তৃতীয় অধ্যায়
হুমায়ুনের রাজত্ব। ১৫৩০-৩১-এ কিলিঞ্জর অভিযান
কিন্তু হুমায়ুনের সব থেকে বড় শত্রু ছিলেন শ্যালক মহম্মদ জাহান মির্জা আর ভাইপো মহম্মদ সুলতান মির্জা এবং তার বহু পুত্র দল। উচ্চবংশে জন্ম হওয়ায়, তারা সারাক্ষণ বংশ গরিমায় নাক উঁচু করে দুঃসাহসিক অভিযানে যাত্রা করে অশান্তি আর সমস্যা তৈরি করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল।
সমস্যার সমাধান হাতের বাইরে ছিল না। কিন্তু সম্রাটকে বাধ্য হতে হয়েছিল তাদের ওপর নিয়মিত নজরদারি করতে। এক দিকে যেমন অনুগামী আর বিশ্বাসীদের পুরষ্কার দেওয়ার নীতি নিয়েছিলেন তেমনি যারা অস্থির বিরূপ দুর্বশ্য তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত যুদ্ধ অভিযানের নীতি থেকে সরেন নি তিনি। তাছাড়া বিদ্রোহীদের শ্রেণী বিভাগ করেন নি, সে ভাই হোক বা সম্পর্কিত আত্মীয় বা আফগান গোষ্ঠীপতিই হোক। তার সাম্রাজ্যে এই নীতিগুলি প্রযুক্ত হতে শুরু করলে, ক্রমশ বিদ্রোহ মাথা নামাতে শুরু করল, বাহাদুর শাহের মত পরাক্রান্তশালী যুদ্ধবাজেরাও বুঝল সম্রাটের বিরুদ্ধাচারণ সুবিধের কাজ হবে না।
কিন্তু বিশাল হৃদয়ের সম্রাট কাউকেই শাস্তি দিলেন না, মির্জাদের তো নয়ই, ভাইদের কথা ছেড়ে দেওয়া গেল। আফগানদের তিনি উপেক্ষা করলেন। কারন তিনি মনে করলেন দক্ষ উপযুক্ত শের খান নিশ্চই ক্ষমতার টানে মুঘলদের দিকে সরে আসবেন; অথবা তার মনে বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল, তিনি যেহেতু আফগানদের জন্মভূমি আফগানিস্তানে বহুকাল কাটিয়েছেন, তাই আফগানদের মানসিকতা ভালভাবে জানেন, তাদের তিনি অন্তর থেকে চেনেন, তাই শের খানকে হয়ত তিনি সামল দিতে পারবেন। তিনি ভুলেগিয়েছিলেন, হিন্দুস্তানে এসে আফগানেরা বিশাল গোষ্ঠীতে পরিণত হয়ে, ততদিনে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠেছে। কাবুল আর কান্দাহারের আফগানেরা তাঁকে মান্য করে না, তারা কামরানের প্রতি অনুগত। কামরান মুঘল হিন্দুস্তানের স্বার্থ বিষয়ে উদাসীন বলে হুমায়ুনের পক্ষে আফগানদের বিষয়ে উদাসীন থাকা ঝুঁকি হয়ে ছিল।
হুমায়ুনের সমস্যা শুরু হল তাঁর রাজত্বের প্রথম সময় থেকেই। আগেই আলোচনা করেছি বড় বোন মাসুমা সুলতানা বেগমের স্বামী, তার শ্যালক মহম্মদ জামান মির্জা বিদ্রোহী হলেন। খুব তাড়াতাড়ি বিদ্রোহ মিটেও গেল হুমায়ুনের বদান্যতায় আর বাবর যেহেতু হুমায়ুনকে তাঁর উত্তরাধিকারী বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আমীরদের জানিয়ে দিয়েছিলেন, তাই আমীরেরা হুমায়ুনের সঙ্গ ছাড়েন নি। মির্জার বিদ্রোহ তিনি ক্ষমা করলেন।
হুমায়ুন বুঝলেন খলিফার তাকে সম্রাট হিসেবে পছন্দ না করা আর একই সঙ্গে মির্জার বিদ্রোহের কারন হল আমীরদের মধ্যে অসন্তোষ। তাই তাকে খুব শীঘ্রই এমন কিছু চোখ ধাঁধানো সাফল্য দেখাতে প্রয়োজন হয়ে পড়ল, যার ঔজ্জ্বল্যে আমীরেরা মোহিত হয়ে যায়। এই সমস্যা সামাল দিতে তার হাতে একটা সহজ উপায় ছিল – কিলিঞ্জর আক্রমন। বাবরের রাজত্বের শেষের দিকে তিনি কিলিঞ্জরের রাজার বিরুদ্ধে অভিযান করেন। বাবরের হঠাৎ অসুস্থতা এবং মৃত্যুর ফলে তাকে অভিযান শেষ না করেই ফিরে আসতে বাধ্য হতেও হয়। ফলে বহুকালই কিলিঞ্জর সমস্যার সমাধানের বিষয়টা তার মাথা থেকে বেরিয়েগিয়েছিল। তিনি দেখলেন, এখন যখন হাতে কিছুটা সময় আছে, তখন নতুন করে কিলিঞ্জর দখল করার পরিকল্পনা ছকলেন।
বিখ্যাত কিলিঞ্জরের কেল্লা দক্ষিণ-পুর্ব বুন্দেলখণ্ডের প্রান্ত এলাকায় আকাশে মাথা তুলে দাঁড়ানো এক বিশাল কাঠামো। তাকে মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা করেছে পাশের বিন্ধ্যাচল পাহাড়শ্রেণীর সানুদেশ থেকে শুরু হওয়া ১২০০ গজের গিরিখাত। এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১২০০ ফুট উঁচুতে এবং স্থানীয় সমতলভূমি থেকে আরও কয়েকশ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। পাহাড়ের মাথায় ছিল ৪-৫ মাইল দীর্ঘ সমতলভূমি, তাকে ঘিরে ছিল গড় প্রাচীর। গড় প্রাচীরের তলায় ১৫০ ফুটের উলম্ব পাহাড়। সেই পাহাড়ে চড়া সহজসাধ্য বিষয় ছিল না। পাহাড়ের মাথায় পাথর কেটে বানানো বেশ কয়েকটা পুকুর থাকলেও জলের গুণমান যে খুব ভাল ছিল এ কথা বলা যাবে না।
বলা হয় সত্যযুগে এর নাম ছিল রত্নকূট, ত্রেতা যুগে নাম ছিল মহাগিরি আর দ্বাপরে পিঙ্গালু। আধুনিক কালে কিলিঞ্জরের নাম পাচ্ছি মহাভারতে, টলেমির ভূগোলে তাছাড়া শিবপূরাণেও। কিলিঞ্জর শিবের একটি নাম, যার অর্থ যিনি সময় বৃদ্ধি করেন। কেল্লায় শিব লিঙ্গ যেমন আছে, তেমনি আছে জৈন মূর্তি আর কেল্লাজুড়ে বহু শিলালেখও।
মুসলমান যুগে জয়পালের অধীনে চান্দেল শাসক ৯৭৮এ গজনির শাসকের বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছেন, এরপরে তারা ১০০৮এ পেশোয়ারের যুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। ১৫ বছর পরে মাহামুদ কিলিঞ্জর অবরোধ করলেও দখল করতে পারেন নি, নন্দ রাজার সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য হন। ১১৮২তে চান্দেল শাসককে পরাজিত করেন দিল্লির পৃথ্বীরাজ। চান্দেল শাসক তাঁর রাজধানী, মাহোবা থেকে কেল্লায় তুলে নিয়ে যান। কুতুবুদ্দিন ইলতুতমিস আর নাসিরুদ্দিন মহম্মদ খুব বেশি দিন নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখতে পারেন নি। ত্রয়োদশ শতাব্দ পর্যন্ত চান্দেল রাজা এই অঞ্চল শাসন করেছেন। পরের ২০০ বছরের ইতিহাস খুব স্পষ্ট নয়।
১৫৩১এ হুমায়ুন কিলিঞ্জর দখলের পরিকল্পনা করলেন। অবরোধ চলে বেশ কিছুকাল। শেষ পর্যন্ত ১২ মন সোনা দিয়ে শান্তি কিনতে হল। এই অঞ্চল মুঘল সাম্রাজ্যের অংশ হল।
মুঘলদের দুটি দরবারি ইতিহাসে তারিখের গোলমাল আছে। আবুলফজল এবং তাঁকে অনুসরণ করা বহু ঐতিহাসিক রাজার আত্মসমর্পণের তারিখ লিখছেন হিজরা ৯৩৭ বা ১৫৩০-৩১। কিন্তু তারিখইআলফি বলছে ঘটনাটা দুবছর পরে ঘটেছিল। আমরা জানি এই অবরোধ বেশি দিন চলে নি। তাই অবরোধ দুবছর ধরে চলেছিল, এই তথ্য ধরে নেওয়া কষ্টকর। আমরা আবুলফজলের উল্লিখিত তারিখই অনুসরণ করলাম।
হুমায়ুন কিলিঞ্জর অভিযান থেকে ১২ মন সোনা বা ৬৭,২০০ টাকার অধিকাংশ উৎসবে উপহারে ব্যয় করেলেন, কিন্তু তার থেকে বেশি অর্জন করলেন বিপুল রাজনৈতিক গুরুত্ব। সুপ্রাচীন সুপরিচিত চান্দোল পরিবারের আত্মসমর্পণে মুঘলদের সম্মান বাড়ল। এই অভিযানের পরে তিনি গাজি উপাধি নিলেন।
সিংহাসনে ওঠার পরে ঘটনাক্রম
হুমায়ুনের সিংহাসনে আরোহন ৩০ ডিসেম্বর ১৫৩০
হুমায়ুন আগরা দিল্লিতে জানু-জুন ১৫৩১
হুমায়ুন কিলিঞ্জর দখল জুলাই আগস্ট ১৫৩১ (চলবে)