গল্প : জন্মদাতা
আজ তৃতীয় পর্বে একটু অন্যরকম বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যাক। আমরা প্রফুল্ল রায়ের গল্পগুলিতে দেখেছি প্রধান প্রধান চরিত্রগুলির মধ্যে মানবিক আবেদন রয়েছে। তারা যেভাবে মানুষকে সাহায্য করেছে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আজকের পর্বে আমদের মূল আলোচ্য বিষয় প্রফুল্ল রায়ের গল্পে অপ্রধান চরিত্রের মধ্যে মানবিকগুণ কিভাবে ধরা পড়েছে। শুরু করা যাক ‘জন্মদাতা’ গল্পটিকে নিয়ে।
‘জন্মদাতা’ একটু ভিন্ন স্বাধের গল্প। এটি গল্পকারের ব্যক্তিগত উপলব্ধির ফসল। তিনি কল্যাণ মৈত্রকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন — “একবার একটা লোককে দেখলাম — বছর চল্লিশ আগে, ব্রাহ্মণ ছিল। প্রস্টিটিউটের মেয়েকে বিয়ে করায় তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হল। বাপ তাকে ত্যাজ্যপুত্র করল। সে এক মজা না ধারে বসে থাকত। যারা পিতৃতর্পণ করতে আসত, তাদের কাজ গুছিয়ে দিত।” (‘কল্যাণ মৈত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকার’/ ‘প্রফুল্ল রায় ৭৫’, পৃ. ৫৬৮)
এই গল্পের প্রধান চরিত্র বিষ্টুপদ। তরুণ বয়সে সে উৎশৃঙ্খল জীবনযাপন করত। বারবনিতার মেয়ে আমোদিনীকে বিয়ে করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার বাবা তাকে ত্যাজ্য পুত্র করে। পরবর্তীতে তার চরিত্রের একটা পরিবর্তন দেখা যায়। স্ত্রী আমোদিনীকে নিয়ে তার সংসার গড়ে ওঠে। বর্তমানে সে দুই ছেলে বাবা। শ্মশানে পুরোহিতের কাজ করে। গল্পটির সূচনায় লেখক বলেছেন—
“মৃত মানুষের উদ্দেশ্যে নিবেদিত তর্পণ বা পারলৌকিক কাজ করে বিষ্টুপদ চলে যেত।”
কিন্তু বর্তমানে তার রোজগারে ভাটা পড়ে। অর্থাৎ রোজগার বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। কারণ শ্মশানে তিন দিন হল কোন মরা আসেনি। পরিবারের অন্ন সংস্থানের মাধ্যম ওটি। যে মানুষটি একসময় কাউকে তোয়াক্কা না করে পরিবার ছেড়ে, বাবাকে ছেড়ে এসেছিল আজ সেই মানুষটি আজ পরিবারের অস্তিত্বের রক্ষার জন্য সংগ্রাম করছে।
ঠিক এইখানেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে অপ্রধান চরিত্র নিবারণ চক্রবর্তী। সেও একজন পুরোহিত। শ্রাদ্ধের জন্য যতটা দ্রব্য লাগবে তার থেকে বেশি দ্রব্য সে আদায় করেছে। এটা মনে হতে পারে সে অন্যায় করেছে। কিন্তু একজন জীবন্ত মানুষকে, তার পরিবারকে রক্ষার জন্য সে এটি করতে বাধ্য হয়েছিল। অতিরিক্ত ঘি মধু আতপ চালের ব্যবস্থা করে দিয়ে নিবারণ চাপা গলায় বলেছিল — “তুই দু’টো পয়সা পাবি, আর আমি না এসে পারি?” এই চরিত্রটির মধ্যে এক আদর্শ মানুষের ছায়া লক্ষ্য করা যায়।
আবার আরেকটি প্রধান চরিত্র ধনঞ্জয়। সে বৃদ্ধ। হাঁপানির রোগী। ওই গ্রামের বাসিন্দা। বিষ্ণুপদকে শ্মশানে এসে তার বাবার মৃত্যু সংবাদ দিয়ে গেছে। সে চেয়েছিল বাবার সম্পত্তির ভাগ যাতে বিষ্টুপদ পায়। এবং ঘুচে যাক তার অভাব। অনটন। গল্পকারের শব্দে — “ধনঞ্জয় যে ট্রেনে বাসে, সাইকেল রিকশায় এবং পায়ে হেঁটে দেড়শো মাইল পাড়ি দিয়ে এই মজ্জা নদীর ঘাটে তাকে খুঁজে বার করে দুঃসংবাদটা দিতে এসেছিল, এতে তার এতটুকু স্বার্থ নেই। সে চায়, বাপের বিষয়-সম্পত্তির ভাগ বিষ্টুপদ পাক।”
“এতে তার এতটুকু স্বার্থ নেই।” — এখানে এই লাইনটি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে মানব চরিত্রের দুটি দিক অপ্রধান চরিত্র দুটির মধ্যে ফুটে উঠেছে। একজন নিবারণ চক্রবর্তী যার প্রধান উদ্দেশ্য বিষ্টুপদকে সাহায্য করা। এখানে তার ব্যক্তিগত কোন স্বার্থ নেই। সে বলেছে — “ওদের দিয়ে আড়াই কিলো গোবিন্দভোগ আতপ কিনিয়েছি, কলা চব্বিশটা, ঘি মধু-দুধ-দইও অনেকটা করে। চোখের কোণ দিয়ে ইঙ্গিত করে নিবারণ বলতে থাকে, পিণ্ডদানে এত সব দরকার হয় না। কেন কিনিয়েছি, বুঝতে পেরেছিস কি?”
আবার ধনঞ্জয় তাকে সাহায্য করেছে। তবে সে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করতে পারে নি পরোক্ষভাবে করেছে। কারণ সেও চেয়েছিল বিষ্ণুপদর এই যন্ত্রণাময় জীবনের অবসান ঘটুক। সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাক। অপ্রধান চরিত্র হলেও এই চরিত্রদুটির মধ্যে মানবচেতনা এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে।
এবার আসা যাক গল্পের পরবর্তী অংশে। কবিরাজের ছেলেরা পিন্ডদান করতে আসে। তিনটি ছেলেই সুপ্রতিষ্ঠিত। পুরোহিতের সৌজন্যে বিষ্টুপদ প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঘি, মধু, চাল ইত্যাদি পায়। সেই সঙ্গে ভালো দক্ষিণা। কিছুদিনের জন্য সংসারের অন্নচিন্তা তার ঘুচে যাবে। মন আনন্দে প্রফুল্ল থাকার কথা। কিন্তু সে খুশি হতে পারল না। তার মনে দগদগে ক্ষতের মত চিনচিন করতে থাকে বাবার স্মৃতি। কবিরাজের জ্যেষ্ঠপুত্র অভিজিৎ যেমন পিণ্ডদানের অধিকারী একইভাবে সেও তো বাবার জ্যেষ্ঠপুত্র — “বড় ছেলে হিসেবে অভিজিতের মতো সে-ও পিণ্ডদান এবং শ্রাদ্ধের অধিকারী।” তার অন্তঃকরণ হুহু করে ওঠে। তার চরিত্রের এই পরিবর্তন গল্পটিকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। তার মনে পড়তে থাকে —“পঁচিশ বছর আগে বর্ধমানে তাদের সেই বাড়ি, বাবা, মা, ভাইবোনেরা, আত্মীয়-স্বজন — সবার মুখ… বিশেষ করে বাবার মুখটা ক্রমশ বড় হতে হতে সমস্ত চরাচরকে যেন ঢেকে দিচ্ছে।” এরপর সে নিজেই কবিরাজের প্রেতের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত পিণ্ডগুলি থেকে কিছুটা চাল তুলে নিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করে — “ভরদ্বাজ গোত্রস্য প্রেতস্য মেঘনাদ দেবশর্মণস্য এত পিন্ডং পুরকম —”
সে যেন এখানে দম দেওয়া পুতুল হয়ে গেছে। নিজের অজান্তেই এই কাজগুলি সে করছে। বলা ভালো কেউ ভেতর থেকে তাকে করিয়ে নিচ্ছে। আসলে গল্পকার এখানে দেখালেন যতই সে তার বাবাকে ত্যাগ করুক, বাবার স্মৃতি তার হৃদয়ে জীবন্ত। তারই তাড়নায় সে এই কাজগুলি করেছে। গল্পকার কত সুকৌশলে মানুষের মনের মণিকোঠায় সুপ্ত মানবিকগুণের এক প্রতিচ্ছবি উন্মোচন করেছেন।
আরেকটি বিষয় এখানে উঠে এসেছে পিতৃত্ব। বিষ্টুপদ যখন তার বাবাকে ত্যাগ করে, তখন সে ছিল একজন যুবক। আমদিনীকে নিয়ে তার চোখে ছিল নেশা। তাই সে পিতৃহৃদয়, পিতৃত্ব বা পিতৃ-অনুভূতি কেমন তা উপলব্ধি করতে পারেনি। কিন্তু সে যখন নিজে বাবা হল তখন কিন্তু সে পিতৃত্বের অনুভব অনুধাবন করতে পারল। মন্ত্র উচ্চারণের সময় ‘তার চোখ ফেটে উষ্ণ জলস্রোত নেমে আসছে।’ যতই ত্যজ্যপুত্র করুক তবুও তো সে বাবা; —“ পঁচিশ বছর ধরে যে অভিমানের বাষ্প হৃদয়ে সঞ্চিত ছিল তাই শোকাশ্রু হয়ে নির্গত হলো তার চোখ দিয়ে।” এ এক শাশ্বত মানবিক আবেদন।
এই গল্পটির মধ্যে লেখক ব্যঞ্জনার মধ্য দিয়ে জীবন-জীবিকা বর্ণনা করেছেন। জীবন নদী এবার ভাগে তো ওপার গড়ে। কেউ মারা গেলে বা চিতার আগুন জ্বাললে তবেই তবেই বিষ্ণুপদ বাড়িতে উনান জ্বলবে। রূপকের আড়ালে নির্মম জীবন সংগ্রামের বর্ণনা করা হয়েছে। এই ধরনের চিন্তাচেতনা বোধ হয় প্রফুল্ল রায়ের পক্ষে সম্ভব।
“শ্মশানে চিতা জ্বলার ওপর তার আর ভগার বাঁচা মরা জড়িয়ে আছে।” (ভগা হল শ্মশানের ডোম)
আবার,
“মানুষ না মরলে বিষ্টুপদ বাঁচে কি করে?”
গল্পটি পড়তে পড়তে মনে হয়েছিল নামকরণ কি ত্যাজ্যপুত্র হলে হয়তো ভালো হত? কিন্তু গল্পের শেষের দিকের কয়েকটি লাইন গল্পটিকে অন্যদিকে নিয়ে গেছে। যেখানে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে মানবিকতা। মনুষ্যত্ববোধ। আর সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে জন্মদাতা পিতার প্রতি পুত্রের কর্তব্য,ভালোবাসা টান। গল্পের পরিসমাপ্তিতে লেখক দেখালেন বিষ্টপদ সংসার, রোজগার, আমোদিনী, পুত্র — সবকিছুকে ভুলে সে পিতৃতর্পণ করেছে। আর এখানেই গল্পটি হয়ে উঠেছে চিরন্তন। মানবজমিন থেকে উঠে আসা এক সুপ্তবীজের মহীরুহ।
পরিশেষে বলতে হয় অপ্রধান চরিত্রগুলির মধ্যে মানবিকতার ছোঁয়া, প্রধান চরিত্রকে সাহায্য করা তাড়না, তার বিপদে পাশে দাঁড়ানো এমন চরিত্র বাংলা সাহিত্যে খুঁজলে বোধহয় হাতে গোনা পাওয়া যাবে। এখানেই গল্পকার প্রফুল্ল রায়ের বিশেষত্ব। শুধুমাত্র প্রধান চরিত্রকে কেন্দ্র করে তার গল্প এগিয়ে যায় নি। সেই সঙ্গে সমানভাবে গুরুত্ব পেয়েছে অপ্রধান চরিত্র। একটু ভেবে দেখলে বোঝা যাবে প্রধান চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে কিন্তু এই অপ্রধান চরিত্রগুলি সাহায্য করে। আর তাই গল্পকার এই অপ্রধান চরিত্র গুলির মধ্যে বপন করেছেন সেই অমূল্য সম্পদ যা মানুষের চিরন্তন ধন — মানবিকতা।