অষ্টম অধ্যায়
গুজরাটের বাহাদুর শাহ (১৫৩৬-৩৭)
১৩০৩-এ চিতোর দখল নেন আলাউদ্দিন খলজি, বাহাদুর শাহ দখল নেন ১৫৩৫-এ, আকবর দখল নিলেন ১৬৬৭-এ। এর পর আরও ৫০ বছর মেওয়ারের ওপর বিশাল রাজনৈতিক ঝড় বয়ে যাবে। রুমি খান পাশের একটি টিলায় কামান বসিয়ে অবরোধ শুরু করেন। সাধারণ রাস্তা আর সুড়ঙ্গ তৈরি হল কেল্লার নিরাপত্তা ধ্বংস করতে। রাণার মা রাণী কর্ণাবতী হুমায়ুনের সাহায্য প্রার্থনা করলেন। কোনও উত্তর না আসায় রাজা গোয়ালিয়রে গিয়ে সেখানে ২ মাস কাটালেন। রাণী পরাজয় স্বীকার করলেন মালওয়ার জেলাগুলোর হস্তান্তরের সঙ্গে দ্বিতীয় মহম্মদের থেকে পাওয়া দামি পাথর খোচিত কোমরবন্ধ, দামি পাথরে মোড়া শিরস্ত্রাণ, ১০টি হাতি, ১০০ ঘোড়া, ৫ কোটি টঙ্কা। এইটুকুতেই বাহাদুর ক্ষান্ত দিলেন, চুক্তি স্বাক্ষর হল ১৫৩৩-এর ২৪ মার্চ।
৭) বাহাদুর রাজপুতানার আরও উত্তরে আজমেঢ় আর নাগোর দখল করলেন ১৫৩৩-এ। রাজপুতানা দুভাগে ভাগ হল।
৮) নভেম্বর ১৫৩৪-এ মার্চে ১৫৩৫ — চিতোরের দ্বিতীয় অবরোধ। গত ২০ মাসের শান্তিপর্বে রাণা খুব কিছু সুবিধা করে উঠতে পারেন নি, আগের মত অলস, কেয়ারলেসভাবে দিন কাটানোর সংবাদে বাহাদুর আবার চিতোর আক্রমনের সিদ্ধান্ত নিলেন এবং লোইচা যুদ্ধে রাজপুতদের হার হল, বড় সেনাপতিরা রাজাকে একা ছেড়ে পালাল। তিনি বড় বাহিনী নিয়ে চিতোর ঘিরে বসলেন। বাহিনী আসার খবর পেয়েও রাণা বাহিনী তৈরির উৎসাহ দেখালেন না। মা রাণী কর্ণাবতী লড়াইএর রশি নিজের হাতে তুলে নিলেন। তিনি সরদারদের রাজ্যত বাঁচানোর ডাক দিলেন। সিসোদিয়া গোষ্ঠী প্রধানেরা যোগ দিল বাধ্য হয়ে। সম্মান হারানো বিক্রমাদিত্য আর তার নাবালক বাচ্চাকে বুঁদিতে পাঠিয়ে কেল্লার সুরক্ষার ভার দেওয়া হলদেবলিয়া প্রতাপগড়ের রাওয়াত বাগ সিংকে। রাওয়াত বুঝলেন এই ছোট, মনোবলহারা বাহিনী নিয়ে যুদ্ধ করা অসম্ভব। আক্রমনের পরিকল্পনা বাতিল করে নিরাপত্তা জোরদার করার জন্যে কেল্লার প্রত্যেকটা দরজায় এক এক জন গোষ্ঠীপতিকে দায়িত্ব দিলেন। তিনি নিজে বসলেন ভৈরব দরজায়, সোলাঙ্কি ভৈরব দাসকে দিলেন হনুমান পোলের দায়িত্ব আর দিলওয়ারার ঝালা রাজ রানা সজ্জাকে দিলেন গণেশ পোলের দায়িত্ব।
আগের মত এবারেও তিনি রুমি খানকে দায়িত্ব দিলেন যুদ্ধের। দক্ষিণ পশ্চিম কোণের একটি ছোট পাহাড়েও কামান তুলে ১৫৩৫-এর মার্চে ২০ গজ দূরে বিকা কোহের দিকে গোলান্দাজ করলেন দ্রুতলয়ে। অর্জুন হাদা মারাগেলেন, তার বাহিনীকে ভৈরব পোল, সুরজ পোল আর লাখোটার বাড়িতে মোতায়েন করা হল। প্রথম দরজায় বাঘ সিং সেনাপতি আর তার ভাইপো রাওয়াত নরবাদের সঙ্গে মারা গেলেন। অন্যান্য দরজার গোষ্ঠীপতিরাও মারা যেতে লাগল। উদয়পুর রাজ্য কা ইতিহাসে যে তালিকা দেওয়া হয়েছে
১) দেবলিয়া-প্রতাপগড়ের বাঘ সিং
২) দাইসুরির সোলাঙ্কি ভৈরব
৩) দিলওয়ারার রাজ রানা সজ্জা
৪) রাওয়াত দুদা, রাওয়াত সাত্তা আর রাওয়াত কাম্মা এবং চন্দ্রাবতেরাও
৫) সোনাগড়ের মালা
৬) রাওয়াত দেবীদাস
৭) রাওয়াত বাঘ
8) রাওয়াত নন্দ
৯) দোদিয়া ভাণ্ড
রাজপুত পঞ্জিকা সূত্রে জানা যায় ৩২,০০০ পুরুষ-নারী জৌহর ব্রত পালন করে মারা যান। ৮ মার্চ ১৫৩৫-এ কেল্লা দখলের পরে প্রতিশ্রুতি মত বাহাদুর কেল্লার ভার, রুমি খানকে না দিয়ে তুলে দিলেন বুরহানউলমুলককে। দ্বিতীয়বারের জন্যে বাহাদুরের কথা না রাখার জন্যে রুমি খান আহত হলেন। পরের অধ্যায়ে দেখব রুমি খান কীভাবে প্রতিশোধ নেবেন।
নবম অধ্যায়
গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহ আর মুঘল সাম্রাজ্যের শাহী উদ্বাস্তুরা (১৫৩৪)
বাহাদুর শাহ ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে দানশীলতা আর রাজকীয় গুণের জন্যে জনগণের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠেন। দূরদূরান্তের গরীব মানুষ তাঁর জনপ্রিয়তায় আকৃষ্ট হয়ে গুজরাটে অভিবাসিত হলেন। খুব সম্প্রতি কালের রাজনৈতিক চক্করে বহু আফগান গোষ্ঠী নায়ক শাসক থেকে সাধারণ মানুষে পরিণত হয়েছেন। সাধারণ আফগান সেনা এবং আফগান গোত্র প্রধান, এমন কী বিখ্যাত সেনাপতিরাও নিজেদের উচ্চ সামাজিক থাকবন্দী সামলাতে বাহাদুরের দরবারে এসে জড়ো হলেন। এদের মধ্যে দুজনেরর কথা না বললেই নয়, একজন হলেন কাল্পির প্রশাসক আলম খান জিঘাত। তিনি বিহারে ১৫২৯-এ আফগানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাবরের সঙ্গী ছিলেন। কিন্তু হুমায়ুনের সঙ্গে যে কোনও কারনেই হোক মানাতে না পেরে গুজরাটে বাহাদুরের দরবারে আশ্রয় পান। ১৫৩২-এর মে মাসে রাইসেনের পতনের পর এই অঞ্চলের জায়গির পান তিনি, এর সঙ্গে জুড়ে দেন ভিলসা আর চান্দেরি। নাগোর বাহাদুর শাহ আজমেঢ়, রণথম্বোর আর মালওয়া দখলের পর এটাই ছিল দুই রাজ্যের কমন বাউণ্ডারি। আলম খান বাহাদুর শাহের পক্ষে, হুমায়ুনের বিপক্ষে ধরাপড়ে বিকলাঙ্গ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই করেছেন।
ইতিহাস সাক্ষী বাহাদুর শাহের পক্ষে আরও একজন আফগান গোষ্ঠী প্রধান লড়াই করেছেন, তাঁর নাম সুলতান আলম খান আলাউদ্দিন লোদি। ছেলের নাম তাতার খান। তিনি সুলুতান বাহালুল লোদির ছেলে এবং ইবরাহিমের শেষ দিনগুলোতে তিনিও দিল্লির সিংহাসনের জন্যে প্রতিযোগিতা করেছেন। প্রথম যুগে বাবর তাঁকে সমর্থন জানান, কিন্তু তাঁর অদক্ষতায় তিনি আলাউদ্দিন লোদির পাশ থেকে সরে গিয়ে দিল্লির সুলতান ইবরাহিমের বিরুদ্ধে নিজে লড়ার সিদ্ধান্ত নেন। পানিপথের যুদ্ধে আমরা আলাউদ্দিনকে দিল্লির সুলতান নয়, বাদাকশনের কিলাইজাফরের বন্দী হিসেবে দেখি। সেখান থেকে তিনি পালিয়ে গুজরাটে বাহাদুর শাহের দরবারে উপস্থিত হন।
আলম খান আলাউদ্দিন তার রাজরক্তের উত্তরাধিকার ভুলে যান নি। বাহাদুরের দরবারে সে সব নিয়ে মাঝেমধ্যেই সক্রিয় হয়ে উঠছিলেন তাতার খান। সক্রিয় যুবা তাতার খানের বাহাদুর শাহের দরবারে সুযোগ পেলেই বাবার দিল্লির সিংহাসন উদ্ধারের জন্যে সক্রিয় হয়ে উঠতেন। বাহাদুর, তাতারকে দক্ষ সামরিক নেতা হিসেবে পছন্দ করতেন, কিন্তু বাবাকে দিল্লির সিংহাসনে পুনর্বাসনের বিষয়ে তাঁর কোনও প্রস্তাবই তিনি কানে তুলতেন না। কিন্তু তাতারের আশা ছিল, বাহাদুর, তাঁর পিতা মুজফফর যেভাবে মালওয়ার সিংহাসন দ্বিতীয় মাহামুদকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, একই ভাবে তিনি আলম খানের দিল্লির সিংহাসন দখলের প্রকল্পকে ব্যর্থ হতে দেবেওন না। কিন্তু বেশ কিছু কারনের জন্যে বাহাদুর, তাতারের প্রকল্পটিতে উৎসাহিত হন নি
১) আলম খান কোনও দিনই দিল্লির সিংহাসনে বসেন নি, ফলে দ্বিতীয় মাহামুদকে যেভাবে মালওয়ার সিংহাসন ফেরত দেওয়া হয়েছিল, সেটা আলম খানের ক্ষেত্রে খাটে না।
২) বাহাদুর, আলম খানকে দক্ষ শাসক হিসেবে গণ্য করতেন না। তাতার যদি নিজের জন্যে সিংহাসনের দাবি জানাতেন, তাহলে হয়ত বাহাদুর শাহ তার পাশে দাঁরাতেন, কিন্তু আলম খানের মত অপদার্থ রাজপুরুষের পাশে দাঁড়াতে চান নি।
৩) বাহাদুরের রাজত্বে পালিয়ে আসার আগে তিনি বহুকাল আকারাগারে ছিলেন। ১৫৩৪-এ তাঁকে মুঘল সাম্রাজ্যের খুব বেশি মানুষ চিনত না।
৪) আলম খানকে সিংহাসনে বসাবার উদ্যমের একমাত্র রাস্তা ছিল মুঘল বাহিনীকে পরাস্ত করা। এও বিষয়ে তাঁর ইতঃস্তত করাই স্বাভাবিক। তিনি পানিপথে মুঘল বাহিনীর কার্যকলাপ, দক্ষতা দূর থেকে লক্ষ করেছেন। সেই দিন থেকে একটা বিষয়ে তিনি নিশ্চিত হয়ে যান, এই মুহূর্তে আফগান বাহিনীকে ধরে, এমন কোনও দক্ষ দেশিয় বাহিনী নেই, যা মুঘলদের মুখোমুখি যুদ্ধে হারাতে পারে। বাহাদুরের এই তত্ত্বের বিরুদ্ধে তাতার খান যুক্তি দেখয়েছেন, বাবরের প্রত্যেকজন সেনাপতি বৃদ্ধ, ভোগলিপ্সায় লিপ্ত, তাদের পক্ষে বাহাদুরের, বাহাদুরির মুখোমুখি হওয়া অসম্ভব। এই যুক্তিতেও বাহাদুরকে নাড়ানো যায় নি। (চলবে)