গৌরকিশোর ঘোষ (২০ জুন, ১৯২৩ থেকে ১৫ ডিসেম্বর, ২০০০) একজন প্রথিতযশা মানবতাবাদী বাঙালি সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। তিনি রূপদর্শী ও গৌড়ানন্দ কবি ছদ্মনামে নিবন্ধ,গল্প ও উপন্যাস রচনা করেছেন।
পোড়খাওয়া জীবনের অধিকারী গৌরকিশোর ঘোষ
বাংলাদেশের বর্তমান ঝিনাইদহ জেলায় হাট গোপালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক পড়াশোনা করেন শ্রীহট্ট জেলার এক চা-বাগানে। শৈশবের কিছুকাল বাংলাদেশে অতিবাহিত হলেও তাঁর কৈশোর থেকে বাকিজীবন কেটেছে নবদ্বীপ ও কলকাতায়। আশৈশব বেড়ে ওঠা শুরু হয় প্রতিকূল নানা পরিস্থিতির সাথে সংগ্রাম করে। তাঁর বৈষ্ণব ভাবাদর্শী, নিরীক্ষাভাবী, সংসার-উদাসী পিতা ১৯৩৫ সালে হাটগোপালপুর ছেড়ে সপরিবারে নবদ্বীপ বসবাস শুরু করে এবং প্রায়শ সংসার ত্যাগ করে নিরুদ্দেশ জীবনযাপন করতে থাকে। ফলে প্রাক্-যৌবন থেকেই পিতার ‘যাযাবর’ সংসারের বোঁঝা বইতে গিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি তাঁকে জড়িয়ে পড়তে হয়েছে ছোট-খাট নানা কাজের সাথে। পাঠ নদীয়া জেলার নবদ্বীপ বকুলতলা উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৯৪৫ সালে আইএস-সি পাশ করেন। ১৯৪১ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত গৌরকিশোর ক্রমাগত পেশা বদলে গেছেন। প্রাইভেট টিউটর, ইলেকট্রিক মিস্ত্রী, খালাসি, রেস্তরাঁর বয়, ট্রেড ইউনিয়ন অর্গানাইজার, স্কুল শিক্ষক থেকে ভ্রাম্যমাণ নৃত্য-সম্প্রদায়ের ম্যানেজার, ল্যান্ডকাস্টমস ক্লিয়ারিং কেরানি, প্রুফ রিডার ইত্যাদি অসংখ্য কাজ করেছেন সাংবাদিক জীবনে প্রবেশের আগে পর্যন্ত।লেখক ও সাংবাদিক হিসেবে খ্যাতি অর্জনের পূর্বে, বিশেষত ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৫১সাল পর্যন্ত তিনি বার বার পেশা বদল করেন।
এক পর্যায়ে তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন। সাংবাদিকদের অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য বহু নির্যাতন সহ্য করেও নিরন্তর সংগ্রামের ব্রতী ছিলেন। মুক্তচিন্তা ও গণতান্ত্রিক চেতনার জন্যে বুদ্ধিজীবী মহলে জনপ্রিয় হন। সাংবাদিক গৌরকিশোর ঘোষের দৃষ্টি ছিল অন্তর্ভেদী, সেই দেখাই তাঁর লেখাকে দিয়েছে বাড়তি সমীহ। তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের বৃত্তে ছিলেন সমাজের মানুষ।
আনন্দবাজার পত্রিকায় তাঁর সাপ্তাহিক কলাম ‘গৌড়ানন্দ কবি ভনে’
অনুজদের কাছে নিজেকে সহজ করে তুলে ধরতে পারতেন গৌরকিশোর ঘোষ। বয়স বা পদের গুরু-দূরত্ব তাঁকে কোনও দিন অনুজদের কাছে অচেনা করে রাখেনি।হাফ পাঞ্জাবি বা ফতুয়ার মতো জামা, ধুতির কোঁচা মাটিতে ঠেকে না। ভারী ফ্রেমের চশমার আড়ালে উজ্জ্বল দৃষ্টি, আর অবিন্যস্ত গোঁফের ফাঁকে একটু হাসির রেখা। সবমিলিয়ে এটাই হল তার চেহারা।
সাংবাদিক গৌরকিশোর ১৯৭৫ সালের ‘মিসা’ (MISA) অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ জন-নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হন। প্রেসিডেন্সি জেলে তাঁকে বন্দী রাখা হয়।জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদী সাংবাদিকতা এবং তাকে গ্রেফতার করে জেলে পোরা হয়।
১৯৭৫ সালে পুজোর ঠিক আগে গৌরকিশোর ঘোষকে গ্রেফতার করা হয়। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় তখন মুখ্যমন্ত্রী। ‘কলকাতা’ পত্রিকায় কিশোর ছেলেকে লেখা বাবা গৌরকিশোরের একটি চিঠি বেরিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে জরুরি অবস্থার অন্ধকারের কথা। প্রতিবাদ করা হয়েছে বাক্স্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে। ততদিনে জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে গৌরদার প্রতিবাদী অবস্থান সকলের জানা হয়ে গিয়েছে।
সাহিত্যিক ও সাংবাদিক হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। কিন্তু সর্বোপরি জনপ্রিয় হয়েছিলেন মানুষ গৌরকিশোর। যে-মানুষ জীবনের প্রতিটি কাজে জড়িয়ে ছিলেন তাঁর মহৎ আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। তাঁর জীবনের মন্ত্র ছিল ‘বন্দে মানবম’। তিনি লিখেছেন, I believe in love, for love and only love makes a man human (সোহিনী ঘোষ, ‘লোকটা’, দেশ, ২০ জানুয়ারি ২০০১)। এই বোধ তিনি ,
তাঁর সাহিত্য বাঙলার বিদগ্ধ পাঠকদের মধ্যে সাড়া ফেলে। আনন্দবাজার পত্রিকায় চাকরি করতেন তিনি। দেশ পত্রিকায় কলাম লিখেছেন। আশির দশকে আজকাল পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। দেশ-মাটি-মানুষ ট্রিলজির দ্বিতীয় খন্ড ‘প্রেম নেই’ গ্রামীণ মুসলিম জীবন নিয়ে সুবিশাল রচনা। দেশ পত্রিকায় এই উপন্যাস ধারাবাহিকভাবে বের হয়। এছাড়া সাগিনা মাহাতো, জল পড়ে পাতা নড়ে, আনাকে বলতে দাও, আমরা যেখানে, লোকটা, রূপদর্শীর সংবাদভাষ্য ইত্যাদি তার অন্যান্য গ্রন্থ। সাগিনা মাহাতো, তপন সিংহর পরিচালনায় চলচ্চিত্রায়িতও হয়েছে। নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন দিলীপ কুমার। গৌরকিশোর সৃষ্ট মজলিশি চরিত্রের নাম ব্রজদা।
সাংবাদিকতার জন্যে তিনি ১৯৭৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কো জয় উক’ স্মৃতি পুরস্কার এবং ১৯৮১ সালে ম্যাগসাসে পুরস্কারে সম্মানিত হন। একই বছর মহারাষ্ট্র সরকারের পুরস্কার, ১৯৯৩ সালে হরদয়াল হারমোনি পুরস্কার, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ পুরস্কার পান। তিনি ১৯৭০ খ্রীষ্টাব্দে আনন্দ পুরস্কার ও ১৯৮২ সালে বঙ্কিম পুরস্কার পান। কলকাতা মেট্রো রেলের নতুন প্রস্তাবিত চিংড়িহাটা স্টেশনটি গৌরকিশোর ঘোষের স্মৃতিতে রাখা হয়েছে।
লেখক-জীবনের অনতিঅতীত ও সমকালীন ইতিহাসের বিষয়কে কেন্দ্র করে কথাসাহিত্য রচনায় যে সকল কথাকার সর্বাধিক সফলতা লাভ করেছেন, গৌরকিশোর ঘোষ তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
আনন্দবাজার থেকে তিনি এক সময় অল্প দিনের জন্য ‘আজকাল’ সংবাদপত্রের প্রথম সম্পাদক হয়ে চলে গিয়েছিলেন। ফিরে আসেন কিছু দিন পর।
প্রসঙ্গত বলতে হয় তার সাংবাদিকতা শুরু ‘সত্যযুগ’ কাগজে। সেখান থেকে আনন্দবাজারে।
রাজনৈতিক বিশ্বাসে গৌরকিশোর ছিলেন র্যাডিক্যাল হিউম্যানিস্ট। মানবতাবাদী, সংস্কাররহিত, উদারপন্থী। ধর্ম, সম্প্রদায়, আচার, নিয়ম কোনও কিছু নিয়ে তাঁর কোনওরকম গোঁড়ামি ছিল না। প্রচলিত রীতি-নিয়মকে কিছুটা অবজ্ঞাই করেছেন নিজের জীবনেও। যেমন, বিয়ে। বাড়ির অমতে বিয়ে করলেন। কলেজ স্ট্রিটে রেজিস্ট্রি সেরে বন্ধু অরুণ সরকারের বাড়িতে ফুলশয্যা হল। পরে একদিন আত্মীয়-বন্ধুদের নিয়ে অনুষ্ঠান। তাতে প্রবেশ মূল্য পাঁচ টাকা! টিকিট না কেটে ঢোকা যাবে না। গৌরদার বাবাকেও টিকিট কাটতে হয়েছিল। আমন্ত্রিত রাজশেখর বসু গৌরদাকে চিঠি লিখে বলেছিলেন, ‘‘তোমার বিয়ে নিয়ে আগ্রহ নেই। আমার আগ্রহ সেই মেয়েটিকে নিয়ে, যে তোমাকে পছন্দ করল।’’
সাংবাদিক গৌরকিশোর ঘোষ সাহিত্যেও কৃতী। সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের স্বীকৃতিতে বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ১৯৮১ তে ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পাওয়ার বহু আগে ১৯৭০ সালে সাহিত্যক্ষেত্রে কৃতিত্বের জন্য আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত হন গৌরবাবু। ঠিক তার আগের বছর, ১৯৬৯ সালে, প্রকাশিত হয় উপন্যাস ‘সাগিনা মাহাতো’। চা বাগানের শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার আন্দোলন। তাঁদের নেতা সাগিনা। যা পরে চলচ্চিত্রে আরও পরিচিতি পায়। কেন্দ্রীয় চরিত্রে দিলীপকুমার। তাঁর অন্যান্য বইয়ের মধ্যে আছে ‘পশ্চিমবঙ্গ এক প্রমোদ তরণী, হা হা’, ‘প্রেম নেই’, ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ প্রভৃতি।
এ ছাড়াও ‘ব্রজদার গুল্পসমগ্র’ রসিক গৌরকিশোরের এক অনবদ্য সৃষ্টি। ব্রজনাথ রায় ছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকার ক্রীড়া সাংবাদিক। সাবলীল ভঙ্গিতে উদ্ভট গুল দিতে জুড়ি ছিল না তাঁর। সেইসব মজার কথা আরও ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে গৌরদা তাঁর ‘রূপদর্শী’র কলমে ধারাবাহিক ভাবে লিখতে শুরু করেন। পরে সেটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। আরও পরে সিনেমা তৈরি হয় ‘ব্রজবুলি’ নামে। ব্রজদার ভূমিকায় উত্তমকুমার।
সঙ্গীতেও যথেষ্ট আগ্রহ ছিল গৌরকিশোরের। ছিল পুরনো রেকর্ড সংগ্রহের নেশা। তাঁর মেয়ে সাহানা বলেছেন, সত্যজিৎ রায় ‘ঘরে বাইরে’ ছবি করার সময় একটি পুরনো গানের রেকর্ড খুঁজছিলেন। গৌরকিশোরের কাছে রাইচাঁদ বড়ালের একটি রেকর্ড ছিল। খবর পেয়ে লোক মারফত সত্যজিৎ সেটি নিয়ে যান। শচীন দেববর্মণের সঙ্গেও খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তার। এতটাই যে, দক্ষিণ কলকাতার সাউথ এন্ড পার্কে তাঁর বাড়িতে কয়েকবার সপরিবার গৌরকিশোরকে ডেকে চর্ব্যচুষ্য খাইয়েছেন শচীনকর্তা।
রিপোর্টার গৌরকিশোরের পরিচিতির জগৎ স্বাভাবিক ভাবেই ছিল বিস্তৃত। তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের বৃত্তে জ্যোতি বসু, সিদ্ধার্থ রায়, চারু মজুমদার, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়রা যেমন ছিলেন, তেমনই ছিলেন শিল্প-সংস্কৃতির বিশিষ্টেরা। সেখানে দল, মত, গোষ্ঠীর কোনও বাছবিচার ছিল না। তবে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক কখনও তাঁর সাংবাদিক সত্তাকে আচ্ছন্ন করেনি। যা উচিত বলে মনে করেছেন পরম বন্ধুর বিরুদ্ধে হলেও সে কথা লিখতে তাঁর দ্বিধা ছিল না। এই আপসহীনতাই গৌরকিশোর ঘোষের অন্যতম ব্র্যান্ডিং।
সাতাত্তর বছর বয়সে ২০০০ সালের ১৫ ডিসেম্বর জীবনাবসান হয় তাঁর। কিন্তু মানবতাবাদী সাংবাদিক ও সাহিত্যিক হিসাবে গৌরকিশোর আজও অমর।
মনোজিৎকুমার দাস, মাগুরা বাংলাদেশ