কয়লাঘাটা যে আদতে ছিল কয়ালঘাটা সে নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে কখন থেকে লোকমুখের অপভ্রংশে কয়াল বাবাজীবনের জান কয়লা হয়ে গেল, সেটা ভেবে দেখতেই হয়। ভাবতে ভাবতেই একটন সূত্র মেলে। সবিস্তারে বলা যাক এবার।
ভারতীয় শিল্প-বাণিজ্যের অগ্রণী পুরুষ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরই প্রথম রানিগঞ্জের একটি কয়লাখনির পত্তন করেছিলেন। বাঙালির ব্যবসাবিমুখ অপবাদ ঘুচিয়ে দ্বারকানাথ ঠাকুর সে দিন যে কারিগরি দক্ষতা দেখিয়েছিলেন, তা এখনও কয়লা উত্তোলক সংস্থাগুলির কাছে এক বিস্ময়। দ্বারকানাথের সৃষ্টি সেই খনি ও বাংলোর ধ্বংসাবশেষ এই এলাকার বাসিন্দাদের কাছে গর্বের বিষয়।
ভারতে কয়লা খননের আঁতুড়ঘর রানিগঞ্জ। ১৭৪৪ সালে প্রথম এখানে ইংরেজ সাহেবরা মাটির তলা থেকে কয়লা তুলতে শুরু করে। কিন্তু ইতিহাস দাবি করেছে, দ্বারকানাথ ঠাকুরই প্রথম ভারতীয় যিনি ব্রিটিশ শিল্পপতি তথা ইংরেজ বন্ধু উইলিয়াম কার-এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কয়লাখনি গড়ে তুলেছিলেন। সংস্থার নাম দিয়েছিলেন কার এন্ড টেগোর কোম্পানি। ১৮৩৫ সালে খনি-শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে দামোদর নদের তীরবর্তী নারানকুড়ি গ্রামে ওই ভূগর্ভস্থ কয়লাখনি খনন করা হয়। খনি-বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, বিশাল একটি কুয়োখাদ বানিয়ে তার দেওয়াল কেটে সুড়ঙ্গ তৈরি করে মাটির গভীর থেকে কয়লা খুঁড়ে বের করার পরিকল্পনা করে এই কোম্পানি। কিন্তু ভূগর্ভের কয়লা উপরে তোলা হবে কী করে? জানা যায়, খনি থেকে কিছুটা দূরে একটি ঘরে কপিকলের মতো বিশাল একটি যন্ত্র বসানো হয়। যন্ত্রের সঙ্গে প্যাঁচানো মোটা লোহার তারের উলটো প্রান্তে সার বেধে জোড়া থাকত একাধিক ডুলি। এতেই কয়লা চাপিয়ে, তার গুটিয়ে কয়লা উপরে তোলা হত। ঠিক যেমন ইঁদারা থেকে জল তোলা হয়। ভূগর্ভে শ্রমিকদের নিয়ে যাওয়া ও ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্যও এই ডুলি ব্যবহার করা হত। এই পদ্ধতির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘হলেজ’ পদ্ধতি। যে ঘরে যন্ত্রটি বসানো ছিল তার নাম ‘হলেজ ঘর’। এই পুরো কাজটি হাতে নয়, বাষ্পীয় যন্ত্রের মাধ্যমে চালিত হত। খনি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এখনও দেশের সমস্ত ভূগর্ভস্থ কয়লাখনিতে এই পদ্ধতিতেই কয়লা তোলা হয়। তবে বাষ্পীয় যন্ত্রের পরিবর্তে বিদ্যুৎ-চালিত যন্ত্র বসানো হয়েছে।

আজও নারানকুড়ি গ্রামের ওই পরিত্যক্ত কয়লাখনির পাশে গেলে জঙ্গলে ঘেরা সেই হলেজ ঘরটির দেখা মেলে। খনি থেকে প্রায় তিনশো মিটার দূরেই ছিল প্রশাসনিক ভবনটি। সেখানেই বসে নিয়মিত কাজের তদারকি করতেন দ্বারকানাথ ও উইলিয়াম কার। পাশের একটি ভবনে ছিল অধস্তন কর্মচারীদের ঘর। শোনা যায়, খনির কাজ দেখাশোনা করার জন্য নিয়মিত সেখানে আসা-যাওয়া করতেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। বারকয়েক নাকি তাঁর সঙ্গে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথও। প্রায় ১৯০ বছরের পুরনো ওই হলেজ ঘরটির দেখা মিললেও প্রশাসনিক ভবনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত। তবে খুঁজলে পুরনো ইট, মেঝের টালির দেখা মেলে।
কয়লা উত্তোলনের পরে কোথায় সরবরাহ হত সেই কয়লা? ইতিহাস বলছে, উত্তোলিত কয়লার বেশির ভাগই চলে যেত উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। কিছুটা সরবরাহ হত বিহারে। খনি থেকে তোলা কয়লা গরুর গাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হত নারানকুড়ি গ্রামের সীমান্তে মুক্তেশ্বরী মন্দির ঘাটের জেটিতে। সেখানে নৌকায় কয়লা চাপিয়ে তা পাঠানো হত কলকাতার কয়লাঘাটায়।
রানিগঞ্জ থেকে কয়লা পরিবহণের জন্য মুক্তেশ্বরী মন্দির জেটিও তৈরি করেছিলেন দ্বারকানাথ। এখন সেখান থেকে নৌকা পারাপার হয় না, তবে সেই জেটির ধ্বংসাবশেষ আজও আছে। এক সময় দ্বারকানাথের মনে হয়, নৌকায় করে কয়লা পরিবহণ অত্যন্ত বিপজ্জনক, আর লাভজনকও নয়। তাই কলকাতা থেকে রানিগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথ পাতার পরিকল্পনাও করছিলেন তিনি। কিন্তু তখন নেটিভদের রেললাইন পাতার অনুমতি দেওয়া হত না। তাই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁকে রেললাইন পাতার অনুমোদন দেয়নি। তবে পরবর্তী কালে ১৮৩৭ সালে ইংরেজ সরকারই রেললাইন পাতার কাজটি করেছে।

তা, প্রশ্ন হল কলকাতায় গঙ্গার এতসব ঘাট থাকা সত্ত্বেও কয়লাঘাটাতেই কেন দ্বারকানাথের কয়লা নামানো হত? আরও কাছে পাথুরিয়াঘাটা, নিমতলা ঘাট, আর্মেনিয়ান ঘাট তো ছিল? আসলে কয়লাঘাটায় কয়াল বা ওজনকারী তথা মাপদারদের গোলা ছিল। কয়লাখনি থেকে ওজন না করা কয়লার এখানে ওজন করত কয়ালরা।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেরেস্তার প্রথমযুগের কাগজপত্রেও কয়াল পদটির উল্লেখ আছে।
কয়লাঘাটার নাম তখন ছিল কয়ালঘাটা। যেমন ভবানীপুরের আদিগঙ্গার তীরে এখনও বহাল তবিয়তে আছে কয়ালঘাট। পরে দ্বারকানাথের কয়লার ঠ্যালায় ভাগীরথীতীরের কয়ালঘাটাও লোকমুখে কয়লাঘাটায় পরিণত হল।