গল্প : নাগমতী
জলবেদে — এই সম্প্রদায়ের উপর বাংলা সাহিত্যে তেমন উল্লেখযোগ্য কাজ হয়নি। কোন কোন গল্পে তাদের হয়তো পার্শ্ব চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে কিন্তু মূল চরিত্র হিসাবে তাদের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু ‘রত্নের মূল্য জহুরীর কাছে’। এই জহুরী প্রফুল্ল রায় এই সম্প্রদায়ের জীবন যাত্রা, কথাবার্তা, রীতি-নীতি, আচার-আচরণ এবং সেই সঙ্গে তাদের বিভিন্ন মানবিকগুণের ডালি সাজিয়ে হাজির করলেন বাংলা সাহিত্যের দরবারে। এমনই একটি গল্প ‘নাগমতী’।
‘নাগমতী’ গল্পের আলোচনা প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন এটা তার বিচিত্র অভিজ্ঞতার ফসল। পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরির অভ্যাসের জন্য এই বেদে বা যাযাবরদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। বিভিন্ন কথাবার্তার মধ্য দিয়ে তাদের জীবনযাপন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করেন। সেই অভিজ্ঞতাকে নিয়ে লেখা ‘নাগমতি’ গল্পটি। পরে এটি ‘শঙ্খিনী’ উপন্যাসে রূপান্তরিত হয়।
সোনাই বিবির বিলে তাঁবু পেতেছিল শঙ্খিনীর দল। শঙ্খিনী সুন্দরী। যুবতী। শরীরে ছিল এক দুর্নিবার আকর্ষণ। চলনে বলনে তুফান। গল্পে তার আবির্ভাব ঘটছে ঠিক ঝড়ের মতই — “মাতলা ঝড়ের মতো সাঁ সাঁ করে ছুটে এল শঙ্খিনী।”
শঙ্খিনী এই যাযাবর দলের প্রধান। তাকে বলা হয়েছে ‘আম্মা’। যাযাবরদের রীতি হল দলের প্রধানকে তারা বলেন ‘আম্মা’। আম্মার আড়ালে আম্মা-সংক্রান্ত কোনো কথা বলা রীতিবিরুদ্ধ।
এখানে লেখক এই চরিত্রটির মধ্যে এই সম্প্রদায়ের কঠিন জীবন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন। তাদের জীবন আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো সহজ, সরল, আরামপ্রিয়, বিলাসবহুল বা নিয়মনিষ্ঠ নয়। তাদের কঠোর কঠিন পরিশ্রম করে বেঁচে থাকতে হয়। পদে পদে বিপদ। নির্মম জীবনযাপনের একটা রূপচিত্র এই চরিত্রটির মধ্যে চিত্রায়িত হয়েছে।
এই দুর্বার নারী চরিত্রের মধ্যেও একটা কোমল নারী-হৃদয় লুকিয়ে ছিল। যৌবন আরম্ভে সে ভালোবেসেছিল রাজাবাবুকে। তার অনুভব —
“রাজাসাহেব আসবে। বুকের মধ্যে কোথায় যেন মৌমাছির গুনগুনানি শুনছে শঙ্খিনী। স্নায়ুগুলোর উপর দিয়ে মধুর আবেশ ছড়িয়ে পড়ছে আফিমের মৌতাতের মত।” কিন্তু পরবর্তী ক্ষেত্রে দেখা যায় তার স্বভাব সিদ্ধ ভঙ্গিতে শেষ রাজাবাবুর সঙ্গে একাত্ম হতে পারেনি।
জীবন নদীর মতই এঁকেবেঁকে চলে। নদীর মতই তার রহস্যময়তা। নিয়ম ভাঙ্গার একটা প্রবণতা।
তাই গল্পকার শঙ্খিনী চরিত্রের বিপরীতে নিয়ে এলেন পালঙ্ককে। যে বাঙালি সাধারণ ঘরের লক্ষীমেয়ে। যাযাবর সম্প্রদায়ের কন্যা হয়েও তার মধ্যে সে আশ্চর্য ব্যতিক্রমী চরিত্র। লেখক তাকে বলেছেন, “ ইচাপার মত মেয়ে।” আসলে গল্পকার দেখাতে চেয়েছেন এক সহৃদয় এমন এক নারী যে চায় স্বামী-সুখ, সংসার, সন্তান। অর্থাৎ এই সম্প্রদায়ের মানুষের হৃদয়ে যে সুপ্ত মানবিকচেতনা রয়েছে তারই প্রকাশ এই চরিত্রটি। সারাক্ষণ বিষধর সাপের সাথে থাকলেও অন্তঃকরণ কিন্তু গরলে পরিপূর্ণ হয়ে যায়নি বরং তা অমৃতরসে জারিত।
রাজা সাহেবের কাছে শঙ্খিনী সেজেগুজে একেবারে নিটোল নারী হয়ে তার কাছে যায়।
নিজের রূপসজ্জা দেখে নিজেই লজ্জা পেয়ে যায় — “নিজের অঙ্গসজ্জার দিকে তাকিয়ে অপরূপ লজ্জায় দৃষ্টি যেন আচ্ছন্ন হয়ে এল তার।”
কিন্তু রাজাসাহেব চরিত্রের মধ্যে তখন একটা পরিবর্তন ঘটে গেছে। রাজাবাবু চেয়েছিল তাকে নিয়ে সুখী নীড় গড়তে। কিন্তু শঙ্খিনী ভাল লাগে না এই বদ্ধ জীবন। সে চায় — “এই ভাইস্যা ভাইস্যা বেড়াইতে, সাপ নাচাইতে, বিষ নামাইতে কী ভালো যে লাগে! আমাগো বাজান আছিল বাইদ্যা, দাদা-নানা আছিল বাইদ্যা। তাগো রক্ত শরীলে রইছে। বেবজিয়া বহর ছাইড়া কেমনে ঘর বান্ধুম! না না রাজাসাহেব, এই মতলব ছাড়।”
অর্থাৎ সূ সাপের মতোই চঞ্চল। সে চায় না এক জায়গায় স্থিতু হতে। এই চরিত্রটি যেন যাযাবর বৃত্তির এক প্রতিনিধি স্থানীয় চরিত্র। আরেকটি বিষয় এখানে উপস্থাপিত হয়েছে। শঙ্কিনী বহিরঙ্গে কোমল নারী সাজলেও অন্তঃকরণে কিন্তু যাযাবর। যার কাছে সমগ্র পৃথিবীটাই সংসার।
এদিকে রাজাসাহেব শান্ত, স্থিতধী, কোমল পালঙ্ককে ভালোবেসে ফেলেছে। পালঙ্ক রাজা সাহেবের প্রেমে পাগল। শঙ্কিনী এই ঘটনা জানতে পেরে সে আফসোস করেছে। তার চরিত্রের এখানে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। সে যে ভুল কাজটা করেছে তার সংশোধন করতে চায়। পালঙ্ককে একা ডেকে বলছিল – “তোরে আমি বেবাক দিমু। এই বহর, সোনাদানা বেবাক। তুই আমারে রাজাসাহেবেরে দে।’
আর্তনাদ করে উঠল পালঙ্ক, ‘না না, উ আমি পারুম না।’ ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘাসি নৌকার দিকে পালিয়ে গেল সে।” কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। সমস্ত দেহটা দাবানলের মতো জ্বলতে লাগল শঙ্খিনী বলে ওঠে — “’আইচ্ছা, কেমনে তুই আমার পুকষেরে ভোগ করস, দেখুম।” এখানে চরিত্রটি আরো জীবন্ত হয়ে ওঠে। ঈর্ষা হিংসা মানুষকে কতটা পরিবর্তন করতে পারে তার উদাহরণ শঙ্খিনী চরিত্রটি।
গল্পের পরবর্তী অংশে দেখা যায় তাদের বিবাহের ব্যবস্থা হয়। এখানে লেখক যাযাবরদের একটা রীতি বর্ণনা করেছেন। সাধারণ বিবাহতে যেমন মালাবদল হয় তেমনি জলবেদেদের বিবাহ সাপ বদল হয়। তবে সাপের বিষ দাঁত ভাঙা থাকে। স্বামী একবার স্ত্রীকে সাপের মালা পরায় ও স্ত্রী একবার স্বামীকে। কিন্তু শঙ্খিনী এই সম্পর্ক কিছুতেই মানতে পারেনি। তাই বিষহীন সাপের বদলে বিষধর কালচিতি এনে দিয়েছিল। সেই সাপ দংশন করল রাজাসাহেব গলায়। রাজা সাহেবের শেষ সংলাপ, “ও কে কি করলি শঙ্খিনী।”
এখানে শঙ্খিনী চরিত্রটিকে আমরা ঈর্ষান্বিত দেখতে পায়। সাপের মতোই লকলক করছিল তার জিভ। একসময় তার স্বপ্নের পুরুষ ছিল এই রাজাসাহেব। তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল পালঙ্ক। তাই সে রাজা সাহেবকে শেষ করে দিল। এক তীব্র হাসিতে সঙ্গিনী বলে ওঠে “আমার পুরুষকে না ভোগ করতে চাইছিলি নে ভোগ কর।”
কিন্তু পরবর্তীকালে শঙ্কিনী তার ভুল বুঝতে পারে। এবং আর্তনাদে হাহাকার করে ওঠে। তাই এই চরিত্রটি জীবন্ত চরিত্র হয়ে উঠেছে। একদিকে সে যেমন প্রতিশোধ স্পৃহায় অন্ধ হয়ে প্রাণের প্রিয় রাজা সাহেবকে হত্যা করে ফেলেছে। পালঙ্ককে শিক্ষা দিতে গিয়ে নিজেকেই শিক্ষা দিয়ে ফেলেছে। এ যেন তার পাপের পরিণাম।
এই গল্পটির আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল এর শব্দ চয়ন। যাযাবর শ্রেণী যাদের কাজ মূলত সাপেদের নিয়ে অর্থাৎ বিষ। এখানে দেখা যায় প্রকৃতির বর্ণনা, নদীর স্রোতে বর্ণনা, এমনকি শরীরের বর্ণনাতেও গল্পকার অসাধারণ দক্ষতায় সাপের উপমা ব্যবহার করেছেন। কখনো কালো মেঘকে কৃষ্ণ সর্পের সাথে, রাজা সাহেবের পেশিকে ছোবলের সাথে তুলনা করেছেন। গল্পটি মূল বিষয় যেন উপমা হিসাবে পদে পদে উপস্থিত।
সর্পিল গতির মত শঙ্খিনীর মন বারে বারে পরিবর্তন হয়েছে; —
এক : প্রথম যৌবনে রাজা সাহেবকে সে ভালোবাসে। নিয়তির কারণে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ আসে।
দুই : দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ হয়। জেগে উঠে পুরোনো প্রেম। সর্ব অলংকারে ভূষিত হয়ে মোহিনীরূপে নিজেকে সাজিয়ে রাজা সাহেবের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে।
তিন : প্রেমের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে সে রাজাসাহেব প্রস্তাবে সম্মত হয় নি। চায় নি সংসারে আবদ্ধ হতে।
চার : আবার পালঙ্ক যখন রাজাসাহেবকে ভালোবেসেছে তখন সে সহ্য করতে পারে নি। পালঙ্ককে টাকা-পয়সার লোভ দেখিয়েছে যাতে সে রাজাসাহেবকে ছেড়ে দেয়। তাকে ভুলে যায়।
পাঁচ : পালঙ্ক রাজি না হলে তাকে থ্রেট করেছে।
ছয় : তার প্রতিশোধস্পৃহায় বলি হয়ে গেল রাজাসাহেব।
সাত : পরিশেষে নিজকৃত কর্মের জন্য অনুশোচনা করেছে।
আসলে এই গল্পটির মধ্যে গল্পকার সদা পরিবর্তনশীল মানবমনের এক বিশেষ দিকের প্রতি আলোকপাত করেছেন। প্রাপ্ত জিনিসকে যদি মানুষ না পায় তাহলে সে কতটা বিষধর হয়ে উঠতে পারে এই গল্পটি তার প্রমান। অথচ রাজা সাহেবকে সে ভালোবাসত। রাজাসাহেব চেয়েছিল শঙ্খিনীকে নিয়ে ঘর বাঁধতে। কিন্তু সে ঘর বাঁধার উপযোগী নয়। সে চায় ঘুরে ঘুরে বেড়াতে। প্রকৃতির কোলে নিজেকে মেলে ধরতে। বন্দী জীবন তার একেবারেই অপছন্দ। অথচ রাজাসাহেব যখন পালঙ্ককে ভালোবেসেছে,তাকে বিয়ে করতে চেয়েছে তখন সে হয়ে উঠেছে কাল নাগিনী। মানব মনের এক রহস্যময় দ্বন্দ্ব এখানে উপস্থাপিত হয়েছে। সে রাজাবাবুকে ভালোবাসে কিন্তু ঘর বাঁধতে চায় না। সে চেয়েছে রাজাবাবু যেন তার মতই যাযাবরের মতই জীবন কাটাক। যখন এটি ঘটল না তখন সে আরও হিংস্র হয়ে উঠল। সে নিজে ভুলে গেল সে দলের প্রধান। আম্মা। তার দলের প্রতিনিধি পালঙ্ক। পালঙ্কের সুখ স্বাচ্ছন্দের কথা আম্মা হিসাবে তার ভাবা উচিত ছিল। কিন্তু নারী মনস্তস্তের চরিত্রের চিরন্তন ঈর্ষা তাকে হিংস্র থেকে হিংস্রতমা করে তুলেছে। আর গল্পটিও এক মাত্রায় পৌঁছে গেছে।