সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, ইতিহাস, স্মৃতিকথা নিয়মিত লিখতেন পত্রিকায়। তার সম্পাদিত চিনি কক, যা উপজাতি যুব সমিতির মুখপত্রে ছাপা হত বাংলায়। তার একাধিক প্রবন্ধ সংকলন ছাড়াও চরন চন্তাইয়ের ঝুলি এই রাজ্যের বাংলা সাহিত্যকে গরিমান্বিত করেছে। উপজাতি জীবন চিনিয়েছে বাঙ্গালী পাঠককে। এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় লিপি বিতর্ক এড়িয়ে আসতে দুই তিনটি ভাষা কমিশনের সম্মুখীন হতে হয়েছিল ককবরক ভাষীদের। ১৯৮৮ সালে কংগ্রেস উপজাতি যুব সমিতির সরকার গঠিত হলে লিপি বিতর্ক নিরসনে প্রথম ককবরক ভাষা কমিশন হল শ্যামাচরন ত্রিপুরাকে চেয়ারম্যান করে। এই কমিশন যে রিপোর্ট দেয় তা কোনও দিন সূর্যালোক দেখতে পায় নি। ১৯৯৩ সালে সরকার বদলে ফের বামেরা ক্ষমতায় এলে শ্যামাচরন কমিশনের সুপারিশকে আর মান্যতা দেয় নি। বামেরা সরকারে এসে প্রথমে কুমুদ কুন্ডু চৌধুরিকে ককবরক ভাষা কমিশনের চেয়ারম্যান ঘোষনা করে কিন্তু তাঁকে কোন অফিস ঘর দেওয়া হল না। ফলে এক দিনের জন্যও কোন বৈঠক হল না এই কমিশনের। অগত্যা নিজের পয়সায় খাতা কলম কিনে নিজের বৈঠকখানায় বসেই একটি সুপারিশ বানিয়ে জমা দেন সরকারি দফতরে। কিন্তু সরকার সেই সুপারিশ কোন দিন খুলে দেখে নি। এরপর ২০০৪ সালে আরও একটি ককবরক ভাষা কমিশন গঠন হল। বিশিষ্ট ভাষাবিদ পবিত্র সরকার ছিলেন এর চেয়ারম্যান। এই কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ করে সরকার। পবিত্র সরকার কমিশন ককবরকের জন্য বাংলা বা রোমান লিপির কথা আলাদা করে সুপারিশ না করলেও তার সঙ্গে যাদের কথা হয়েছে, যারা মতামত দিতে এসেছিলেন তাঁদের ৬৭.৮৭ শতাংশ রোমানের পক্ষে বলেছেন।

এই সুপারিশ নিয়ে সরকার তখন আর না এগোলেও পবিত্র সরকার কমিশনের রিপোর্টে একটি যুগের অবসান ঘটে। বাংলা নাকি রোমান এই বিতর্ক কেটে যায়, বরং বলা হতে থাকে যারা ওই ভাষায় কথা বলবেন, লিখবেন সেটা তারাই স্থির করবেন, করুন। কিন্তু লিপি নিয়ে বিতর্ক বুঝি আর শেষ হয় না। তুইপ্রাল্যান্ডের দাবি নিয়ে ভোটে জিতে ২০১৮ সালে বিজেপি জোট সরকারে যোগ দেয় আইপিএফটি। ককবরক ভাষী মানুষ, সুশীল সমাজ ভেবেছিলেন এইবার একটা হেস্তনেস্ত হবেই। হায় রাম! এই রাম আমলে দীর্ঘ ১৭ বছর পর আবার ফিরে এলো লিপি বিতর্ক। গেল বছরের শেষ দিকে রাজ্য সরকার উপজাতি কল্যানে হাই পাওয়ার কমিটি অন মডালিটিস ঘোষনা করে। তাতে একগুচ্ছ প্রস্তাব, পরামর্শের মধ্যে একটি ছিল ককবরকের লিপি হিসাবে দেবনাগরি বেছে নেওয়া হোক। প্রসঙ্গত রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দফতরকে নিয়ে গড়া এই কমিটির নোডাল সংস্থা কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। যার মন্ত্রী অমিত শাহ। বিষয়টি জানার পর ককবরক সুশীল সমাজ এর প্রতিবাদ জানান। রাজস্বমন্ত্রী থেকে উপ-মুখ্যমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী সবার কাছেই প্রতিলিপি পাঠিয়ে ঘোর বিরোধিতা করেছেন তারা। বলেছেন, বাংলা এবং হিন্দি দুটি ভাষাই অষ্ট্রিক এশিয়ান পরিবারের ভাষা। যদিও হিন্দিতে ইউরোপিয়ান ভাষার প্রভাব রয়েছে। কিন্তু এই ভাষার লিপিও টিবেটো বার্মান ককবরকের জন্য বাংলার মতই অদরকারি। এর আগে পর্যন্ত রাজ্যে ককবরক ভাষী মানুষই এই সরকারের প্রতি আশা পোষন করেছেন, ঠান্ডা হয়ে আসা লিপি বিতর্কের পর এবার নিশ্চয়ই রাজ্য সরকার ককবরক ভাষা উন্নয়নে লিপি পরবর্তী কাজ অর্থাৎ করপাস প্ল্যানিং কিংবা ভাষার প্রমিতকরনের কাজে হাত দেবে। পন্ডিত ব্যক্তিদের ডেকে এনে ককবরকের মান্য লেখ্য রূপ তৈরি করা হবে। কিন্তু হায়, আর এর পরেই শোনা গেল জাতীয় ভাষা কমিশনের সংসদীয় কমিটির বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পরামর্শ দিলেন, উত্তর পূর্বের লিপিহীনের দেবনাগরি লিপি নিন।
আর উত্তর পূর্বাঞ্চলের লিপিহীন ভাষাগুলিকে দেবনাগরি নেওয়ার প্রস্তাবে প্রকাশ্য প্রতিবাদ জানিয়েছে নর্থ ইস্ট স্টূডেন্টস অর্গানাইজেশন বা নেসো। বাকিদের সরব প্রতিবাদ এখনো দেখা না গেলেও তারা বুঝতে চাইছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাস্তবেই কি বলতে চেয়েছেন। তিনি যা বলেছেন তা হয়তো রাজনৈতিক ভাষনে বলা যায় কিন্তু বহুভাষীকতার দেশে কি করে সম্ভব? প্রকাশ্য প্রতিবাদ নেই তুইপ্রা মথার মতো রাজনৈতিক দলের। যদিও বুবাগ্রা (রাজ পরিবারের প্রতিভূ) প্রদ্যুত কিশোর দেববর্মন হিন্দিতেই স্বচ্ছন্দ থাকেন উপজাতি মহল্লায়, তবে তার দল চায় উপজাতির নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতির সর্বোচ্চ বিকাশ। রাজ্যে সর্বশেষ ভাষা কমিশন হয়েছিল যাদের আমলে, সেই সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদক জিতেন চৌধুরী বললেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সময়ে পার্টি কংগ্রেস চলছিল। আমরা পার্টি কংগ্রেস থেকেই প্রতিবাদ করেছি। আমাদের যে সংবিধান, যে বহুত্ববাদের আদর্শ তাতে নানা ভাষার সমাহার থাকবে। বহুত্ববাদী সমাজে এই রকম হতে পারে না। আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করি। আসলে আরএসএসের যে মতবাদ, হিন্দি-হিন্দুত্ব-হিন্দুস্তান — সেই ব্লু প্রিন্ট ধরেই এই সব বলেছেন অমিত শাহ। তাঁদের বন্ধ্যা রাজনীতি ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসছে। জিতেন বাবু বললেন, জিএমপি (ত্রিপুরার প্রাচীনতম উপজাতি ভিত্তিক দল গন মুক্তি পরিষদ) সভাপতি হিসাবেও তার একই বক্তব্য থাকছে। ককবরক ইস্যুতে সিপিআইএম নেতা বলেন, এই ভাষার লিপি কি হবে কি না হবে তা সেই ভাষার মানুষই স্থির করবেন। সরকার ভাষার বিকাশে সহায়তা করবে। এখানে সরকার সহায়তাকারীর ভূমিকা নিন। চাপিয়ে দিতে যাবে কেন?

বাংলায় চারখানা উপন্যাস লিখেছেন নন্দ কুমার দেববর্মা। ছোটগল্প, কবিতা অজস্র। ককবরক সুশীল সমাজের অন্যতম শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব নন্দ কুমার দেব্বর্মার বিষ্ময়, কী বলার আছে! ভাবতে গেলে হাসিও পায়। উত্তর পূর্বাঞ্চলে অধিকাংশ ভাষাই লিপিহীন। তিনি কি সবগুলি ভাষার জন্য দেবনাগরী চাইছেন? তাহলে তো ভালোই, লিপিহীনের সমস্যা কেটে গেল। বেশ সোজা বিষয় মনে হচ্ছে। সরকারের তো অধিকার আছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরও এক্তিয়ার আছে। তাহলে পার্লামেন্টে আইন নিয়ে আসুন না কেন! বহু ভাষিকতার এই সমাজ, রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিষয়টা কি খুব মসৃন হবে? আমরা নিলাম কি নিলাম না সে না হয় অন্য কথা, গনতান্ত্রিক উপায়ে দিন না লিপি চাপিয়ে। নন্দকুমার দেববর্মার এই উষ্মা নিঃসন্দেহে স্বাভাবিক। এই আমলে ত্রিপুরা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ককবরক পঠন পাঠন শুরু হলে নন্দ দেববর্মাকে আউটসোর্সিং হিসাবে লেকচারার নিযুক্তি দিয়ে মূলত ঢাল তরোয়ালহীন হয়েও কি করে কাজটা করতে হবে তারই পথ বাতলেছে প্রশাসন। ভাষাটার স্থাণুবৎ অবস্থা তার চেয়ে বেশি সম্ভবত কেউ টের পায় না। তার মতে বাংলায় আমরা লেখাপড়া করেছি, বাংলার একটা সামাজিক সহজাত অবদান আমাদের জীবনে রয়েছে তাই একসময় বাংলা লিপি দিয়েই ককবরক লিখতে শুরু করি। এক সময় দেখলাম ককবরকের যে সৌরভ তা বাংলা দিয়ে পাওয়া যায় না। রোমানে অনেকটাই স্বচ্ছন্দ। এটা শুধু উপজাতি অংশের মানুষের জন্যই নয়, যারা উপজাতি নন কিন্তু ককবরক পড়তে, লিখতে চাইছেন তারাও রোমানে স্বচ্ছন্দ মনে করছেন। কিন্তু রোমানেও সবটা হচ্ছে না। হচ্ছে না মানে লিপি কিন্তু একটি ভাষার শেষ কথা নয়। লিপি নির্বাচনের পর আরো অনেকগুলি কাজ বাকি থাকে, সেই কাজগুলি তো হচ্ছে না। হয় নি। লিপি যদি শেষ কথা হত তাহলে ত্রিপুরায় চাকমা, মগ ভাষার নিজস্ব লিপি আছে। সেই ভাষাগুলি কি সমৃদ্ধি লাভ করেছে, করছে? নন্দ দেববর্মা জানান, রোমান হরফেও যখন ককবরকে ভাব প্রকাশের সব স্তরে যেতে পারছিলাম না তখন আমরা সিল বা সেন্ট্রাল ইন্সটিটিউট ফর ইন্ডিয়ান ল্যঙ্গুয়েজের সঙ্গে যোগাযোগ করি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক-এর অধীন এই সংস্থা আমাদের জানিয়ে দেয় গবেষনার কাজগুলি যতদিনে শেষ না হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত রোমান হরফে কি লিখতে হবে কীভাবে লিখতে হবে। সেই সব দলিল দস্তাবেজ আছে আমাদের হাতে।

ককবরক সাহিত্যসভার সভাপতি ককবরকের বিশিষ্ট গীতিকার সুরকার বিকাশরাই দেববর্মা বলেন, ককবরকে দেবনাগরি লিপির কথা বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নতুন করে লিপি বিতর্ক উস্কে দিচ্ছেন তাতে সন্দেহ নেই। এই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে রাজ্য সরকার, শিক্ষা দফতরের কাছে স্পষ্টীকরন চাইব ত্রিভাষা নিয়ে। প্রথম থেকে দশম পর্যন্ত হিন্দি পড়ানো বাধ্যতামুলক বলে যখন বলা হল তখন ত্রিভাষার কি হবে এই রাজ্যে? ইংরেজি বাধ্যতামূলক থাকবে, হিন্দি যদি অবশ্যপাঠ্য হয় তাহলে বাংলা তো রাজ্যের সামাজিক ভাষা। ককবরক কোথায় থাকবে? নাকি ককবরক ভাষাভাষীর এলাকায় বাংলা বাদ দেওয়া হবে? নাকি এই রাজ্যে চতুর্ভাষা চালু হচ্ছে? দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষাদান এই দেশে শিশুর ঘোষিত অধিকার। এই রাজ্যে ১৯টি উপজাতি গোষ্ঠীর মধ্যে দুইটি অস্তিত্বহীন। সাতটি গোষ্ঠির ভাষা ককবরক। তাহলেও জনসংখ্যার যে বিন্যাস তার প্রেক্ষিতে ১১ ধরনের লিপি দরকার। সরকার এই নিয়ে কিছু কি ভেবেছে? ত্রিপুরা বোর্ড থাকাকালে যে সব স্কুলে ককবরক পড়ানো হত সিবিএসসির অধীনে বিদ্যাজ্যোতি প্রকল্পের অধীন হবার পর সেই সব স্কুলে এখন আর ককবরক পড়ানো হোচ্ছে না। এই সময়ে প্রায় ৪০ হাজার প্রাথমিকের ছাত্র মাতৃভাষা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জাতীয় শিক্ষানীতি এখানে অসাড়। তৃতীয়ত, লিপি বিতর্কে ৪৫ বছর সময় কেটে গেল। একটি ভাষার উন্নয়নে সরকারের যে ভূমিকা থাকার কথা তা কি রয়েছে ককবরকের ক্ষেত্রে? লিপির পরবর্তী পর্যায়ে কর্পাস প্ল্যানিং, স্ট্যান্ডারাইজেশনের কোন আয়োজন নেই সরকারি ভাবে। ব্যাক্তি উদ্যোগে এই সব কাজ করা সম্ভব নয়। দরকার প্রাতিষ্ঠানিক ও যৌথ উদ্যোগের। এই নেই গুলির সংখ্যা বিশাল। এই কারনেই কি লিপি বিতর্ক ফিরিয়ে আনা?