ছোটবেলায় “এ তে—এক্কা গাড়ী খুব ছুটেছে” পড়লে চোখের সামনে ভাসতো তেজিয়ান ঘোড়া টগবগ করে গাড়ি ছুটিয়ে নিয়ে চলেছে। কিন্তু এখন আর সেই এক্কা গাড়ি খুব ছুটতে দেখা যায় না। নিয়মের বেড়াজালে পথও থমকে দাঁড়িয়েছে ওদের জন্য। “কেন রে তুই চড়লি ওরে বাবুদের জুরি গাড়িতে”…. গান থেকে বোঝা যাচ্ছে, কোন এককালে এই ঘোড়ার গাড়ি ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। গল্প- উপন্যাস- সিনেমাতে আজো এই গাড়ী স্ট্যাটাস সিম্বল।
ঘোড়ায় টানা দুই বা ততোধিক চাকার গাড়িকে এক্কা, টমটম, জুরি, টাঙ্গা গাড়ি বলে। কলকাতা ইতিহাস চর্চাকারীদের সূত্র অনুযায়ী, রানী ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুর পর লর্ড কার্জন তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে সৌধ তৈরি করার পরিকল্পনা করেন। ১৯২১ সালে উদ্বোধন হওয়া স্মৃতিসৌধ পর্যটকদের ঘোরার জন্য ঘোড়া গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়। সেই হিসাবেই ইতিহাসের পাতায় শতবর্ষ হয়ে গেলো ঘোড়া গাড়ির।

উনিশ শতকের মাঝ পর্ব থেকে কিছু বনেদি বাড়িতে ঘোড়ার গাড়ি এসেছিলো। ব্রিটিশ আমলে কলকাতায় ঘোরাগাড়ি ছিলো যাত্রী পরিবহণের ভরসা। ঘোড়াদের জলপানের জন্য তৎকালীন পুরসভা রাস্তার ধারে চৌবাচ্চার মতো লোহার পাত্রের ব্যবস্থা করে। উন্নত করা হয় সড়ক ব্যবস্থাও। ঘোড়ায় টানা ট্রামও চলতো একদা। তবে তা এখন অতীত। প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে আছে ঘোড়ার গাড়ির ভবিষ্যতও।
ঘোড়ার গাড়ি বন্ধ করা হোক এই নিয়ে একটি জনস্বার্থ মামলা করা হয়। মামলা দায়ের করেন পিপল ফর এথিক্যাল ট্রিটমেন্ট ফর অ্যানিম্যালস (পেটা)। মামলাকারী স্বেচ্ছাকারী সহস্থার আবেদনে তুলে ধরা হয় ঘোড়ার স্বাস্থ্য নিয়ে। পর্যাপ্ত খাবার-পরিচর্যা না পাওয়ায় দরুণ অসুস্থ, পঙ্গু ঘোড়াগুলো কে জুরিগাড়িতে জুড়ে পর্যটকদের ঘোরানো হচ্ছে। বম্বে হাই কোর্ট ইতিমধ্যে জুরিগাড়িকে নিষিদ্ধ করেছে।

রাজ্য সরকার কলকাতা হাইকোর্টকে জানায় যে, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এবং ময়দানের চারপাশে ঘোড়ার গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি নীতি তৈরি ও তার প্রণয়ন করতে কিছুটা সময় লাগবে। হাইকোর্ট ২৮ ফেব্রুয়ারি এই বিষয়ে আবার শুনানি করবে।

ঘোড়ার গাড়ি চালকদের লাইসেন্স আছে কিনা তা জানতে চেয়েছিল আদালত। বর্তমানে ২৯টি লাইসেন্স প্রাপ্ত ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে। ১৩টি গাড়ি লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে। বাস্তবে, এর বাইরেও কিছু গাড়ি চলে। প্রধান বিচারপতি প্রকাশ শ্রীবাস্তব ও বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজের ডিভিশন বেঞ্চ এই বিষয়ে শুনানি করছে।
পেটা জানিয়েছে যে ১৪ জুলাই ২০২১ থেকে এক মাসের জন্য, বিশেষজ্ঞদের একটি চার সদস্যের দল ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে ৮০টি ঘোড়া এবং নিবেদিতা সেতুর নীচের ঘোড়াগুলি পরীক্ষা করেছে। দলটি দেখেছে যে বেশিরভাগ ঘোড়ার শরীরে আঘাত ছিল— তাদের মধ্যে কিছু ট্র্যাফিক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিল। কমিটি দেখেছে ঘোড়াগুলো প্রাথমিক চিকিৎসা বা সেবা পায়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে নির্বিচারে প্রজনন সমস্যা অসুস্থতা আরও বাড়িয়ে তুলছে। প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে যে এই ঘোড়াগুলির মধ্যে ৮০% এর লোহিত রক্তকণিকার সংখ্যা এবং রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কম ছিল। তাদের অধিকাংশই রক্তাল্পতাহীনয় ভুগছিল।

আদালতে পেটার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায় রাজ্য। অধিকাংশ ঘোড়াকেই শনি ও রবিবার বাদ দিয়ে যততত্র ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। এই দুদিন গাড়ির সঙ্গে এদের জুড়ে দেওয়া হয়।
ক্রমশ কমতে শুরু করেছে ঐতিহ্যের এই গাড়ি।
লাল, রুপোলি, সোনালির মতো উজ্জ্বল রঙয়ের গাড়িগুলো কাঁচ, আয়নার টুকরো, এলইডি লাইট, প্লাস্টিকের ফুল দিয়ে সাজিয়ে বিয়ে, সিনেমা, ময়দানের হাওয়া খাওয়ানোর মধ্যে দিয়ে চলছে এদের রুজি রোজগার। করোনার প্রকোপে লকডাউনের সময় সমস্যা বেড়ে গেছিল প্রচুর। তবে, আজো দ্রুত বদলাতে থাকা শহরটায় নস্ট্যালজিয়া মাখানো টগবগ শব্দ শুনতে চায় বহুমানুষ।
Source: Adapted from various articles.
Eta kolkatar pride…save horse cart
বেশ ভালো লেখা