জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৭২ সালে ২৮ জুলাই দিনটিকে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবসের মর্যাদা দেয় ‘জীববৈচিত্র্য রক্ষা, অবক্ষয়িত বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। প্রতি বছর দিনটি পালিত হলেও গত দু’দশক ধরে প্রচুর বনভূমি যে আমাদের দেশ থেকে হারিয়ে গিয়েছে সেকথা আড়াল করার কোনো উপায় নেই। আরও অবাক করার মতো বিষয় হল বন সম্পর্কিত তথ্য নিয়ে ভারত সরকারের প্রচার করা তথ্যের সঙ্গে বেসরকারি সংস্থা গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ বা জিএফডাব্লু-এর (Global Forest Watch) তথ্যের মধ্যে আসমান জমিন ফারাক। জিএফডাব্লু-এর তথ্য থেকে জানা যায় যে, গত বিশ বছরের মধ্যে ভারত থেকে প্রায় ৪০২ হাজার হেক্টর বনভূমি হারিয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে দেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় প্রচারিত ভারতের বন জরিপ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী গত বিশ বছরে দেশের বনভূমি সামগ্রিকভাবে ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জিএফডাব্লু জানাচ্ছে ২০০৩ সালে ভারত প্রায় ১০.৩ হেক্টর বনভূমি হারিয়েছে। ২০০৮ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে হয় ২০.৭। এইভাবে বছরের পর বছর ধরে বনভূমি হারানোর সংখ্যা ওঠানামা করে ২০১৪ সালে ২১.৯ হেক্টরে পৌঁছায়। অথচ ভারতের বন জরিপ (এফএসআই) জানায় যে, দেশের সামগ্রিক বনভূমি ২০০৩ সালে ছিল ৬৭,৮৩৩.৩ হেক্টর, ২০২৩ সালে তা বেড়ে হয় ৭১,৫৩৪.৩ হেক্টর। অর্থাৎ বিশ বছরে ভারতের বনভূমি ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভারতের বন জরিপ (এফএসআই) অনুসারে, ১০ শতাংশের বেশি গাছের ঘনত্ব এবং এক হেক্টরের বেশি এলাকা সহ যেকোনো ভূমি হল বন। এর মানে হল, ব্যক্তিগত বৃক্ষরোপণ বা স্থানীয় নয় এমন বৃক্ষ-আচ্ছাদিত এলাকাকেও বনভূমি হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে। কিন্তু পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন অন্য কথা। তাদের বক্তব্য, এফএসআই মূলত সবুজ আচ্ছাদনের উপর ভিত্তি করে বনকে সংজ্ঞায়িত করছে, কিন্তু এটি অগত্যা বন বাস্তুতন্ত্র এবং রেকর্ডকৃত বনাঞ্চলের জন্য হিসাব করে না। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, কীর্তি বর্ধন সিং, লোকসভায় বলেছিলেন যে ভারতীয় বন রাজ্য প্রতিবেদন ২০২১ এবং গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের তথ্যের মধ্যে যে বৈপরীত্য ঘটেছে তা দুটি প্রতিবেদনে দেওয়া বনভূমি এবং বৃক্ষভূমির সংজ্ঞার পার্থক্যের কারণে হতে পারে।
এফএসআই-এর তথ্য অনুসারে, ১৫টি রাজ্যের প্রায় সবকটিতেই ২০০৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বনভূমির বৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে। যদিও এফএসআই-এর থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, ওই বিশ বছরের মধ্যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের মধ্যে চারটিতে বনভূমির সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। যেমন নাগাল্যান্ডে ১০.২ শতাংশ, ত্রিপুরায় ৬.৩ শতাংশ এবং মণিপুরে ৩.৭ শতাংশ বনভূমি হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু জিএফডাব্লু জানাচ্ছে যে ২০০২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে বনভূমির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। যার মধ্যে অরুণাচল প্রদেশে প্রায় ১৩৯ হেক্টর, আসামে ৭১ হেক্টর এবং মেঘালয়ে ৫১ হেক্টর বনভূমি হ্রাস পেয়েছে। জাতীয় বন্যপ্রাণী বোর্ডের স্থায়ী কমিটি থেকে জানা যায়, মেঘালয় এবং অরুণাচল প্রদেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন জমিগুলি মূলত স্থানান্তরিত চাষের কারণে বনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এইসব জায়গায় পতিত জমির ফলে অনেকেই তাদের জমিগুলিকে ভিন্ন ভিন্ন ধরণের ভূমি ব্যবহারের জন্য পরিবর্তিত করছে। তাছাড়া কয়লা খনির কারণেও বনভূমির হ্রাস ঘটেছে। মোটকথা গত দশ বছরে দেশের বনভূমি হ্রাসের পরিমাণ প্রায় ৬,৬৮,৪০০ হেক্টর, যা বন উজাড়ের হারে গোটা বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয়। ওই দশ বছর সময়ের মধ্যে প্রায় ৪৬,০০০ বর্গ কিলোমিটার বনভূমি উজার হয়ে গিয়েছে- এটি ভারতের বন সংরক্ষণের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়।
বনভূলি এইভাবে কমে যাওয়ার কারণ একাধিক, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণ হল — কৃষি সম্প্রসারণ, বেহিসাবি নগরায়ন, বেআইনিভাবে গাছ কাটা এবং খনিজ উত্তোলন। বনভূমি কমে যাওয়ার ফলে পরিবেশগত ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে, কার্বন নিঃসরণ বাড়ছে, জীববৈচিত্র্য হ্রাস পাচ্ছে এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। প্রশ্ন হল, কোথায় গেল দেশের ২৩.৩ লক্ষ হেক্টর জমির গাছ? কেন কমছে সবুজের আচ্ছাদন? একটি বেসরকারি প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, মানুষের এবং প্রাকৃতিক দুই কারণেই সবুজের আচ্ছাদন কমেছে। গাছপালা কমেছে ব্যাপক হারে গাছকাটা, আগুন লাগা, দাবানল এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ঝড়ের কারণে। গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের তথ্য অনুসারে, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত, ভারতের প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের ৯৫ শতাংশ সবুজই কমে গিয়েছে। আরও জানা গিয়েছে, গত আড়াই দশকে ভারতে যত গাছপালা কমেছে, তার ৬০ শতাংশের জন্যই দায়ী উত্তর পূর্ব ভারতের পাঁচটি রাজ্য। গ্রিন ট্রাইবুনালের মতে এই বিপুল সবুজের ক্ষতি হয়েছে বন সংরক্ষণ আইন, ১৯৮০, বায়ু (দূষণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ) আইন এবং পরিবেশ সুরক্ষা আইন লঙ্ঘন হওয়ায়।
সাধারণ হিসাব অনুসারে ভারতের বনগুলি বছরে ৫১ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত করে এবং ১৪১ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড অপসারণ করে। কিন্তু ব্যাপক হারে গাছের ক্ষতি হওয়ায় প্রতি বছর গড়ে ৫১.০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে নির্গত হয়। জানা গিয়েছে, গত দশ বছরে ১.১২ গিগাটনের সমান কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হয়েছিল। কারণ, বনভূমি যখন পুনরায় বৃদ্ধি পায় তখন বায়ু থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড অপসারণ করে। তবে, জলবায়ু, পরিবেশের হাল নিয়ন্ত্রণে থাকে। এরপর ওই বনভূমি যখন ধ্বংস হয়ে যায় তখন তা থেকে ডাই অক্সাইড নির্গত হতে থাকে। এইভাবে, বনের ধ্বংস জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে। বনভূমির ক্ষতি যে সব সময় বন উজাড়ের ফলে হয়, তাও নয়। অনেক সময় মানুষের তৈরি কারণেও প্রাকৃতিক বনভূমি চিরতরে অপসারিত হতে পারে।