সাগর খুব বেশি দূরে নয়। নিশুত রাতে দমকা হাওয়ার টানে রঘুরাজপুরে শোনা যায় সমুদ্রগর্জন। গ্রামের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে যে শীর্ণ স্রোতধারা, তা মিশেছে ক্রোশটাক দূরে সেই সমুদ্রেই। ভাঁটার টানে নদীর জল হয়ে ওঠে নোনতা। স্রোতসম্বল নদীর বুকে জেগে থাকা সফেদ মিহি বালির চরে মাঝেমধ্যে জমে থাকে উজানে ভেসে আসা সামুদ্রিক লতাগুল্ম আর ঝিনুকের স্তূপ। গ্রাম থেকে নদীর ধার বরাবর পায়ে চলা পথ এমনিতে বড় নির্জন। হাটবারে সেখানেই পাঁচ গ্রামের ভিড়। গ্রাম পেরিয়ে পথ মিলেছে নদীর সেতু বরাবর রেললাইনে। ভার্গবী নদীর সেতুর ঠিক প্রান্তটিতে ছোট স্টেশন জনকদেইপুর। লাইন পেরিয়ে খানিক এগোলে রাস্তা ঠেকেছে চন্দনপুরের হাটের সওদার ভিড়ে। চন্দনপুর হাটের মুখোখুমি হাইওয়ে। এপথে তীর্থযাত্রীদের আসা-যাওয়ার বিরাম নেই। যাত্রীভর্তি কত বাস ছুটে চলে দক্ষিণে। চন্দনপুর থেকে এ রাস্তা ধরে দুকদম এগোলেই দক্ষিণে ধানক্ষেত, নারকোল বাগিচার মাথা ছাড়িয়ে চোখে পড়বে জগন্নাথ মন্দিরের চুড়োয় ওড়া ধ্বজা। তীর্থশহর পুরী চন্দনপুর থেকে বাসরাস্তায় মাত্র আট কিলোমিটার পথ।
একদিকে যেমন রঘুরাজপুরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ভার্গবী নদী গিয়ে লীন হয়েছে পুরীর সমুদ্রে, তেমনি অন্যদিকে গ্রামের পথও গিয়ে মিলেছে ওই সমুদ্রশহরে। ভাগর্বীতে চলে জোয়ার ভাঁটার আসা-যাওয়া, পাশাপাশি গ্রামের লোকজনও প্রায় নিত্য যাওয়া-আগা করে পুরীতে। গ্রামের পসরা বিকোয় শহরের বাজারে। ব্যাপারীরা ফিরে আসে লাভের কড়ি গুণে আর সঙ্গে শহরের অভিজ্ঞতা নিয়ে।
বর্ণচোরা গ্রাম রঘুরাজপুর। নারকোল বাগিচার ঘেরাটোপের আড়ালে এখানে রঙ-রূপের নিত্য আয়োজন। আটপৌরে গ্রামজীবন, তবু মহারাণাদের পাড়ায় ঘরের চৌকাঠ পেরোলেই এ এক রঙীন জগৎ। বারোমাসই এপাড়ায় ঘরে ঘরে চলে পটগড়া বা চিত্রণের বিবিধ পর্ব।

প্রতিটি কুটিরই যেন এক-একটা চিত্রশালা। গৃহস্থালির দৈনন্দিনতা, মলিনতাকে আড়াল করে থাকে শিল্পের অঢেল সম্ভার। এক একটা চিত্রশালায় দেওয়াল জুড়ে মুখোশের সার ঘরের আলো-আঁধারিতে মায়াবী রূপ নেয়। তারই মধ্যে মেঝেতে ছড়িয়ে থাকে রঙগোলা পাত্র, বাঁশের দানিতে গোঁজা কত তুলি। মাথার ওপরে সিকে থেকে ঝোলে গুটিয়ে রাখা, তৈরি পটের বাণ্ডিল।ঘরে আলো যতটুকু আসে তাও ফাঁকফোকর গলে। কোণে কোণে বহুদিনের অন্ধকার যেন জমে থাকে। তাই গ্রীষ্মের দাবদাহে শিল্পীরা ঘর ছেড়ে ছবি আঁকার সরঞ্জাম গুছিয়ে বেছে নেয় কোন গাছতলার নিরালা ছায়াটুকু কিংবা গ্রামের রাধামোহন মন্দিরের চত্বর। গুরুবারে চিত্রশালার চৌকাঠ ভরে যায় লক্ষ্মীর পদচিহ্নে। দেওয়ালে ওঠে ধানের ছড়া, উঠোন জুড়ে পড়ে আল্পনা।
বর্ষাটুকু ঘরের চালের আড়ালে ভালোয় ভালোয় কাটিয়ে দিতে পারলে আশ্বিনের পূজোর পর থেকে সারা শীতকাল চিত্রকরদের পাড়ায় প্রতিটি উঠোন জুড়ে লেগে যায় কারিগরদের ব্যস্ততা। খড়িমাটির আস্তরণ দেওয়া পটের ওপর রেখে টেনে ফুটিয়ে তোলা হয় নকশা। পরে পটের ওপর রক্ষ লাগতেই স্পষ্ট হয় কাহিনীর সূত্রটুকু। রামায়ণ, মহাভারত, পূরাণ থেকে দেবদেবীদের লীলা, ইতিকথা নির্ভর করে তৈরী হয় রকমারি পট আর তার বহুবর্ণ চিত্ররূপ।
তৈরী পটচিত্রের ঝুলি কাঁথে নিয়ে শিল্পীরা যান পুরীর বাজারে। পুরুষানুক্রমে এই পথ ধরেই তাদের রুজিরোজগারের তাগিদে আসা-যাওয়া। জগন্নাথ মন্দির থেকে যে প্রশস্ত ‘বড়দাণ্ড’ রাজপথ গুণ্ডিচামন্দির পর্যন্ত বিস্তৃত, তারই দুধারে মনোহারী দোকানের সারি। পটচিত্রের কারিগরদের বড় মহাজন হল পুরীর হস্তশিল্পের বড় দোকানদারেরা। আগাম কথামত তারা পট নেয়, দাদন দেয়। কোনো মেলার সময় কিংবা কোনো তিথি উপলক্ষে যাত্রীর ভিড় যখন বাড়ে, শিল্পীরা আস্তানা গাড়ে বড়দাণ্ড পথের ধারে। বিকিকিনি চলে। পড়ন্ত বিকেলে অনেকে পট সাজিয়ে বসে যায় স্বর্গদ্বারের কাছে সাগরবেলায়।

এক সময় পটশিল্পের বাল বাজার ছিল এই পুরীতে। তীর্থযাত্রীর দল এককালে দর্শন সেরে ফেরার পথে কিনে নিয়ে যেত টুকিটাকি নিদর্শন। অন্যান্য হস্তশিল্পের সঙ্গে দেবদেবীর পট, বিশেষ করে জগন্নাথ মন্দিরের ত্রিমূর্তির পট কেনার আকর্ষণ ছিল বেশি। ছাপাই ছবি প্রচলনের আগের কথা এসব। তখন পূণ্যার্থীদের জন্য নিয়মিত প্রচুর পটের চাহিদা মেটাতে হত এই চিত্রকরদের। নানা জায়গায় যাত্রীদের পট কেনার সুবাদে পুরীর পটচিত্র পরিচিত হয়েছিল দেশের অন্যান্য অংশেও। এভাবে তীর্থশহর পুরীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল পটচিত্রকরদের রুজি রোজগার এবং তার পাশাপাশি ছিল শিল্পের উপযুক্ত পরিবেশ। পরে ছাপাই ছবি প্রবর্তনের এবং প্রচলনের ফলে পটশিল্পের টিকে থাকাই দায় হয়েছিল।
ভালো পটচিত্র গড়তে কমপক্ষে লাগে কয়েকপুরু কাপড়ের ক্যানভাস। শিল্পীরা অনেক সময় নিয়ে হাতে তৈরি রঙ দিয়ে সেই জমিতে সনাতনী ধারায় ফুটিয়ে তোলার দৃশ্যাবলী। এভাবে পট তৈরি করতে যা খরচ পড়ে, সামান্যতম মজুরীর লাভটুকু পেয়ে বিক্রি করলেও মিশিনে ছাপা বা লিথোছাপাই পটচিত্রের ছবির তুলনায় তার দাম পড়ে অনেক বেশি।নকল পট বা ছাপাই ছবি তাই প্রকৃত সমঝদারির অভাবে একসময় ছেয়ে গিয়েছিল বাজারে। সেই শুরু, একালেও সেই ছাপা ছবির রমরমা একইভাবে অব্যাহত। একারণে বিংশশতাব্দীর প্রথম দিক থেকেই পুরীর পটচিত্রীদের সামনে দেখা দিয়েছিল পটশিল্প এবং শিল্পীদের বেঁচে থাকার বড় কঠিন সমস্যা।
পটচিত্রশিল্প পুরীর চিত্রকরগোষ্ঠীর একান্ত নিজস্ব জাত পেশা। শুধু পেশা নয়, সৃষ্টির নেশাটিও লক্ষ করা যায় গুণী শিল্পীদের হাতের কারুকাজে। শুধু বিষয়বৈচিত্র্যই নয়, নান্দনিক দিক থেকেও সেসব পটচিত্র অনুপম সৃষ্টি।
পুরী শহরের চৌহদ্দির বাইরে এ জেলার পটচিত্রকরদের সবচেয়ে বড় বসতি ভার্গবী নদীর তীরে রঘুরাজপুর গ্রামে। পুরী শহরেও কয়েকঘর পটচিত্রী আছেন। বারবাটি জগ মন্দিরের কাছে হরচণ্ডীসাই, বালিসাহি এবং স্বর্গদ্বার থেকে মন্দির আসা-যাওয়ার পথের ধারে কেউ কেউ পাকাপাকিভাবে দোকান সাজিয়ে বসেছেন।

পুরীর জগন্নাথমন্দিরে বিগ্রহ সেবার ভার রয়েছে ছত্রিশটি কাজের জন্য পারদর্শী সেবাদাসের দলের ওপর। এরমধ্যে মহরাণা পদবীধারী সেবকরা সবাই কারিগর গোষ্ঠীভুক্ত। মহারাণা পদবীধারীদের মধ্যেও কুলগত বৃত্তির ধরন অনুযায়ী ভাগ আছে। পাথুরিয়া মহারাণারা হ’ল মন্দির স্থপতি ও পাথরখোদাইকার ভাস্কর, কর্মকারের বৃত্তিধারীরা কামার মহারাণা। এভাবে কাঁসার কারিগর বা কংসারি মহারাণা, রূপকার মহারাণা, করতি মহারাণা, সিপুটি মহারাণা, কাচরা মহারাণা এবং চিত্রকর মহারাণাদের প্রত্যেকেরই নির্দিষ্ট বৃত্তি। জগন্নাথমন্দিরের সেবায় নিযুক্ত সব বৃত্তির মহারাণাদেরই মন্দিরে আগে সেবার সুযোগ ছিল বংশানুক্রমে। মন্দিরে সংরক্ষিত কয়েক শতাব্দী আগেকার ‘মাদলা পাঞ্জী’ বা দিন নির্ঘন্টতেও দেখা যায় বহু যুগ ধরে চিত্রকরেরা পুরী মন্দিরের সেবক হিসেবে আছেন। তাদের কাজ নির্দিষ্ট ছিল প্রধানত বিগ্রহের অঙ্গরাগ করা। গ্রায় বারো বছর অন্তর যে নরকলেবর উৎসব হয় সেসময় নতুন বিগ্রহের রূপদান করার যাবতীয় কাজের দায়িত্ব পড়ত চিত্রকর মহারাণাগোষ্ঠীর প্রধান শিল্পীর ওপর। প্রাচীন প্রথা মেনে রথযাত্রার সময় জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার তিনটি রথকে রঙ করা, রথের চারিদেকে বিভিন্ন নকশা এবং বিভিন্ন মূর্তি দিয়ে সাজানোর কাজ এখনও চিত্রকরদের দলই করে।
অন্যান্য সেবকদের মতো চিত্রকদেও মন্দিরে নিযুক্ত করেন ‘পাটযোষী মহাপাত্র’ উপাধিকারী মন্দিরে কর্মী নিয়োগকারী।
দেবসেবার উদ্দেশ্য নিয়ে আসা চিত্রকরদের পাটযোষী মহাপাত্র বাছাইয়ের পরে নির্দিষ্ট দিনে মন্দিরে আসতে বলেন। এরপর সেবকরা মন্দিরে গর্ভগৃহে ‘সারিবন্ধা’ অনুষ্ঠানে পূজার শেষে নিজেকে উৎসর্গ করে বিগ্রহের কাছে। ‘সারিবন্ধা’ না হওয়া পর্যন্ত জগন্নাথমন্দিরে সেবক হবার অধিকার সাধারণত কেউ পায় না।