ভারতবর্ষে আধুনিক অর্থে সুদূরপ্রসারী রাজপথের (হাইওয়ে) উদ্বোধন করেন শেরশাহ। পেশোয়ার থেকে শুরু করে পাঞ্জাব, দিল্লি, বর্তমান উত্তরপ্রদেশও বিহারের মধ্য দিয়ে শেরশাহের তৈরি গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড এ দিকে এসে শেষ হয়েছে ফলতার বন্দরে। অন্য একটি শাখা পাটনা থেকে চলে গিয়েছে ঢাকায়। গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের মূল অংশ চাঁপদানি ঘাট পর্যন্ত এসে গঙ্গা পেরিয়ে আবার শুরু হয়েছিল আজকের বারাকপুরের নবাবগঞ্জ ঘাট থেকে। আরও এগিয়ে চিড়িয়ার মোড় হয়ে তা বর্তমান সাব রেজিস্ট্রি অফিসের পাশ দিয়ে গ্র্যান্ড ট্র্যাঙ্ক রোড নাম নিয়েই প্রচলিত ছিল ইংরেজ আমলের প্রথম দিক পর্যন্ত। এ দিক থেকে কলকাতা যাওয়ার এটাই ছিল প্রচলিত রাস্তা। ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে চালু হয় বারাকপুর ট্রাঙ্ক রোড। ফলে এ অংশের গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড ওরফে ক্যালকাটা রোডের গুরুত্ব কমে গেলেও ওই সময় থেকেই নতুন নামকরণ হয় ওল্ড ক্যালকাটা রোড। প্রাচীন কলকাতার কালী তীর্থ আর ফলতার বাণিজ্য বন্দর, এ দুয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় সম্ভবত পূর্বাঞ্চলের গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের শেষ অংশের সৃষ্টি হয়েছিল আলোচ্য পথের রেখা ধরে।
কলকাতা আছে কলকাতাতেই। কিন্তু তার জীবন রেখার উৎস দূর-দূরান্তের গ্রামে-গঞ্জে। তার হিসেব আমরা তেমন রাখি না। কলকাতার পতন উত্থান আর তার সৌন্দর্য ও কালিমা,কামনা-বাসনা সবই জড়িয়ে আছে চারিদিকের বাইরের পরিবেশ নিয়ে। নানা পথ। মহানগরীর বুকে হয় এ সবের আনাগোনা। যেমন হতো তিনশো বছর আগে জব চার্ণকের আমলে। কিন্তু তার পূর্বেও কলকাতার অস্তিত্ব ছিল। তার বাইরের গ্রাম-গঞ্জ থেকে এখানে যাতায়াতের একটা স্থায়ী বন্দ্যোবস্ত সে আমলেই করা হয়েছিল। এমনই যোগাযোগ রক্ষার একটি প্রাচীন সড়ক আজও কলকাতার কাছেই তার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বারাকপুর শহরে। নাম তার ওল্ড ক্যালকাটা রোড। এ নাম শুনে অনেক কলকাতাবাসী হয়তো আঁতকে উঠে বলবেন — সে কী কলকাতার নামে তো কলকাতাতেও কোনও পথ বা স্টেশন ছিল না বছর ২০ আগেও। তবে বাকাকপুর কিন্তু বহু কাল ধরেই এই গৌরবের অধিকারী।

বারাকপুর স্মরণ করিয়ে দেয় ইংরেজ শাসনের গোড়াপত্তনের অনেক কথা। কোম্পানি আমলে এখানে ছাড়নি স্থাপিত হয়েছিল ১৭৭০ সালে। দেশের অন্যান্য জায়গায় এমন আরও ছাউনি স্থাপন করা হয়েছিল যাতে সঙ্কট মুহূর্তে যে কোনও জায়গায় অবিলম্বে সৈন্য পাঠানো সম্ভব হয়। সিপাহী বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল মিরাট ছাউনিতে ১৫.৫.১৮৫৭ তারিখে। বিদ্রোহের বাণী গোপন ও সাঙ্কেতিক মার্গে অচিরে পৌঁছে গিয়েছিল অন্যান্য ছাউনিতে। মঙ্গল পান্ডে বারাকপুর ছাউনিতেই মিরাট বিদ্রোহের আগে একদিন বন্দুক নিয়ে অকর্কিতে ইংরেজ অফিসারদের উপর আক্রমণ চালিয়ে পূর্বাঞ্চলে বিদ্রোহের আভাসের সূচনা করে আহ্বান করেছিলেন অন্যান্য সহকর্মীদের স্বাধীনতা সংগ্রামে শরিক হওয়ার জন্য। কেউ তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয়নি। বরং দেশিয় সিপাহীদের সাহায্যেই তাঁকে পর্যুদস্ত করে নিরস্ত্র করা হয় ও তাৎক্ষণিক বিচারে মঙ্গল পাণ্ডের ফাঁসি হয়ে যায় ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ।
সাধারণভাবে আমাদের একটা ধারণা আসে সিপাহী ব্যারাক থেকে এ জায়গার নামকরণ হয় বারাকপুর। কিন্তু তা ভ্রান্ত। ইংরেজ শাসনের পূর্বে এ অঞ্চলের নাম ছিল বারবাকপুর তার উল্লেখ রয়েছে আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরি গ্রন্থে। ১৭৭৬ সালে ইংরেজরা তার নাম দিল বারাকপুর। হতে পারে তাদের উচ্চারণের সুবিধার জন্য এমন নামকরণ। তারও আগে এ অঞ্চলের নাম ছিল চানক গ্রাম। চানক গ্রামের একাংশে কোম্পানি আমলে গভর্নর জেনারেলের জন্য স্থাপিত হয়েছিল এক বাগানবাড়ি। আজও সে জায়গাটি লাটবাগান নামে পরিচিত। চানক নামের সঙ্গে জব চার্নকের কোনও সম্বন্ধ নেই। কস্মিনকালেও জব চার্নক এ অঞ্চলে বসবাস করতে আসেননি। অথচ অনেকেই আবার জব চার্নকের সঙ্গে চানক মৌজার সম্পর্ক খুঁজে বের করতে চেষ্টা করেন। অদ্যাবধি বারাকপুর অঞ্চলের দলিলপত্রে সিংহভাগ অংশকেই চানক মৌজান্তর্গত বলে উল্লেখ করা হয়। এখনও অনেক প্রাচীন পাকা বাড়ির গায়ে লাগানো ফলকে ঠিকানা হিসেবে লক্ষ্য করা যাবে চানক — ৩৪ বা অন্য কোনও সংখ্যা। চানক গ্রামের একাংশে বর্তমানের লাটবাগান এক সময় এখানকার প্রাচীন ঐতিহ্যবাসী ঘোষ পরিবারের ভদ্রাসন ছিল। শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থেও এ গ্রামের উল্লেখ আছে। মহাপ্রভু একবার চানকের ঘোষ পরিবারে পদার্পণ করেছিলেন। তার বর্ণনা — “চনৌকে আইলেন প্রভু ঘোষের বাড়ীতে।” তা ছাড়াও সমসাময়িককালে রচিত বিপ্রদাসের মনসামঙ্গল পুঁথিতেও চনৌক গ্রামের উল্লেখ রয়েছে। জব চার্নক তো তার অনেক পরে স্থায়ীভাবে কোম্পানির ডিরেক্টরের পদ পেয়ে সুতানুটির নিমতলায় অবতরণ করেছিলেন। দিনটি ছিল ১৬৯০ সালের ২৪ আগস্ট।

আমাদের আলোচ্য বিষয় ওল্ড ক্যালকাটা রোড — এ নামের সূত্র সন্ধান। তাই ফিরে আসা যাক সেই প্রসঙ্গে। কালীঘাট বহু বছর ধরে পরম আকাঙ্ক্ষিত তীর্থস্থান রূপে পরিগণিত। দূর দূরান্তের পূণ্যার্থী মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ধূলি ধূসর অতীতের জল-জঙ্গল পরিবেষ্টিত দস্যু আকীর্ণ পথ ধরে চৌরঙ্গীনাথের মন্দিরের পাশ দিয়ে হেঁটে গেছে কালীঘাটের মাতৃদর্শনে। কালীঘাটের এ গুরুত্ব বিচারেই সুদূর অতীত থেকে প্রাচীন কলকাতার সঙ্গে গড়ে উঠেছিল যোগাযোগের সড়ক। ওল্ড ক্যালকাটা রোড তেমন একটি রাস্তারই ভগ্নাংশ। প্রাচীন এ সড়কটির যে পরিচয় লভ্য, তা থেকেই এ অনুমান।
রাস্তাটি আদিতে ছিল গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের সম্প্রসারিত পথ। গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে চাঁপদানি ঘাটে পৌঁছে গঙ্গা পারাপারের ব্যবস্থা ছিল নৌকাতে। এ পাড়ে তা এসে পৌঁছত নবাবগঞ্জ ঘাটে, যা পলতা ঘাট নামেও পরিচিত ছিল। ওখান থেকে বারাকপুর ছাউনি পর্যন্ত এসে নর্থ গেট হয়ে বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি রোড ধরে চিড়িয়া মোড় হয়ে বর্তমান বি টি রোড ধরে সাব রেজিস্ট্রি অফিসের পাশ দিয়ে রাস্তার মুখে পৌঁছলে শুরু ওল্ড ক্যালকাটা রোড। তা চৌদ্দ নম্বর রেল গেট পার হয়ে পাতুলিয়া গ্রামের মধ্য দিয়ে রহড়া পৌঁছে সোদপুর, পানিহাটি, আগরপাড়া ও বেলঘরিয়ার মধ্য দিয়ে ডানলপ ব্রিজের কাছে এখনকার বি টি রোডে পৌঁছল। ওখান থেকে বরাহনগর হয়ে কাশীপুর ও চিৎপুর ধরে পেরিল সাহেবের বাংলোর গা ঘেঁসে চিৎপুর খাল পার হয়ে সোজা আজকের চিৎপুর রোড ধরে ওই সময়ের চৌরঙ্গী খালের পাশ দিয়ে রসা-টালিগঞ্জ হয়ে নবাবদের ফলতার মাটিতে দূর্গে পৌঁছনো সম্ভব ছিল। সিরাউদ্দৌলা ১৭৫৬ সালে কলকাতা আক্রমণ করলে গভর্নর ড্রেক সহ শহরের বেশিরভাগ ইংরেজ স্ত্রী-পুরুষ কলকাতার দুর্গ ছেড়ে ফলতায় আশ্রয় নেয়। কালে ইংরেজ আমলে আজকের অংশটুকু, পুরনো কলকাতার সঙ্গে সংযোগরক্ষাকারী সড়কের সাক্ষী হিসেবে, নামকরণ হয় ওল্ড ক্যালকাটা রোড।

এখন এই রাস্তা ধরে বারাপুরবাসিদের আর কলকাতা আসার প্রয়োজন হয় না। সহজ রাজপথ বি টি রোড আর সমান্তরাল রেলপথ বারাকপুরবাসীদের রুটি-রুজির জীবন রেখা। মান্ত্র ২০-৩০ মিনিটে কলকাতায় পৌঁছে জীবনধারণের নানা কাজকর্মে দিবা-নিশি ব্যস্ত এখানকার মানুষ। তাদের জীবনে এ মহানগরী আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা। কলকাতা ছাড়া তাদের এখন চলে না। ওল্ড ক্যালকাটা রোডের নামটুকু অন্তত বারাকপুরবাসীদের কলকাতা মহানগরের সঙ্গে একটা একান্ততার অনুভব এনে দেয় মনে। এই নামটি অক্ষয় হয়ে থাক।
অজানা অনেক তথ্য পেলঅম, ধন্যবাদ