| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

হুদুর দুর্গা – আমাদের বহুতর সংস্কৃতির না-কথিত বয়ান : প্রলয় চক্রবর্তী

Reporter
প্রলয় চক্রবর্তী / ১৬৭৭ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২

২০১৬ সালের আশ্বিন মাস। অসুর পুজো দেখতে চলেছি ভালাগোড়া গ্রামে। পুরুলিয়ার কাশীপুর ব্লকের অন্তর্গত গ্রাম ভালাগোড়া। গোঁসাইডি-বীরসিংহবাড়ি পেরিয়ে সোনাইঝুড়ি পঞ্চায়েত। পাকা রাস্তা পেরিয়ে ভিতরে ঢুকতেই সোনাইঝুড়ি হাইস্কুলের মাঠ। এখানেই হয় ‘অসুর পুজো’। বেশ বড় মাঠ, ময়দান বলাই ভাল। স্থানীয় আদিবাসী মানুষের কাছে ‘ডাহি’।

দুর্গাপুজোর নবমীর দিন আদিবাসী, না-আদিবাসী প্রচুর মানুষের ভীড় হয় এখানে। স্থানীয় মানুষ ছাড়াও ঝাড়খন্ড, বিহার, উড়িষ্যা থেকেও আসেন আদিবাসীরা। রাতভোর চলে তাদের অনুষ্ঠান। বিনতী গান, দাঁশায় নাচ, কাঠি নাচ, পাতা নাচ, ঝুমুর, করম নাচ করতে করতে মাতোয়ারা হয় ভালাগোড়ার রাত দিন। এসব আয়োজনের প্রাণপুরুষ অজিত প্রসাদ হেমব্রম।

পুজো হয়ে গেছে আগের দিন। আমরা পৌঁছেছি দুর্গাপুজোর দশমীর দিন। খেলার মাঠের পাশে লম্বা এক ছাতিম গাছ। গাছের সামনের দিকে লাল সিমেন্টের প্রশস্ত বেদী। এখানেই কথা হল অজিত হেমব্রমের সঙ্গে। অসুর পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা। সারা রাত জাগার ক্লান্তি চোখেমুখে। আমাদের গাড়িতে ছিল সরকারি গাড়ির স্টিকার। দেখেই বললেন, ‘স্কুলের একটা ঘরে আমাদের পুজো হত। স্কুলের মাথারা আর পঞ্চায়েত মিলে আমাদের মাঠে নামিয়ে দিল। ওদের জায়গায় পুজো করতে দেবেনা বলে’। বিডিও কে জানিয়েছিলেন? জিজ্ঞেস করতেই বললেন, দুদিন গেছি, দেখা পাই নাই। আর কি হবে, ওরা আমাদের কথা শুনবেক নাই। অজিত হেমব্রম অবশ্য এই অনুষ্ঠানকে পুজো বলতে চাননা। ওর কথায়, এটা শহীদ স্মরণ অনুষ্ঠান। অনার্য সাঁওতাল, মুন্ডা, অসুর, কোল, কুড়মি, কোড়া প্রভৃতি খেরওয়াল গোষ্ঠীর আদিবাসীদের আদিপুরুষ ছিলেন ঘোরাসুর বা মহিষাসুর। তাকেই আমরা বলি হুদুড় দুর্গা। হুদুড় কথার অর্থ বীর। আর কোন দুর্গের প্রধান পরিচালক হলেন ‘দুর্গা’। অর্থাৎ দুর্গ থেকে দুর্গা। আমাদের কাছে হুদুর দুর্গা সিধু-কানু, বীরসার মতই একজন বীর, দেশপ্রেমিক। বহিরাগত আর্যরা অন্যায় যুদ্ধে, তাঁকে বধ করে আমাদের মাতৃভূমির দখল নিয়েছিল। আপনাদের ‘দেবী’ দুর্গা নবমীর দিন তাঁকে হত্যা করেন। তাই এই দিনটিতেই আমরা আমাদের রাজা হুদুর দুর্গাকে স্মরণ করি। তাই এইদিন আমাদের কাছে দুঃখের দিন, হুদুর কে স্মরণ করার দিন।

বাঙালির জীবনে দুর্গোৎসব এক জাতীয় উৎসব। পুরান কাহিনীর ধর্মীয় বিশ্বাসে প্রতি বছর আশ্বিন মাসে অসুরনিধনকারী দেবী দুর্গার পুজো কে কেন্দ্র করে বাঙালি হিন্দু যখন উৎসবে মাতোয়ারা হয়, সেই উৎসবের রোশনাইয়ের মধ্যে নিহিত থাকে আদিবাসী জনজাতির মধ্যে পূজিত মহিষাসুর তথা অসুর জনজাতির অপমানের ব্যথাও।

‘মহিষাসুর নির্নাশি ভক্তানং সুখদে নমঃ’ মন্ত্রে বিভোর মানুষের কাছে দেবী দুর্গা হয়ে ওঠেন সব শুভের আধার, আর মহিষাসুর অশুভের প্রতীক। তাই আদিবাসী ও অসুর সম্প্রদায়ের মানুষরা দুর্গা পুজোর দিনগুলিতে স্মরণ করেন তাদের দেবতা মহিষাসুর কে। এ এক বিকল্প আখ্যান বা কাউন্টার টেলিং।কলকাতা থেকে অনেকদূরে, বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে এভাবেই চলে এক বিকল্প দুর্গার আবাহন। তাঁদের দুর্গা কোন দেবী নন, পুরুষ। তিনিই আদিবাসীদের পূজিত হুদুর দুর্গা। আদিবাসী জনজাতির মানুষ মনে করেন, দুর্গা পুজো হল আর্য সাম্রাজ্যবাদী উৎসব, এর বিকল্প হলেন হূদুড়। ইনি আদিবাসীদের আদিপুরুষ ঘোরাসুর বা মহিষাসুর। বিদেশি আর্য রমণী দ্বারা অন্যায় নিধনের ফলে ভূমিপুত্র আদিবাসীরা দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হারায়। সেই শোকেই তারা পিতৃপুরুষ হুদুর স্মরণে এই পুজো করেন। পুজোয় ফুল, বেলপাতা, নীলপদ্ম, সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণের কোন অনুষঙ্গ নেই। এর পরিবর্তে তারা সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে ছাতা উত্তোলন করেন। হুদুর দুর্গার মাথার উপর থাকে এই ছাতা।একারণে একে ছাতা ধরা উৎসবও বলে।

কিছুদিন আগেও এ পুজোর কথা তেমন ভাবে নাগরিক সমাজে আসেনি। ভদ্রলোক বাঙালি কেবল শুভ-অশুভের কাহিনীতেই অভ্যস্ত ছিল।অপরিচিত হুদুর দুর্গা তার কাছে এক আসুরিক বিস্ময়। এই বিস্ময় ধাক্কা খায় জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ‘মহিষাসুর শহিদ দিবস’ পালন কে কেন্দ্র করে। সে সময় লোকসভায় এক বিবৃতিতে মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী বলেন, এই কাজ দেশের সংস্কৃতি বিরোধী, দেশবিরোধী কাজ। শহিদ দিবস উদযাপিত হয় ২০১৪ সালে, আর মন্ত্রী বিবৃতি দেন ২০১৬ তে একটি প্রচারপত্র কে কেন্দ্র করে! পৌরানিক এক কাহিনী যা বর্তমান কাল পর্যন্ত প্রবহমান, আমাদের ইতিহাস চেতনা সম্পর্কেই প্রশ্ন তুলে দেয়।

মহিষাসুর আদিবাসী ও ভারতের প্রান্তিক মানুষদের কাছে এক ‘নায়ক’। যেমন অসুর এক সম্প্রদায় যারা মহিষাসুর পুজো করেন।ঝাড়খন্ডের এক বিস্তৃত অঞ্চলে এদের বসবাস। তাদের কাছে মহিষাসুরের করুণ পরিনতি বেদনার। দেবী দুর্গার পুজো যদি হতে পারে, মহিষাসুরের কেন নয় ! আমাদের ঔচিত্য চেতনা বড় গোলমেলে। বেতারে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তা যখন তুঙ্গে তখন গোঁড়া ব্রাহ্মনরা এর প্রতিবাদ করেছিলেন। পিতৃতর্পণ শেষ হওয়ার আগে এক অ-ব্রাহ্মনের কণ্ঠে (বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র) চণ্ডীপাঠ , সে তো চরম অ-শাস্ত্রীয় ঘটনা! সংস্কৃত জানা পণ্ডিতদের সেই অ-সংস্কৃত আচরণের কথা অনেকেই মনে করতে পারেন।

গত কয়েকবছর ধরে হুদুর দুর্গা পুজো বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পশ্চিম বর্ধমান, ঝাড়গ্রাম ও উত্তরবঙ্গের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে সাতশো টি জায়গায় হুদুর দুর্গা স্মরনে পুজো হয়েছে। অবশ্য এরা বলেন পুজো নয়, এ হল শহিদ হুদুর দুর্গা স্মরনে তাদের শ্রদ্ধার্ঘ। বাঙালি আচারে হুদুর দুর্গা অপরিচিত। সে কারনেই পুরুলিয়ার কাশীপুর ব্লকের ভালাগোড়া গ্রামের সোনাইঝুড়ি আঞ্চলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে হুদুর স্মরন অনুষ্ঠান করার অনুমতি মেলেনা। হয়ত বিজাতীয় এই উৎসবে তারা নেই, তাই অনুমতিও নেই! আদিবাসীদের হুদুড় স্মরণ অনুষ্ঠান করতে হয় মাঠের পাশের মহুয়া গাছের বাঁধানো বেদিতে। অন্যদিকে রামচন্দ্রের অনুগত সেবক বানানোর এক প্রক্রিয়ার অঙ্গ হিসেবে চলছে পবনপুত্র অনুসারীদের আগ্রাসন। আদিবাসী এলাকায় এর দাপট বেশ দৃশ্যমান! ব্রাহ্মন্যবাদী সংস্কৃতির আঙিনায় সব চিন্তার আত্মসমর্পনের বিকল্পে নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চায় কেন এত বাঁধা, এ প্রশ্ন উদ্বিগ্ন করছে আদিবাসী জনজাতির মানুষকে।

জনজাতি ইতিহাস লেখেনা। পুরাণ তো অনেকদূর। তারা পরাজিত। বিজয়ীরাই ইতিহাস লেখেন। রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ সবই বিজয়ীদের আখ্যান। অথচ এই আখ্যানের খাঁজে খাঁজে থাকে পরাজিতদের বঞ্চনার কথা, অন্যায় সমরের কথা, ন্যায়ধর্ম বিসর্জনের কথা। এভাবেই উঠে আসে অমৃত ভাগে দেবতাদের ছলনা, রামচন্দ্রের হাতে শূদ্র শম্বুকের মুণ্ডছেদ, গুরুদক্ষিণার নামে একলব্যকে ধনুকহীন করার কথা। অসুররা স্বর্গ, মর্ত্য, পাতালের অধীশ্বর হওয়ার ক্ষমতা রাখত, এও তো বিজয়ীদের আখ্যানেই শ্রুত। পুরানে উল্লেখ আছে যিনি কুশদ্বীপের অধিপতি ছিলেন সেই ঘোরাসুরই মহিষাসুর নামে খ্যাত। দুর্গা শব্দের সহজ অর্থ দুর্গাধিপতি বা সেনাধ্যক্ষ। দেবী দুর্গা দেবতাদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মহিষাসুরকে বধ করে স্বর্গ কে মুক্ত করতে। একই অর্থে ঘোরাসুর বা মহিষাসুরকে অসুর সেনা দুর্গের পরিচালক হিসেবে দুর্গা বা হুদুর দুর্গা বলা হয়ে থাকে। তিনি মায়াবী অসুর, নানা বেশে স্বচ্ছন্দ। এমন তো নয়, দেবতা বা আর্যায়িত সংস্কৃতি আলাদা কিছু! নানা রূপ, নানা ভঙ্গিমায় দেবতারা কম কিছু নন, বরং কিছুটা এগিয়েই! অথচ এই বিশ্বায়নের যুগেও অসুর জাতির অবদমন একই সনাতনী সুতোয় বাঁধা।

প্রাচীন কালে রাজা সুরথ তাঁর হারানো রাজ্য ফিরে পেতে দুর্গাপুজো করেছিলেন। সেই পুজো বর্তমানে বাসন্তী পুজো নামে পরিচিত। কিন্তু যে পুজোকে কেন্দ্র করে আজকের বাঙালির দুর্গোৎসব, মহিষমর্দিনী-রূপে দুর্গাদেবীর শরৎকালীন অকালবোধন তার সূচনা করেছিলেন রাজশাহীতে তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ খাঁ। বহু লক্ষ টাকা ব্যয় করে তিনি এই পুজো করেন বলে কথিত। রাজা কংসনারায়ণ-এর এই ব্যয়বহুল দুর্গাপুজোর খবর ছড়িয়ে পড়লে তৎকালীন বঙ্গদেশের রাজা-মহারাজা, জমিদাররা তাদের পৌরুষ, প্রতিপত্তি ও ঐশ্বর্য দেখানোর তাগিদে ‘মহিষমর্দিনী’ দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় কবি কৃতিবাস ওঝা রাবন বধের উদ্দেশ্যে রামচন্দ্র নীলপদ্ম নিবেদনে দুর্গাপুজো করেছিলেন — এমন কাল্পনিক কাহিনির অবতারণা করেন। বাল্মিকী রামায়ণে যার উল্লেখ নেই! এভাবেই বাংলায় দুর্গাপুজোর হিড়িক পরে যায়, বর্তমানে যা সর্বজনীন রূপ পেয়েছে। তখন সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কৃত হয়নি, ভারতের মূলনিবাসী মানুষের কথা আলোচনায় আসেনি। আর্যরাই ভারতের আদিম অধিবাসী — এই ধারণায় আপ্লুত দেশবাসী জারিত হয়েছিল এক কল্প ইতিহাসের ঘেরাটোপে, যার প্রতিফলন আমাদের রাজনীতি, সমাজনীতিকে আজও সস্ক্রিয়। কোন একটি রাজনৈতিক দল বর্তমানে যার ধারক বাহক বলে নিজেদের দাবি করে থাকে।

একারণেই আজ উত্তর উত্তর ও দক্ষিন দিনাজপুর, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, পুরুলিয়া, পশ্চিম বর্ধমান, এমনকি রাঁচী, গুমলা, হাজারিবাগের অসুর জনগোষ্ঠীর মানুষ চরম ক্ষোভে-দুঃক্ষে ও অপমানে বাঙালির দুর্গোৎসব এর কটা দিন বাড়ির বাইরে বেরোতে চাননা। প্রাচীন কালে মহিষাসুরকে নিধন করে আর্যরা যখন আনন্দ উৎসবে মেতেছিল, তখন বিজিত অনার্যরা ‘দিকু’ আর্যদের বশ্যতা না মেনে তীর ধনুক কে সেরেঞ্চ বা ভুয়াং বানিয়ে, নারীর ছদ্মবেশে নাচ- গানের অভিনয় করতে করতে বন জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে নিজেদের মান বাঁচিয়েছিল।

ভারতের ৮০ শতাংশ ভূমিপুত্রদের উত্তসূরীরা দীর্ঘদিন যাবত আর্য উচ্চবর্গীয়দের শাসনাধীন থাকার ফলে এবং তাদের ‘সারি ধর্মের’ থেকে অজ্ঞানতাবশত হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার ফলে আজ এক নিরালম্ব জনগোষ্ঠীতে পরিনত। তাদের জীবন ও সংস্কৃতিতে ঘটে গেছে স্মৃতি ও ইতিহাসের বিস্মরণ। সাংস্কৃতিক এক নির্বাকায়ন। তাই উত্তর ও পূর্ব ভারতে রাবন বধ এর উৎসব তাদের চেতনায় ধরা পরেনা। দক্ষিন ভারতে মহাজ্ঞানী রাবনের পুজো এ বঙ্গের মানুষের কাছে এক অদ্ভুত রঙ্গ বটে! একারণেই হয়তো মধুসূদনের ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’ বাঙালির গণচেতনায় সাড়া ফেলেনা। গত শতকের আশির দশকে ‘নিম্নবর্গের ইতিহাস’ আলোচনায় সে অর্থে প্রথম রণজিৎ গুহের ‘একটি অসুরের কাহিনী’ তাৎপর্যপূর্ণভাবে এক জিজ্ঞাসা নিয়ে উপস্থিত হয়। এই আলোচনায় মধুসূদন সরাসরি না এলেও গভীরতর অর্থে এই জিজ্ঞাসার সূত্রপাত করেছিলেন তিনি তাঁর মেঘনাদবধ কাব্যে।

আশ্বিন মাস আদিবাসীদের কাছে দাঁশাই মাস। এই মাসে তারা তাদের রাজাকে হারায়। তাই এই মাস তাদের কাছে দুঃখের মাস। দুর্গা পুজোর ষষ্ঠী থেকে দশমীর দিন পর্যন্ত ‘দাঁশায় পরব’ হয়। অতি করুন সুরে হায়রে হায়রে বলে গান করে কাঠি নাচের সঙ্গে তারা খোঁজ করেন তাদের হারিয়ে যাওয়া রাজাকে, তাদের প্রাণের ঠাকুর হুদুর দুর্গাকে।এ গানের অর্থ হল— দুর্গা অন্যায় সমরে তোমাকে বধ করেছে। হে বীর, তোমার পরিনামে আমরা দুঃখিত। তুমি আমাদের প্রণাম নাও।

আমাদের বহুতর সংস্কৃতির এও এক না-কথিত বয়ান।

ঋণ

১. ভালাগোড়ায় অজিতপ্রসাদ হেমব্রমের সঙ্গে ব্যক্তিগত কথোপকথন

২. অসুর আখ্যান : আবাদভূমি, তৃতীয় বর্ষ, সপ্তম সংখ্যা, ২০১৭

৩. নিম্নবর্গের ইতিহাস : গৌতম ভদ্র ও পার্থ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev