পর্তুগিজরা মশলার খোঁজে এসেছিল পৃথিবীর পূর্বাঞ্চলে। মশলার বিনিময়ে কি দিলে খুশি করা যাবে এ অঞ্চলের মানুষকে? — উত্তর ছিল ঘড়ি। এই ঘড়ির লোভ দেখিয়েই একসময় পশ্চিমিরা রীতিমতো দখল করে নিয়েছিল প্রাচ্যকে।
চীনের শাসকেরা ঘড়ির খবর পেয়ে উতলা হয়ে উঠেছিলেন। ১৮৫৩ সালে চীনের প্রাদেশিক এক সাহেব রীতিমতো আবদার করেছিলেন যেন তাকে “নিজে নিজে বাজে যে যন্ত্র” তা এনে দেওয়া হোক। পশ্চিমিরাও ঘড়ি উপহার দিয়ে খুশি করেছিলেন ওই শাসক কে। বেজিংয়ের সম্রাটের প্রাসাদে যাতায়াতের অধিকার পশ্চিমিরা জোগাড় করেছিলেন এই ঘড়ি উপহার দিয়ে। চীনের সম্রাট ঘড়িগুলো পেয়ে এতটাই আনন্দ পেয়েছিলেন যে, সেগুলি কখনো হাতছাড়া করতেন না। সেই সুযোগেই পশ্চিমের শাসকরা পূর্বে তাদের উপনিবেশ স্থাপনের পথটি সুগম করে নিয়েছিলেন।
বিদেশিদের কাছে শুধু নয়, সেই কবে থেকে রাজা বাদশা আমিরদের কাছে ঘড়ি ছিল অত্যন্ত লোভনীয় বস্তু। আর সেই সুযোগই কাজে লাগিয়ে ছিলো ধূর্ত ইংরেজরা। সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবার থেকে নিজের দেশে চিঠি লিখে ইংরেজ দূত টমাস রো যেসব উপহার আনিয়েছিলেন তার মধ্যে অন্যতম ছিল ঘড়ি। ইংরেজরা কলকাতায় বসবাসের জন্য ঔরঙ্গজেবের নাতি আজিম উসসানের কাছে অনুমতি চাইতে যাওয়ার সময় তাই ঘড়ি উপহার দিতে মোটেও ভুল করেননি।

কলকাতা-সুতানুটি-গোবিন্দপুরের জমিদারদের কাছ থেকে জমিদারি ইংরেজদের হাত থেকে চলে যাওয়া অন্যতম কারণ ছিল ঘড়ি। ১৭৫২ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলা কে পাঠানো উপহারের তালিকায় এ কারণেই তারা রেখেছিল ৮৮০ টাকা দামের একটি ঘড়ি। ১৭৫৮ সালে তারা পাঁচ হাজার টাকা দামের আরো একটি ঘড়ি এক নবাবের জন্য কেনে — যার নাম ছিল ‘মীরজাফর’। ১৮১২ সালে ইংরেজরা এক আদেশ জারি করে, তাদের অনুমতি ছাড়া ভারত ও চীনে কেউ ঘড়ি পাঠাতে পারবে না। পাছে অন্য কেউ ঘড়ি দিয়ে খুশি করে এই অঞ্চলে ঘাঁটি গেড়ে বসে — সেই ভয়েই হয়তো এই আদেশ জারি।
ঘড়ির জন্য প্রাণদণ্ডের কথাও জানা যায়। কলকাতায় এক সাহেবের বাড়িতে কাজ করতো ব্রজমোহন। ১৮০০ সালে তার ফাঁসি হয়। তার অপরাধ ছিল — ২৫ টাকা দামের সাহেবের সেই ঘড়িটি নাকি সে-ই চুরি করেছিল। কি ভয়ঙ্কর অমানবিকতা।

স্বদেশী ও বিদেশীদের ঘড়ির প্রতি আন্তরিকতা মিলে মিশে গেছে এক বিখ্যাত ঘড়ির স্তম্ভে। হুগলীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর চুঁচুড়ার প্রাণকেন্দ্র ঘড়ির মোড়ের ঘড়ির কথা। দীর্ঘ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাক্ষী হয়ে আছে এই শহর কেন্দ্রের চারমাথা মোড়ে ‘এডওয়ার্ডিয়ান ক্লক টাওয়ার’ (Edwardian Clock Tower) যার স্থানীয় নাম ঘড়ির মোড়। বড়লাট সপ্তম এডওয়ার্ডের স্মরণে প্রাচীন এই স্তম্ভঘড়িটি। ঐতিহাসিক এই ঘড়িটির সঙ্গে এখানকার মানুষ এতটাই জড়িয়ে পড়ে যে, ‘টাউন গার্ড রোড’ ‘ঝাউতলা’ নামটি পাল্টে এই জায়গার নাম হয় ‘ঘড়ির মোড়’।
রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড-এর (Edward VII) শাসনকাল ছিলো ১৯০১ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত। তিনি ছিলেন ব্রিটেনের রানি ভিক্টেরিয়ার (Queen Victoria) জ্যেষ্ঠ পুত্র। তার মৃত্যুর পর ১৯১৪ সালে সুসজ্জিত স্তম্ভ ঘড়িটি চারমাথার মোড়ে স্থাপিত হয়। রাস্তার মোড়ে ১৬ স্কয়ার ফিট জায়গায় ৩০ ফুট উচ্চতায় ঢালাই লোহার স্তম্ভের উপর চারদিকে চারটি ঘড়ির ডায়াল। ঘড়ির মূল যন্ত্রাংশ পিতল ও ইস্পাতের। প্রতি আধা ঘন্টা অন্তর তার ঢং-ঢং আওয়াজে নিজের ঘড়ির সময় মেলায়নি এমন মানুষ চুঁচুড়ার খুঁজে পাওয়া ভার। স্তম্ভের উত্তর অংশটিতে রয়েছে রাজাসপ্তম এডওয়ার্ড-এর অবয়বের একটি ধাতব পার্শ্বমূর্তি। বাকি তিন দিকে রয়েছে তিনটি কারুকার্যখচিত স্মৃতিফলক।

পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শ্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায় ১৯৭৩ সালে স্তম্ভ ঘড়িটির উত্তর প্রান্তে স্বাধীনতা সংগ্রামী ভূপতি মজুমদারের একটি আবক্ষ মূর্তির উদ্বোধন করেন।
এত বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ২০০৯ এ আইলার সময় একমাত্র ১৫ মিনিটের জন্য ঘড়িটি বন্ধ হয়। ব্রিটিশ আমলে ঘড়ি মেরামতির দায়িত্ব পালন করত ‘কুক এন্ড কেলভি’ সংস্থা। এরপর ১৯৫৪-১৯৬৩ পর্যন্ত মেরামতের দায়িত্ব পেল কলকাতার ‘বিবি দত্ত কোম্পানি’। বর্তমানে চুঁচুড়ার ‘এম এস হোসেন অ্যান্ড কোম্পানি’ ঘড়ির স্বাস্থ্য পরীক্ষায় নিয়োজিত।

লন্ডনের ওয়েস্টমিনিস্টারে অবস্থিত বিগ বেনের পরই দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘড়িটি রয়েছে এই হুগলি জেলার ইমামবাড়ায়। ব্রিটিশ স্থাপত্যের বদলে পাবেন এখানে ইসলামিক শিল্পকলার স্বাদ। ঘড়িটি লন্ডনের বিগ বেনের নির্মাতারা তৈরি করেছিলেন এবং মোটা অঙ্কের (প্রায় ১১,৭২১ টাকা) বিনিময়ে মহসিন খান ইংল্যান্ড থেকে এটি আমদানি করেছিলেন। ঘড়িটিতে দম দেয়ার জন্য যে চাবি রয়েছে তারই ওজন কুড়ি কিলোগ্রাম। তিনটি ঘন্টা রয়েছে মাঝারি ও ছোট ঘন্টা দুটি ১৫ মিনিট অন্তর আর বড় ঘন্টাটি এক ঘন্টা অন্তর বাজে। ঘন্টাটিতে রানী ভিক্টোরিয়ার মুখ খোদাই করা আছে। ঘড়ির দু-দিকের দুই মিনারে ওঠা যায় প্রায় ১৫২টি করে সংকীর্ণ সিঁড়ি বেয়ে, যদিও বা এখন সেফটির কারণে পর্যটকদের এই সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেওয়া বন্ধ আছে।

এছাড়াও ইমামবাড়ার অঙ্গনে রয়েছে একটি সূর্যঘড়িও।
মূল ঘড়িতে পিতলের ফলক ছিল দুটি চুরি হয়ে গেছে। পরে পাথরের ফলক লাগানো হয়। তৈরি হওয়ার কয়েক শতাব্দী পরেও সূর্যের ডায়ালটি আজও সঠিক সময় নির্দেশ করে।
আবিষ্কারের পর থেকে হাল আমল পর্যন্ত কত রকম ভাবে যে বদলেছে ঘড়ি, তার ইয়াত্তা নেই। কোন ঘড়ি আছে দম দেওয়া কোনটি ব্যাটারি চালিত কোনোটি আবার সৌরশক্তিতে চলে। অসংখ্য বৈশিষ্ট্যের অগুনতি আকারে নানান ধরনের ঘড়ি ছড়িয়ে রয়েছে আমাদের চারপাশে। যতই মোবাইলে সময় দেখাক না কেন, হাত ঘড়ি আজও হয়ে রয়েছে ফ্যাশন স্ট্যাটাসের প্রতিক। গিফটের বাক্সে একটা ঘড়ি পেলে মন আনন্দে আত্মহারা হয়ে পরে বৈকি।
ঘড়ির বাজার একটু ধীর গতি কারন মোবাইলেই
সময় সূচনা থাকে,তবুও এখনো জনপ্রিয়।উ প্র.ও
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে শহরের মাঝামাঝি এক
স্তম্ভের উপর বিরাট ঘড়ি বসানো থাকতো যাতে
পথিকের সময় অনুমান হয়,তা আজও রয়েছে
অনেক জায়গায়,”ঘন্টাঘর” নামে।তবে সব ঘড়িই
অচলাবস্থায় বিরাজমান।ঘড়ি বিবরন,ঘড়ি কথা
ভালোলাগলো।
অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই আপনাকে ????