এই ধারাটির মূল কথা হচ্ছে এই যে ভারতবাসীর একজাতীয়তা বলতে যা বােঝায় তার বাস্তব সংগঠন ও চৈতন্যরূপ ইংরেজ শাসন, তৎসংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক আদর্শ এবং ব্যক্তিগতভাবে কোনও কোনও শাসকের ও সমষ্টিগতভাবে শাসকগােষ্ঠীরই প্রতিভার ফল। এক ধরনের সংকীর্ণ ব্যবহারবাদী চিন্তায় যেমন সব কিছুই ব্যাখ্যা করা হয় প্রেরণা ও প্রতিক্রিয়ার খেলা হিসেবে, ইতিহাসবিদ্যার এই ধারাটিতেও জাতীয়তাবাদকে ব্যাখ্যা করা হয় এই বলে যে তা শুধু রাজশক্তির প্রয়ােজনে সৃষ্ট সুযােগসুবিধা শিক্ষাদীক্ষা আইনকানুন ইস্কুল–আদালত ইত্যাদির প্রেরণায় উৎসাহিত ভারতীয় উচ্চবর্গের আচরণ ও মনােভাবের সমষ্টিমাত্র। এই ব্যাখ্যাটির এক সাবেক সংস্করণে ইংরেজের আমদানি লিবারল’ সংস্কৃতিকেই জাতীয়তাবাদের প্রধান কারণ বলে গণ্য করা হত। তবে এখন সেই দা–কাটা বক্তব্যকে আরও একটু পালিশ করে দেখানাে হচ্ছে যে কজনকে বি এ ডিগ্রি দেওয়া হল শুধু তারই ওপর জাতীয়তার প্রসার নির্ভর করে না, ওটা আর এক রকম শিক্ষাপ্রণালী বা লার্নিং প্রসেস–এর ফল। এই প্রণালীটি সম্পর্কে ব্যবহারবাদীরা পরীক্ষানিরীক্ষার দ্বারা প্রমাণ করেছেন যে খাবারের লােভ দেখালে ইদুরের মতাে জন্তুকেও শিক্ষিত করে তােলা যায়। একটা খাঁচার মধ্যে জটিল ধাঁধার মতাে চলাচলের পথ বানিয়ে তার কোনও দুর্গম অংশে একখণ্ড পনীর রেখে দিন। তারপর একটা শাদা ইঁদুর ছেড়ে দিন খাঁচার মধ্যে। কৃষ্ণের জীবটি অবশ্য দু–একবার রাস্তা হারিয়ে ফেলবে, ভুল করবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখবেন গােলােকধাঁধার প্যাঁচগুলি বহু চেষ্টায় রপ্ত করে সে ঠিক বুঝে নিয়েছে কেমনভাবে ওই খাদ্যবস্তুর কাছে পৌঁছনাে যায়। ইদুরের পক্ষে যা সম্ভব তা ভারতবাসীর অসাধ্য হবে কেন? কারণ এই ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী দেখতে গেলে ইংরেজ আসার আগে ক্ষমতা বা রাজশক্তি সম্পর্কে আমাদের ধারণাচিন্তা যা ছিল তার মধ্যে পলিটিকসের লেশমাত্র নেই, এগুলি নেহাৎ সনাতন সংস্কার মাত্র। তারা এসে তাদের শাসনকে রূপায়িত করল নানা ঔপনিবেশিক সংস্থায়, তা পরিচালনার জন্যে নিয়ম বেঁধে দিল। নিয়ম ভাঙলে কী সাজা হবে তাও ঠিক করে দিল আইনকানুন দিয়ে এবং ওইসব কিছু যাতে উচ্চবর্গের বােধগম্য হয় তার জন্যে একটা সংস্কৃতিকেও চালু করে দিল রাষ্ট্রক্ষমতা কায়েম ও বিস্তার করার উদ্দেশ্যে। এইসব সংস্থা ও তৎসংক্রান্ত সংস্কৃতি যে রাষ্ট্রীয় চিন্তা ও কর্মের উপলক্ষ ও বিষয় তারই নাম পলিটিকস এবং আলােচ্য ধারাটি অনুযায়ী সেই পলিটিকসে উচ্চবর্গের দীক্ষিত হওয়ার প্রণালীটির—‘লার্নিং প্রসেসটিরই—নাম জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদের এই ব্যাখ্যায় আদর্শনিষ্ঠা ও নিঃস্বার্থ জনসেবার স্থান নেই, আছে শুধু ঔপনিবেশিকতার বরে পাওয়া অর্থ যশ ও ক্ষমতার লােভ আর সেই লােভের লক্ষ্যগুলিতে পৌঁছনাের জন্যে ইংরেজ ও ভারতীয় উচ্চবর্গের মধ্যে এবং শেষােক্তদের নিজেদের মধ্যে সহযােগিতা ও সংঘাতের কাহিনীই, এই মতে, জাতীয় আন্দোলনের মূল কথা।
অপরপক্ষে দ্বিতীয় প্রতিকল্পটির ছাঁচে সাজানাে ইতিহাসবিদ্যায় জাতীয় আন্দোলনকে উচ্চবর্গের নেতৃত্বে উদ্বুদ্ধ ও চালিত নির্ভেজাল আদর্শবাদী সংগ্রামের চেহারা দেওয়া হয়। এই ধরনের ব্যাখ্যা প্রধানত ভারতীয় ঐতিহাসিকদেরই কাজ, তবে বিদেশে ‘লিবারল’ চিন্তাধারায়ও এর প্রকাশ বিরল নয়। এই ব্যাখ্যায়ও তারতম্য ঘটে। জাতীয় সংগ্রামের নায়ক রূপে উচ্চবর্গের অবদান এতে সর্বস্বীকৃত হলেও সব ব্যক্তি, সংস্থা, নীতি ও তার বিশেষ বিশেষ প্রয়ােগ সম্পর্কে মূল্যায়ন সকলের এক রকম নয়। তবে মােদ্দা কথাটা সম্পর্কে দ্বিমত নেই। সে কথাটা হচ্ছে এই যে আমাদের জাতীয় সংগ্রাম উচ্চবর্গের মাহাত্ম্য ও আদর্শনিষ্ঠার কাহিনীমাত্র, এবং এই প্রতিপাদ্যটিকে বিশ্বাসযােগ্য করার জন্যে ইংরেজের সঙ্গে তাদের সহযােগিতার চেয়ে বিরােধিতার দিকটাই বাড়িয়ে দেখা হয়, শােষক ও উৎপীড়ক হিসেবে তাদের সামাজিক ভূমিকা প্রায় অস্বীকার করেই জনসেবায় তাদের অগ্রণী ভূমিকার কথা বলা হয়, জাতীয় আন্দোলনের রাজনীতি ব্যবহার করে তারা যে রাজদত্ত ক্ষমতা ও সুযােগসুবিধার গৌণ ভাগ নিয়ে কাড়াকাড়ি মারামারিতে লিপ্ত ছিল সেকথা চেপে গিয়ে শােনানাে হয় স্বার্থলেশহীন আত্মত্যাগের অলীক রূপকথা। এইভাবেই বুর্জোয়া–জাতীয়তাবাদী ইতিহাসে জনগণের বিশাল আন্দোলনগুলি পরিণত হয়েছে উচ্চবর্গের সংকীর্ণ জীবনবৃত্তান্তে।
এই পক্ষপাতদুষ্ট ইতিহাস থেকে অবশ্য অনেক কিছুই শেখার আছে। দেশি ও বিদেশি উচ্চবর্গের নানা ব্যক্তি ও গােষ্ঠীর কাজকর্ম ও চিন্তাধারা, তাদের ঐক্য অনৈক্য, রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি তার চালক ও সহায়কদের মনােভাব, গণজীবন ও গণমত সম্পর্কে তাদের ধারণা ইত্যাদি অনেক তথ্যের আকর এই ভাষ্য। তবে এই ইতিহাস থেকে যা সবচেয়ে শেখার কথা তা হচ্ছে এই যে ইতিহাসচেতনা কখনও শ্ৰেণীচৈতন্যের সীমা অতিক্রম করতে পারে না।
কিন্তু এই ধরনের ঐতিহাসিক চিন্তা ও রচনার মধ্যে যা শিক্ষাপ্রদ তা অস্বীকার না করেও বলা যায় যে তার সাহায্যে জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় আন্দোলনের অভিজ্ঞতাকে । সমগ্রভাবে বােঝা সম্ভব নয়। কারণ সেই অভিজ্ঞতার অন্যতম এবং মুখ্য উপাদান জনসমাবেশ, যা বলতে আমি বােঝাতে চাই সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক চেতনা ও . তাদের সমবেত কার্যকলাপের সমন্বয়। এই অর্থে জনসমাবেশ যে কদাচিৎ এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে উচ্চবর্গের প্রতিনিধিস্থানীয় ব্যক্তি ও সংগঠনের মাধ্যমেই সম্ভবপর হয়েছিল তা যেমন সত্যি, তেমনই একথাও সত্যি যে সেই সমাবেশ অনেকবার এবং বহু ক্ষেত্রেই গড়ে উঠেছিল জনসাধারণের নিজস্ব ও স্বতন্ত্র উদ্যোগে, এমন কী সচেতনভাবেই ওইসব ব্যক্তি ও সংগঠনের তােয়াক্কা না রেখে, বরং তাদের বিরােধিতা করেই। সেই উদ্যোগের ফলস্বরূপ যে অজস্র জমায়েতের কথা জানা যায় ভারতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে মহাত্মা গান্ধীর আবির্ভাবের আগেই, তার দৃষ্টান্তগুলি না হয় বাদ দিচ্ছি, কারণ অনেকে হয়তাে বলবেন যে তার মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রকট ছিল না, যদিও ১৮৫৭–র মহাবিদ্রোহ বা ১৮৯৯–১৯০০ সালের বিরসাপন্থী বিদ্রোহের মধ্যে জাতীয়তার অংকুর বা পূর্বাভাস যাঁদের চোখ পড়ে না অথচ সরকারি চাকরির অধিকার নিয়ে উনিশ শতকে উচ্চশিক্ষিতের বিক্ষোভ বা কংগ্রেসের প্রথম দশ বছরের কার্যকলাপে যাঁরা জাতীয়তাবাদের প্রকাশ দেখতে পান, তাঁদের মনশ্চতে চাশে ধরেছে বলতে হবে। তবু এসব কথা আপাতত বাদ দিয়ে যদি ঔপনিবেশিক আমলের সেই পর্বটির কথাই শুধু ধরা যায় যখন জাতীয়তাবাদের অস্তিত্ব একেবারেই সন্দেহের অতীত, তখনও বহু বিরাট আন্দোলন ঘটেছে যার সবটাই বা অনেকখানিই জনসাধারণের স্বতন্ত্র উদ্যোগের দৃষ্টান্ত, যেমন অসহযােগ যুগের কোনও কোনও সমাবেশ, ১৯৪২–এর অগাস্ট সংগ্রাম, কিংবা দেশভাগের পূর্বাহ্নে নৌবিদ্রোহকে উপলক্ষ করে শ্রমজীবী জনতার অভ্যুত্থান।
উচ্চবর্গের দৃষ্টিভঙ্গির বাহন ইতিহাসবিদ্যার সাধ্য নেই যে জাতীয়তাবাদের এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটা স্বীকার করে কিংবা ব্যাখ্যা করে। কারণ তা হলেই মেনে নিতে হয় যে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুধু উচ্চবর্গের কৃতিত্ব নয়, এবং সেই অস্বস্তিকর সত্যটা তাদের স্বার্থ ও আদর্শের—ইডিয়ােলজির—বলগায় বাঁধা ইতিহাসের সঙ্গে খাপ খায় না। অথচ ওই ধরনের সমাবেশের ব্যাপক ও সংগ্রামী ভূমিকা এতই স্বতঃপ্রকাশ যে তা উপেক্ষা করা চলে না। সুতরাং ওই ইতিহাসে সাক্ষ্যপ্রমাণ সব উড়িয়ে দিয়ে জনসাধারণের যা স্বতন্ত্র সৃজনী প্রতিভার ফল, উচ্চবর্গ তাকে আত্মসাৎ করে চালিয়ে দিচ্ছে নিজেরই চিন্তা ও কাজ বলে। এক কথায়, এই বিদ্যা ভারতবাসীর ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার বিস্তার, গভীরতা ও জটিলতাকে উচ্চবর্গের পক্ষপাতী একটা প্রশস্ত, অগভীর, অতি সরল কীর্তিগাথায় পরিণত করেছে।
অথচ যে আদিকল্প থেকে এই ধরনের ব্যাখ্যার উদ্ভব হয়েছে, একদা ইতিহাসবিদ্যার প্রগতি ঘটেছিল তারই জোরে। একথা আমি আগেই বলেছি। তারই জোরে তখন ইতিহাসচেতনায় দেবলীলার পরিবর্তে মানুষের ঐহিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং জের টেনে—শেষ পর্যন্ত একথাও স্বীকৃতি পেয়েছিল যে ভারতের ইতিহাসে কেবল ইংরেজেরই নয়, ভারতবাসীর (যদিও উচ্চবর্গের অন্তর্ভুক্ত মুষ্টিমেয় ভারতবাসীর) অবদানও আছে। সেই ধাক্কার জোরেই তখন অতীতের কত নতুন দরজা খুলে গিয়েছিল, নতুন তথ্যের খনি আবিষ্কৃত হয়েছিল, রাষ্ট্র সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কত নতুন সম্পর্ক উদ্ভাসিত করেছিল আগলভাঙা হঠাৎ আলাে। কিন্তু সেই আদিকল্পটি আজ বৃদ্ধ, সে তার সৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। জ্ঞানবিজ্ঞানের ইতিহাসে এটা মােটেই নতুন ব্যাপার নয়। এক সময় জ্যোতির্বিদ্যার চর্চা হত ভূকেন্দ্রিক আদিকল্পকে আশ্রয় করে। কোপারনিকাস তারই ভিত্তিতে এমন সব প্রশ্ন করে বসলেন যে ওই টলেমীয় বিদ্যার সাহায্যে তার উত্তর মেলে না। এইসব নতুন প্রশ্নের চাপেই শেষ পর্যন্ত সেই পুরনাে আদিকল্প ভেঙে পড়ল, তার জায়গা জুড়ে বসল সূর্যকেন্দ্রিক আদিকল্প, এবং জ্যোতির্বিদ্যায় মধ্যযুগীয় চিন্তার রাজত্ব শেষ হল। আলেকজর কোয়ারে, টমাস কুন প্রমুখ ঐতিহাসিকরা দেখিয়েছেন যে এইভাবেই বিজ্ঞানের এক একটি শাখায় সংকট ঘটেছে যখন প্রতিষ্ঠিত আদিকল্পগুলির নিজ প্রতিভাবলেই এমন সব সমস্যা তৈরি হয়েছে যার সমাধান তাদের তত্ত্ব ও অভ্যাসের অধীন নয়, আর তখনই নতুন কোনও আদিকল্প এসে সেই সংকট সমাধান করেছে। (চলবে)