গল্প : শিকড়
প্রফুল্ল রায়ের ‘শিকড়’ গল্পের প্রসঙ্গ এলে সচেতন পাঠক মাত্রই বলবেন এটি মূলত দেশভাগ এবং উদ্বাস্তু জীবনের ইতিকথা। ফেলে আসা জীবনস্মৃতি। সেই সঙ্গে উদ্বাস্তু মানুষের শিকড় বিচ্ছিন্নতা, মানসিক যন্ত্রণা এবং নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রামের চিত্রায়ন করে। কিন্তু এই যে শিকড়ের উৎস যে অন্তঃকরণ তা মানবিক রসে পরিপূর্ণ।
এই গল্পটির মধ্যে মানবিক চেতনার এক অভিনব প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। শুধু ব্যক্তি নয়, ভিটামাটি জমিজমার প্রতি একটা অব্যক্ত টান লক্ষ্য করা যায়। ভিন্ন ধর্মের মানুষ হলেও তাদের মানবিকতা, চিন্তা চেতনা অনুভূতি যে এক এক ও অভিন্ন এই গল্পটি তার প্রমান করে।
গল্পের প্রথম পর্বে দেখা যায় রাজমোহনের স্মৃতিতে মাঝে মাঝে উদয় হয় ফেলে আসা বাড়ি। বাড়ির সামনে মাঠ। এখন তার এই পাক-সার্কাসের যে বাড়িটিতে থাকে সেটা তারা দেশভাগের সময় এক্সচেঞ্জ করে পেয়েছিল। আর তাদের ঢাকার বাড়িতে পেয়েছিল আব্দুল করিম নামক এক মুসলিম। কিন্তু ঢাকার বাড়ির প্রতি তার যে একটা মনখারাপ তা কখনই মন থেকে মুছে যায় নি।
“রাজমোহন অনুভব করেন, একচল্লিশ বছরে তাঁর অস্তিত্বের দ্বিতীয় একটি শিকড় পার্ক সার্কাসের এই বাড়িতে ধীরে ধীরে চারিয়ে গেছে।”
ওই একই অনুভূতি আব্দুল করিমের সঙ্গেও ঘটেছে। এখানে মনুষ্য হৃদয়ের এক পথিক ছবি ফুটে উঠেছে।
যাইহোক পাক-সার্কাসের এই বাড়িতে তারা এক চল্লিশ বছর রয়েছে। বাড়ি প্রতি জমে গেছে এক ভালোবাসা। কিন্তু তার ছেলে মনীশ এই বাড়িটি বিক্রি করতে চায়। সে বাবাকে বোঝাতে থাকে এই বাড়িতে বিক্রি করলে তারা কত টাকা পেতে পারে।
“দশ কাঠা প্লটের মাঝখানে তাঁর এই দোতলা বাড়িটা ভেঙে তারা আট তলা হাইরাইজ তুলে একটা গোটা ফ্লোর তো দিতে চেয়েছেই, সেই সঙ্গে নগদ যা দিতে চেয়েছে সেটা ব্যাঙ্কে ফিক্সড ডিপোজিট করে রাখলে পরের পাঁচ জেনাবেশনকে কিছু করতে হবে না, পায়ের ওপর পা তুলে জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে।”
কিন্তু রাজমোহন রাজি হয় নি। কারণ তার হৃদয় ছিল সহানুভূতিকে পরিপূর্ণ। তার আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্নার অনেক স্মৃতি এই বাড়ির সাথে যুক্ত। বাড়ি বিক্রি করা মানে শুধুমাত্র একটা জড়বস্তুর হস্তান্তর নয়, স্মৃতিগুলোকেও অবলুপ্ত করা হয়। রাজমোহনের সুরে কথা বলেছেন
স্কুলে কথা বলেছে আব্দুল করিম সাহেব —
“কনস্ট্রাকশন কোম্পানির লোকেরা রোজ এসে জ্বালিয়ে মারছে। ওখানে মাল্টি-স্টোরিড বাড়ি করতে চায়। ছেলেমেয়ে নাতি-নাতনি সবাইকে একটা করে বড় ফ্ল্যাট তো দেবেই, তা ছাড়া কয়েক লাখ টাকা নগদও দেবে। ছেলেরা রাজি হওয়ার জন্যে আমার ওপর প্রেসার দিচ্ছে।”
আসলে আসলে তারা দুইজনেই একবার বাড়ি-ছাড়া হয়েছে। তারা জানে বাড়িছাড়া হওয়ার দুঃখ বেদনা। ফলে তারা আর দ্বিতীয়বার একই কাজ করতে চায় না। আসলে এখানে গল্পকার দেখালেন মানুষের মন চেতন অচেতনের পার্থক্য না করে কেমন মায়ার বন্ধনে সবকিছুকে আবদ্ধ করে নেয়। আলাদা দেশ, আলাদা স্থান, আলাদা কালচারে মানুষ হলে দু’জনের মনের প্রতিচ্ছবি কিন্তু একই। এখানেই গল্পকার মানবিকতার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
এরপরেই গল্পকার আমাদের নিয়ে গেছেন ঢাকার সেই বাড়ি যেখানে অতিবাহিত হয়েছে রাজমোহনের শৈশব। কৈশোর। রাজমোহনের মানবিক হৃদয়ে জাগ্রত ছিল প্রথম শিকড় অর্থাৎ পুরনো বাড়ির অনুভূতি —
“ঢাকার বাড়ির সঙ্গে অবশ্য এ বাড়ির তুলনা হয় না। সেগুন বাগিচায় প্রায় এক বিঘে জায়গার মাঝখানে ছিল তাঁদের মাঝারি মাপের তেতলা। সামনের দিকে বিরাট বাগান, পেছনে পুকুর।”
গল্পের পরবর্তী এরপর দেখা যায় আব্দুল করিম সাহেব ওই একই অনুভূতিতে অনুভূত হয়ে রাজমোহনের বাড়িতে এসেছি। তার বয়স হয়েছে। শেষবারের মতো পিতৃপুরুষের ভিটে দেখা তার ইচ্ছে। রাজমোহন এবং আব্দুল করিম দুই ভিন্ন ধর্মের মানুষ, ভিন্ন রুচির মানুষ তবুও তাদের মধ্যে একই মানবিকবোধ লক্ষ্য করা যায়। বাড়ির প্রতি এ যেন এক পিছুটান। যেন এক নাড়ির টান। “জীবনের মূল শিকড়টা ঢাকার বাড়িতেই থেকে গেছে।”
গল্পের পরবর্তী পর্বে দেখা যায় তহমিনা, শামীম এদের সাথে রাজা এবং জুনার বন্ধুত্ব। অথচ এরা কেউই কাউকে চেনে না। কোনদিন দেখেনি। কিন্তু মানবিকতার টানে তারা যেন চির চেনা, চির পরিচিত হয়ে উঠে। রাজমোহন যখন হোটেল থেকে তাদের জিনিস আনতে বলে তখন তারা আনন্দে সেই কাজটি করেছে। রাজা গাড়ি করে তাদের কলকাতার বিভিন্ন জায়গা ঘুরিয়ে দেখেছে। এখানে গল্পকার দেখালেন পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে এই মানবিকবোধ কিভাবে প্রবাহিত হয়েছে। তারা কত সুন্দরভাবে মেলামেশা করেছে। ধর্ম কিন্তু এখানে কোন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। কারণ এখানে মুখ্য বিষয় মানবিকতা। দুই প্রজন্মের মধ্যে কত সুন্দর মেলবন্ধন ঘটেছে। গল্পকার এখানে বার্তা দিলেন ধর্ম যে যার নিজের কাছে,কিছু মানবিকতা সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত।
রাজমোহন ও আব্দুল করিমের কথাবার্তার মধ্য দিয়ে বারে বারে প্রকাশ পেয়েছে তাদের অতীত। হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি।
“এই গল্পের আরেকটি দিক উপস্থাপিত হয়েছে পরবর্তী প্রজন্মের চিন্তা ভাবনার একটা পরিবর্তন। দুই প্রবীণদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তাদের স্মৃতি, পিতৃ পুরুষের ভিটে। আর নবীনদের কাছে তাদের বিলাসবহুল জীবন। প্রবীণরা এখানে প্রাচ্যের প্রতিনিধি। আর নবীনরা পাশ্চাত্যে। কথা চলাকালীন ওদের পোশাকে প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল — “মডার্ন জেনারেশনের ছেলেমেয়েরা-সে ঢাকাতেই হোক কি কলকাতাতেই হোক-সব এক ছাঁচ থেকে বেরিয়ে এসেছে।”
এখানে গল্পকার কত সুকৌশলে দুটি প্রজন্মের মধ্যে ব্যবধানকে শব্দের মোড়কে চরিত্রের সংলাপে চিত্রিত করেছেন। যুগের সঙ্গে সঙ্গে যে মানসিকতা পরিবর্তন হয় এটা যে কতটা স্বাভাবিক তা লেখক কত নিখুঁতভাবে পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করেছেন।
এই গল্পের উপসংহার বড় বেদনার। দুঃখের। দুই বন্ধু মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটছে অর্থাৎ করিম সাহেব ফিরে যাচ্ছেন ঢাকাতে। হয়তো তাদের আর কোনদিনও দেখা হবে না। কিন্তু পড়ে থাকবে স্মৃতি। সময়। বিদায়কালে রাজমোহন বলেন, ‘বার্ডস অফ দা সেম ফেদার। ফেদার না ফ্লক কোনটা যেন?”
আবার — “করিম সাহেবের দুঃখটা বুঝতে পারছিলেন রাজমোহন। গাঢ় বিষাদ তাঁর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে থাকে।”
এই গল্পটি মধ্যে অনেকগুলো জায়গায় মানবিকতা বোধের প্রকাশ প্রস্ফুটিত হয়েছে। বারে বারে পরিবর্তন হয়েছে পট; —
এক : দুই বন্ধুর পিতৃপুরুষের স্মৃতির প্রতি টান ও ভালোবাসা, সেই সঙ্গে স্মৃতি বিচরিত বাড়ি।
দুই : ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ হলেও তারা একইভাবে একই ঘরে থেকেছে একই সাথে খাওয়া দাওয়া করেছি। এখানে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের উর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মানবিকতা।
তিন : আবার পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে পোশাক কথাবাত্রা আলাপচারিতায় পরিবর্তন রয়েছে। কিন্তু পরিবর্তন হয়নি মানবিকতার তাই তারা অনায়াসেই মেলামেশা করতে পেরেছে।
চার : “করিম সাহেব রাজমোহনের দু’হাত ধরে আন্তরিক গলায় বলেন, বেশি দেরি করবেন না।”
— এই সংলাপে ‘দেরি’ শব্দটি খুব তাৎপর্যবহ। কারণ ঢাকা যাওয়ার জন্য যেভাবে বলা হয়েছে তাতে নির্ভেজাল আন্তরিকতার ও এক মানবিক আবেদন ফুটে উঠেছে।
তাই পরিশেষে বলতে বলা যায় শুধু বিষয় বা চরিত্র নয়, গল্পের রূপ নির্মাণেও প্রফুল্ল রায় প্রশংসার দাবি রাখেন। তাঁর প্রতিভা, সাহিত্যবোধ, দেশ-কাল সংক্রান্ত জীবন অভিজ্ঞতার আখ্যান দেশভাগের গল্পের মধ্যে যেমন রয়েছে, তেমনি এই বৃহৎ দেশের সুখ-দুঃখের ইতিহাস বিবৃত হয়েছে মানবিকতার নাটমন্দিরে। তাই গল্পকার প্রফুল্ল রায় মানবিক গল্প রচনায় যে মহৎ কথক সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কবিগুরুর বক্তব্য দিয়েই শেষ করা যাক —
“একলা মানুষ টুকরা মাত্র। মানুষ যদি মিলতে না পারে তাহলে তাদের ভরসার পরিবেশ তৈরি হবে না।” — (‘সমবায়’ : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)