ষষ্ঠ অধ্যায়
নতুন শহর তৈরির নীতিমালা চরমতম বাস্তববাদী মুঘল সম্রাট হুমায়ুন ভেবেচিন্তেই তৈরি করেছিলেন। তিনি অভিজ্ঞতায় দেখেছিলেন লোদি সাম্রাজ্যের তৈরি দিল্লি শহর শ্রেণী এবং গোষ্ঠী নির্ভর হয়ে মানুষে মানুষে ভেদাভেদের রেখা টেনেরেখেছিল কঠোর নির্দেশ অনুসরণ করে। নিজেদের গোষ্ঠীর মানুষ ছাড়া আফগানেরা অন্য সমাজের মানুষদের মানুষ বলে গণ্য করত না। শাসক হিসেবে লোদিরা আফগান আমীর ছাড়া কোনও সমাজের অভিজাতকে মান্যতা দেয় নি। সিকান্দার লোদির ধর্মান্ধতা আদতে উদারপন্থী মুসলমান দর্শনের বিরুদ্ধে সংগঠিত অত্যাচার।
তাই দিলখোলা হুমায়ুন নতুন শহরের নাম দিলেন দিনপনাহ [বা বিশ্বাসীর আশ্রয়]। তিনি যথাযোগ্য পরিকল্পনায় গড়ে ওঠার আগেই দিনপনাহ শহরের কাঠামোকে প্রত্যেক দেশের বুদ্ধিমান আর পণ্ডিতদের বসবাসের আদর্শ স্থলে পরিণত করার মানসিকতা তৈরি করলেন। মহম্মদ তুঘলকের দৌলতাবাদের মত দিনপনাহ তৈরির নীতি প্রণয়ন করে হুমায়ুন বার্তা দিলেন, তার সাম্রাজ্য প্রত্যেক প্রজার জন্যে সহনশীল হবে, বিচার দিতে পক্ষপাত করবে না, সবার সাথে সম আচরন করবে। কিন্তু মহম্মদ তুঘলক যেমন নিজের প্রজাকে বঞ্চিত করে বিদেশিদের সব সুযোগ সুবিধের ব্যবস্থা করেছিলেন, হুমায়ুন কিন্তু দেশীয় জ্ঞানীদের সঙ্গে এশিয়াজোড়া বিখ্যাত পণ্ডিত, জ্ঞানী, কবি, ঐতিহাসিক, সুফি, দার্শনিক, চিত্রকর ইত্যাদিদের প্রতিষ্ঠিত শহরে ঠাঁই দিলেন। তাঁর সময় তুর্কি নয়, পারস্য নয়, পশ্চিম বা মধ্য এশিয়াও নয়, দিল্লির দিনপনাহ শহর হয়ে উঠল এশিয়ার বিদ্যাচর্চার কেন্দ্র, প্রখ্যাতদের বাস কেন্দ্র, খ্যাতিপেতে ইচ্ছুক যোগ্য ব্যক্তির আশ্রয় নেওয়ার আকাঙ্ক্ষিত শহর। বিশ্বজোড়া কৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বদের নতুন পত্তন হওয়া শহরে আশ্রয় দিয়ে উদারনৈতিক কৃষ্টিবান সম্রাট, তৎকালীন সমাজের স্বর হয়ে উঠলেন। আমরা আরও একটু এগিয়ে বলতে পারি দিনপনাহ শহর তৈরি এবং ব্যবস্থাপনা নীতির মাধ্যমে হুমায়ুন পরোক্ষে সাফাভি বা উসমানিয় সাম্রাজ্যের অত্যাচার, ধর্মীয় নিপীড়ন নীতির বিরোধিতা করলেন। একইসঙ্গে মাথায় রাখা দরকার আকবর হুমায়ুনের শাসনের বহু নীতি নিজের প্রশাসনে অঙ্গীভূত করবেন। দিনপনাহ’র সহনীয়তার নীতিমালা তাঁর সময়ের হয়ে উঠবে শুলইকুল বা সবার জন্যে শান্তি নীতি — যে নীতি প্রত্যেক মুঘল সম্রাট অনুসরণ করবেন।
আজকে যাকে দিল্লির পুরানা-কিলা এলাকা বলি, সেদিনের নতুন শহর দিনপনাহর কাঠামো আজ প্রায় হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। শাসন কেন্দ্রে থাকা কেল্লাটা এখনও (১৯৩৮-এ লেখক বইটা লিখছেন) দেখা যায়, দেওয়ালটা অনেকটাই বেঁচে আছে। এক সময় শহর ঘিরে যমুনার জল খেলা করত। দেওয়ালটা ছিল ৪০ ফুট উঁচু, আর কেল্লার প্রবেশ পথে লাল দরওয়াজা তৈরি করা হয় স্থাপত্যবিদের জ্ঞাত সর্বোচ্চ কলাকৌশল বাস্তবে বাস্তবায়িত করে। হুমায়ুনের পূর্ত দপ্তর এতই দক্ষ ছিল যে শহরের দেওয়ালটা তৈরি শেষ হয় মাত্র ৯ মাসের মধ্যে ১৫৩৩-এর জুলাই থেকে এপ্রিল ১৫৩৪-এ।
হুমায়ুনের প্রবাসকালে শের শাহ আরও দুটো প্রাসাদ বানান মসজিদ-ই-কিলঅকোনহা আর শেরমণ্ডল। প্রথমটা জামে মসজিদ হিসেবে বহুকাল ব্যবহার হইয়েছে। পরেরটি শেরমণ্ডল জ্ঞানপিপাসুদের অবশ্য গন্তব্য হিসেবে আজও দাঁড়িয়ে আছে সগর্বে মাথা তুলে — একে হুমায়ুন দ্বিতীয়বারের রাজত্বে তাঁর আকাশ দেখার স্থান আর গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহার করবেন। হিন্দাল আর বাবরের তৃতীয় ভাই নাসির মির্জার সন্তান ইয়াদগার নাসির মির্জা বর্ণাঢ্য খেলাত পেলেন আর পেলেন লাজে মোড়া সোনার শিকলির আরব ঘোড়া। এছাড়াও খেলাত পেলেন আবদুল্লা সুলতান, সুলতান আলি মির্জা, আমীর মুবারিজুদ্দিন ফকির আলি আর মির্জা কাসিম আরঘুন। কাসিম আরঘুনকে অতিরিক্ত একটি ঘোড়ার লেজের চামর বা তোঘ উপহার দিলেন সম্রাট, আর আমীর তাঘাইএর ছেলে ইয়ুসুফ বেগকে দামি পারসিক কার্পেট দিলেন। তোপ বিশেষজ্ঞ উস্তাদ আলি কুলিকে একটা শিরস্ত্রাণ, একটা সোনার জরির খেলাত, সোনালি চুরি, কোমরবন্দ আর একটি আরব ঘোড়া দেওয়া হল।
সুলতান বাহাদুর বুঝলেন নতুন শহর তৈরি বা উৎসব উদযাপন সম্রাট আয়োজন করছেন তার সামরিক বিজয়ের প্রতিস্পর্ধী হিসেবে। তিনি সম্রাটের চিন্তা দূর করতে বন্ধুত্বের বার্তা দিয়ে দূত পাঠালেন। হুমায়ুন কিছুটা নিশ্চিত হলেন। তিনিও পাল্টা বন্ধুত্বের বার্তা পাঠালেন। পারস্পরিক সমঝোতার পরিবেশ বেশ কিছু কাল বজায় থাকবে।
দিনপনাহ তৈরি করার পর তিনি আগরা ফিরে এলেন ১৫৩৪-এর জুলাই মাসে। খানজাদা বেগমের আবারও বড় করে বেশ কয়েকটা চড়ুইভাতির ভোজসভা আয়োজন করলেন সম্রাট — এর মধ্যে একটা চড়ুইভাতির ভোজসভাকে শ্রীমতী বেভারিজ বলছেন রহস্যময় চড়ুইভাতি ভোজসভা। অন্য আরেকটা ভোজসভা আয়োজিত হবে হিন্দালের বিবাহের সময়। দুই ভোজসভাতেই শাহী পরিবার আর খানজাদা আর আমীরদের পরিবারের বহু মহিলা অংশ নিয়েছেন। ভোজসভার বিস্তৃত বিবরণ লিখেছেন হুমায়ুনের সৎ বোন গুলবদন বেগম। মহিলাদের একসঙ্গে জড়ো করে এই ধরণের ভোজসভা আয়োজনের প্রথম প্রস্তাব তুলেছিলেন মাহাম বেগ। বর্তমানে তাঁর প্রয়ানের পর তাঁর স্থান নিয়েছেন খানজাদা বেগম। সম্পূর্ণ বর্ণনা গুলবদন বেমন নিজের জবানিতে লিখেগিয়েছেন। একটি বড় আটকোণা অনেকগুলি তলাবিশিষ্ট অভূতপূর্ব সাজানো প্রাসাদের মেঝেতে জলাশয় তৈরি করে তার চার পাশে সুন্দর মহিলা, যুবা পুরুষ, বাদ্যকর এবং মিষ্টিগলার গায়কেরা বসলেন। সম্রাট আর তার বোন খানজাদা, মাহাম বেগের দেওয়া সিংহাসনে বসলেন — মাহাম যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে তিনিই সেই সিংহাসনে বসার অধিকারী ছিলেন। প্রথম তলার ঘরগুলোর নামক ছিল ১) কর্তৃত্ব, ২) সৌভাগ্য, ৩) আনন্দ। প্রাসাদের বাসিন্দা সহ সেই অনুষ্ঠানে আসা অভ্যাগত যেমন মির্জা, গোষ্ঠী প্রধান, অভিজাত, ধর্মতাত্ত্বিক, দরবেশ, সাদা দাড়ি, সেনাপতি, উপাসক, গরীব এবং অভাবী মানুষদের মধ্যে প্রচুর অর্থ বন্টন করা হল। উপস্থিত বাছা বাছা মানুষকে খেলাত উপহার দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় ভোজসভা আরও গুরুত্বের, আয়োজিত হয় মাহাদি খাজার পারিবারিক প্রাসাদে, হুমায়ুনের পরিবারের সঙ্গে আত্মীয় স্থাপনের জন্যে। হিন্দাল আর মাহাদি খাজার বোন সুলতানম বেগমের বাগদান হয়েছিল মাহাম বেগ বেঁচে থাকার সময়েই — কিন্তু মাহামের অসুস্থতার দরুন বড় করে উৎসব আয়োজিত হয় নি, বিবাহের আচার আচরণও তেমনভাবে পালিত হয় নি। এখন খানজাদা প্রস্তাব দিলেন এবারে সুলতানম বেগম আর হিন্দালের মধ্যে বিয়েটা সম্পূর্ণ হোক। কন্যা তার স্বামীর বোন বলে নয়, তিনি সুলতানমকে বাচ্চা বয়স থেকেই বড় করে তুলেছিলেন এবং তাঁর অভিভাবকও বটে। এই বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হওয়া হুমায়ুনের মহত্তর হৃদয়কে চিহ্নিত করে। মাত্র কয়েক বছর আগেই মাহাদি খানা হুমায়ুনের সিংহাসনের আরোহনের অন্যতম [দুর্বল] প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মাহাদি খাজা। কিন্তু হুমায়ুন মনের মধ্যে মাহাদি সম্বন্ধে যে বিদ্বেষ পুষে রাখেন নি, সেটা বোঝা গেল এই বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হওয়ার সূত্রে। গুলবদন বর্ণনা করছেন বিবাহ সূত্রে বর আর বধুকে নানান ধরণের গহনা, দামি পরিধেয়, আসবাবপত্র, শাহী কারখানা থেকে আনানো নানান উপহার দ্রব্য, তুর্কি, ককেসাস, রুশ আর বিসেনিয়ার ঘোড়া, হাতি আর দাস। (চলবে)