অষ্টম অধ্যায়
গুজরাটের বাহাদুর শাহ (১৫৩৬-৩৭)
বাহাদুরের ক্ষমতা আরোহনের পরে মাহামুদের সঙ্গে গুজরাটের সম্পর্ক প্রথমের দিকে শীতল হয় এবং তার পরে সম্পর্কের পতন ঘটে। নতুন করে নিরাপত্তা সুরক্ষিত করার বিষয়টা মাহামুদকে চিন্তায় রেখেছিল। মাহামুদ ইতিমধ্যে বাহাদুরের ভাই চাঁদ খানকে আশ্রয় দিয়েছেন। চাঁদ খান ছিলেন বাহাদুরের সিংহাসনের প্রতিযোগী। তা ছাড়া মাহামুদ, রানা সঙ্গ দুচারটে জেলায় সেনা পাঠিয়েছিলেন। দুয়ে মিলে গুজরাটের মালওয়া আক্রমনের বাহানা তৈরি ছিল। বাহাদুরের ধারনা ছিল মাহামুদ তার ভাই চাঁদ খানকে গুজরাটের হাতে তুলে দেবে। মাহামুদ দুচারবার রাজি হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছিল না। বাহাদুর সেনা পাঠিয়ে মাহামুদকে গ্রেফতার করলেন ১৫৩১-এ এবং মাণ্ডু গুজরাটের অধীনে এল।
৪) ঐ বছর তিনি আহমদনগরের বুরহান নিজাম এবং তার ভাইপো খণ্ডেশের মহম্মদকে শাহ উপাধি ব্যবহার করতে অনুমতি দিলেন। তারা নিজেদের নাম সাজালেন শাহেনশা ইপাধি দিয়ে। মীরাটি সিকন্দরি লিখছে বিদরের আমীর বারিদুল মুমালিক নিজের নাম খুতবা পড়ালেন।
৫) ১৫৩২-এর মে মাসে রাইসেন দখল হল। খণ্ডেশের পরে দৃষ্টি দিলেন আধা স্বাধীন রাজপুত রাজ্য মালওয়ার দিকে। গত ২০ বছরে তারা গোটা মালওয়া বিশেষ করে এর পূর্বাঞ্চল রাজপুতদের কয়েকটা গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করতে থাকায় সে সব রাজপুতের নাম হয় পূর্বাইয়া রাজপুত। প্রধান শাসক ছিলেন সিলহাদি, রাইসেন অঞ্চলের শাসক। বাহাদুর, সিলহাদির রাজ্য দখল করতে মনস্থ করলেন। সিলিহাদি শেষ পর্যন্ত তার হারেম বাহাদুরকে সঁপে দেওয়ার প্রস্তাব এবং তার পরে বুরহানউলমুলকের উদ্যমে নিজের ধর্ম পরিবর্তন করে সালাউদ্দিন রাখলেও তিনি বাহাদুরের আগ্রাসন থেকে ছাড় পেলেন না। সিলহাদি এবং তার ভাই লক্ষ্মণ সিংহ বাহাদুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বীরগতি প্রাপ্ত হলেন। তার জেনানার মহিলারা জৌহর ব্রত আপন করে প্রাণ বিসর্জন দিলেন। রাইসেনের পতন ঘটল বাহাদুরের কামানদারের দক্ষতায় ১৫৩২-এর মে মাসে।
বাহাদুর তার অধিকাংশ রাজপুত জায়গির চান্দেরি, ভিলসা, রাইসেন শাসনের অধিকার দিলেন আলম খান লোদিকে, কাল্পির নিয়ন্ত্রণ দিলেন ইব্রাহিমের হাতে। হুমায়ুনের সঙ্গ ছেড়ে দিলে আলম খানকে বাহাদুর আশ্রয় দিলেন একটা শর্তে, পূর্বাইয়া রাজপুতদের ক্ষমতা ছাঁটা। তবে আলমের কাল্পি দখল ছিল নামমাত্র, মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল বাহাদুরের হাতে।
৬) ১৫৩৩ বাহাদুরের চিতোরের প্রথম অবরোধের বর্ণনা দেওয়ার আগে, সেই সময়ের আশেপাশে চিতোর ঘিরে ঘটনবাবলী নিয়ে দুচারটে কথা বলা দরকার। রতন সিংহকে উত্তরাধিকারী চিহ্নিত করে রাণা সঙ্গ মারা যান ১৫২৮-এর ১২৯ জানুয়ারি। ১৫৩১ পর্যন্ত রতন সিংহ রাজত্ব করেন, তারই মধ্যে রাণার পরিবারে পারিবারিক দ্বন্দ্ব বাজারে নেমে আসে, রতন সিংহ পারিবারিক ঝগড়ায় তীব্র আহত হয়ে মারা যান।
নিঃসন্তান রতনের ছোট ভাই বিক্রমাদিত্য বা বিক্রমাজিৎ। রণথম্বোরের রাজকুমার বিক্রমাজিৎ ১৫২৮-এর অক্টোবরে রণথম্বোর শহর বাবরের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এর বদলে চিতোর বা বিয়ানার সিংহাসনে তার অধিকার থাকবে এমন একটা রাজনৈতিক রফা হয় বাবরের সঙ্গে। বিক্রমাজিৎ বিখ্যাত বাবা বা অকর্মণ্য দাদার যোগ্যতার কাছাকাছি রাজনেতা ছিলেন না। প্রশাসনিক দক্ষতা তার ছিল না। টডের ভাষায় বিক্রমাজিৎ হলেন দাম্ভিক, আবেগী আর প্রতিশোধপরায়ন। শুধু ব্যক্তিগত অনুচর আর ৭ হাজার কুস্তিগীর ছিল তার দেহরক্ষী, তাদের মধ্যেই তিনি ক্ষমতার যত রকম প্রসাদ ছিল সব কিছু বেঁটে দিতেন — বাইরের কোনও মানুষ কোনও সরকারি সুবিধে পেতেন ন। বৃদ্ধ, বয়স্ক রাজপুত গোত্র গোষ্ঠীপতি, অভিজ্ঞ সেনাপতিদের তিনি উপহাস করতেন। ফলে তারা রাজধানীতে না থেকে নিজেদের জায়গীরে সময় কাটাতেন। তিনি কোনও দিনই প্রশাসনিক কাজে মন দেন নি — রাজ্যের মানুষ তাঁর প্রশাসনের নাম দিয়েছিল ‘পাপা বাই কা রাজ’ ‘স্ত্রৈন বাবার রাজত্ব’।
বাহাদুর বহুকাল গোপনে চিতোরের দিকে লক্ষ্য রেখে সাম্রাজ্য বিস্তার রাজনীতিটির গুটি সাজাচ্ছিলেন। যত দিন না রাজনৈতিক পরিবেশ তাঁর অনুকূলে পেকে ওঠে, ততদিন তিনি চিতোর অভিযানের গোপন ইচ্ছে দমন করে নিজেকে সংযত করে রেখেছিলেন। রানা সঙ্গ এবং রতন সিংহ উভয়েই তাঁর সিংহাসন আরোহন নিয়ে শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছিলেন। শত্রুঞ্জয় মন্দির সারাই করা নিয়ে তারা বিধিবদ্ধ অনুমতিও নিয়েছিলেন। নতুন রাণার কোনও কিছুই কেয়ার না করার মনোভাব এবং তাঁকে অবহেলা করে চলায় বাহাদুর মানসিকভাবে চিতোর অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়েফেলেন। গুজরাটের সুলতানের আক্রমন থেকে সিলহাদি রক্ষা করে নিজের সুরক্ষা বলয়কে জোরদার অভূতপূর্ব সুযোগ এসেছিল বিক্রমজিতের। চরমতম আলস্যে ইনি সেই সুযোগও হাত থেকে যেতে দিলেন। সিলহাদি রক্ষা করতে সেনা তৈরি করলেও সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় প্রথমত তিনি সিলহাদি রক্ষা করতে পারলেন না আর দ্বিতীয়ত সিলহাদি রক্ষায় তার সাজো সাজো রর বাহাদুরকে ক্ষুব্ধ করে তুলল। বাহাদুর দেখলেন দুর্বুদ্ধির রাজা বিক্রমাজিৎকে সাহায্য করার মত সেনাপতি রাজার দরবারে অনুপস্থিত। এই সুযোগে তিনি চিতোর আক্রমনের পরিকল্পনা সাজালেন।
চিতোর আক্রমনের মুখড়া হিসেবে সেনাপতি রুমি খানকে দিয়ে প্রথমে রণথম্বোর দখল করালেন। অন্য সেনাপতি যেমন খণ্ডেশের মহম্মদ, খুদাবন্দ খান, আলতাফ খান গগরাউম, কানুর, তিলহাতি আর পারগুসার মত ছোট কেল্লা একের পর এক দখলে নিলেন পরিশ্রম না করেই। হাল্কা চালে তিনি এগিয়ে চললেন ১৬ নভেম্বর ১৫৩২-এ চিতোরে পৌঁছবার আগে রাণার দূত উপঢৌকন আর মালওয়া দখল করে পাওয়া এক জেলার নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে দেখা করতে এল। বাহাদুর দূতের প্রস্তাব ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন। তাঁকে রানার ভাইপো নরসিংহ দেব চিতোরের বাহিনীর বাস্তব অবস্থার খবর পাঠিয়েছিলেন। আলাউদ্দিন আলম খানের পুত্র তাতার খান লোদিকে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে চিতোরে পৌঁছতে নির্দেশ দিলেন, তাঁর নির্দেশে কার্যকর করে অন্য সেনাপতির পৌঁছনোর ৪ দিন আগেই ১৫৩৩-এর ৩০ জানুয়ারি বাহিনী চিতোরে পৌঁছল। বাহাদুর হেলতেদুলতে পরে পৌঁছলেন। তারিখইবাহাদুরশাহীতে দাবি করা হচ্ছে, বাহাদুর শাহের মত এত বড় বাহিনী নিয়ে চিতোর দখলের চেষ্টা এর আগে কেউ করে নি।
অবরোধের মূল দায়িত্ব পেলেন কামান বিশেষজ্ঞ রুমি খান। কেউ কেউ বলেছে সে ইওরোপজাত, তবে মনে করা হয় রুমি খান তুর্কিজাত সেনাপতি। ১৫৩১-এ সঙ্গীসাথী নিয়ে সে গুজরাটের উপকূলে পৌঁছলে তাকে গুজরাটি বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়। দিউর প্রশাসক বিখ্যাত মালিক আয়াজের পুত্র মালিক তুঘানের পদাভিষিক্ত হয় রুমি খান। অসম্ভব উচ্চাকাঙ্ক্ষী রুমি খান এইটুকু উন্নতিতে সন্তুষ্ট হলেন না, তিনি রণথম্বোর বা চিতোর যে কোনও একটা অভিযানের দায়িত্ব পান শর্ত দুর্গের প্রশাসন তাঁর হাতে রাখার শর্তে। সমস্যা হল গুজরাট রাজ, রণথম্বোর দখলের আগে সেই প্রতিশ্রুতি রুমি খানকে দিলেও, যুদ্ধ জয়ের পরে তিনি মত বদল করলেন। রুমি খানকে দায়িত্ব না দিয়ে রণথম্বোর প্রশাসনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব দিলেন আরেক আমীর নিশান খানকে। শোনা যায় কেউ বাহাদুরকে বলেছিল, রুমি খানের মত অল্প দিনের পরিচয়ের বিদেশি সেনাপতিকে এই রকম গুরুত্বপূর্ণ কেল্লার ভার না দিতে। প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করা সুলতানকে রুমি ক্ষমা করেন নি।
চিতোর বা চিত্রকূট ভূমি থেকে ৫০০ মিটার উঁচুতে তৈরি কেল্লা। ৩.২৫ মাইল লম্বা আর আধ মাইল চওড়া সমভূমি সামনে, কাছেই গম্ভীর নদী। বলা হয় এই শহর দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীমের হাতে তৈরি। এটা মোরি রাজপুতদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, বাপ্পা রাওয়াল এটি দখল নেন ৭৩৪-এ। তখন থেকে ১৫৬৭ পর্যন্ত চিতোর ছিল মেওয়ার রাজ্যের রাজধানী। সেই বছর রাজধানী চিতোর থেকে উদয়পুর চলে যায়। (চলবে)