‘মানুষ’ ও ‘মানবিকতা’ দুটি শব্দ আমাদের কাছে প্রায় সমর্থক হলেও দুটি শব্দের মধ্যে একটা বিস্তর ফারাক রয়েছে। সাধারণভাবে বলা হয় দ্বি-পদবিশিষ্ট প্রাণী মাত্রই মানুষ। কিন্তু মানুষ হলেই যে তার মধ্যে মানবিকতাবোধ বা মনুষ্যত্ব থাকবে তা সব সময় নয়। গল্পকার প্রফুল্ল রায় এই জায়গাটিকে বারবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তার গল্পে। উপন্যাসে। প্রকৃত মানুষ বলতে তিনি তাকেই ইঙ্গিত করেছেন যে সবসময় ‘মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ায়’। যে কোনো ধর্মের, যে কোনো বর্ণের, যে কোনো পেশার মানুষই হোক না কেন মানবিকতায় মুখ্য আকর্ষণ হয়ে উঠেছে প্রফুল্ল রায়ের গল্পে। একবার নয়, বহুবার। আমরা জানি তার গল্পের পরিধি বৃহৎ। বিভিন্ন দিকে তার বিস্তার, ও প্রসার — যেমন উদ্বাস্তু সমস্যা, ফেলে আসা ভিটে মাটির টান, পিতৃত্ব, ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে ঐকতা, ইত্যাদি। তবে যে গুণ তাকে আলাদা মর্যাদা এনে দিয়েছিল তা হল গল্পের মানবিকতাবোধ। তার নিখুঁত পর্যবেক্ষণশক্তি ও অকৃত্রিম সহানুভূতির স্পর্শ সেই সঙ্গে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তার গল্পের ডালিকে আরও ঋদ্ধ করেছে। আমাদের এই আলোচনার মুখ্য বিষয় প্রফুল্ল রায়ের গল্পের মানবিক আবেদন।
গল্প : নরক
‘নরক’ গল্পটি দিয়ে শুরু করা যাক। একটু অন্যরকম গল্প। যারা সমাজে অবহেলিত, পরিত্যক্ত সেই তাদের মধ্যেও যে কতখানি মানবিকতা মনুষ্যত্ব বোধ রয়েছে তার প্রমাণ সগিরা চরিত্রটি। সে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে তারাও মানুষের বিপদে ধর্ম, জাত, কুল অপেক্ষা করে মানুষকে সাহায্য করে। তাদের কাছে প্রধান মানুষের প্রাণ।
সাগিরা এক সংগ্রামী চরিত্র। তার গোটা জীবনটাই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। যখন সে দেহ ব্যবসার জন্য নৌকা করে যাচ্ছে তখন মাঝ নদীতে নৌকা উল্টে যায়। সে সাঁতার জানে। তাই অনায়াসেই নিজের প্রাণ বাঁচাতে পারত। কিন্তু সে যখন দেখল একজন মানুষ ভেসে যাচ্ছে তখন সে নিজের জীবন বাজি রেখে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। এখানে সগিরা তো ভাবতেই পারতো যে সমাজ তাকে বেশ্যাবৃত্তি করতে বাধ্য করেছে, যে সমাজ তাকে সমর্যাদায় বাঁচতে দেয়নি, যে সমাজ তাকে সসম্মানে কাজ করতে দেয়নি সেই সমাজের প্রতি তার কী দায়? কিন্তু না। এখানেই লেখকের মহানুভবতা। তাই তার সৃষ্ট সগিরা সেই ডুবন্ত মানুষটিকে বাঁচাবার চেষ্টা করছে। গল্পকারের বর্ণনায় —
“মরিয়া হয়ে দু’হাতে জল কেটে সে এগিয়ে যায় এবং অনেকক্ষণ যুঝবার পর শেষ পর্যন্ত লোকটার কাছে এসে তার কাঁধের কাছটা জামাসুদ্ধ ধরে ফেলে। সাগিয়া বুঝতে পারছিল তার নিজের নাকমুখ দিয়ে গল গল করে জল ঢুকে যাচ্ছে,পায়ের শিরায় টান ধরে গেছে। কিন্তু এখন কোনও কিছু ভাবার সময় নয়। নিজেকে এবং লোকটাকে স্রোতের ওপর ভাসিয়ে রেখে এবার সে পারের দিকে যেতে থাকে। মাঝে মাঝে চোরা ঘূর্ণি আর উঁচু উঁচু ঢেউ লোকটাকে ছিনিয়ে নিতে চায় কিন্তু সাগিয়া হাতের মুঠি মুহূর্তের জন্য আলগা করে না, তার হাত সাঁড়াশির মতো লোকটার কাঁধ চেপে ধরে থাকে।”
সেই মানুষটিকে বাঁচিয়ে সে পাড়ে তুলে নিয়ে এসেছে। তার প্রাণ ফেরানোর চেষ্টা করেছে।
চোরা ঘূর্ণি আর উঁচু উঁচু সঙ্গে সংগ্রাম সে ক্লান্ত। তবুও মানুষটিকে টানতে টানতেই চড়ের বালির ওপর নিয়ে গেছে; —
“জলস্রোতেব ওপর দিয়ে ভাসিয়ে ভাসিয়ে এক-সময় লোকটাকে যখন নদীর পার তুলে আনে তখন সাগিয়ার জীবনীশক্তি প্রায় ফুরিয়ে এসেছে।”
এত কষ্টের মূলে রয়েছে সগিরার উদার মনোভাব। সে হয়তো বৃদ্ধ মানুষটির মধ্যে তার বাবা হয়তো বা কাকাকে দেখেছিল। তাই সে কোনকিছু না ভেবে মানুষটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। আত্মীয়-স্বজন ত্যক্ত সগিরা যেন আমাদের ঘরের মেয়ে হয়ে উঠেছে। পরবর্তীকালে আমরা জানতে পারি ওই মানুষটি সমাজের একজন প্রতিষ্ঠিত, সৎ ধার্মিক, নিষ্ঠাবান ব্যক্তি — শিবশঙ্কর শাস্ত্রী।
এখানেই সে থেমে থাকে নি সগিরা। সে মানুষটিকে বয়েল গাড়ি করে ঘরে ফিরিয়ে এসেছে। ঘর বলতে বেশ্যাপল্লী। লেখকের শব্দে ‘নরক’। নরকে দেবতার (‘দেওতা’) আবির্ভাব ঘটেছে। দেবতা বলতে সমাজ যাকে দেবতার রূপে মানে। তাই ডাক্তারবাবু সাবধানের সুরে বলেছেন — “সর্বনাশ, এ কাকে এনে তুলেছিস!”
এখানে লেখক এক অদ্ভুত দ্যোতনার সৃষ্টি করলেন। একদিকে নরক — বেশ্যাপল্লী — যার প্রতিনিধি সগীরা। অন্যদিকে স্বর্গ — ভদ্রসমাজ — যার প্রতিনিধি শিবশঙ্কর শাস্ত্রী। কেবলমাত্র ‘মানুষ মানুষের জন্য’ — এই মূল মন্ত্রে নরক হয়ে উঠেছে স্বর্গ। সমাজ বা তথাকথিত সমাজ যাদের ঘৃণা করে, অবহেলা করে এক কোণে রেখে দিয়েছিল তারাই হয়ে উঠল প্রকৃত অর্থে মানুষ। এই ভাবনাচিন্তা বা এই বলিষ্ঠ লেখনি সম্ভবত প্রফুল্ল রায়ের পক্ষে সম্ভব।
এবার আসি গল্পের তৃতীয় অংশে যেখানে দেখা যাচ্ছে শিবশঙ্কর শাস্ত্রীর জ্ঞান ফিরে এসেছে। তিনি তাকাচ্ছেন। জানতে চাইছেন তিনি কিভাবে এখানে পৌঁছালেন। স্থানটিবা কোথায়? তার উত্তরে সগিরা বলেছে এটা নরক। আর তারা নরকের কিট। ডাক্তারবাবু বলে গিয়েছিলেন শাস্ত্রীমশাইকে যেন দুধ অর্থাৎ পানীয় জাতীয় খাদ্য দেয়া হয়। অন্ন দিলে তার হয়তো তার জাত, ধর্ম, পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কারণ সাগিরা অপবিত্র। এ কথা শুনে ভয় পেয়েছিল সাগিরা। তাই শাস্ত্রীমশাই যখন খিদের জন্য ছটফট করছিলেন, বারবার খাবার চাইছিলেন তখন সগিরা জিজ্ঞাসা করে জিজ্ঞাসা করে —
“আমাদের ছোঁয়া কি খাবেন?”
আবার, “আমরা নরকের পোকা দেওতা। আর এটা দুনিয়ার সব চেয়ে নোংরা জায়গা।”
শাস্ত্রীমশাই-এর উত্তর — “খাব না কেন? নিয়ে এস। ভূখ লাগছে।”
এখানে লেখক ঘূণধরা সমাজের মেরুদণ্ডে চাবুক মারলেন। আর ‘ভূখ’ শব্দটি হয়ে উঠল শাশ্বত, এক চিরন্তন সত্যের প্রতীক। সদ্য জীবন ফিরে পাওয়া মানুষের কাছে ধর্ম,অর্থ, পবিত্রতা,সততা সবকিছুর ঊর্ধ্বে গুরুত্ব পেয়েছে ‘ভূখ’ — ক্ষুধা। লেখক প্রমাণ করলেন মানুষের জীবনের সর্বপ্রথম চাহিদা এটি। বাঁচার জন্য দরকার খাদ্য। তারপরে অন্য কিছু। মানুষের জীবনের ন্যূনতম চাহিদার প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে ‘ভূখ’ শব্দটি। আমরা জানি শব্দব্রহ্ম। শব্দের অনেক ক্ষমতা। এই আপ্তবাক্যটি ‘ভূখ’ শব্দ আবার প্রমাণ করল। সৎ, পবিত্র, ধার্মিক, শিবশংকর শাস্ত্রীর মুখেও আমরা এর প্রতিফলন লক্ষ্য করি — “তুমি আমার জীবন দিয়েছ। দুধ নিয়ে এস।”
সগিরা যখন তাকে জিজ্ঞাসা করে এই বেশ্যাপল্লী থেকে আপনি যদি দিনের আলো বের হন তাহলে কলঙ্ক রটে যাবে। এ পল্লীতে কেউ দিনের আলোয় আসে না। যারা আসে তারা সকলেই অন্ধকারে আসে। কিন্তু শাস্ত্রীমশাই দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন তিনি দিনের আলোতেই চলে যাবেন।
আসলে শাস্ত্রীমশাই কোন অসৎ কার্যে লিপ্ত নয় তাহলে কেন তিনি দিনের আলোতে যাবেন না। আর জায়গাটি কেন অপবিত্র। ওখানেও তো মানুষ বাস করে। তারাও যে মানুষের বিপদে আপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার প্রমাণ তো তিনি নিজেই তাহলে দিনের আলোতে তার মত ব্যক্তির ফিরে যাওয়া তা নিদর্শন স্থাপন সমাজের কাছে একটা বার্তা জানে যে না এরাও রক্ত মাংসে গড়া মানুষ। এদেরও সুখ দুঃখ আশা-আকাঙ্ক্ষা চাওয়া পাওয়া রয়েছে। এদেরকেও যদি সঠিকভাবে সঠিক পথে চালিত করা যায় তাহলে এরাও সম্মান সামাজিক বাঁচতে পারবে বাঁচতে পারবে দিনের আলোয়। এখানেও লেখক এক চূড়ান্ত জীবন দর্শন এর প্রতিফলন। গল্পের পরিসমাপ্তিকে দেখা যায় শিবশঙ্কর বাবুর মনের মধ্যে এক দোলাচলতা সৃষ্টি হয়েছে। তার মনে হয়েছে স্বর্গ ও নরকের মাঝখানে সীমারেখা কি? প্রকৃত অর্থের স্বর্গ কোনটা? নরকই বা কোনটা? এই চিন্তা তার মনকে তোলপাড় করছিল। স্বর্গ বলতে কি আমরা শুধু মাত্র পূজা, পাঠ, ধর্ম আলোচনা ইত্যাদি আধ্যাত্মিক বিষয়কেই বুঝি। কিন্তু লেখক প্রচলিত অর্থে স্বর্গ বলতে যা বোঝায় সেদিকে গেলেন না। তিনি অন্য দিকে পাঠকদের দৃষ্টি ফেরালেন। গুরুত্ব দিলেন জীবসেবাকে। ‘জীব সেবায় শিব সেবা’ হল আসল ধর্ম। এটাই স্বর্গ। এটাই পবিত্রতা। তাহলে সগিরা পবিত্র নারী। স্বর্গের অধিবাসিনী। গল্পকার এটাই প্রমাণ করতে চাইলেন যে যিনি দুর্গত, আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়াবে, মানুষের বিপদের সাহায্য করবে, তিনিই প্রকৃত দেবতা। তিনি মহান। বেশ্যা হলেও সে কিন্তু প্রকৃত মানুষ।
ঠিক এর বিপরীতে লেখক নিয়ে এলেন জগনাথ চরিত্রটিকে। যার কাছে নারী মানেই ভোগ্যবস্তু। জগনাথ ‘লালদাসিয়া’ কায়াথ। বয়স পঞ্চাশের ওপর। অর্থ সম্মান প্রভাবশালী এই জগন্নাথ দিনের আলোয় সে ভদ্রলোক সেজে ঘুরে বেড়ায় অথচ তার মন নরকের থেকেও অপবিত্র।
পরিচয় দিতে গিয়ে লেখক বলেছেন —
“… মেয়েমানুষের জন্য তার শরীরে সারাক্ষণ আগুন জ্বলছে।”
তার স্ত্রী অসুস্থ। কিন্তু কামনার আগুনে সে সব সময় বেশ্যাপল্লীতে ঘুরে বেড়ায়। এরাও সমাজের একটা চরিত্র তথাকথিত ভদ্রলোক কিন্তু এদের মন পঙ্কিলময়। লেখক এর বর্ণনাতেই তার স্পষ্ট — “শরীর বলে তো একটা ব্যাপার আছে। রুগ্ন রতিশক্তিহীন গিধের মতো স্ত্রীকে নিয়ে সে কী করবে? ধর্মপত্নীর জন্য তো আমৃত্যু ব্রহ্মচর্য পালন করা যায় না।”
তাহলে গল্পটির মধ্যে দু’রকমভাবে সমাজকে দেখানো হয়েছে। যারা বেশ্যাপল্লীতে থাকে।
বেশ্যাবৃত্তি করতে বাধ্য হয়। আর জগনাথের মত মানুষ যারা সমাজকে অবনতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে তাদের সখই হচ্ছে নিত্যনতুন নারী-শরীর।
এখানে লেখক এই সমস্ত মানুষদের মনকেই ‘নরক’ বলেছে। গল্পের প্রধান তিনটি চরিত্র
সগিরা, জগনাথ ও শিবশঙ্কর শাস্ত্রী। এই তিনটি চরিত্র তিন দিকের প্রতিনিধিত্ব করেছে। সগিরা নরকের বাসিন্দা হলেও তার মন স্বর্গের মতো পবিত্র। আবার জগনাথ সমাজের নামী দামী ব্যক্তি হলেও তার মন নরকের মতই তমসাচ্ছন্ন। সৎ, জ্ঞানী শাস্ত্রীমশাই প্রকৃত অর্থে বিদ্বান। তাই তিনি সত্যটিকে অনুধাবন করতে পেরেছেন। তিনি সগিরার হাতে খাবার গ্রহণ করেছেন। আবার সমাজকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য, প্রচলিত ধ্যান ধারণা ভেঙে দিনের আলোয় ওখান থেকে ফিরে এসেছেন। প্রমাণ করেছেন সগিরারাও মানুষ।
আসলে প্রফুল্ল রায় প্রায় সারা জীবনই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। বিভিন্ন ধরনের মানুষের সংস্পর্শে এসেছেন। তাদের সাথে আলাপ করেছেন। খুব কাছ থেকে দেখেছেন জীবনকে। যার প্রতিফলন তার প্রত্যেকটি গল্পে। হ্যাঁ, তিনি হয়তো লাজুক ছিলেন। নিজেকে প্রকাশ করতে চাইতেন না। বিভিন্ন অজুহাতে এড়িয়ে চলতেন সাহিত্যের অনুষ্ঠান বা বইমেলা। কিন্তু তার চিন্তার বলিষ্ঠতা, সমাজে প্রচলিত অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখরতা শব্দ হয়ে তার গল্পকে জীবন্ত করে তুলেছে। তাই সগিরা কেবল একটা চরিত্র নয় সমাজ পরিবর্তনের এক জ্বলন্ত শিখা।