চতুর্থ অধ্যায়
আফগানদের বিরুদ্ধে হুমায়ুনের প্রথম অভিযান ১৫৩১-৩৩
বিহারের রাজনীতিতে বিতশ্রদ্ধ শের শাহের বিরক্ত হওয়ার কারন স্পষ্ট। তৎকালীন ঘটনাবলীর গতিপ্রকৃতি যে তার ভাবনাচিন্তার প্রতিকূল, তিনি যে সেই রাজনীতিতে মানাতে পারছেন না, এই বিষয়টা ইতিহাস অনুসন্ধিৎসু প্রত্যেক মানুষের না বোঝার কারন নেই। তিনি দেখছেন, তাঁর দক্ষ সামরিক সেবা ক্ষমতাসীনেরা স্বীকৃতি দিচ্ছে না, তাকে সামনে আনছে না; বিহারের অভিজাতরা শুধুই নামের পিছনে দৌড়োচ্ছে। যার নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা রয়েছে, তাকে পিছনের সারিতে বসিয়ে রাখা হয়েছে। সময়সন্ধিক্ষণে কিছু না করতে পারার বেদনা তাকে নিরন্তর কুরে কুরে খাচ্ছে। মাহমুদ লোদির শিবির বিহারের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই উত্তেজিত, কিন্তু অনুপযুক্ত পরিকল্পনার দরুন সাফল্য অধরা থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। মাথায় রাখতে হবে মাহমুদ লোদি কিন্তু অতীতেও সাফল্য লাভ করেন নি।
শের শাহ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন বিহারের আফগান গোত্রের নেতাদের অপরিকল্পিত, অদক্ষ সামরিক প্রস্তুতির ফলে, আফগান বাহিনীর দক্ষ, প্রশিক্ষিত পেশাদার মুঘল বাহিনীর সামনে খড়কুটোর মত ভেসে যাওয়া সময়ের অপেক্ষা। এর আগেও এ ধরণের সামরিক অসাফল্যের ঘটনা ঘটেছে, এই অসাফল্যের জড়ত্বকে জোর ধাক্কা দিতে না পারলে আগামী দিনেও বার বার একই ঘটনা ঘটতে থাকবে। অবিমৃষ্যকারী, উদ্যত স্বজাতির আত্মহনন থেকে নিজেকে বাঁচাতে শের খান স্পষ্ট অবস্থান নিলেন। হুমায়ুনের সেনাপতি হিন্দু বেগকে চিঠি লিখে শের খান জানালেন, তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের অনুগামী জায়গিরদার। তিনি বাধ্য হয়ে আপাতত আফগান শিবিরে আছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি নকল যুদ্ধ করে মুঘলদের বিরুদ্ধে আফগানদের হার নিশ্চিত করবেন।
কালিকারঞ্জন কানুনগো শের শাহ বইতে তাঁর নায়কের এই বিশ্বাসঘাতমূলক বক্তব্য মানেন নি, যদিও শের খানের সময়ের প্রত্যেক ঐতিহাসিকই এই বক্তব্য সমর্থন করেছেন। তিনি যে সব যুক্তি দিয়েছেন, সেগুলো নিচে ছোটকরে সাজিয়ে দেওয়া গেল —
১) শের শাহের চরিত্রের মহত্বের সঙ্গে, এই প্রস্তাব খাপ খায় না।
২) ততকালীন লেখকেরা, তাদের লেখাপত্রে বাচাল ঐতিহাসিক আব্বাস খান সারওয়ানির তারিখইশেরশাহী থেকে তথ্যাদির ওপর নির্ভর করেছেন। ফলে সেই তথ্য মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।
৩) ঐতিহাসিকেরা শের শাহের জীবনে বিশ্বাসঘাতকতার কথা বলেছেন, কিন্তু হুমায়ুনের রাজত্বের কথা বিস্তারে বলেন নি। এটা স্রেফ দ্বিচারিতা।
৪) যে কোনও জাতীয় বিপর্যয়ে বিশ্বাসঘাতকতা, সমর্থকদের মনে হারের একটা গ্রহণযোগ্য বাহানা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি এই বস্তাপচা বক্তব্য আর কত দিন চলবে।
৫) এমন কী এলফিন্সটোনের মত আধুনিক ঐতিহাসিকও শের খানের বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ স্বীকার করেন নি।
আমরা এর সঙ্গে আরও কিছু বক্তব্য যোগ করলাম, ক) আকবরনামায় শের খানের বিশ্বাসঘাতকতার উল্লেখ নেই; খ) শের খানের বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ উঠেছে ঘটনার ৪৮ বছর পরে; গ) বিশ্বাসঘাতকতা বর্ণনায় আব্বাস, নিজামুদ্দিন আর ফরিস্তার ভাষা খুবই কাছাকাছি। যেহেতু আব্বাসই প্রথমদিককার ঐতিহাসিক, তাই তাঁর ভাষ্য প্রত্যেকেই নকন করবেন এতাই স্বাভাবিক।
আসুন আমরা কেন কানুনগো মহাসয়ের যুক্তি মানতে রাজি নই, সে বিষয়টা আলোচনা করি —
১) গোটা উদ্যমটাই ছিল সমস্ত আফগান গোত্রর পরিকল্পনা, তাই প্রত্যেককে অংশ নিতে হয়েছে, ইশা খান বা আজম হুমায়ুনেরর সঙ্গে শের খানও বাধ্য হয়ে অংশ নিয়েয়েছেন।
২) সুলতান মাহামুদ লোদি জৌনপুর দখল পেলেই, সমগ্র বিহার শের খানকে জায়গির হিসেবে দেওয়া হবে, এই ফরমান সুয়লতান মাহমুদ কিন্তু শের খানকে যুদ্ধ শুরুর আগেই দিয়েছিলেন। ক্ষমতা যখন শের শাহ’র দক্ষতা স্বীকার করে নিচ্ছে, তখন শের শাহের পক্ষে সেনা প্রধান না হয়েও উক্ত অভিযানে শামিল না হওয়ার কারব ছিল না।
৩) তাঁর পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত বহু আফগান গোত্রর উপকারে এসেছিল। বহু আফগান নেতা মুঘলদের সঙ্গে জোট করে আর যেহেতু শের খান বিহারের আফগান গোষ্ঠীর অন্যতম নেতা, তাই তিনি প্রত্যেককে উপরে ক্ষমতার সিঁড়িতে উঠতে সাহায্য করেন। আগামী পাঁচ বছর ধরে শের খানের সাফল্য অর্জনের কারন হল সে সময় মুঘলেরা তার সক্রিয় কর্মকাণ্ডে নাক গলাতে আসে নি। তারা শের খানকে মুঘল অমাত্য হিসেবেই গণ্য করেছে।
৪) ইতিমধ্যে শের খান নিজেকে তাঁর সমাজের ভবিষ্যতের উদ্ধারকর্তা হিসেবে গড়ে পিটে নিচ্ছিলেন। তাঁর কাজকর্ম আফগান সেনাপতিদের চক্ষুশূল হয়ে উঠছিল। যে যুদ্ধে তাঁর সঙ্গে সুলতানের কোনও তালমিলই গড়ে ওঠে নি, সেই যুদ্ধে তাঁর যোগ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সুলতানের সম্মানহানির অর্থ হল শের খানের দক্ষতার গ্রহণযোগ্যতা বাড়া এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থায় প্রভাব বৃদ্ধি।ফলে আব্বাস যে ঘটনার কথা বলছেন, সেটাকে তথাকথিত বিশ্বাসঘাতকতা বলা যায় না, শের খানকে অস্বস্তিতেও ফেলা যায় না।
৫) আমরা যদি ধরেই নি, প্রত্যেক লেখক আব্বাসের ব্যবহার করা তথ্য ধার নিয়েছেন, তার পরেও এই বিষয়টাকে খারিজ করার যুক্তি খাড়া করা যায় না। আব্বাস তাঁর নায়কের দিওয়ানা ছিলেন, তাঁর রোহতাস দখল সমর্থন করেছেন, পূরণমল হত্যার অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়েছেন। মুঘল দরবারি হিসেবে আব্বাসের পক্ষে বাবরের প্রশাসনিক দক্ষতা সমালোচনা আকবরের প্রশংসা কুড়িয়েছে। যতদূর সম্ভব আব্বাস পাঠককে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাতে বাবরের সমালোচনা করেছেন। এটা তাঁর শের শাহের সম্বন্ধে করা মন্তব্যগুলোর ক্ষেত্রেও সত্য। তিনি সম্পূর্ণভাবে, তাঁর নায়ক শের শাহের পাশে দাঁড়ালেও তিনি মনে করছেন, সময়েরে ডাক অনুযায়ী, এই ক্ষেত্রে তিনি সম্পূর্ণভাবে শের শাহর পক্ষে দাঁড়াতে পারবেন না।
দাদরার যুদ্ধের পরে সুলতান মাহমুদ নেতার পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তার অদক্ষতার দরুন, সুন্দরের প্রতি আকর্ষণের দরুন, সম্পদ না থাকার দরুন তার পক্ষে এই ধরণের উচ্চাকাঙ্ক্ষী কাজে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব ছিল না। তিনি সব কিছু ছেড়ে পাটনায় নির্বাসনে সবার অলক্ষ্যে দিন কাটাবেন সাধারণ মানুষের মত, এবং যে সব ঘটনা তার দেশের দশের ভাগ্য নির্ধারণ করছে, সে সব নিয়ে তিনি নির্বিকার থাকবেন আগামী দশ বছর এবং ১৫৪২-৪৩-এ তিনি মারা যাবেন।
দাদরা থেকে হুমায়ুনের লক্ষ্য হল চুনার
বেনারস থেকে ১৬ মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে আর মির্জাপুর থেকে ১৮ মাইল পূর্বে গঙ্গার দক্ষিণ তীরে তীরে পাহাড়ের ওপরে তৈরি চুনার কেল্লার তৎকালীন সময়ে রণনৈতিক গুরুত্ব ছিল অসামান্য। গঙ্গার গা বেয়ে পাথুরে পাহাড় উঠে গেছে ১৫০ ফুট – মাটিতে তার ৭০০ মিটার দৈর্ঘ আর ৩০০ মিটার প্রস্থ। নদী বেয়ে পাহাড়ের গায়ে ৫০-৬০ টনের পণ্য নিয়ে আসা যায়। পাহাড় খুব লম্বা না হলেও এর খাড়াই পাহাড় চড়ার পক্ষে যথেষ্ট অসুবিধে তৈরি করেছে।
ঐতিহাসিকভাবে বলা হয় এটিতে উজ্জয়নীর বিক্রমাদিত্যের ভাই ভতৃনাথের বাস। এখানে তিনি সাধুর মত জীবন কাটাতেন। মুসলমান সাম্রাজ্যে কেল্লাটি বার বার হাত বদল হয়েছে। এখানেই, পাহাড়ের তলায় স্থানীয় সন্ত শাহ কাসিম সুলেইমানের মাজার।
সুলতান ইব্রাহিম লোদি চুনারে তার কেন্দ্রিয় খাজাঞ্চিখানা বানালে চুনারের পরিচিতি চৌদিক ছড়িয়ে পড়ে। খাজাঞ্চি আর কেল্লার দায়িত্ব দেওয়া হল তাজ খান সারংখানিকে (Taj Khan Sarangkhani)। বাবরও চুনার কেল্লার অবস্থানকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি ১৫২৯-এ কেল্লা পরিদর্শনে আসেন। তাজ খান, বাবরের অনুগত প্রশাসক হলেও, কেল্লা প্রশাসনের দায়িত্ব দিলেন সুলতান জুনায়েদকে। জৌনপুরের প্রশাসনের দায়িত্ব নিলেন মহম্মদ জামান মির্জা। তাজ খানের অধিকার খর্ব হলেও তিনি অধস্তন আমলা হসেবে কেল্লায় রইলেন। ১৫২৯-এর জুনে আগরায় পদার্পনের পর বাবর আর পূর্ব রাজ্যগুলোয় আসেন নি। মহম্মদ জুনায়েদ মির্জাকে রাজধানীতে ডেকে নেওয়া হয়, পূর্বাঞ্চলের সমস্যার সমাধান করতে তাঁর দক্ষতা নিয়ে পড়ে রইলেন সুলতান জুনায়েদ। চুনারের দায়িত্ব তাজ খানকে দিয়ে তাঁকে জৌনপুরে রাজনীতির ডাকে ফিরে যেতে হবে। জুনায়েদ শের খানের প্রতিও সহমর্মী হয়ে তাঁর পুরোনো জায়গির, মহম্মদ খান শূরের কবল থেকে ফিরে পেতে সাহায্য করেন। (চলবে)