শীতের কুয়াশা যখন একটু একটু করে শহরকে জড়িয়ে ধরছে, তখনই দুটি নবীন প্রাণের উৎসাহে এক অনন্য উৎসবে যোগ দিতে কোলকাতা থেকে নাগাল্যান্ডের দিমাপুর যাবার উড়ান ধরেছিলাম। বিমানের জানলা দিয়ে সহস্র জল বিভাজিকা আর গিরিখাতের মধ্যে টুকরো মেঘ আটকে ছিল। তাড়াতাড়ি দৃশ্যপট বদলানোয় ছবি আর তোলা হয়নি। আসলে ছবি তোলা আর প্রাণ ভরে দেখা দুটো কাজ একসঙ্গে ঠিক সামলানো গেল না।
দিমাপুর থেকে নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমা হয়ে কিসামা গ্রামে যখন পৌঁছলাম তখন সেখানে বিকেল সাড়ে পাঁচটার অন্ধকার! পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি হচ্ছে সেখানে। সে যাত্রাপথের অভিজ্ঞতা ধূলোয় ধূসর। পাথুরে ধাক্কা অবশ্যই সুখকর নয়। হোম স্টেতে ছিলেন এক ষাটোর্দ্ধ সুইস দম্পতি। তাঁদের সঙ্গে পরিচয় হবার পর জানলাম তাঁরা সাইকেল চালিয়ে ঐ পথে এসেছেন। সাইকেলেই কোলকাতা ভ্রমণে যাবেন! একথা শুনে নিজেদের কষ্ট একটু কম মনে হল।

পরদিন সকাল বেলাতেই আমরা পৌঁছে গেলাম পাহাড়ঘেরা-কিসামায়। সেখানেই তৈরি হয়েছে নাগা হেরিটেজ ভিলেজ। উৎসবের পোশাকি নাম হর্নবিল ফেস্টিভাল। প্রতি বছর সরকারী উদ্যোগে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দেশবিদেশ থেকে অতিথি সমাগম হয় এখানে। নাগা পাহাড়ের অধিবাসীদের রঙবেরঙের বিচিত্র সংস্কৃতির ঝলক পাবার জন্যে।
হর্নবিল বা ধনেশপাখি নাগা সংস্কৃতি, লোককথায় আমাদের মা লক্ষ্মীর বাহনটির মতই আদরের। এই রঙিন পাখিটি বিশালতায়, সৌন্দর্যে, অরণ্যের গরিমা রক্ষা করে চলেছে। এদের রঙিন পালকে নাগারা সাজায় তাদের মাথার টুপি। তাদের কাছে এটি বড় সম্মান এবং গৌরবের। ধনেশ পাখির নামেই তাই এই উৎসবের আয়োজন।

নাগা পাহাড়ের আনাচে কানাচে, বিশাল অঞ্চল জুড়ে সাজানো হয় তাদের সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক। পার্বতীয় প্রকৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত তাদের খাওয়াদাওয়া সাজপোশাক, রীতিনীতি, নাচগানবাজনা, যুদ্ধবিগ্রহ এবং সর্বোপরি সাহস ও সারল্য। এদের বিভিন্ন উপজাতির মধ্যেও পোশাকের রঙের ফারাক, ভাষায় বিভিন্নতা, রীতিনীতিতেও পার্থক্য। তারা আমাদের থেকে আলাদা তো বটেই, নিজেরাও স্বয়ংসম্পূর্ণ এক একটি গোষ্ঠী।
তবে আলাদা হয়েও এ উৎসবে বৈচিত্র্যের, রঙের, আনন্দের, প্রাণের সমারোহ! কি দেখব আর কি দেখব না! একবার দৌড়ে যাচ্ছি লালফুলের টায়রা পরা, শঙ্খমালা পরা সুন্দরীদের দেখতে। মুগ্ধ হচ্ছি তাদের খোঁপার সাজ, কোমরের চন্দ্রহার, রঙিন পোশাক, পুঁতির মালা দেখে। তারা নিজেরাই নেচে গেয়ে উঠছে বিয়ের উৎসবে, ফসল কাটার মরশুমে, তাঁত বোনার ছন্দে।

পুরুষরা দলবেঁধে যুদ্ধ যাত্রায়, শিকারে, জীবনের প্রতিটি ওঠাপড়ায় গাইছে উদ্দীপনার গান। তাদের শিরস্ত্রাণ বিস্মিত করছে আমাদের। কারোর টুপিতে ধনেশ পাখির পালক, কোনো টোপরে হিংস্র জন্তুর দাঁত বা নখ, কারোর মাথায় তীরের ফলা। রণপা পায়ে, বর্শা নিয়ে, তীরধনুকের খেলায় বিস্মিত করছে আমাদের। দেখাচ্ছে মার্শাল আর্ট। উল্লসিত হচ্ছে প্রাকৃতিক উপায়ে আগুন জ্বালিয়ে। তাদের নাচের ছন্দে আমরাও দুলে উঠেছি। গুনগুন করেছি গানের সুরে।
হাসিমুখে নাগাসুন্দরীরা বাঁশের গ্লাসে পরিবেশন করছে রাইস বীয়ার, কালো চা। তাদের রঙিন পোশাকে সাজিয়ে দিচ্ছে অতিথিদের। বললেই বাজিয়ে শোনাচ্ছে মাদল, বাঁশি, শিঙা, একতারা, দোতারা, আরো কত কি অজানা বাজনা।

উৎসবের আঙিনায় কেউ নিবিষ্ট হয়ে ছবি আঁকছে, কেউ কাঠের কাজ করছে, কেউ তাঁত বুনছে। রঙবেরঙের সাল,পুঁতির মালা, কাঠের-মাটির বাসন, ঘর সাজানোর জিনিস আরো কত কি পশরা সাজানো রয়েছে মেলায়।
আমাদের বাঙালি রসনা অবশ্য নাগা খাবারের স্বাদ গ্রহণ করতে পারেনি। সাহসও হয়নি ভূত ঝলকিয়া নামের বিশ্বের তীব্রতম ঝাল লঙ্কাটির স্বাদ নেওয়ার। তবে ক্ষেত থেকে সদ্য পেড়ে আনা আনারস খেয়েছি। রাস্তায় ছোট্ট ছেলেটি ঝুড়ি মাথায় বয়ে আনল রসালো আনারস। মা ঝটপট কেটে তাকে কোনের আকার দিল। একটা কাঠি গুঁজে তাতে সামান্য লঙ্কা আর নুনের গুঁড়ো মাখিয়ে আমাদের হাতে তুলে দিল। নামমাত্র দামে আমরা পেলাম অনন্য আনারসের স্বাদ। নাগাদের কথায় সেটি নাকি নাগাদেরই স্বভাবের মত। বাইরে কঠিন, ভিতরে রসালো।

সন্ধ্যেবেলা পাহাড়ের বুকে সঙ্গীতের আসর। উত্তুরে হিমালয়ের ঠান্ডা বাতাস তখন উৎসবের আঙিনায়। অথচ এ আমেজ ছেড়ে যাবার অনিচ্ছে সবার। তাই শুরু হল উদ্দীপনার গান, — Nothing can stop us, We are the free.
যীশুখ্রীস্টের জন্মদিনও দোরগোড়ায়। নাগাল্যান্ডের সভ্যতা-সংস্কৃতিতে ক্রীশ্চান মিশনারীদের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। তাই প্রভু যীশুর আগাম আগমনবার্তা গেয়ে উঠল ক্যারলগ্রুপ। প্রতিধ্বনিত হল তা পাহাড়ে, পাহাড়ে। আমরাও তাদের সঙ্গে গেয়ে উঠলাম, —

Go tell it on the mountain
Over the hills and everywhere
Go tell it on the mountain
Our Jesus Christ is born…

When I was a seeker
I sought both night and day
I asked the Lord to help me
And he showed me the way…

মনে হল ঈশ্বর নানাভাবে আমাদের পথ দেখান। পথটি খালি খুঁজে নিতে হয়।
এত অপূর্ব ভ্রমণকাহিনী আমি খুব কম পড়েছি… এক অজানা সংস্কৃতির সাথে কী সুন্দর ভাবে পরিচিত হলাম… অসাধারণ… সাথের ছবিগুলোও খুবই সুন্দর… !!
শুভেচ্ছা সতত। ভালো থেকো।
দারুণ লাগল! ছবিগুলোও জীবন্ত। লংকার ছবি দেখে বড়ই লোভ দিলাম।????
থ্যাঙ্কু গো। অনেক ভালোবাসা।
ছবি গুলো এত রঙীন , আমি বড্ড লাল রং ভক্ত , সেখানে জুডেছে আবার সবুজ হলুদ , রাজপোশাক গুলোও কি সুন্দর । আর তোর লেখাও তত রঙীন । কত সহজে আর সুন্দর করে তুই অন্যদেশের সাথে পরিচয় করাল আমাদের ❤️