প্রথম অধ্যায়
শাহজাদা হুমায়ুন, ১৫০৮-৩০
শাহজাদা শুধু পড়াশোনা করেই দিন কাটাতেন না। বাবর যখন লোদিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান করছেন, তখন হুমায়ুন যুদ্ধক্ষেত্রে পূর্ণরূপে যোগ দিলেন। ২০ এপ্রিল ১৫২৬-এ পানিপথের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে, খাজা কালাম আর হিন্দু বেগের মত অভিজ্ঞ সেনাপতির সঙ্গে তিনি সেনাবাহিনীর ভিতরের বলয় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে ছিলেন। বাবর কীভাবে গোলাবারুদের জোরে উদ্ধার পেলেন, সেটা অন্য কোনও ঐতিহাসিক সন্দর্ভে পড়ে নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু আমরা এই প্রসঙ্গে একটাই মন্তব্য করব, হুমায়ুন এই যুদ্ধে যথেষ্ট দায়িত্ববান ভূমিকা পালন করেন।
যুদ্ধের পরে লোদিদের দুটি রাজধানীর অন্যতম আগরা দখলে হুমায়ুনকে পাঠানো হয়। যুবা শাহজাদা আগরায় পৌঁছে দেখেন মালিক দাদ কারনানি, মালিক সুরদুক এবং ফিরোজ খান মেওয়াতি তাঁকে বাধা দেওয়ার জন্যে রণসাজে সজ্জিত হয়েছেন। তিনি আগরা অবরোধ করলেন, যতক্ষণ না বাবর এসে উপস্থিত হন অবরোধ চলল। যদিও শহর আর তার তোষাখানা তাঁর দায়িত্বে ছিল, কিন্তু তিনি শহরের বাইরে যাওয়া মূল রাস্তায় থানাগেড়ে অবরোধ করেছিলেন কারন যুদ্ধ জয়ের আনন্দে সামরিক শৃঙ্খলা তুচ্ছ করে তাঁর বহু সেনা স্থানীয় অঞ্চল লুঠতে বেরিয়েছিলেন।
দিক দুয়েক পরে তিনি গোয়ালিয়রের বিক্রমজিতকে হারান। রাজা যুদ্ধক্ষেত্রেই মারা যাওয়ার আগে দক্ষিণ থেকে আলাউদ্দিনের আনা কোহইনুর হুমায়ুনকে দিয়ে যান। হুমায়ুন যুদ্ধ জয়ের ফলে পাওয়া হিরেটি বাবরের হাতে দিলে, তিনি সেটি হুমায়ুনকেই রাখার উদার অনুমতি দেন। বাবর হিরের বিশদ বিবরণ লিখেগিয়েছেন। তিনি বলছেন হিরেটি ৮ মিসক্যাল ওজনের এবং সারা বিশ্বের মানুষের আড়াই দিনের খাওয়ারের মূল্যের সমান। তিনি নিজেই লিখছেন হিরেটির ওজন সাড়ে তিন তোলা। কয়েক দিন পরে বাবর বাহিনী নিয়ে হাজির হয়ে পরাজিত সেনাপতিদের ওপরে মৃত্যুদণ্ড ধার্য করলেও, অন্যান্যদের হস্তক্ষেপে মালিক দাদ করনানি এবং অন্য প্রত্যেককে ক্ষমা করেন এবং তাদের সকলকে তাদের জীবন সম্পত্তি ফিরিয়ে দেন। তাঁর উদারতার একটা উদাহরণ হল গ্রেফতার হওয়া ইব্রাহিমের মা’কে বছরে সাত লক্ষ দ্বিগুণ দামের বা ৩৫,০০০ টাকার পরগণার প্রশাসক করা।
বাবর দিল্লি আর আগরা দখল নিয়ে প্রত্যেককে উপহার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। হুমায়ুন যেহেতু প্রথম সন্তান, তাই তিনি ৭০ লক্ষ দাম [তামার মুদ্রা — অনুবাদক], অগণিত সম্পদ, প্রাসাদ, সম্ভলের জায়গির পেলেন। তাছাড়া পানিপথের পরে বাবর যখন পাঞ্জাবের দিকে অভিযান করচ্ছিলেন, সে সময়ের হুমায়ুনকে দেওয়া হিসর ফিরুজার অধিকারও রাখতে দিলেন। ফরিস্তা একে সাড়ে তিন লক্ষ দামের সম্পত্তি বলছেন, তাহলে অবশ্যই এটা ডবল দামে হিসেব করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর অন্যান্য সেনাপতিদের থাকবন্দী অনুযায়ী উপহার আর সম্মান দেওয়া হল।
কিন্তু বাবর এখানেই থামলেন না। তাঁর আশেপাশের মানুষদের উপহারে ভরিয়ে দেওয়ার পরে তিনি সমরখন্দ, খুরাসান, কাশগর এবং কাশগরের আশেপাশের আত্মীয়-স্বজন, সমরখন্দ, খুরাসান, মক্কা আর মদিনার সন্তদের উপহার পাঠিয়েও তাঁর হৃদয় শান্ত হল না, তিনি তিনি কাবুল উপত্যকা আর ভরসকের প্রত্যেক পুরুষ-নারী, মুক্ত দাস, বৃদ্ধ যুবক প্রজার জন্যে এক শাহরুখি করে অর্থ সাহায্য পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত হলেন। ফরিস্তা বলছেন এর পর থেকে তাঁকে কলন্দর নাম দেওয়া হল এবং বাবর তাঁর এই জনগণের দেওয়া উপাধি গর্ব করে ধারণ করলেন। অযোধ্যার মসজিদে তিনি লেখালেন ‘বিশ্বে রাজাদের মধ্যে বিখ্যাত বাবর কলন্দর’। এত দান-ধ্যান করার পরে দিল্লি আগরার অভিজাতদের ভাঁড়ার শূন্য হয়ে যাওয়ার কথা তিনি স্বয়ং লিখছেন। ফলে তাঁকে ৩০% পর্যন্ত শুল্ক চাপাতে হল। হুমায়ুন যখন সিংহাসনে উঠছেন, তিনি প্রায় শূন্য খাজাঞ্চি নিয়েই রাজত্ব শুরু করছেন, যদিও হুমায়ুন কোনও দিনই বাবার অপরিমিত দানের জন্যে যে তাঁর রাজত্বে রাষ্ট্রীয় সম্পদে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেই তথ্য স্বীকার করেন নি।
পানিপথের যুদ্ধের পর হুমায়ুন পূর্ব ভারতে আফগানদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করলেন। বাবরের রাজত্বে দুটো অঞ্চলের সমস্যা কুরেকুরে খাচ্ছিল একটি পূর্ব ভারতবর্ষের আফগানদের শক্তি বাড়ার সমস্যা আর অন্যটি দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের রাজপুত সমস্যা। হুমায়ুন স্বয়ং স্বেচ্ছায় পূর্ব দেশে অভিযানে যাওয়ার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। বড় ছেলের সামরিক দায়িত্ব নেওয়ার ইচ্ছেকে সম্মান জানিয়ে হুমায়ুনকে সামরিক অভিযানের স্বাধীন দায়িত্ব দিলেন সম্রাট বাবর। হুমায়ুন কানপুরের কাছে জাজমাউতে নাসির খান আর মারুফ ফারমুলির মুখোমুখি হলেন। শূরবীর শাহজাদা হুমায়ুনের প্রতাপে আফগান প্রতাপ নিবৃত্ত হল। আফগানেরা মুঘল বাহিনীর মুখোমুখি না হতে পেরে ভীরুর মত পালিয়ে গেল; হুমায়ুন তাদের তাড়া করে দূর করদিলেন ২০০ মাইল পূর্বে। জৌনপুর ছিল পূর্বভারতবর্ষ প্রবেশ সীমান্তের প্রধানতম মুঘল শিবির। খারিদ শহরে কিছু দিন থেকে হুমায়ুন জৌনপুরের মুঘল ঘাঁটিতে ফিরে এসে বিশ্রাম নিলেন। তার পরিকল্পনা ছিল আফগান প্রধান ফাতাহ খান সারওয়ানিকে মাহাদি খাজার সঙ্গে বাবরের দরবারে পাঠিয়ে তুষ্ট করা। ফাতাহ খান মুঘলদের ছেড়ে বিহারের মাহিমুদ লোদির বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি খানইজাহান উপাধিতে বিন্দুমাত্রও খুশি ছিলেন না। দাবি ছিল তাঁকে বাবার আজম হুমায়ুন উপাধি অর্পন করতে হবে। কিন্তু এই উপাধি বাবর তাকে দেন নি কারন তাঁর বড় ছেলে হুমায়ুনের নামের সঙ্গে তার উপাধির বয়ান মিলে যায়। তাছাড়া সাধারণ একজন আফগান গোষ্ঠীপতিকে আজম বা প্রধান উপাধি দেওয়াও তিনি যুক্তিযুক্ত মনে করেন নি। ফাতাহ খান ছাড়াও অন্য যারা মুঘল পক্ষ ছাড়লেন, তাদের মধ্যে ছিলেন বিবান, বায়াজিদ এবং শের খান; কিন্তু তারা কেন মুঘল সঙ্গ ছাড়লেন তার নির্দিষ্ট কারন পাওয়া যায় নি। এই পক্ষ বদলের সময় হুমায়ুন কিছুটা সাফল্য পেলেন — তিনি জালাল খান জিঘাতের পুত্রকে মুঘল পক্ষে রাখলেন এবং আগরার দরবারে যেতে সম্মত করালেন।
১৫২৭-এর শুরুতে মুঘল পশ্চিম সীমান্ত বিনার দিকে দ্রুত এগিয়ে আসা রাণা সঙ্গের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রায় বাবর হুমায়ুনকে সঙ্গে নিলেন। ৬ জানুয়ারি তিনি আগরায় বাবার সঙ্গে মুঘল বাহিনীতে যোগ দেবেন নিজের বাহিনী নিয়ে। খানুয়ার যুদ্ধে ভিতরের ডানদিকের পক্ষ ধরে রাখলেন এবং বিজয়ের পরে তাঁকে আলোয়ারের তোষাখানা নিয়ন্ত্রণের সম্মান দেওয়া হল। (চলবে)