ষষ্ঠ অধ্যায়
উৎসবের আমেজ ফুরিয়ে গেলেও হুমায়ুন আরও বেশ কিছুকাল আগরায় সময় কাটাবেন। মাঝেমধ্যে যমুনার অপর পারে মহিলা মহলকে সঙ্গে নিয়ে বিশাল বিশাল শিবির তৈরি করে মাসের পর মাস রাত কাটাতেন খোলা আকাশের তলায়। একবার একটা আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটল। যমুনার তীরে সন্ধ্যেবেলায় ঠাণ্ডা হাওয়ায় সম্রাট আর শাহী মহিলা মহল খুব আনন্দ করতেন। বহু সময়ই সম্রাটের বয়স্কা স্ত্রীরা, বোনেরা হুমায়ুনের সঙ্গ পেতেন না। তারা একা একা সময় কাটাতে বাধ্য হতেন। হুমায়ুনের প্রধানা রাজ্ঞী বেগা বেগম, তাদের প্রতি হুমায়ুনের এই অবজ্ঞার প্রতিবাদ জানিয়ে বললেন, ‘কত দিন আর আপনি আমাদের মত অসহায় মহিলাকে অবজ্ঞা করবেন, আমাদেরও হৃদয় আছে, আমরাও আপনার সঙ্গ চাই। তিন বার আপনি অন্য জেনানার প্রাসাদে গেলেন, তাদের সঙ্গেই রাত দিন আপনি গল্পগুজব আনন্দ করে সময় কাটিয়ে দিলেন, আমাদের দিকে নজরই দিলেন না’। অস্বস্তিতে পড়া বিক্ষুব্ধ সম্রাট খুব বেশি কথা বাড়ান নি। দিন কয়েক পরে তিনি প্রত্যেকজন স্ত্রী আর বোনকে দরবারে ডেকে বললেন, তিনি নিয়মিত আফিম সেবন করেন, তাকে যেন ভুল না বোঝেন তাঁরা, তাঁর সঙ্গে যেন কঠোর ব্যবহার না করেন। মাথায় রাখতে হবে, সম্রাটের উপস্থিতিতে এই সব সমবেত অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল বয়স্ক পিসি, ফুফা, দিদিমার মত সম্পর্কের নারীদের সম্মান দেওয়া, আনন্দ দেওয়া, যারা এক সময় আনন্দিত জীবন যাপন করেছেন, এখন যারা সেই আনন্দময় জীবন হারিয়েছেন, তাদের সুখে রাখা। এই মহিলারা অনেকেই বিধবা। পৃথিবী তাঁদের অনেককেই ভুলে গেছে। কিন্তু ঘটনাটা অন্য রকম ঘটত। বয়স্করা একা হয়ে যেতেন।
অস্বস্তিতে পড়া সম্রাট, বেগা বেগম অন্য শাহী জেনানার সদস্যর পক্ষ থেকে তাঁকে স্বাক্ষরিত আবেদন লিখতে বললেন, ‘হে সম্রাট, জড়ো হওয়া জেনানার মহিলাদের আনন্দ অনুষ্ঠানে আপনি যোগ দিন আর নাই দিন, জেনানার [বয়স্কা] মহিলারা নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় যথেষ্ট আনন্দ খুঁজে নিতে জানেন এবং তাঁরা নিজেদের নিয়েই সন্তুষ্ট আছেন। তাঁদের অভিযোগ নেই’। বহু জেনানা বাধ্য হয়ে সম্রাটের নির্দেশিত আবেদনে স্বাক্ষর করলেন। আবেদনপত্রটি দেখে একমাত্র বাহ্যত অসন্তুষ্ট বেগা বেগম বিড় বিড় করে অসন্তোষের কথা বললেও স্বাক্ষর করতে দেরি করলেন না। আমরা দেখলাম হুমায়ুন তাঁর ওয়ালি-নিমাতানদের কীভাবে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন। বাবার সঙ্গে তাঁর পার্থক্য ছিল, বাবা জেনানায় প্রতি শুক্রবার যেতেন, আর হুমায়ুন যান রবিবার আর মঙ্গলবার রাতে।
সপ্তম অধ্যায়
মহম্মদ জাহান শাহের বিদ্রোহ, আফগানদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অভিযান ১৫৩৪
দিনপনাহ শহর প্রতিষ্ঠা এবং বাহাদুর শাহের সঙ্গে হুমায়ুনের রাজনৈতিক বোঝাপড়া হয়ে যাওয়ার পর ভারতবর্ষীয় শাসকদের মধ্যে হুমায়ুনের অবস্থান অনেকটা সুরক্ষিত এবং প্রভাবশালী হল। হুমায়ুনের উদ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে যে উৎসব এবং দান আর খেতাব দেওয়ার যে অনুষ্ঠান আয়োজন করা য়েছিহল, তার ফলে তার বহু অসন্তুষ্ট আত্মীয় যেমন মহম্মদ জামান মির্জা, মহম্মদ সুলতান মির্জা, সুলতান মির্জার পুত্র উলুঘ মির্জা, শাহ মির্জা হুমায়ুনের প্রতি আরও সন্তুষ্ট হয়ে তার পাশে এসে দাঁড়ানোর বদলে বাধ্যতামূলকভাবে তাঁর বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। হুমায়ুন বিরোধীরা সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উন্মুখ। হুমায়ুনের নরম স্বভাব আর মৃত্যুর সময় বাবার দেওয়া উপদেশ মাথায় রেখে তিনি বিদ্রোহী আত্মীয়দের বিরুদ্ধে হাত খুলে চরম ব্যবস্থা নিতে পারছিলেন না। বছর চারেক আগে এরা সকলেই তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন, তার বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছেন, তিনি তাদের সম্মুখ সমরে হারিয়েছেন, তারপরে দুষ্কর্ম ভুলেগিয়ে তাদের ক্ষমা করেছেন, তাদের জায়গির ফিরিয়ে দিয়েছেন। সম্রাটের সমঝোতার নীতিতে মহম্মদ জামান মির্জা বিহারে এবং মহম্মদ সুলতান মির্জা কনৌজে জায়গির ফেরত পেলেন। মহম্মদ জামানের ক্ষেত্রে হুমায়ুন একটু বেশিই দয়া দেখিয়েছেন। মির্জা সম্রাটের সৎ বোন মাসুমা সুলতান বেগমের বর, ফলে তিনি শাহী পরিবারের সদস্য না হয়েও বিবাহসূত্রে শাহী পরিবারের অংশ, সম্রাটের শালাও। তিনি মহম্মদ জামানকে শুধু পুনর্বাসনই দিলেন না, তাঁর বোনকে আগরার আগরার বাইরের অভিযানে জুড়ে নিয়ে দামি তাঁবুতে বাস করার অধিকার সম্মানও ফিরিয়ে দিলেন। সম্রাটের আশা ছিল মির্জা আর তার দিদি মাসুমা সুলতানা শাহী পরিবারের সঙ্গে মিলেমিশে থাকবে এবং মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে।
১৫৩৪-এর জুলাইতে রাজনৈতিক আকাশে নীল মেঘের ছড়াছড়ি। সে সময় দুই মির্জা, তাদের থেকে বংশ গরীমায় অনেক কম শাহজাদা ওয়ালি খুব মির্জার সঙ্গে হাত মিলি শাহী পরিবার আর মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেন। হুমায়ুন সহজে তাদের বিদ্রোহ দমন করলেন, মহম্মদ জাহান মির্জাকে বন্দী করলেন, একই সঙ্গে মহম্মদ সুলতান মির্জা আর দুই পুত্র উলুঘ মির্জা আর শাহ মির্জাও ধরা পড়ল। সদাশয় সম্রাট আবারও তাদের সমস্ত দুষ্কর্ম ক্ষমা করলেন মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে। এবারে তিনি তাঁদের মনে রাখার মত শাস্তি দিতে মনস্থির করলেন। তিন প্রধান মির্জা — ওয়ালি, জামা আর সুলতানকে অন্ধ করার নির্দেশ জারি করলেন এবং যতদিন এই শাস্তি পূর্ণ করা না হয় ততদিন তাদের এবং যুবা মির্জাকে কারাগারে বন্দী করে রাখার নির্দেশ জারি করলেন। বন্দীদের হুমায়ুনের মামা এবং শ্বশুর মির্জা ইয়াদগার তাঘাইএর নজরদারিতে রাখা হল। ওরালি খুব আর মহম্মদ সুলতানকে অন্ধ করা হল, বয়সের জন্য মহম্মদ জামানকে এই শাস্তির বাইরে রাখার অনুরোধ করলেন জেলার। জেলারের গাফিলতিতে তাঁর চোখে ধুলো দিয়ে মহম্মদ জামান, গুজরাটে বাহাদুর শাহের রাজত্বে পালালেন এবং তাঁকে জামান মুঘল রাজত্ব আক্রমনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার পরামর্শ দিতে থাকবেন।
সম্রাট হুমায়ুন বিহারে তৈমুরী বিদ্রোহীদের দমন করার পরে বিহারের আফগানদেরও মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে আনার পরিকল্পনা করলেন। আমরা দেখেছি তিনি সাম্প্রতিক অতীতে ১৫৩২-এর ডিসেম্বরে চুনার কেল্লা শের খানের নিয়ন্ত্রণে রাখার চুক্তি করেছিলেন। তখন থেকে শের খানের ভাগ্য চমকাচ্ছিল। বিহারে নুহানি গোষ্ঠী আর শের খান লোদি সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখার ফলে শের খান বিহারে নেতা বিহীন আফগানদের নেতা হয়ে উঠলেন নিজের যোগ্যতায়। (চলবে)