সৌম্য সিংহ
হাওড়া পুরসভারও ভোট আসছে। মোট ওয়ার্ড ৬৬।
নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপরে সাধারণ মানুষের অগাধ আস্থা, বিশ্বাস। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেও একমাত্র আশা–ভরসা বলতে তিনিই। কিন্তু হাওড়ার কয়েকটি ওয়ার্ডে স্থানীয় কাউন্সিলরের কাজকর্মে, আচরণে বিরক্ত ওয়ার্ডের মানুষ। দল হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি ভরসা অটুট থাকলেও কিছু ওয়ার্ডের কাউন্সিলররা পুনরায় মনোনয়ন পাক সেটা ভোটাররা চাইছেন না। সকলেই জানেন, দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অসৎ, অযোগ্য ব্যক্তিদের যে টিকিট দেবেন না, সে বিষয়ে সকলেই নিশ্চিত।
হাওড়া শহরের কিছু ওয়ার্ডে এটাই এখন কঠিন বাস্তব। সেই কারণেই হাওড়ার পুরভোটে সঠিক প্রার্থী বাছাই করতে কার্যত সমীক্ষা শুরু করে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের জেলা নেতৃত্ব। ওপর থেকে একতরফাভাবে কোথাও কোনও প্রার্থী চাপিয়ে না দিয়ে সাধারণ কর্মী-সমর্থক, এলাকার মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাইছে দল। জেলা সভাপতি (সদর) অরূপ রায় ইতিমধ্যেই খোলামেলাভাবে কথা বলতে শুরু করেছেন বিভিন্ন ওয়ার্ডের তৃণমূলস্তরের কর্মীদের সঙ্গে। মত বিনিময় করছেন দলীয় সমর্থক এবং সাধারণ ভোটারদের সঙ্গেও। কখনও এলাকায় ঘুরে আবার কখনও ঘরোয়া বৈঠকে বোঝার চেষ্টা করছেন মানুষের মন। কোনও কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে এক বা একাধিক অভিযোগ থাকলে কিংবা তাঁর ব্যক্তিগত আচরণ এবং কাজকর্ম সাধারণের চোখে আপত্তিকর বলে মনে হলে, তিনি নেগেটিভ মার্কিং পাবেন।
এটা ঘটনা যে, ২০১৩-য় হাওড়া পুরসভা তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে আসার সঙ্গে সঙ্গেই শহরের উন্নয়নের জন্য দরাজ হাতে টাকা বরাদ্দ করতে শুরু করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। বামফ্রন্ট আমলে যে হাওড়া দীর্ঘ অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার হয়ে এসেছিল, গঙ্গার পশ্চিমপাড়ের ঐতিহ্যবাহী সেই হাওড়া শহরকে কিন্তু উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার। শহরের রূপ বদলানোর জন্য প্রথমেই ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল রাজ্য। তারপরে ধারাবাহিকভাবে কয়েকশো কোটি টাকা মঞ্জুর করা হয়েছে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে। উন্নয়ন হয়েছে, তবুও কোথায় যেন কিছু কিন্তু থেকে গেছে। সংখ্যায় অল্প হলেও কিছু নির্বাচিত পুরপ্রতিনিধির কাজকর্ম, আচরণ, দুর্ব্যবহার ক্রমশ গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রমশ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন এই কাউন্সিলররা। জানা গেছে, হাওড়ার মোট ৬৬টা ওয়ার্ডের মধ্যে প্রায় ১৯ থেকে ২০টা ওয়ার্ডে এই বিষয়টা প্রকট হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটা ওয়ার্ডের সমস্যা বেশ জটিল আকার নিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে কিছু প্রকল্প রূপায়ন, তার প্রয়োজনীয়তা এবং পরিচালন ব্যবস্থা নিয়েও। কোথাও আবার কথা বেশি কাজ কম কিংবা নিপাট ফাঁকিবাজিও আছে। দলীয় নেতৃত্ব সময় থাকতে সতর্ক করলেও তাতে আদৌ কান দেননি সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলররা। ফলে নির্বাচনের মুখে আদাজল খেয়ে ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমেও ওই বিশেষ এলাকাগুলোতে রীতিমতো কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হতে হচ্ছে জেলা সভাপতি মন্ত্রী অরূপ রায়কে। প্রার্থী বদলের দাবি ক্রমশ জোরদার হচ্ছে। গুটিকয়েক ওয়ার্ড এতটাই স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে যে সংগঠনকে ঢেলে সাজিয়ে চাঙা করে তুলেও কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রশমিত করা সম্ভব হচ্ছে না আদৌ। প্রকৃত অর্থেই তৃণমূল কংগ্রেস অধ্যুষিত এলাকা, অথচ আসন ধরে রাখতে ভাবতেই হচ্ছে প্রার্থী বদলের কথা। কী বলছেন অরূপ রায়? খুব খুলে না বললেও সমস্যার কথা মোটেই অস্বীকার করছেন না তিনি। কঠোর বাস্তববাদী এই নেতার স্পষ্ট কথা, হাওড়ার উন্নয়নের জন্য দরাজ হাতে খরচ করেছে রাজ্য সরকার। নতুন জীবন পেয়েছে এই শহর। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি গভীর আস্থা এই শহরের মানুষের। তাই দলের প্রতিটি পুরপ্রতিনিধির ভাবমূর্তিটা অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। সেখানে কারও কাজকর্ম, আচরণ, জীবনযাত্রা এবং ব্যবহারে অসঙ্গতি থাকলে জনমানসে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। তাই প্রশ্নটা যেখানে বিশ্বাসযোগ্যতার, সেখানে ভোটারদের আগাম মতামতকে গুরুত্ব তো দিতেই হবে। কারণ জয়-পরাজয় তো তাঁদেরই হাতে। ব্যক্তিগতভাবে কাউকে আড়াল করতে গিয়ে বা তুলে ধরতে গিয়ে দলের স্বার্থ তো বিসর্জন দেওয়া যায় না। মানুষ কী চাইছে তা সঠিকভাবে বুঝতে পারলে এবং সেইমতো চলতে পারলে ভোটের ফলাফল আরও ভালো হবেই। মাথা তুলতে পারবে না গেরুয়া-শক্তিও। ঠিক সেই কারণেই সম্ভাব্য প্রার্থী-তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে এই বিষয়টা অবশ্যই খতিয়ে দেখা হচ্ছে গভীরভাবে। প্রস্তুত করা হচ্ছে সমীক্ষা রিপোর্ট। তারপরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই শীর্ষ নেতৃত্বের।