নজরুল ১৯১৭ সালে প্রথম কলকাতায় আসেন। এরপর ১৯২০ সাল থেকে কলকাতায় নিয়মিত থাকতেন। কর্মসূত্রে কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে, বিভিন্ন সময়ে তিনি বাস করেছেন। কলকাতার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, সভায়, আকাশবাণীতে তাঁর অসংখ্য গান গীত হয়েছে। চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য বিভিন্ন স্টুডিও-তে তিনি দিনের পর দিন উপস্থিত থেকেছেন। গান রেকর্ড করতেও তিনি গেছেন বহু কোম্পানীর অফিসে। উত্তর থেকে দক্ষিন কলকাতাময় ছড়িয়ে আছে তাঁর স্মৃতি। আমাদের এই প্রতিবেদনে শুধুমাত্র যেসব বাড়িতে তিনি বাস করেছেন এবং সম্পাদিত পত্রিকা প্রকাশ করেছেন সেই বাড়িগুলির একটি তালিকা তুলে ধরার চেষ্টা করছি। সবগুলি বাড়ির অস্তিত্বও বর্তমানে পাওয়া যায় না। সঙ্গে অতি সংক্ষিপ্ত বিবরণীর মাধ্যমে সেই বাড়িগুলির পরিচয় দিচ্ছি।
সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে যাবার সময়ে নজরুলের সঙ্গী হয়েছিলেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। আসানসোলে এস.ডি.ও’র কাছ থেকে চিঠি নিয়ে দুজন কলকাতায় এসে ওঠেন শৈলজানন্দের মামারবাড়ি ৭১ সুকিয়া স্ট্রিট। সেটা ১৯১৭ সাল।
নজরুলের প্রথম ছাপা লেখা ‘বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী’ প্রকাশিত হয় সওগাত পত্রিকার প্রথম বর্ষ সপ্তম সংখ্যায়। নজরুল তখন থাকতেন করাচীতে। ১৯১৯ সালের মে-জুন মাসে। সওগাত পত্রিকার অফিস তখন ছিল কলকাতার ৮ নম্বর জ্যাকেরিয়া স্ট্রিটে।
৩ নম্বর কলেজ স্কোয়ারে ‘মোসলেম পাবলিশিং’ হাউসই ছিল ‘মোসেলেম ভারত’ পত্রিকার প্রকাশক। ১৯২০ সালের এপ্রিল মাস থেকে এই পত্রিকার আত্মপ্রকাশ ঘটে। প্রথম সংখ্যা থেকেই নজরুলের ‘বাঁধনহারা’ উপন্যাস প্রকাশিত হয়।

নজরুল ইসলামের সঙ্গে মুজাফ্ফর আহ্মদ-এর প্রথম যোগাযোগ হয়েছিল ১৯২০ সালের জানুয়ারি মাসে। ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিট তখন ছিল বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’-র অফিস। পরে এখানেই তিনি মুজফ্ফর আহ্মদ-এর সঙ্গে এক ঘরে বাস করতেন। ১৯২২ সালে এই ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিট থেকেই নজরুল সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রখম প্রকাশিত হয়। পরে অবশ্য অষ্টম সংখ্যা থেকে পত্রিকার দপ্তর উঠে যায় ৭, প্রতাপ চ্যাটার্জি লেনের ঠিকানায়। এই বাড়িটি ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটের পাশেই। ৭ প্রতাপ চ্যাটার্জি লেনের দোতলার ঘরে ছিল ‘ধূমকেতু’-র দপ্তর। সাংবাদিকতায় নজরুলের হাতে খড়ি সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ-এ। ১৯২০ সালের ১২ জুলাই ৬ নম্বর, টার্নার স্ট্রিট (এখন নাম আব্দুর রহমান স্ট্রিট) থেকে এ.কে ফজলুল হকের মালিকানায় প্রকাশিত হয় দৈনিক নবযুগ পত্রিকা। পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন নজরুল ও মুজফ্ফর আহ্মদ। এই সময়ে মুজফ্ফর আহ্মদ ও নজরুল থাকতেন ৮/৩ টার্নার স্ট্রিটের একটি ঘরে। বর্তমানে বাড়িটির অস্তিত্ব নেই। সেখানে একটি বহুতল বাড়ি হয়েছে।
‘বল বীর বল উন্নত মম শির …’ যে কবিতা লিখে নজরুল বিদ্রোহী অ্যাখ্যা পেলেন, যেটি লেখা হয়েছিল ৩/৪ সি, তালতলা লেনের একটি বাড়িতে। ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে এই তালতলা লেনের বাড়িতে মুজফ্ফর আহ্মদ-এর সঙ্গে থাকতেন নজরুল।
৩৭, হ্যারিসন রোডের বাড়িতে ছিল লেবার স্বরাজ পার্টি এবং নজরুল সম্পাদিত লাঙ্গল পত্রিকার দপ্তর। ঐতিহাসিক বাড়িটি ‘পূরবী’ সিনেমার উল্টোদিকে। লাঙ্গল পত্রিকা প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে।
১৯২৭ সালে নজরুল সক্রিয়ভাবে ‘গণবাণী’ পত্রিকায় যোগ দেন। ২/১, ইউরোপীয়ান অ্যাসাইলাম লেন (এখন নাম আবদুল হালিম লেন) ছিল গনবাণী পত্রিকার দপ্তর। নজরুল এখানে নিয়মিত আসতেন। ১১, ওয়েলেসলী রোড-এ (এখন নাম রফি আহ্মদ কিদোয়াই রোড) ছিল সাপ্তাহিক ‘সওগাত’ পত্রিকার দপ্তর। নজরুল ১৯২৯ সালে এখানে কিছুদিন বাস করেছিলেন।
নজরুল অনেকগুলি বাড়িতে বেশ কিছুদিন করে বাস করেছিলেন। ১৯২৮ সালে শিল্পী নলিনীকান্ত সরকারের বাড়িতে ছিলেন। আবার ওই বছরের শেষদিকে বেশ কিছুদিন ছিলেন এন্টালির ৮/১, পানবাগান লেনের বাড়িতে। ১৯৩৩-৩৫ সালে থাকতেন ৩৯ সীতানাথ রোডের বাড়িতে। ৫এ-জি, হরি ঘোষ স্ট্রিট-এ থাকতেন ১৯৩৮ সাল নাগাদ। ১৫/৪ শ্যামবাজার স্ট্রিট-এ থাকতেন ১৯৪৬ সালে। নজরুল দীর্ঘদিন কাটিয়েছেন ক্রিস্টোফার রোডের বাসভবনে।