১৯৫৫ সালের মে মাসে ভারতবর্ষের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু লোকসভার একটি বিলের ওপর বক্তৃতা দিয়েছিলেন। বিলটি ছিল ‘হিন্দু-কোড-বিল’। যার মর্মার্থ হলো হিন্দু বিবাহ আইন ও ভারতীয় নারীর সামাজিক অধিকারটিকে সুরক্ষিত করা। স্বাধীন ভারতের পার্লমেন্টে নারীর সামাজিক অধিকার বিষয়ে এটিই ছিল প্রথম রাজনৈতিক তর্ক। এই আইনটির প্রাথমিক খসড়া করেছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম আইনমন্ত্রী বি আর আম্বেদকর। আম্বেদকর তাঁর খসড়ায় যে কয়েকটি বিষয়ের ওপরে জোর দিয়েছিলেন তার মধ্যে ছিল নারীর নিজস্ব বিবাহসঙ্গীকে খোঁজার অধিকার, বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার, পিতার সম্পত্তিতে নারীর অংশের অধিকার ইত্যাদি ইত্যাদি। নেহরু এই বিষয়ে লোকসভায় বলতে গিয়ে বলেছিলেন স্ত্রী-পুরুষ সম্পর্কের নজির কত খারাপ আমাদের দেশে, তা কতটা কুৎসিত এবং নারী সম্পর্কে পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি কতখানি সামন্ততান্ত্রিক। সৌরাষ্ট্রের উদাহরণ দিয়েছিলেন নেহরু। বলেছিলেন, সেখানে গড়ে প্রতিদিন একটি করে নারী আত্মহত্যা করে শুধুমাত্র পুরুষদের অত্যাচারে। বলেছিলেন, সেখানে নারী আত্মহত্যার খতিয়ান বছরে তিনশো পঁচাত্তর জন। নেহরু আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, এই আইন পাশ হবার পরেও এই পুরুষবাদী সামন্ততান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভারতবর্ষ রক্ষা পাবে কিনা তিনি নিশ্চিত নন, যদিও ভারতের ‘প্রকৃত আত্মা’কে নারীরাই প্রকাশ করতে পারে, পুরুষরা নন। যদিও সেই আত্মার প্রকাশের ক্ষেত্রে ‘নারী’ত্বের যে গুণগুলো নেহরু দেখেছিলেন যথা— সৌন্দর্য, আভিজাত্য, আকর্ষণীয় ক্ষমতা, লাজুকত্ব, বিনয়, বুদ্ধিমত্তা, ত্যাগের মর্মকে অনুধাবন করা— তা আধুনিক নারীবাদের কাছে কতটা গ্রাহ্য হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়, তবু এ কথা মানতেই হবে নেহরু আনীত এই বিল ভারতীয় গণতন্ত্রে একধরণের সদর্থক নিরীক্ষা। নেহরুর সংশয় অবশ্য রয়েই গেছিল যার মূল কথা ছিল পুরুষতন্ত্র নারীর এই স্বাভাবিক অধিকারকে কখনওই মান্যতা দেবে না।
স্বাধীন ভারতবর্ষের সংসদীয় রাজনীতিতে সম্ভবত সে কারণেই যাঁরা নারী হিসেবে ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছেন কী জাতীয় বা কী আঞ্চলিক স্তরে তাঁদের পেছনে সবসময়ই কোনও না কোনও পুরুষ থেকেছেন। হয় পিতা বা স্বামী বা ‘মেন্টর’ হিসেবে। ব্যতিক্রম একজনই। তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভানেত্রী তথা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি নিজে বারবার বলেছেন, তিনি নারীবাদী নন বরং একজন মানবতাবাদী। যেটি সব অর্থেই নারীবাদীদের জন্য একটি অনন্য ও অনুপম উদাহরণ। এই হিউম্যানিস্ট দর্শনের মূল কথা হলো স্ত্রী এবং পুরুষকে তাঁদের লিঙ্গভেদের ঊর্ধ্বে উঠে শুধুমাত্র মানুষ হিসেবেই তাকে দেখা। এই মতবাদ পাশ্চাত্য দর্শনে এতটাই তীব্র ও অভিঘাতী যে অন্যতম মানবতাবাদী দার্শনিক আর্নেস্ট রেনাল ঊনবিংশ শতাব্দীতেই ঘোষণা করেছিলেন যে ভবিষ্যতে ধর্মের বিকল্প কোনও মতবাদ যদি পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হয় তবে তা হিউম্যানিজম তথা মানবতাবাদ। ভারতীয় সংবিধানের ১৪-১৮ ধারা অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিককে তাঁদের লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম, সম্প্রদায় নির্বিশেষে সমান অধিকার দেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখা যায় তবে বলতেই হবে, তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে যেভাবে একক সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে শীর্ষে উঠেছেন তা ওই নেহরু কথিত অলীক স্বপ্নকে অতিক্রম করে গিয়ে নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নেরই এক আধুনিক মহাকাব্য।
তাঁর আন্দোলনও সবসময়েই সেই সমানাধিকারকে মর্যাদা দান করেছে। নিম্নবর্গের মানুষ, সাধারণ মানুষ, পিছড়ে বর্গ, প্রান্তিক মানুষ, সব মিলিয়ে নেত্রীর কথায় ‘মা-মাটি-মানুষ’, তাঁদের লড়াই, সংগ্রাম ও অধিকারকে সুনিশ্চিত করে সামাজিক স্তরে সেই ভারতবর্ষীয় অন্বিষ্ট গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। তিনি কখনওই ভুলে যাননি আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা ও বিন্যাসে বৈষম্য রয়েছে, ভারতীয় সংবিধান বলা সত্ত্বেও সব নাগরিককে সমানাধিকার দেওয়া হয় না। তাই তৃণমূল কংগ্রেস ভারতবর্ষের অন্য সব দলের তুলনায় ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সব থেকে বেশি নারী প্রতিনিধিত্ব দিয়েছিল ১৮.৫ শতাংশ। দূরবর্তী দ্বিতীয় দলটি অনেক পেছনে মাত্র ১০.৩ শতাংশ। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও সারা রাজ্যে সর্বাধিক মহিলা প্রতিনিধিত্ব দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসই যা হলো ১৪.৯ শতাংশ। বামফ্রন্ট, কংগ্রেস, বিজেপি বা অন্যান্য দলগুলির থেকে অনেক এগিয়ে। এটাও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই পারেন। সেই সঙ্গে এ-ও মনে রাখতে হবে লোকসভায় প্রান্তিক নারীদের অধিকার ও নির্বাচনে তাঁদের সংরক্ষণ নিয়ে স্বাধীন ভারতবর্ষে প্রথম কথা বলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই। যেখানে বিজেপি, কংগ্রেস বা বামফ্রন্ট, যারা সংসদে অনেক পুরোনো কথা, যারা মুখে সমানাধিকারের ও প্রান্তিক মানুষদের কথা বলে কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তারা কোনওদিন এ ধরনের চিন্তা প্রকাশ্যে আনেনি। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মা-মাটি-মানুষ’-এর মানসিক দর্শনচিন্তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এত বছরের উচ্চবর্ণীয় ও উচ্চশ্রেণির সামাজিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, যা দরিদ্র ও সংখ্যালঘু মানুষদের শোষণের বিরুদ্ধে এবং সামাজিক ভারসাম্যের পক্ষে। আধুনিক ভারতবর্ষে এক্ষেত্রে তিনিই আমাদের পথ প্রদর্শক।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, আমাদের সমাজে লিঙ্গ-সম্পর্ক নির্ধারণে লিঙ্গ, বর্ণ, জাতি, সম্প্রদায় এ সবই এক একটা বর্গ। এইগুলোই আবার একে অপরকে গঠন করে। ফলে সমাজে মহিলা ও পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক নির্ভর করে, তাঁরা সমাজের কোন পরিকাঠামোতে অবস্থান করেন তার ওপর। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় উচ্চ জাতি ও উচ্চবিত্ত মহিলারা নিম্নবর্গ ও নিম্নজাতির পুরুষের তুলনায় বেশি ক্ষমতাবান। আবার এইভাবেই একজন মহিলা শ্রমিকের চেয়ে হয়তো বা একজন উচ্চবিত্ত মহিলা তাঁর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ‘পুঁজি’র ভিত্তিতে অনেক বেশি ক্ষমতাশালী। তেমনই পরিবার, রাষ্ট্র, ব্যক্তি এই বিষয়গুলিকে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা নানা আলোক থেকে দেখার চেষ্টা করেন। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবারের পরিভাষা ও কর্তৃত্বের সংজ্ঞাকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে পুনর্নিমাণ করেছেন তা আজ বহু সমাজবিজ্ঞানীর কাছেও গবেষণার বিষয়। তিনি তাঁর দলকেই তাঁর পরিবার হিসেবে দেখেন, যেখানে তিনি একইসঙ্গে অভিভাবক তথা রক্ষক। তিনিই দলের সর্বাধিনায়িকা ও সবার দিদি। একাধিক গবেষক দেখিয়েছেন, তিনি রাজনীতিকে সম্পূর্ণ অন্য এক মাত্রা দিয়েছেন— যা কেতাবি নয়, যা এমনকী সাবেকি যুক্তি দিয়েও ব্যাখ্যা করা যায় না। তাঁর ব্যক্তিগত আবেগ, ভাষা ও কমিউনিকেশন সমস্ত শ্রেণির মানুষের মন ছুঁয়ে যায় বলেই তিনি আজ গণদেবতার এত কাছাকাছি। খুব স্বাভাবিকভাবেই তাই ভারতবর্ষে প্রথম তাঁরই দলের নাম তৃণমূল এবং তিনি সেই তৃণমূল স্তরে থেকেই সর্বজনীন শ্রেণির নেত্রী। তিনিই ভারতবর্ষে প্রথম কন্যাশ্রী প্রকল্প ২০১৩ সালে চালু করেছেন যা আজ ভারতবর্ষে মেয়েদের মুক্তির প্রথম নিশান। ইউনিসেফ পর্যন্ত এই পরিকল্পনা রূপায়ণে অভিভূত। এই প্রকল্পে আজ পর্যন্ত ২৭ লাখের বেশি মেয়েরা আর্থিক সাহায্য পেয়েছে। তিনিই এ রাজ্যে প্রথম মহিলা থানা তৈরি করেছেন, প্রথম মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছেন। পাশাপাশি তথাকথিত যৌনকর্মীদের সামাজিক মর্যাদা তথা স্বার্থকে সুরক্ষিত করতে চেয়ে তৈরি করা হয়েছে ‘মুক্তির আলো’ প্রকল্প, যাতে তাঁরা সামাজিক পুনর্বাসন পেতে পারেন। এই রাজ্যে মহিলারা সর্বাধিক সুরক্ষিত, বিভিন্ন সমীক্ষাতেই তা প্রমাণিত। সব মিলিয়ে নারীবাদকে তিনি যে মানবতাবাদের মধ্যে স্থাপন করেছেন তা আধুনিক নারীবাদ তাঁর থেকে শিখে নিতে পারে। লিবারাল নারীবাদীরা যতই তাঁকে ‘নারীবাদের সম্প্রসারণ’ হিসেবে এক সামাজিক তকমা দিতে চান না কেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই তত্ত্বকে ভেঙেচুরে এক নব্য মানবতাবাদের প্রতিষ্ঠা করেছেন। যা একান্তভাবেই উত্তর-আধুনিক।
নেহরু তাঁর ওই বক্তৃতায় বলেছিলেন, সেই গণতন্ত্র কখনওই সার্থক হতে পারে না যেখানে মনুষ্যত্বের ৫০ শতাংশ (অর্থাৎ নারী)-কে যদি নিম্নশ্রেণির বৃত্তে ফেলে রাখা হয় বা সমস্ত সামাজিক সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়। নেহরুর ভাষায় ‘তখন তারা বিদ্রোহী হতে বাধ্য এবং তা পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি যথার্থ বিদ্রোহ’। বিদ্রোহ, লড়াই, সংগ্রাম এই শব্দগুলি আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক নতুন অভিধানে স্থান দিয়েছেন। মানবতাবাদের যে স্বপ্ন সদ্যউদ্ভিন্ন ভারতীয় গণতন্ত্র দেখেছিল, আজ নতুন শতাব্দীতে এসে তাকেই বাস্তবায়িত করেছেন তামাম ভারতবর্ষের একমাত্র গণনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
সংগ্রামী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২০১৬ পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত