সেকালের মতো এখনও পুরী পটচিত্রের প্রিয় বিষয় জগন্নাথ মন্দিরের ত্রিমূর্তি এবং কৃষ্ণলীলা। বিভিন্ন তিথি এবং উৎসবে জগন্নাথমন্দিরের বিগ্রহের বেশ এবং সাজের পরিবর্তন হয়। পটচিত্রে ত্রিমূর্তির যেসব বেশ দেখা যায় তার মধ্যে রঙের প্রয়োগও সঠিক হতে হয়। বাঁকাচুড়া বেশে বিগ্রহের কেশ থাকে কুঞ্চিত, থিয়া কেয়া বেশে মূর্তির সাজ হয় কেয়া ফুল দিয়ে, এছাড়াও আছে গজ উদ্ধারণ বেশ, পদ্মবেশ, রাজ-রাজেশ্বর বেশ, রাজা বেশ, রাধাদামোদর বেশ, কালীয়দমন বেশ, বাণভোজি বেশ, সোনা বেশ, কৃষ্ণবলরাম এবং গজানন বেশ।
কৃষ্ণলীলাবিষয়ক পটে কৃষ্ণের জন্ম, পুতানা বধের কাহিনীচিত্রের চেয়ে শিল্পীদের আকর্ষণ বেশী ননীচোরা গোপাল, রাধাকৃষ্ণের যুগলমিলন ও বিহারের নানা দৃশ্য, কালীয়দমন, গিরিগোবর্ধন-ধারী কৃষ্ণ, গোপিনীদের বস্ত্রহরণ ও অন্যান্য ক্রীড়া, কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গণে কৃষ্ণ জাতীয় পটচিত্র রচনায়। পটচিত্রের বিষয়বস্তু বিচিত্র এবং বেশিরভাগই হিন্দু পুরাণ ও নানা ধর্মীয় কাহিনীর চিত্ররূপ। প্রাকৃতিক দৃশ্য, ফুলপাখি, ঘরবাড়ির আলাদা বা এককভাবে চিত্রণ প্রায় অনুপস্থিত হলেও পটচিত্রের মধ্যে চিত্ররচনাকে ব্যঞ্জনাময় করতে পরিপার্শ্বে এসব ছবি যথেষ্ট দেখা যায়। প্রধান সব হিন্দু দেবদেবী বা তাঁদের লীলাকথার ছবিই এককভাবে পটচিত্র আছে। রামায়ণ মহাভারতের আকর্ষণীয় অংশ নিয়ে অসংখ্য পট দেখা যায়। অযোধ্যার সিংহাসনে আসীন রাম, বামে সীতা, সঙ্গী ভরত ও হনুমানও আছে। দুপাশে চামর বাজনরত দাসদাসী, পাত্রমিত্র, লোকলস্কর। সব মিলিয়ে রাজসভার পরিবেশে একটা সময় থমকে আছে। হরধনুভঙ্গ, রাম রাবণের লড়াই, আগুন সাক্ষী রেখে রাম ও গুহকের মিলন, সেতুবন্ধন, বনবাসী ত্রয়ী, গণ্ডিবদ্ধ সীতার কাছে ভিক্ষাপাত্রধারী ছদ্মবেশী রাবণ, লবকুশ, রাক্ষসনগরী লঙ্কায় হনুমান — এসবই পটচিত্রকরদের কাছে আকর্ষণীয় বিষয়।

কন্দর্পরথ পটে পাঁচটি নারীশরীর মিলে রথের রূপ নিয়েছে। কামকুঞ্জর বা নরনারীকুঞ্জ পটে নয়টি নারী শরীর মিলে হাতির আকার। অর্ধনারীশ্বর বা রথযাত্রা পটে শিল্পীদের মুনশিয়ানা দেখার মতো।
সেকালের পটে দৃশ্য থাকত মোটামুটি একটাই। এযুগে যোগ হয়েছে নতুন রীতি। যে কোন দেবদেবীর লীলাকথা, রামায়ণ, মহাভারতের উপাখ্যানের বাছাই করা ধারাবাহিক দৃশ্যরূপ একই পটে পাওয়া যায় একালের শিল্পীদের কাজে। যেমন কৃষ্ণলীলার পূর্ণাঙ্গ পটচিত্রে পটের কেন্দ্রভাগে সবচেয়ে বেশি এলাকা জুড়ে থাকে রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তি। প্রধান মূর্তি ঘিরে চতুর্দিকে ছোটখাটো খোপ বা বৃত্তের নকশাদার পরিধি বা ফ্রেমের মধ্যে থাকে কৃষ্ণের জন্ম থেকে আমৃত্যু প্রধান সব ঘটনার একটি করে দৃশ্যরূপ। এধরনের পটচিত্রে বোঝা যায় দৃশ্যের বিন্যাসের ক্ষেত্রে শিল্পীদের কল্পনা বেশকিছুটা নতুনত্বের দিকে ঝুঁকেছে। আখ্যানভিত্তিক ছবিতে ধারাবাহিকতা, দৃশ্যান্তরের এমন সুষ্ঠু প্রয়োগ পটচিত্রের পাশাপাশি তসরচিত্রে এবং তালপাতা চিত্রণেও যোগ হয়েছে।
আশ্চর্যের কথা পুরীর সমাজ ও ইতিহাসে ষোড়শ শতাব্দীর পর থেকে চৈতন্যদেবের যে বিরাট প্রভাব পড়েছিল একালের পটচিত্রে তার তেমন স্থান প্রায় নেই। অন্যদিকে পুরীর গজপতি রাজাদের কীর্তি ও ইতিহাসের কিছু পটচিত্রে রাজাদের কীর্তি ও ইতিহাসের কিছু পটচিত্র জায়গা পেয়েছে। এরকমই একটি কাহিনী যা ‘কাঞ্চীকাবেরী যাত্রা’ বা ‘কাঞ্চীবিজয়’ নামে ওড়িশায় যুগে যুগে কাব্য সাহিত্য ও শিল্পে স্থান পেয়েছে। ওড়িশী শিল্পীদের কাছে পুরীর রাজা পুরুষোত্তমদেবের কাঞ্চী রাজ্য বিজয়ের কাহিনী যথেষ্ট প্রিয় বিষয়। তাই সেই উপাখ্যানের দৃশ্যাবলী দেখা যায় প্রাচীন মন্দিরের ভিত্তিচিত্র এবং পটচিত্রে।
কাঞ্চীকাবেরী কাব্যের মূলচরিত্র রাজা পুরুষোত্তমদের এক ঐতিহাসিক চরিত্র। জানা যায় তাঁর রাজত্বের কাল ছিল ১৪৬৭ থেকে ১৪৯৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। ১৪৮৯ সালে তিনি সসৈন্য যুদ্ধযাত্রা করে কাঞ্চীর রাজাকে পরাজিত করে তাঁর কন্যা রূপাম্বিকাকে হরণ করে আনেন। ঐতিহাসিক সত্যের পাশাপাশি কাব্যের রূপকারদের হাতে এ কাহিনী হয়েছে ভক্তি ও প্রেমরসে দ্রাব এবং নাটকীয়। কাঞ্চীকাবেরী গাথার দৃশ্যচিত্র পুরীর মূল দেউলের নাটমন্দিরের দেওয়ালে কোন প্রাচীনকালে আঁকা হয়েছিল, যা আজও রয়েছে কিছুটা পরিবর্তিতরূপে।

পুরীর গঙ্গামাতা মঠ
পুরীর গঙ্গামাতা মঠে ঢুকলে মঠের বৈঠকখানার দিকে তাকিয়ে অবাক না হয়ে উপায় নেই। ঘরের চার দেওয়াল, মাথার ওপরের ছাপ সর্বত্র ছবি আর অলঙ্করণে সমৃদ্ধ। জগন্নাথের ত্রিমূর্তি ছাড়াও দেওয়াল-জোড়া বিশাল ভিত্তিচিত্রের এক একটিতে রয়েছে বালকৃষ্ণ জঙ্গলে শিশুকৃষ্ণ ও তপস্যারত মুনি, নৃসিংহ অবতার, গোবর্ধন ও গোধন ও গোপী সঙ্গ কৃষ্ণ, রামচন্দ্রের অভিষেক, ঘোড়সওয়ার সেনানী। মঠের মোহন্তদের ছবি ও একটানা অলঙ্করণের আকর্ষণীয় কারুকাজ। গঙ্গামাতা মঠের সব ছবিই প্রাচীন, তাই কয়েক জায়গায় অস্পষ্ট হয়ে এসেছে কিন্তু সব ছবিতেই ওড়িশী রীতিটুকু স্পষ্ট।
এধরনের আরো আকর্ষণীয় ভিত্তিচিত্র রয়েছে বড় ওড়িয়া মঠে। বড় ওড়িয়া মঠের প্রতিষ্ঠাতা জগন্নাথ দাস রাজা প্রতাপরূদ্রদেব এবং চৈতন্যদেবের সমসাময়িক ছিলেন। বড় ওড়িয়া মঠের ছবির সংখ্যা অনেক। ত্রিমূর্তির ছবি ছাড়া রয়েছে কৃষ্ণের রাসলীলা, বৈষ্ণবদের নামগান, মোহন্তদের চিত্র, নৃসিংহ অবতার, গোপীদের বস্ত্রহরণ দৃশ্য, সমুদ্র মন্থনে দেবাসুরের দল আরো বহুকিছু।

নন্দনতাত্ত্বিক এম শেঠ এক প্রবন্ধে মন্তব্য করেছেন যে ওই দুই মঠের ভিত্তিচিত্র অঙ্কনের কাজে শুকনো দেওয়ালে গোলা রঙ লাগানো হয়েছিল। শিল্পশৈলীর বিচারে দুই মঠের ভিত্তিচিত্রই সম্ভবত উনবিংশ শতাব্দীতে করা। এরমধ্যে বড় ওড়িয়া মঠের কয়েকটি ছবিতে উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশের শিল্পের এবং গঙ্গামাতা মঠে যথাক্রমে মুঘল ও রাজপুতশৈলীর উপাদান রয়েছে। ও সি গাঙ্গুলীসহ অনেক শিল্পতাত্বিকেরই ধারণা ওড়িশার মঠে মন্দিরে ভিত্তিচিত্রের ধারা প্রাচীন ঐতিহাসিক কালে বিভিন্ন স্থানে আবিষ্কৃত গুহাচিত্রেরই উত্তরসুরী। ওড়িষার কেওনঝাড় জেলার সীতাবিনজি গুহায় দ্বাদশ শতাব্দীতে অঙ্কিত যে রাজকীয় শোভাযাত্রার দৃশ্য আবিষ্কৃত হয়েছে, বহু ঐতিহাসিকের মতে তা ওড়িশী শিল্পেরই আদি নিদর্শন।
ওড়িশার বহু প্রাচীন মন্দিরে মিথুন ভাস্কর্য আছে। পুরীর কাছাকাছি কোনার্কের সূর্যমন্দির ছাড়াও পুরীর মূল জগন্নাথ মন্দির বা বড়দেউলের বিভিন্ন স্থানে মিথুনমূর্তি যথেষ্ট সংখ্যক রয়েছে। একসময় অশ্লীলতার দায়ে চুন বালির আস্তরণ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল জগন্নাথ মন্দিরের বহু মিথুনমূর্তি। পুরীর মন্দির স্থপতিদের উত্তরসুরী শিল্পী ভাস্কর ও মহারাণাদের দৃঢ় বিশ্বাস — যে কোন বড় মন্দিরেই মিথুনমূর্তি খোদাই করতে হয় চূড়া বা খিলানের আশেপাশে। কেননা মিথুনমূর্তি থাকলে সে জায়গায় বাজ পড়ে না। তাই দেউলকে বজ্রনিরোধক করার প্রয়াস এটি।

রঘুনাথপুরে এক বয়স্ক শিল্পীর ঘরে রাখা আছে প্রাচীন এক পুঁথির নকল। সড়জাতের রাজা উপেন্দ্র ভঞ্জের রচনা চৌষট্টিটি ওড়িয়া শ্লোকে রয়েছে চৌষট্টি প্রকারের আসন বা মিথুনভঙ্গীর সচিত্র অনুপুঙ্খ বিবরণী। এ ধরনের প্রাচীন পুঁথি যাতে শিল্পের সচিত্র নির্দেশ রয়েছে, আছে পুরীজেলার কিছু পটশিল্পীর ঘরে।
লোকশিল্পের ক্ষেত্রে শিল্পীরা পূর্বসূরীদের কাছে হাতেনাতে দেখে ও শুনে শেখেন। লোকশিল্পীদের কাছে শিল্প সবসময় জীবিকা নাও হতে পারে। তবে কৃষিভিত্তিক সমাজই আদিতে লোকশিল্পের পৃষ্ঠপোশক। দরবারী শিল্পের চরিত্র এর থেকে কিছুটা আলাদা।
শিল্পের চর্চা, শিক্ষা বা শিল্পরীতি ক্রমশ ধরাবাঁধা লিখিত নিয়মে বাঁধা পড়ে, যার ফলে অনেকসময় আলাদা ঘরানা বা শৈলীর উদ্ভব ঘটে। রাজা বদলায়। যুগ পাল্টে যায়। দরবারী কাল অতিক্রান্ত। পটচিত্রকরদের রুজি যোগায় এখন তীর্থযাত্রীর দল, দেশ বিদেশের পর্যটক কিংবা সরকারি অনুদান। গত কয়েক দশকে রঘুরাজপুর এবং পুরীর পটচিত্রকরদের ঘরে আবার শুরু হয়েছে কাজ, নতুন উৎসাহে। যোগ হয়েছে নতুন মাধ্যম ও কিছু নতুন ধারা। কিন্তু বিষয়বস্তু, আর রীতি এখনও বহু শতাব্দীর পুরনো খাতেই বয়ে চলেছে। সেই স্রোতে টান শুধু বেড়েছে। শিল্পীদের ঘরে মেয়েপুরুষ মিলে যখন হেলাফেলার টানেটোনে গড়ে পুতুল বা পট, তখন সেই ধ্রুপদী শিল্পে মার্জিত হাতের তুলিতেই ঝলসে ওঠে সুন্দরের আর এক রূপ — লোকচিত্রের আদল।