গল্প : মানুষ
প্রফুল্ল রায়ের গল্পে মানবিক আবেদন শুধুমাত্র বিষয় বা সংলাপ বা চরিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর প্রতিফলন ঘটেছিল গল্পের নামকরণেও। তেমনি একটি গল্প ‘মানুষ’।
‘মানুষ’ শব্দটি বেশ গোলমেলে। গোলমেলে কেন বললাম? ধরুন যদি প্রশ্ন করা হয় মানুষ কাকে বলে? সবাই এক বাক্যে বলবে দ্বিপদবিশিষ্ট জীব মাত্রই মানুষ। কিন্তু প্রফুল্ল রায় ঠিক এই জায়গা থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছেন। তার মতে মানুষ হল সেই যার মধ্যে মনুষ্যত্ব, সহমর্মিতা, সহযোগিতা, গুণ রয়েছে তিনিই মানুষ। যেমন এই গল্পে ভরসালাল।
ভরসালাল একজন অতি সাধারণ মানুষ। ভবঘুরে। এখন সে মিউনিসিপ্যালিটিতে খ্যাপা কুকুর ধরার কাজে চলেছে টাউনে। এটাই মানুষের প্রকৃত মানুষের নিদর্শন।
বৃষ্টির জন্য গাছের নিচে মাঝ বয়সে কয়েকজন লোকের সঙ্গে ওই গর্ভবতী মেয়েটি দাঁড়িয়েছিল। ভরসালাল এসে দাঁড়াল। বৃষ্টি একটু কমলে সকলেই হাঁটা শুরু করল। কিন্তু মেয়েটি ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে থাকে। হঠাৎ শুরু হয় তার শ্বাসকষ্ট। মাঝে মাঝে ভেসে আসছিল মেয়েটির গোঙানীর শব্দ। লক্ষ্য করুন মাঝবয়সি লোকটির সঙ্গে যে ক’জন ছিল তারা কিন্তু মেয়েটির গোঙানীতে নিতে কান দিল না। কান দিল একমাত্র ভরসালাল। সে ইচ্ছা করলে বড় বড় পা ফেলে পাহাড় ডিঙিয়ে চলে যেতে পারত। কিন্তু মেয়েটিকে ওই অবস্থায় দেখে তার পা যেন আটকে গেল। তার মনে ‘কেমন যেন মমতা বোধ করতে লাগল’। এখানেই আর পাঁচটা চরিত্রের থেকে ভরসা লাল আলাদা হয়ে গেছে। শুধু অর্থ , প্রতিপত্তি দিয়েই মানুষের বিচার করা উচিত নয়। তা গল্পকার ভরসলাল চরিত্রের মধ্যে প্রমাণ করেছেন।
ভরসলালের বিপরীত চরিত্র যদি বলতে হয় তাহলে সে হচ্ছে মহাজন বিষুণ আহেরী। এই চরিত্রটিকে এখানে নরপিশাচরূপে দেখানো হয়েছে। গর্ভবতী মেয়েটির স্বামীকে সে বেগার খাটাচ্ছে দিনের পর দিন। বছর চারেক আগে সে কিছু টাকা ধার করেছিল। শোধ করতে পারেনি।
তাই তাকে বছরের একটি সময়ের বেগার খাটতে হয়। হয়তো দেখা গেছে সুদে আসলে জমিদার যে টাকা পাবে সেটি হয়তো শোধ হয়ে গেছে। তবুও তাকে অন্যায় ভাবে খাটানো হচ্ছে। সুযোগ নেওয়া হচ্ছে তার দারিদ্র্যের তার অসহায়তার। ভরসালাল স্বামী সম্বন্ধে জানতে চাইলে মেয়েটি বলেছে —
“মহাজনের ক্ষেতিবাড়িতে বেগার দিতে গেছে।”
এদিকে তার স্ত্রী গর্ভবতী। সে স্ত্রীর পাশে থাকতে পারছে না। অথচ এই সময় প্রতিটি মেয়ে তাদের স্বামীকে কাছে পেতে চায়। কিন্তু এক্ষেত্রে জমিদার গর্ভবতী মহিলার স্বামীটিকে ছাড়ে নি। ফলে বাধ্য হয়েই মেয়েটিকে পাহাড় ডিঙিয়ে একা হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। এখানে গল্পকার জমিদারদের অত্যাচারের নগ্নচিত্র তুলে ধরেছেন।
এ অত্যাচার শুধুমাত্র শারীরিক নয়, মানসিক।
গল্পকারের শব্দে “আস্ত কষায়।”
মেয়েটি যখন আর হাঁটতে পারছিল না। তখন সে অভিনব পন্থা আবিষ্কার করল। কারণ — “দায়িত্ব যখন নিয়েছে তখন মেয়েটিকে নিরাপদে পাহাড় পার করে দিতে হবে”। তার সেই ‘চিত্র-বিচিত্র’ ঝোলা থেকে দুটি কাপড় বার করল এবং দুটি কাপড় একসাথে বেঁধে তৈরি করল একটা ঝোলা। সেই ঝোলার ভিতর মেয়েটিকে বসিয়ে এগিয়ে যেতে থাকল। এত বড় মনের পরিচায়ক সত্যিই দুষ্কর। প্রকৃতি বড়ই প্রতিকূল। প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টি। সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে ও মেঘ ডাকছে। পিছলে যাচ্ছে পা। গল্পকারের বর্ণনায় — “খেপ্যা বাতাস। আকাশের গায়ে ফাটল ধরিয়ে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। এলোমেলো বাতাস বইছে।” এই কিভাবে বুড়ো আমি টিপে টিপে দুর্বার পরিস্থিতিতে মেয়েটিকে পিছে নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে সে। চোখ বন্ধ করে এ দৃশ্য কল্পনা করলে গা শিউরে উঠে।
কোনরকমে পাহাড়ের ওপারে পৌঁছায় তারা তখন ভরসা লালের অবস্থা খুব খারাপ। ঘর্মাক্ত হয়ে গেছে সারা শরীর। জোরে জোরে শ্বাস পড়তে থাকে। হঠাৎ তার চোখ যায় মেয়েটির দিকে। সে তখন কুকুড়ে গেছে। যন্ত্রণায় ছটফট করছে। তার অবস্থা দেখে চমকে উঠেছে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। শারীরিক কষ্ট অপেক্ষা করে এক দৌড়ে রয়েল গাড়ি ডাকতে যায়। গাড়ি ভাড়া পাঁচ টাকা। টাকার কথা না ভেবে তার কাছে প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে মেয়েটিকে হাসপাতালে ভর্তি করানো। তাকে কোনরকমে গাড়ির ছইয়ের মধ্যে শুয়ে দেয়। আর বলতে থাকে “ হো রামজি ও পবনসুত …”
কিছুদূর যাওয়ার পরে ভরসালাল দেখল মেয়েটি যন্ত্রণায় আরও কুঁকড়ে গেছে। আঁকড়ে ধরে আছে তার তলপেট। এই অবস্থাতেই কি করা উচিত সে বুঝতে পারে না। বাধ্য হয়ে মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করে। তখন মেয়েটি জানায় কোমরের সেদ দিলে আরাম পাবে। সে তখন গাড়ির মধ্যে হ্যারিকেন জ্বালে এবং মেয়েটিকে সেদ দিতে থাকে। অবশ্য তেলের দাম বাবদ চার আনা দিতে হয়েছে গাড়িওয়ালাকে। একটা আর্ত মানুষের পাশে যত রকমভাবে থাকা সম্ভব, সাহায্যের হাত যতটা বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব ভরসালাল তাই করেছে। এখানে লেখক দেখিয়েছেন মানুষের জীবন বাঁচানোটাই মানুষের একমাত্র কর্তব্য।
হাসপাতালে পৌঁছে মেয়েটিকে ভর্তি করা নিয়ে নতুন সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। হাসপাতাল থেকে নার্স-দিদিরা জানালেন এই সময় ভর্তি করা সম্ভব নয়। কাকুতি মিনতি করতে থাকে ভরসালাল। তখন তারা জানায় মাত্র ডাক্তারবাবু অনুমতি দিলেই ভর্তি করা সম্ভব। সে ছুটে যায় ডাক্তারের কোয়াটারে। ডাক্তারের হাতে পায়ে ধরে। মেয়েটিকে আনার সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণনা করে। তখন ডাক্তারের অনুমতি দেন। এবং মেয়েটিকে ভর্তি করানো হয়। এবার হয়তো ভরসালালের দায়িত্ব শেষ হল সে হয়তো ফিরে যাবে। গল্পকার এখানে একটা সুন্দর লাইন ব্যবহার করেছেন — “এবার ভরসালালের দায়িত্ব শেষ।”
কিন্তু না। তার হৃদয় আর পাঁচটা মানুষের থেকে আলাদা। মেয়েটিকে ভর্তি করার পর সে অনায়াসে তার কাজে চলে যেতে পারত। কিন্তু গেল না। ওখানে থেকে গেল। অপেক্ষা করল মেয়েটির ডেলিভারির জন্য। সে জানত কুকুর মারার কাজটি হয়ত চলে যাবে। হয়তো তার জায়গায় অন্য কাউকে নেওয়া হবে। রোজগার হবে না। যাবে তবুও সে মানবিকতার খাতিরে রয়ে গেল। পরপর দু’দিন দু’বেলা সে নিয়ম করে হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে যেত। কোন রকমে রুটি তৈরি করে দু’বেলা খেয়েছে। এবং কারুর বাড়ির দোয়াই বা বারান্দায় রাত কাটিয়েছে। একজন অপরিচিতা মহিলার জন্য এতটা ত্যাগ বিরল। এই ধরনের চরিত্র সমাজের দৃষ্টান্তস্বরূপ।
দু’দিন পর মেয়েটির একটি পুত্র সন্তান হল। ফর্সা। সুন্দর। ডাক্তারবাবু অভিনন্দনের সাথে খবরটি তাকে জানাল। বলল আপনার ‘লারকা’ হয়েছে।
ভরসালাল নমস্কার করে তাকে জানায় মেয়েটি তার অপরিচিতা। রাস্তায় তার সাথে আলাপ। বিপদগ্রস্ত মেয়েটির সাথী হয়েছে। অবাক হয়ে যান ডাক্তারবাবু। শুধু ডাক্তারবাবু কেন আমরাও অবাক। লেখক এই গল্পটিতেও দেখালেন শুধুমাত্র দ্বিপদ বিশিষ্ট জীব মাত্রই মানুষ নয়। এ পাশাপাশি গল্পকার এই গল্পটির মধ্যে আরেকটি বিষয় উপস্থাপন করেছেন সেটি হল সমস্যা কখনো মানুষকে থামাতে পারে না। এই গল্পে নানান ধরনের সমস্যা এসেছে এবং সেই সঙ্গে তার সমাধানও দেখা গেছে। পথচলা কিন্তু থামেনি। থামে নি মানুষকে সাহায্য করার উদ্যোগ।
আবার লেখক ভরসালাল নামটিও অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে দিয়েছেন। ভরসা লালের ভরসাতেই মেয়েটি নির্বিঘ্নে হাসপাতালে পৌঁছে গেছে। তার ভরসাতেই পৃথিবীতে এক নবজাতকের জন্ম হয়েছে। যার নিজের পরিবার নেই, কোন পিছুটান নেই, অথচ তারই প্রচেষ্টায় অজানা অচেনা মহিলা মাতৃত্বের স্বাদ পেল। হয়তো তার সাথে দেখা না হলে মেয়েটি আদৌ হাসপাতালে পৌঁছাতে কি না সন্দেহ আছে।
পরিশেষে বলতে হয় লেখক এই গল্পে একটি সুন্দর বাক্যবন্ধ্ব ব্যবহার করেছেন — “হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলল ভরসা লাল”। আসলে এই হাত বাড়িয়ে দেওয়া একমাত্র গর্ভবতী মেয়েটির জন্য নয় হাত বাড়ানোর সমাজের সেই সব মানুষের জন্য যারা সত্যিই বিপদে রয়েছে।