে যোগ হয়েছিল সরকারী সহায়তা। স্বাধীনতার প্রায় এক দশক পরে পুরীর ঐতিহ্যমণ্ডিত পটশিল্প এভাবে ক্রমশ সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেতে শুরু করে। দেশে বিদেশে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের প্রদর্শনী এবং দোকানে পটচিত্র হয়ে দাঁড়ায় সমঝদারদের আকর্ষণ।
পঞ্চাশের দশকে যে গ্রামে কুড়ি পঁচিশঘর পটচিত্র শিল্পী নিরাশায় দিনগুজরান করতেন, সেখানে এখন কাজের আবহাওয়া ফিরে এসেছে। যদিও করোনা কালে তা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল। শিল্পীদের সংখ্যাও সেসময়ের তুলনায় আজ অনেক গুণ বেড়েছে। হেলিনার পৃষ্ঠপোষকতায় যে সব শিল্পী মরিয়া হয়ে এগিয়ে এসেছিলেন তাঁরা শুধু পথপ্রদর্শক বলেই নয়, দক্ষতার বিচারে খ্যাতিমান হয়েছিলেন। ১৯৬৫ তে জগন্নাথ মহাপাত্রের পুরস্কারপ্রাপ্তি পুরীশৈলীর পটচিত্র শিল্পীদের কাছে বড় ঘটনা।
১৯৬৯ সালে মস্কোয় আয়োজিত ভারতীয় হস্তশিল্পের প্রদর্শনীতে যোগদান করেছিলেন জগন্নাথবাবু। পরে তাঁর এক ছাত্র শরৎকুমার সাহু এধরনের সরকারী প্রদর্শনীতে অংশ নিতে যান লন্ডনে। রঘুনাথপুরের বেশ কয়েকজন শিল্পীর ঘরে জমা রয়েছে নানা জায়গায় শিল্পপ্রদর্শনীতে কৃতিত্বের অভিজ্ঞানপত্র। ১৯৮২ সালে জাতীয় স্তরে হস্তশিল্পের সেরা সম্মান পেয়েছিলেন পটচিত্রকর বনমালী মহাপাত্র।
রঘুরাজপুরের মহারাণা বংশীয় শিল্পীরা পুরী শৈলীর পটচিত্রকর বলে পরিচিত। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা যায় যে এঁদের মধ্যে কয়েক ঘর ওড়িষার অন্যান্য অঞ্চল থেকে কয়েক পুরুষ আগে ভাগ্যসন্ধানে চলে এসেছিলেন রঘুরাজপুরে।

পুরীজেলার মধ্যে পটচিত্রকরদের বাস বেশি রঘুরাজপুরে আর পুরী শহরের চিত্রকরসাহী, দণ্ডসাহী এবং আরো দু একটা মহল্লায়। পুরী ছাড়াও ওড়িষার অন্যত্র পটচিত্রকরদের বড় গ্রাম বা পাড়া রয়েছে গঞ্জাম জেলার পারলাঘেমণ্ডি, জয়পুর এবং মথুরা গ্রামগুলিতে। ঢেংকানল টাউনের কাছে দীনবন্ধুপুর, মানপুর, রাজাআটগা, সুবর্ণপুর গ্রামের পটচিত্রের সঙ্গে পুরীশৈলীর বিষয়বস্তু প্রায় একই, সামান্য কিছু অমিল আছে অঙ্কনশৈলীতে। কেওনঝাড়গড় শহরের প্রাচীন জগন্নাথমন্দির এবং রাজবাড়ি সংলগ্ন পাড়ায় কয়েকঘর পটচিত্রকর এখনও পটচিত্র গড়েন। সর্বত্রই শিল্পীদের কাজে দুটি স্বতন্ত্র ধারা পাশাপাশি প্রবহমান।
রঘুরাজপুর এবং পুরীর প্রায় সব শিল্পীই সাবেকী পদ্ধতি মেনে পটের জন্য জমি গড়েন। রঙ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রাচীন পদ্ধতি প্রাধান্য পায়। পটচিত্রের জমি তৈরিতে চাই সুতীর কাপড়। মন্দিরে বা অন্যত্র পুজোর কাজে লাগবে এমন পটের জন্য চাই নতুন কোরা কাপড়। অন্য ক্ষেত্রে পুরনো ব্যবহার করা কাপড়েই কাজ করা হয় বেশী। তেঁতুল বিচ গুঁড়িয়ে তৈরী আঠার সঙ্গে খড়িপাথরের গুঁড়ো গুলে তিন চার টুকরো কাপড়ে মাখিয়ে কাগড়গুলো একটা অন্যর ওপর জুড়ে দেওয়া হয়। জোড়া কাপড় শুকোলে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব। এবার শুকিয়ে কুঁচকে যাওয়া কাপড়ের পট প্রশস্ত শিল বা ‘বগড়া’ পাথরে ফেলে নোড়া জাতীয় ‘মুগুনি’ পাথর ঘসে মসৃণ ও একপ্রস্ত পালিশ করা হয় পটের উভয় দিক। একদিকে পটের জমি তৈরী যখন চলে, পাশাপাশি চলে রঙ তৈরির কাজ। সনাতন পদ্ধতিতে রঙ তৈরী সময়সাপেক্ষ কাজ। বাজারে পসরা ফেললেই রঙ পাওয়া যায়। কিন্তু সেসব শিল্পীদের না-পসন্দ। সাবেকী নিয়মে তাই পাথর, মাটি, খনিজ বা লতাপাতা থেকে রঙ তৈরী করে নেন শিল্পীরা। বয়স্ক শিল্পীদের স্মরণ আছে ইংরাজ আমলে ভার্গবী বা কাঞ্জী নদীর মোহনায় সওদাগরদের জাহাজ এসে নোঙর করত। ব্যাপারী বেনিয়াদের দল জাহাজ থেকে ছোটছোট পানসিতে উজান বয়ে এসে উঠত দুদিকের গ্রামে। দূরদেশ থেকে তারা নিয়ে আসত নানান পসরা। থাকত সরেস দামী পাথুরে রঙ। পাথুরে রঙ ভিজিয়ে শিলে দীর্ঘসময় বারবার ঘষে এক একটি রঙ শেষে বাটা চন্দনের থেকেও বহুগুণ বেশি মিহি করতে বেশ কিছুদিন কেটে যায়। এসব ছাড়া কাজল কালো রং তৈরী হয় ভুসোকালি থেকে, দুধসাদা বর্ণ আসে শঙ্খচূর্ণ ফুটিয়ে। পটচিত্র ব্যবহারের সময় রঙের সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণ বেলের আঠা বা অন্য ধরনের আঠা মেশান শিল্পীরা। পরে রঙ লাগাতে সূক্ষ্ম থেকে মোটা বিভিন্ন মাপের তুলি শিল্পীরা তৈরী করে নেন মেঠো ইঁদুরের কোমল লোম থেকে। কেয়াগাছের মূল থেকেও এ গ্রামের শিল্পীরা এককালে তুলি তৈরি করে নিতেন।
তৈরি পটের জমিতে প্রথমে হাল্কা রঙে পটচিত্রের ফ্রেমটুকু এঁকে নেওয়া হয়, একই সঙ্গে মূর্তিরচনার কাজও চলে রেখাচিত্রে। পরে জায়গামত প্রয়োজনীয় রঙ ফেলে ভরাটের কাজ। ওড়িশী পটচিত্রের চারদিকে টানা মোটা ফ্রেম জুড়ে থাকে ফুলপাতা ও নানা ধরনের নকশা। (চলবে)