লোকে এখন আর দোল খেলে না, দেখে। দোল খেলা হয়, বিভিন্ন চ্যানেলে, স্টুডিওতে — সিরিয়ালের অভিনেতা, অভিনেত্রীদের নিয়ে। সেখানে কিছু লোকজন নিজেদের ছোটবেলার দোল খেলার অভিজ্ঞতার কথা বলেন, দোলের দিন তারা কী কী মহান কাজ করেছিলেন তার ফিরিস্তি দেন। বেশ বোঝা যায় এইসব সবজান্তা লোকগুলোর কোন শৈশব ছিলনা। ৭০-৮০ এমনকি ৯০ এর দশকেও কলকাতায় দোল ছিল সকাল থেকে সন্ধ্যা একটা সরগরম ব্যাপার। রঙ ভরা বেলুন, গাধার ছাপ দেওয়া আলু, জল ঢাললেই মাথা আরও রঙিন হবে এমন রঙ, উঠতেই চায় না এমন বাঁদুরে রঙ — এমন সব অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় সে এক ধুন্ধুমার ব্যাপার! প্লাস্টিকের পিচকিরি, রঙের বালতি, পকেটে কিংবা হাতে রঙ ভরা বেলুন এই ছিল সেই যুদ্ধে মেতে ওঠা ছোটদের অস্ত্র। যদিও রাস্তায় নেমে রঙ খেলা চিরকালই যাকে বলে ডাইরেক্ট অ্যাকশন। জাপ্টে ধরে রঙ মাখানো, রঙ না থাকলে কাদা এমনকি মোবিল মেশানো ভুষো কালি না মাখালে সে যুদ্ধ সম্পূর্ণ হত না। একটুআধটু মন কষাকষি এমনকি মারপিটও নিশ্চয়ই হত তবে দোলের দিন বলে সেসব কেউ মনে রাখতো না।

একটু বড় যারা, মানে যারা স্কুলের ওপরের ক্লাসে পড়ে, নাইন-টেন আর কি, তাদের টার্গেট ছিল পাড়ার মেয়ে বা বন্ধুদের দিদি, বোনদের দিকে। দোলই তো ঘনিষ্ট হওয়া, মিলেমিশে যাওয়ার সময়। অনেকের আবার চোখ ছিল পাড়ায় নতুন আসা মেয়েদের ওপর। তাদের বাড়িতে রঙ খেলার জন্য মাসিমা-মেসোমশাই বলে ঢুকে পড়তো পাড়ার ছেলেরা। এরপরই ঢিপ করে বড়দের পায়ে আবির মাখিয়ে দেওয়া আর প্রণাম। অনেকে এরপর দুরু দুরু বক্ষে আড়চোখে তাকাতে শুরু করেছে বাড়ির কিশোরী মেয়েটির দিকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা সেসবে আমল দিত না। আবার অনেকের আলতো হাসি, সব আড়ষ্টতার আগল ভেঙে দিত। একবার পাড়ার নন্তুদাকে কাবেরীদির গালে সেন্ট মাখানো আবির মাখিয়ে দিতে দেখেছিলাম। কাবেরীদিও সেদিন কিছু বলেনি। দোলের দিন নন্তু+কাবেরী হয়ে গেল! তার মাহাত্ম্যই এমন। আমাদের কাছে হিরো হয়ে গেল নন্তুদা। আবার উল্টোটাও ঘটতো, অনেক বাড়িতে এমন সাহসী রঙবাজদের ধমক দিয়ে বাড়ির থেকে বার করে দিতেন বড়রা। স্কুলের ‘গার্জিয়ান কল’ এর মত অভিভাবকদের কাছে নালিশ জানানোর ঘটনাও ঘটতো। তবে তা খুবই কম।

বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেত দোলের ছবি। সকালে বাড়ি কিংবা পাড়ার চৌহদ্দিতে পিচকিরি, রঙ, আবির দিয়ে শুরু হওয়া উত্তেজনা বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পাড়ি দিত বেপাড়ায়। কখনও ঢোল বাজিয়ে গান করতে করতে আর কখনও হোলি হ্যায় বলে কান ফাটানো চিৎকার করে রঙযোদ্ধারা হামলা করতো পাশের পাড়াতে। সেখানে গিয়েও আরেক প্রস্ত রঙে ভিজে ওঠার পালা। এবার দুপাড়ার দল মিলে হানা দিত পাশের পাড়ায়। এই রঙ খেলা ছিল ফ্রি স্টাইল কুস্তি। যে যাকে যেমনভাবে পারে রঙ মাখাবে। এখনকার মত পরিশীলিত ব্যাপার নয়, একটা ভরপুর উত্তেজনা। এই উত্তেজনায় দুর্ঘটনাও ঘটতো, অনেক সময় হত মারপিট। তবে সাধারণভাবে বিরাট কোন পরিকল্পিত হাঙ্গামা হত না, হলেও দুপক্ষ মিলে তা মিটিয়ে ফেলতো।

ছেলেছোকরাদের এই দোলের বাইরেও পাড়ার বড়দের, বাড়ির দিদি, বৌদিদের একটা দোল খেলা ছিল। তবে তা হত পাড়ার মধ্যেই। দল বেঁধে তারা একেকটা বাড়িতে গিয়ে সে বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে দোল খেলতেন। যাদেরকে রঙ দিলেন তারা মিষ্টিমুখ করাতেন তাদের। একটু বেলা গড়ালে শুরু হত বড়দের দোল। পাঞ্জাবী, পাজামা বা ধুতি পরে রঙ খেলতে বেরোতেন বাড়ির বাবা-কাকারা। এরমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে পাড়া প্রতিবেশির বাড়ি থেকে মিষ্টি আসা। দোল সবাইকে মিলিয়ে দিত, দোল মানেই একটা অবাধ মেলামেশা। এখনকার দোলের সঙ্গে সেই দোলের সবচেয়ে বড় তফাৎ এটাই। এখন দোল অনেকটাই ডিজাইনার ব্যাপারস্যাপার।

দোলের দিন রঙ মেখে আরও জ্যান্ত হয়ে উঠতো শহর। উৎসব স্পর্শ করতো মানুষকে, এখন দোল যেন ক্রমশই রিয়্যাল থেকে ভার্চুয়াল হয়ে উঠছে। কিছুদিন পর হয়তো অনলাইনে দোল খেলা শুরু হয়ে যাবে। ছোটবেলায় দোল খেলার জন্য পেতাম প্লাস্টিকের পিচকিরি আর একটু বড়রা দোল খেলতো পিতলের পিচকিরি দিয়ে। সেদিন ঘর ঝাড়তে গিয়ে বেরোল সেই পুরনো পিচকিরি। তাকে মোটেই কোন ‘বালম’ বলে মনে হল না। উন্মাদনা, হৈচৈ সরিয়ে দোল এখন যেন অনেক পরিশীলিত ব্যাপার। ন্যাড়াপোড়ার দিন থেকে শুরু করে গোটা দোলের দিনের তুমুল উন্মাদনা সেখানে অনুপস্থিত। ছোটবেলার সেই দুর্লভ সম্পদ পিতলের পিচকিরি বাতিল জিনিস বলে বিক্রি হয়ে গেল ওজন দরে। দোল এখন শুধুই একটা ছুটি হয়ে গেছে!