অষ্টম অধ্যায়
গুজরাটের বাহাদুর শাহ (১৫৩৬-৩৭)
গুজরাট অঞ্চল আজকের গুজরাটি ভাষা বলা দুই অঞ্চল কচ্ছ আর কাথিয়াবাড়, পালানপুর থেকে দমন পর্যন্ত বম্বে প্রেসিডেন্সি এলাকা নিবদ্ধ ছিল। মোট এলাকা ৪০,০০০ মাইল, যার অর্ধেক নিয়ে ছিল কাথিয়াবাড় উপদ্বীপ। মধ্যযুগে সিন্ধু আর খণ্ডেশও এই রাজ্যের অংশ ছিল, ১৫৩১-এর পরে মালওয়াও এর অধীনে আসে। সদর ছিল সবরমতীর তীরে আহমেদাবাদ। মূল ভূমিখণ্ডে মাহি, বানাস, নর্মদা আর তাপ্তি। গুজরাটে খুব বড় পাহাড় ছিল না, নর্মদা আর তাপ্তি ঘিরে কিছু ছোটখাটো টিলা ছিল। বিন্ধ্য আর সাতপুরা পাহাড়ের পশ্চিমপ্রান্তে দুঙ্গারপুর, গিরিনার আর পালিতানা পাহাড় এবং আবু পাহাড় — এটাই উচ্চতমঅঞ্চল।
গুজরাত প্রদেশ ধনী ছিল তার দিউ, গোগো, ক্যাম্বে, বারুচ, সুরেয়াট, নাভাসারি, বুলসার এবং দমন বন্দরগুলো। ফলে পারসিক বণিকেরা শুধু বহিঃশুল্ক দিত ৬০,০০০ টাকা। তাপ্তি নদীর মুখে লোহাচুর মিলত। রাজপিপলায় পাওয়া যেত দামি কর্নেলিয়ান পাথর। চাল, গম, বাজরা, ডাল উৎপন্ন হত। কিন্তু রাজ্যের সব থেকে বড় বাণিজ্য পণ্য ছিল তুলো। পাওয়া যেত খেজুর আর তাল। আর পাওয়া যেত কাঁঠাল, আম, তরমুজ, খরমুজ। ডুমুর আর বাওবাব জাতের গাছ (adansonia) থেকে ডাল কেটে শুকিয়ে জালে বেঁধে মাছ ধরার জাল ভাসিয়ে রাখতেন জেলেরা। আবুলফজল বলেছেন আম ইত্যাদির জন্যে গুজরাটকে বাগান বলা যায়।
গুজরাট ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের কারিগরি পণ্য উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। সুতির ওপর আঁকা, ছবি আঁকাসিলের ওপর খোদাই ইত্যাদি কারিগরি আইন-ই-আকবরিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়া সুতি আর রেশমের কাপড়ের ওপর সোনার সুতোর সূচী কর্ম যেমন চিরা আর ফোতা, ভেলভেট (মলমল) আর ব্রোকেড এই রাজ্যে উৎপন্ন হত; এছাড়াও তুর্কি, ইওরোপ, পারস্য থেকে আমদানি করা ভেলভেট (মলমল) আর ব্রোকেডের ওপরে সূচীর কাজ হত। উচ্চমানের ছুরি, তরোয়াল, তীর, ধনুক ইত্যাদি তৈরির দক্ষ কারিগর ছিল রাজ্যজুড়ে। তাছাড়া দামি ভারি গয়নার কাজও হত। রূপো আমদানি করা হত তুর্কি আর মেসোপটেমিয়া থেকে। শ্রীকৃষ্ণ কাথিওয়াবাড় উপদ্বীপের দ্বারকায় শেষ জীবন কাটিয়েছেন। এখানেই মানবলীলা সম্বরণ করেছেন। সৌরাষ্ট্র এবং অন্যান্য অঞ্চল অশোকের রাজত্বের অংশ ছিল। সমুদ্রগুপ্ত্র এবং দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সময় গুজরাটের শক রাজারা রাজস্ব দিতেন চতুর্থ শতাব্দে। গুপ্ত বংশের পতনের পরে মৈত্রেক গোষ্ঠী বল্লভীতে রাজধানী স্থাপন করে। হর্ষের সময় (৬০৬-৪৭) বল্লভী তাঁর রাজস্বদায়ি রাজত্ব ছিল। হর্ষের মৃত্যুর পর ভারতবর্ষ যখন বহু ছোট ছোট রাজ্যে ভেঙে যায়, সে সময় গুজরাটের রাজারা স্বাধীন প্রশাসন চালিয়েছেন। জনৈক মূলরাজের হাতে তৈরি চালুক্য আর সোলাঙ্কি রাজত্ব ১২৪২ পর্যন্ত স্বাধীন সাম্রাজ্য চালিয়েছেন, এই সময় শেষ শাসক দ্বিতীয় ভীম দেব মারা যান।
১১৭৯ তিনি মহম্মদ ঘুরি’কে হারান। কিন্তু ১৫ বছর পর মহম্মদ ঘুরির সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবক সামরিক অভিযান করেন এবং গুজরাট লুঠ করেন। ভীম দেবের পতনের পর বাঘেলা মন্ত্রীরা রাজত্ব চালিয়েছেন বেশ কিছুকাল। ১২৪৩-এ বিশাল দেব শাসন করতেন। এর প্রনাতি কর্ণ দেবকে আলাউদ্দিনের সেনাপতি উলুঘ খান আর নুসরত খান পরাজিত করেন ১২৮৭-তে। এই সময় থেকে গুজরাট দিল্লির প্রদেশ হিসেবে কাজ করেছে। ১৩৯১-তে জাফর খান শাসক হিসেবে মনোনীত হন। ১৩৯৬-তে তুঘলক সাম্রাজ্যের পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী মহম্মদ শাহ আর নসরত শাহ পরস্পরের মধ্যে দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে তিনি নিজের অবস্থা জোরদার করেন এবং স্বাধীনতা ঘোষনা করেন। ১৪০৪-এ তিনি সুলতান মজফফর শাহ উপাধি গ্রহণ করবেন। বাহাদুর শাহ তাঁর উত্তরাধিকারী। তিনি মহম্মদ বেঘারার (১৪৫৮-১৫১১) নাতি। শাহজাদা থাকাকালীন তাঁর উৎসাহ আর দক্ষতা অনেকের নজর কাড়ে। তাঁর বাবা দ্বিতীয় মুজফফর শাহ (১৫১১-২৬) ভাই সিকন্দর খানকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করলে তিনি রাজ্য ছেড়ে দিল্লিতে যান। ইতিমধ্যে বাবর প্রথম এবং শেষবারের মত সিন্ধু পেরিয়ে দৌলত খানকে বন্দী করে পাঞ্জাব দখল নিয়ে দ্রুত পানিপথের দিকে এগিয়ে এলেন ভারতবর্ষের ভাগ্যবিধাতা হওয়ার স্বপ্নপূরণে। বাহাদুর, ইব্রাহিম লোদির শিবিরে যোগ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র সাজাবার জন্যে দক্ষিণ পূর্ব এলাকায় ঘাঁটি গাড়লেন এবং ক্রমশ আফগান সেনানায়কেরা বাহাদুর শাহকে পছন্দ করা শুরু করবে এবং আফগান গোত্রগুলোর মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা দেখে ইব্রাহিম লোদির ঈর্ষা হল। তিনি প্রকাশ্য কাজকর্ম করা বন্ধ করলেন এবং পানিপথের যুদ্ধ হল ১৮ এপ্রিল ১৫২৮-এ। তিনি যুদ্ধে যোগ দিলেন না। দূর থেকে যুদ্ধের গতি প্রকৃতি অনুসরণ করে বাবরের রণনীতিতে প্রভাবিত হলেন, এবং বাবরের অনুগামীদের অসমান্য শৌর্য তাঁকে মুগ্ধ করল। সামনাসামনি তিনি মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখলেন বহুকাল। তিনি দেখছিলেন, কঠোর মুঘল পাথরে ঘা লেগে কাঁচের তৈরি দেহ নিয়ে ভারতীয় রাজারা খান খান হচ্ছিলেন একটা ঠোকা লাগতেই। আফগানদের পরাজয়ের পরে বাহাদুর শাহ জৌনপুরের শাসক হলেন। সুলতান ইব্রাহিমের রাজত্বের শেষ সময়টায় পূর্ব দিকে ব্যাপক গোলযোগ চলছিল বাহাদুর খান নুহানির নেতৃত্বে।
পানিপথে ইব্রাহিম লোদির পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে আফগানেরা বুঝলেন বিরোধীপক্ষ সামরিক দিক থেকে অনেকটাই দক্ষ এবং তাদের নেতা এই ধাক্কা সামলাতে পারেন নি। মুঘলদের দক্ষতার পদচিহ্নে আফগানেরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় আতঙ্কিত হয়ে উপযুক্ত নেতা খুঁজতে শুরু করলেন, তাদের মনে হল, এই শূন্যস্থান পূরণ করার নেতৃত্ব নুহানিরাই দিতে পারে। তাই তারা বাহাদুর শাহকে জৌনপুরের শাসক হতে আমন্ত্রণ জানায়। গুজরাটেও শাসক শূন্যতা দেখা গেল। পাণিপথ যুদ্ধের ১১ দিন আগে, ১৭ এপ্রিল ১৫২৬-এ তাঁর বাবা মুজফফর শাহ মারা গেলেন। আমীর আমলারা যোগ্য শাসক চিহ্নিত করার কাজে একমত হচ্ছিলেন না। আমীরেরা তিন ভাই সিকন্দর, বাহাদুর আর তৃতীয় ভাই লতিফের শিবিরে ভাগ হয়ে গেল। প্রয়াত সুলতান সিকন্দরকে যেহেতু তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছেন, এবং তিনিই রাজধানীতে আছেন তাই তাঁকেই সিংহাসনে বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হল তড়িঘড়িতে। কিন্তু ইমাদুলমুলক খুশকদম, খুশকদম খুদাবন্দ খান আল-ইজি এবং অন্য যারা এই মাথামোটা সিদ্ধান্তের জন্য প্রমাদ গুণলেন। ৫ বছর শাসন করার পর ১৫২৬-এর ১২ এপ্রিল সিকন্দর খুশকদম ইমাদুলমুলকের হাতে নিহত হলেন।
বেশ কিছু আফগান যেমন তাজ খান নারপালি সিকন্দরের পক্ষে ছিলেন আর কায়সার খান ছিলেন লতিফের পক্ষে। দুই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী খুশকদম খুদাবন্দ খান আল-ইজি এবং ইমাদুলমুলক খুশকদম, যারা সিকন্দরকে ক্ষমতায় এনে তাঁকে হত্যা কলেন, তারা মুজফফর শাহের ছোটছেলে নাসির খানের পক্ষে দাঁড়ালেন। তারা আমিরদের বিপুল অর্থ দিলেও যেহেতু এই দানের সঙ্গে জায়গির ছিল না, তাই তারা, তাদের পাশে দাঁরালেন না। ইমাদুলমুলক খুশকদম পাশেরে রাজ্য বেরারের প্রধান ইমাদুলমুলক, বাবর আর রাণা সঙ্গকে লিখলেন তার সরকারকে সমর্থন জানাতে। কিন্তু এর ফলে যেহেতু গুজরাটের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হবে, তাই তাজ খান নারলাইর মত কিছু গোত্র প্রধান ইমাদুলমুলক খুশকদমের অন্য রাজ্যের সমর্থ চাওয়ার পরিকল্পনা সমর্থন করলেন না। তারা পায়ান্দা খানকে বাহাদুরের কাছে রাজ্যের প্রধান হওয়ার প্রস্তাব দিয়ে দূত করে পাঠালেন দ্রুত। পায়ান্দা খান তাঁর সঙ্গে বাগপতে বৈঠক করলেন। বাহাদুর জৌনপুরের সিংহাসনের চাইতে নিজের রাজ্য গুজরাটের ক্ষমতায় আসতে চাইছিলেন। তিনি জৌনপুরী অভিজাতদের সঙ্গে গুজরাট থেকে আসা প্রস্তাব নিয়ে আলাপ আলোচনা করে সমর্থন আদায় করে দ্রুত নিজের রাজ্যে পৌঁছে ১৫২৬-এর ১১ জুন গুজরাটের সিংহাসনে আরোহন করলেন।
সিংহাসনে আরোহন করে তাঁর প্রথম কাজ হল দাদা সিকন্দরের খুনি ইমাদুলমুলক খুশকদম এবং তাঁর অন্য কোলাবরেটরকে হত্যা করা, ভাই লতিফের আর খোঁজ পাওয়া গেল না। ছোট ভাই দ্বিতীয় মাহামুদ শাহ উপাধি নেওয়া নাবালক নাসির খানও খুব হলেন, আরেক বয়সজ ভাই চাঁদ খান মাণ্ডুতে পালিয়ে গেলেন। সমস্ত থ্রেট মুক্ত হয়ে বাহাদুর শাহ সিংহাসনে আরোহন করলেন। সুলতান বাহাদুর শাহ গুজরাট সাসন করেছেন প্রায় ১১ বছর (জুলাই ১৫২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ১৫৩৭)। তিনি তার পূর্বজ মাহামুদ বেঘারার মত গুজরাটের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে গণ্য হন। সিংহাসনে বসে তিনি দক্ষতাতা উদ্যম আর তাকতের জন্যে বিখ্যাত হন আর নিজেকে হজরত শায়খ জিউ এবং তার বংশধরদের প্রতি উতসর্গ করেন। বাহাদুর শাহের সিংহাসনের আরোহনের পরে গুজরাট আশ্চর্যজনক বিকাশের সময়ে প্রবেশ করল। মাত্র ২০ বছর বয়সী বাহাদুর রাজ্যের ক্ষমতার সমীকরণ সামলে, এত দিনের রাজনৈতিক উত্তেজনা সামাল দিয়ে প্রতুবেশী রাজ্য জয়ে বেরোলেন (১) ১৫২১৭-২৯-এ বেরারের আলাউদ্দিন ইমাদুল মুলকের এবং খণ্ডেশের দ্বিতীয় মহম্মদের ডাকে দাড়া দিয়ে তিনি বুরহান নিজাম শাহকে (১৫০৯-৫৩) পিছু হঠতে বাধ্য করেন, তাঁর নামে খুতবা পড়ান; (২) ১৫৩০-৩১-এ পর্তুগিজ দমনে ঘাঁটী বেঁধে বসেছিল। তিনি নৌযুদ্ধে পর্তুগিজদের দমন ছাড়া করলেন; (৩) ১৫৩১-এ রানা সঙ্গের সঙ্গে হাত মিলয়ে মালওয়া দখল নিলেন, মালওয়া স্বাধীনতা হারাল। তাঁর বাবা মুজফফরের সময়ে মালওয়ার সুলতান ছিলেন দ্বিতীয় মাহামুদ (১৫১১-১৫৩১)। দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ব সম্পর্ক ছিল। মুজফফর দ্বিতীয় মহম্মদের স্বার্থে বিভিন্ন শহরে গুজরাটি বাহিনীর ছাউনি তৈরি করেন। (চলবে)