সপ্তম অধ্যায়
মহম্মদ জাহান শাহের বিদ্রোহ, আফগানদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অভিযান ১৫৩৪
১৫৩২-এ বাংলার সুলতান নুসরত শাহের সুলতানিকে প্রতিস্থাপিত করলেন সুলতান আলাউদ্দিন ফিরোজ খান। নুসরতের বিদ্রোহী ভাই আর ফিরোজের কাকা/চাচা চার মাস পরেই আলাউদ্দিন ফিরোজ খানকে খুন করে ১৫৩৩-এর মে মাসে নিজে সিংহাসনে আরোহন করলেন সুলতান গিয়াসুদ্দিন মহম্মদ শাহ নাম নিয়ে। মহম্মদ শাহের সিংহাসন দখলদারি বাংলার অভিজাতরা যেমন তার শালা, বিহারের হাজিপুরের শাসক মকদুমইআলম এবং অন্যান্যরা মেনে নিলেন না। মখদুমের সঙ্গে বিরোধের পরিবেশ তৈরি হল। নিজেকে বাঁচাতে এবং নিজের অবস্থান জোরদার করতে মখদুম, শের খানের সঙ্গে দোস্তি করলেন, দুজনের মধ্যে কার্যকর সুদূরপ্রসারী সামরিক জোট গড়ে উঠল। শের খানকে পাশে পেয়ে তাঁর প্রভুর পুত্রের হত্যাকারীকে শাস্তি দিতে কোমর বাঁধলেন নতুন সুলতান। মাহামুদ, মুঙ্গেরের শাসক কুতুব খানকে মকদুমকে শাস্তি দিতে বললেও যুদ্ধে শের খানের সহায়তায় মখদুম জিতলেন। কুতুবকে আরও বড় বাহিনী পাঠানো হল, এবারে আর মকদুমের পাশে শের খান রইলেন না। যুদ্ধে কুতুব জিতলেন, যুদ্ধক্ষেত্রেই মকদুম বীরগতি প্রাপ্ত হলেন। কিন্তু মখদুমের বিপুল সম্পদ বাংলার সুলতানের হাতে এল না, মখদুম মরার আগেই সেটা শের খানের হাতে উপহার স্বরূপ দিয়েগিয়েছিলেন। শের খান আরও ধনী হলেন।
ইতিমধ্যে শের খানের সঙ্গে তাঁর প্রভু জালালুদ্দিন এবং নুহানি গোত্রের আফগান গোষ্ঠী প্রধানের দ্বন্দ্ব চরমে উঠল। জালাল এবং অন্য গোত্র প্রধানেরা নিজেদের বঞ্চিত বোধ করছিলেন। বাংলার সুলতানের সঙ্গে জোট তৈরি করে তারা ঠিক করলেন শের খানকে বিহার থেকে উচ্ছেদ করে নিজেরাই বাংলার সুলতানের অধীনে বিহার শাসন করবেন।
শের খানের পাশ থেকে নুহানি গোত্র সরে গেলেও তার খুব একটা ক্ষতিবৃদ্ধি হল না, অন্য আফগান গোষ্ঠীর কাছে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন, তারা নিজেদেরই প্রয়োজনে তাঁর পাশে দাঁড়ল। বিহারের প্রজাদের অবস্থার উন্নতির জন্যে তিনি প্রত্যেক আফগানকে তাঁর সঙ্গে জোট বাঁধতে আহ্বান জানালেন এমন কী তিনি সুদূর আফগানিস্তানের আফগানদের ডাক দিলেন বিহার বাঁচাতে আসার বা শামিল হওয়ার জন্যে, জনগণের সম্পদ আর প্রাণ বাঁচানোর জন্যে। তিনি যে প্রস্তাবগুলো দিলেন —
১) প্রতিটি অভাবী আফগানকে রোজগার দেওয়া
২) প্রতিজন আফগান যেমন তাঁর নিজের উন্নতির জন্যে পরিশ্রম করবেন, তেমনি রাজ্যের উন্নতিও তাঁর লক্ষ্য হবে।
৩) ভিক্ষাবৃত্তি কঠোর হাতে দমন করা হবে। প্রতি বেকার আর অলস ব্যক্তিকে জোর করে কাজে লাগানো হবে।
৪) একতা বজায় রাখা, অপচয় বা নকলিকরণ (ডুপ্লিকেশন) যাতে না হয় তার জন্যে তাঁর নেতৃত্বে কঠোর নজরদারি চালানো হবে। তাছাড়া আফগানদের দুর্বলতার জায়গা নরম দুর্নীতিও নতুন করে সাজানো হবে। তিনি প্রজাদের স্বার্থ দেখার কথাও যেমন বললেন, তেমনি বললেন আগ্রাসনের মুখ থেকে তাঁর প্রজাদের অধিকার রক্ষাও তাঁর দায়িত্ব।
মাকদুম মারা যাবারে পরেও মাহামুদ শাহ থামেন নি। তিনি শের খানের দিকে নজর ঘোরালেন। বেশ কয়েকটা যুদ্ধ হল। প্রথমটায় আগে উল্লিখিত কুতুব খান মারা গেল, দ্বিতীয় যুদ্ধ মুঙ্গেরের ১১ মাইল পশ্চিমে গঙ্গার তীরে সুরজগড়ে কুতুব পুত্র ইব্রাহিম পরাজিত হলেন। দুটো সফল যুদ্ধে শের খান তাঁর শাসন এলাকা বৃদ্ধি করলেন, প্রথম যুদ্ধে তিনি বাড় অবদি এগোলেন দ্বিতীয় সাফল্যে তিনি প্রায় মুঙ্গের ছুঁলেন।
হুমায়ুন ১৫৩৪র সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আগরায় ছিলেন। তিনি দূর থেকে নিশ্চই শের খানের ওপর নজর রাখছিলেন এবং শঙ্কিত দৃষ্টিতে শের খানের প্রজাদের একজোট করার উদ্যম আর সাম্রাজ্য বৃদ্ধি প্রক্রিয়া লক্ষ্য করছিলেন। কিন্তু তখনও তাঁর বিশ্বাস ছিল শের খান মুঘল অভিজাত, তিনি যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছেন, সব কটা মুঘল শাসনের স্বার্থ সম্বন্ধীয়। তিনি তখনও আগ্রাসী শের খানের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনী পাঠানোর কথা ভাবলেন না।
শের খানের বিরুদ্ধে বাহিনী পাঠাতে না পারার অন্যতম কারন ছিল গুজরাটের শাসকের বাহাদুর শাহর মুঘল সাম্রাজ্যের সামনে ক্রমশ হুমকি হয়ে উঠতে থাকা। বেশ কয়েকবার বাহাদুর শাহ, সম্রাট হুমায়ুনকে আন্তরিক বন্ধুত্বের বার্তা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিককালে তিনি সে পথ থেকে সরে এসে, বিগত বেশ কয়েক মাসে বন্ধুপূর্ণ আলাপের পরিবেশ খতম করলেন, কারন তিনি দেখছিলেন শের খান আর বাহাদুর শাহের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পরিবেশ তৈরি হচ্ছিল। দুজনেই বুঝতে পারছিলেন হুমাইয়ুন কোনও না কোনও সময়ে কোনও না কোনও ছলে তাদের দুজনের একজনকে আক্রমণ করতে পারেন। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন একজন আক্রান্ত হলে অন্যজন তার সাহায্যে ছুটে যাবেন। মাথায় রাখতে হবে, উত্তর ভারতবর্ষে বাহাদুর শাহের কর্মকাণ্ডে শঙ্কিত হয়ে হুমায়ুন, শের খানের সঙ্গে চুনারের চুক্তি করে রাজধানীতে ফিরে যেতে বাধ্য হন। এখন যখন শের খান বেশ কয়েকটা বিজয় হাসিল করেছেন, তখন বাহাদুরের আক্রমণের শংকায় হুমায়ুন আর শের খানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান করার থেকেও বিরত থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
কুতুবের মৃত্যু আর কুতুব পুত্রের হারের ফলে হুমায়ুন বুঝতে পারছিলেন, শের খানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে বেশি দেরি করলে সমস্যা আরও পেকে ওঠার সম্ভাবনা আছে। তাঁর মনে হচ্ছিল দিনপনাহ নিয়ে যে হাইপ উঠেছে, তার ফলে কিছু দিন হয়ত বাহাদুর শাহ মাথা নিচু করে থাকবেন, কিন্তু খুব সহজেই তিনি বিহারের আফগানদের বিরুদ্ধে একটা ছোট সামরিক অভিযান করে তাদের নিজের পক্ষে টেনে নিতে পারবেন। ১৫৩৪-এর সেপ্টেম্বরে একটা বাহিনী নিয়ে তিনি কাল্পি আর কানার জেলা পর্যন্ত সামরিক অভিযানে গিয়ে শুনলেন বাহাদুর শাহ নতুন করে জেগে উঠে চিতোর অবরোধ করেছেন, তার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন আলম খান আলাউদ্দিন (ইবরাহিম লোদির কাকা, বাবর বেশ কিছুদিন তাঁকে দিল্লির সিংহাসন দখলের জন্যে সমর্থন দেবেন) আলম খানের ছেলে তাতার খান আর কারাগার থেকে পালানো মহম্মদ জামান মির্জা। বাহাদুর এবারে প্রবলভাবে দিল্লি আক্রমনের পরিকল্পনা করলেন। বাধ্য হয়ে তাকে আগরায় ফিরে আসতে হল। (চলবে)