চতুর্থ অধ্যায়
আফগানদের বিরুদ্ধে হুমায়ুনের প্রথম অভিযান ১৫৩১-৩৩
কিলিঞ্জর বিজয়ের পর হুমায়ুন সরাসরি আফগান ঘাঁটি চুনার অভিযান করলেন। এই অভিযানটা বর্ণনা করার আগে তার বিরোধীপক্ষ নিয়ে কিছু বাক্যব্যয় করে তাদের কাজকর্ম, অবস্থান বুঝে নেওয়া দরকার।
পাণিপথের যুদ্ধে সুলতান ইব্রাহিম লোদি শুধু হারলেন বা প্রাণ হারালেন না, সেই যুদ্ধে অন্তত ১৫ থেকে ৫০ হাজার [বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত] আফগান প্রাণ দিলেন। ইব্রাহিম লোদির ভাই সুলতান মহম্মদ লোদি ১০ হাজার অনুগামী নিয়ে রানা সঙ্গের বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে রাজত্ব উদ্ধারের চেষ্টা করলেও সে উদ্যম বিফল হল। তিনি মুঘলদের হারাবার স্বপ্ন সম্বল করে রাণার সঙ্গ’র সঙ্গে থেকেগেলেন। ১৫২৮এ ৩০ জানুয়ারি, ১৫৪৮ সম্বতে রাণার মৃত্যুতে তার স্বপ্ন চৌচির হয়ে গেল, তিনি রাজ্য উদ্ধারে অন্য রাস্তা খুঁজতে শুরু করলেন।
সুলতান ইব্রাহিমের অদূরদর্শীতার ফলে দক্ষিণ বিহারে বিপুল সংখ্যক আফগান একজোট হতে বাধ্য হলেন। সুলতান ইব্রাহিমের নীতির ফলে ভাই সুলতান জালালুদ্দিন, মন্ত্রী মিঞা ভোয়া এবং প্রথম ৩০,০০০ বাহিনীর সেনানী আর নাকাড়া বাজাবার অধিকার পাওয়া সেনানী আজম হুমায়ুন শিরওয়ানির মৃত্যু আফগান আমীরদের মনে ব্যাপক নিরাপত্তার অভাব তৈরি করে এবং এর ফলে কয়েজকজন আফগান আমীর বিদ্রোহও করেন। প্রথম দুজন বিদ্রোহী আমীর হলেন লখনৌএর শাসক আজম হুমায়ুইন লোদি এবং আজম হুমায়ুন শিরওয়ানির দ্বিতীয় পুত্র ইসলাম খান। বিদ্রোহ খুব একটা সফল না হলেও ইব্রাহম লোদির অত্যাচার মাত্রা ছাড়াল (তাঁর শেষ শিকার শেখ হুসেইন কারমালি); অভিজাতরা তাঁর একচ্ছত্র শাসনের বিরুদ্ধে মাথা তুলতে শুরু করলেন। বিহারের শাসক দারিয়া খান নুহানি আনুগত্য প্রদর্শন করেও স্বাধীনভাবে প্রশাসন চালাতে লাগলেন। ১৫২১-এ তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র বাহাদুর খান শাসন ব্যবস্থা সামলালেন, প্রথম দিকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন নি, শাসক উপাধি নেন নি, কিন্তু সুলতানের মৃত্যুর পর তিনি নিজেকে সুলতান ঘোষণা করলেন। ১৫২৬-এ নিজের নামে খুতবা পড়লেন। ফলে বিহারে আফগানদের মধ্যে নুহানি গোত্র যথেষ্ট গুরুত্ব অর্জন করলেও অন্যান্য যেমন কারমালি আর বিক্ষুদ্ধ লোদিরাও ছিল।
দুবছর পরে বিহারের নুহানি আফগান শাসক সুলতান মহম্মদ মারা গেলে বালক পুত্র জালাল খান সুলতান জালালুদ্দিন শাহ নাম নিয়ে সিংহাসনে আরোহন করেন। তাঁর প্রধান পরামর্শদাতা হলেন মা দুদু আর আতলিক বা উকিল হলেন শের খান। যতদিন মা বেঁচেছিলেন বজ্রমুষ্টিতে রাজ্যে শাসন চালিয়েছেন — অঞ্চলে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় ছিল। সুলতান আর তার আমীরদের মধ্যে এবং সুলতান আর বাবরের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত ঘটে নি। ১৫২৯-এ দুদু আর জালাল বাবরের সঙ্গে দেখা করেন, বাবর তাদের আধা-স্বাধীনভাবে রাজ্য চালানোর অনুমতি দেন ১ কোটি ডবল দাম বা ৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে খালিসা আর মহম্মদ খান নুহানি জায়গির পেলেন ৫০ লক্ষ ডবল দাম বা আড়াই লক্ষ টাকার বিনিময়ে মূলত আসকরির শাসনে সেবা দেওয়ার জন্যে, ৪ মে’র ঘাগরা যুদ্ধে তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ।
জালালুদ্দিনের সমস্যা হল তার ছোট্ট রাজ্যটা ভৌগোলিকভাবে দুই মহা শক্তিশালী রাষ্ট্র দিল্লি আর বাংলার মধ্যে অবস্থিত ছিল। তিনি দু’পক্ষেরই বন্ধু ছিলেন। কিন্তু বাংলার সুলতানের বাহিনীর সাহায্যে বিহারে বাবর যে যুদ্ধ লড়লেন তাতে জালালুদ্দিন অংশ নেন নি, কিন্তু বাবর নুসরত শাহকে যুবা সুলতানের প্রভাব নিয়ে লিখলেন Jalal Khan whom the Bengali Nasrat Shah must have held as if eye-bewitched। ১৫২৯এ ১৯ মে, বাবর বাংলার সুলতানের সঙ্গে সমঝোতা করে আগরা ফিরে যাওয়ায় আপাতত জালালুদ্দিনের ছোট রাজ্যের ওপরে ছেয়ে থাকা কালো মেঘ কাটল।
কয়েক মাস পরে জালালুদ্দিনের অভিভাবক, বিহারের যোগ্য প্রকাশক মা, দুদু প্রয়াত হলেন। শাসনের বজ্রমুষ্ঠি আলগা হল। নুহানি গোত্রের আফগান যেমন জালালের সঙ্গে শের খানের মধ্যে বিবাদ বাধল। নুহানিরা শের খানের উত্থানে, তার প্রশাসনিক দক্ষতা আর চাতুর্যে এতই ঈর্ষাকাতর হয়ে উঠল যে তারা জালালের শাসন অস্বীকার করে পাশের রাজ্যের প্রতি নিজেদের আনুগত্য প্রকাশ করল। সেই মুহূর্তে নুহানি গোত্রের গোষ্ঠীপতিদের সমস্যা হল দিল্লি না বাংলা কার প্রতি তারা সমর্থন যোগাবেন সেটা তারা ঠিক করেউঠতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত নিম্নলিখিত কারনে তারা বাংলার সুলতান নুসরতের অধীনে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন — ১) আফগানেরা মুঘল রাজাকে দখলদার মনে করতেন। তারা মনে করতেন মুঘলেরা তাদের স্বাধীনতা হরণ করে দিল্লি দখল করেছে। আর শের খান যেহেতু আগে মুঘল দরবারের অনুগত ছিলেন, তাই তারা শের খানকে আরও বেশি ঘেন্না করে। ২) বিবান আর বায়াজিদ, দুই আফগান আমীর মুঘলদের বিরুদ্ধে লড়েছে; তাই বাবরের দলে যোগ দেওয়ার অর্থ হল তাদের বিরুদ্ধাচারণ করা। ৩) নুসরত এখন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখে ঘাঘরা যুদ্ধে আফগানদের পক্ষে অংশ নিয়েছে ঠিকই; কিন্তু সে কতদিন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখবে বলা মুশকিল। নুহানি আর শের খানের মধ্যে চলতে থাকা দ্বন্দ্ব বিহার রাজ্যকে দুর্বল করেছে ক্রমাগত; আর নুসত শাহ দিল্লির মুঘলদের তুলনায় বিহারের কাছে থাকেন, তাকে ভয় পাওয়া দরকার কারন সে যে কোনও সময় বিহার দখল করতে পারে। ৪) নুসরত আর শের খানের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। এর বড় কারন হল শের খানের প্রশাসনিক দক্ষতা নুসরত টের পেয়েছে। তাছাড়া শের খানের সঙ্গে উত্তর বিহারের হাজিপুরের শাসক মখদুম-ই-আলমের সম্পর্ক অতি মধুর। তাই তারা শের খানের শত্রুতা আর নুসরতের সঙ্গে বন্ধুতা তৈরির সিদ্ধান্ত নিলেন। ফলে সুলতান জালাল আর অন্য নুহানি গোত্র, নসরত শাহের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
এবারে আমরা সুলতান মাহমুদ লোদিকে নিয়ে কিছুটা সময় ব্যয় করব। আমরা এর আগে আলোচনা করেছি তিনি রাণা সঙ্গের সাথে যোগ দিয়ে দিল্লি উদ্ধারের স্বপ্ন দেখতেন। ১৫২৮-এ রাণা সঙ্গের মৃত্যু হয়। তার পর তিনি চিতোর ছেড়ে বিহারে পৌঁছে ১৫২৯-এ দিল্লির মুঘল শাসনের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর বাহিনীর ৩টে ডিভিশন ছিল প্রথমটা রওনা হল বিবান আর বায়াজিদের নেতৃত্বে গোরখপুর দখল করতে, দ্বিতীয়টা শের খানের নেতৃত্বে রওনা হল বাবরের প্রিয় জালালুদ্দিন শর্কির হাত থেকে বেনারস দখল নিয়ে সুলতান জুনায়েদ বারলাসের প্রশাসনিক নেতৃত্বে জৌনপুরে পৌঁছতে আর তৃতীয় অভিযানে প্রখ্যাত চুনারগড় কেল্লা দখল নিতে নিজে রওনা হলেন সুলতান মাহমুদ লোদি। কোরায় তিনি বাবরের মুখোমুখি হওয়ার আগে জৌনপুর মাহমুদের হাতে এলে, লখনৌ পর্যন্ত অঞ্চলে কার্যত আফগানদের শাসন চালু হল। ১৫২৯-এর মার্চে বাবর সুলতান মাহমুদ লোদির মুখোমুখি হলেন, চুনারের অবরোধ উঠল এবং লোদি আরও পূর্ব দিকে হঠে যেতে বাধ্য হলেন।
ও দিকে শের খান চেষ্টা করছেন তাঁদের ছোট রাজ্য বাঁচানোর জন্য। যদিও রাজ্যের আমীরেরা শের খানের দক্ষতায় ভরসা রাখতেন, কিন্তু আফগানদের কাছে লোদি বংশ পরিচয়ের মাহাত্ম্য প্রবল। নাম মাহাত্ম্যে তারা বেতর। প্রায় প্রত্যেক আমীর, সুলতান মাহমুদ লোদির শরণাপন্ন হয়ে মাহামুদকে রাজ্যে আমন্ত্রণ জানালেন। ১৫৩০-এ সুলতান মাহমুদ লোদি, রাজ্যে প্রবেশ করে প্রশাসনের হাল ধরলে, বিরক্ত শের খান তাঁর পুরোনো জায়গিরে আশ্রয় নিলেন। কিন্তু রাজ্যের আমীরেরা জানতেন শের খানের দক্ষতা লোদির থেকে অনেক বেশি। শের খান জানতেন যে সব আমীর মাহমুদ লোদিকে ডেকে এনেছেন, তারা সামরিক দিক থেকে কত অদক্ষ, অবিবেচক। নতুন শাসক লোদি, শের খানকে তার দরবারে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। শের খান জানতেন তার পক্ষে লোদির পক্ষ দাঁড়ানো কতটা বিপজ্জনক। কিন্তু মাহামুদ লোদি শের খানের জায়গিরে এলেন তাকে নতুন পরিকল্পনায় শামিল করতে।
এবারে আমরা হুমায়ুনের রাজত্বে আফগানদের অবস্থা বোঝার চেষ্ট করব। নুহানিরা পূর্ব দিকে পিছয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এক বছর আগে মাহামুদ লোদির মুঘলদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আফগানদের একমাত্র ভরসা শের খান নতুন উদ্যমে খাজাঞ্চি সামলালেন, প্রজাদের নিরাপত্তা দিলেন, বাহিনীর জন্যে অনুগামী সেনা সংগ্রহ করলেন এবং তিনি দিন রাত বিহার রাজ্যের নিরাপত্তার জন্যে খাটছিলেন। মাথায় রাখতে হবে শের খান ছিলেন সে সময়ের আফগান গোত্র নেতাদের মধ্যে সব থেকে সম্পদশালী সেনাপতি। কিন্তু সমস্যা হল তিনি সাধারণ শূর গোত্রের নেতা আর তার ঠাকুর্দা যেহেতু সাধারণ ঘোড়া ব্যবসায়ী ছিলেন, তিনি যেহেতু কোনও শাসক নীল; রক্তের পরিবারের সন্তান ছিলেন না, তাই তাঁকে বিহারের সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য করা হল না।
সেই মুহূর্তে মাহামুদ লোদি নতুন অভিযানের তোড়জোড় করছিলেন। প্রত্যেক আফগান গোত্র, ইচ্ছেয় বা অনিচ্ছায় তার সঙ্গে যোগ দিতে বাধ্য হলেন। এক বছর পর ১৫৩২এ বাহিনী সাজিয়ে পশ্চিম দিকে অভিযান চালানো হল, কোনও বাধা ছাড়াই আফগান বাহিনী ২৫০ মাইল উজিয়ে পৌঁছল আজকের বারাবাঁকির কাছে নবাবগঞ্জ তহসিলের কাছে পৌঁছল। আমরা এর আগে হুমায়ুনকে কিলিঞ্জরের রাজার সঙ্গে চুক্তি করতে দেখেছি। হুমায়ুনকে সেই অবস্থায় চুক্তি করার সিদ্ধান্র নেওয়ার বড় কারন ছিলল আফগান বাহিনীর বাধাহীন অগ্রগামিতা।
হুমায়ুনের বাহিনীর সঙ্গে বিহারী আফগানদের প্রথম যুদ্ধ হল ১৫৩২এর আগস্টে দাদরার কাছে। মুঘলদের সহজ জয় এল। যুদ্ধে আফগানেরা দুই বড় যোগ্য সেনাপতি বাতাজিদ কারমালি আর ইব্রাহম খান ইউসুফ-খাইলকে হারাল। আমরা জানি না, এই যুদ্ধে শের খানের কী ভূমিকা ছিল। ইতিহাস তার কৃতি উল্লেখ করে নি। কিন্তু যে শের আফগান বহুবার বাংলার সুলতানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বার বার জিতেছেন, তিনি নেতৃত্বে থাকলে যুদ্ধের ফল এতটা শোচনীয় হত কীনা সন্দেহ আছে। যুদ্ধের হারের দায় শের খানের ঘাড়ে কোনও মতেই চাপানো যায় না। প্রথমত নেতৃত্বে ছিলেন মাহামুদ লোদি স্বয়ং। তাঁর পাশে ছিলেন বিবান খান জালওয়ানি এবং বায়াজিদ কারমালি। দু’জনেই সাহসি সেনাপতি কিন্তু যুদ্ধের মাঠে কৌশলী সেনাপতি হিসেবে খুব যোগ্য, এমন কথা বলা যাবে না। সে সময়ের আমীরেরা কেউই শের খানের যোগ্যতা মাপতে পারেন নি। এবং বিহারে লোদির শাসনে তাঁর নাম সামনের সারির সেনাপতি হিসেবে বিবেচনা করা হয় নি। শের শাহের হয়ত মনে হচ্ছিল, বিহারের আফগান অভিজাত আমীরেরা তাঁর প্রতিভার সমাদর করতে পারল না। তাকে শুধু বলা হয়েছিল, জৌনপুর দখল করা গেলে সেখানে সব আমীরের জায়গির সরিয়ে নিয়ে গিয়ে, গোটা বিহার তাঁর জায়গির হিসেবে দেওয়া হবে। এ বাবদে অগ্রিম ফরমানও জারি করা হল। তিনি ছাড়া আরও দুজন আফগান ছিলেন সুলতান মাহমুদের শ্বশুর মসনদইআলি আজম হুমায়ুন, মসনদইআলি ঈসা খান। দুজনই অভিজ্ঞ এবং দক্ষ সেনাপতি। তারাও শের খানের মত পিছনে রইলেন। আমরা দেখলাম আফগান বাহিনীতে সেনাপতিদের মধ্যে যুদ্ধে সফল হওয়ার মত বোঝাপড়া প্রায় শূন্য ছিল বললেই চলে। (চলবে)